ছোট গল্পঃ

হারিয়ে যাওয়া কনেদের একজন

শনিবার, ২৬ জুন ২০২১

হারিয়ে যাওয়া কনেদের একজন
প্রচ্ছদঃ সংগৃহিত

যেতে যেতে কেবলই মনে হচ্ছিল রাঙাবৌকে সঙ্গে নিয়ে আসতে পারতাম। ফিরতি পথেও রাঙাবৌয়ের কথা আমার আরো বেশি করে মনে পড়ছিল। গ্রামে বেড়াতে ওর ভালো লাগে এ কথা আমি জানি। শহরে ওর জন্ম, শহরেই বড় হয়েছে। বছরে দু-একবার পরিবারের সঙ্গে গ্রামে বেড়াতে গেছে। আর তাতেই গ্রামের প্রতি ওর ভালোবাসা তৈরি হয়ে গেছে।

শ্যামা আমাকে বলে, গ্রাম থেকে উঠে এসেছি বলেই না-কি আমাকে ও পছন্দ করেছিল। কতবার যে এই একই কথা বলেছে! আমি ওকে খ্যাপানোর জন্য বলি, গেঁয়ো বলে তুমি কি আমায় হাবলু ভেবেছিলে? গ্রামের মানুষকে তুমি যতই মফিজ মনে করো তারা কিন্তু আসলে সেরকম নয়। আর আমি ওদের চাইতে এক ডিগ্রি সরেস।


শ্যামা বলে, নিজের সম্পর্কে যা বলেছ সত্য বলেছ। আমি এ ক’দিনেই তোমাকে কম চিনেছি মনে করো?

চা খেতে খেতে এরকম বিতর্ক আমাদের প্রায়ই হয়। আমি শ্যামার ঝগড়াও উপভোগ করি। আমি গ্রাম থেকে এসেও কেন গ্রামের মানুষের বিরুদ্ধে কথা বলি এই নিয়ে সে আমাকে খোঁটাও দেয়। বলে, তুমি গাঁয়ের ছেলে, এমন কথা কেন বলো তুমি?

আমি বলি, তুমি কি এমন কাউকে দেখেছ যে গ্রাম থেকে উঠে এসে আবার কখনো গ্রামে ফিরে গেছে? এমনকি কৃষিবিজ্ঞান পড়েও শহর ছেড়ে যায় না। যদিও কেউ কেউ যায় সে কেবল মৃত্যুর পর, শেষযাত্রায়।

তুমিও কি মৃত্যুর পর যাবে? আমি কিন্তু ইচ্ছে হলেই কখনো কখনো তোমার গ্রামে গিয়ে থাকব।

সে দেখা যাবে।

মানে কী?

আগে আমাদের একটা সন্তান হোক। ওকে মানুষ করার জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করতে হবে।

তুমি কি গ্রামে থেকে মানুষ হওনি?

গতকাল তদন্ত কাজে গ্রামে যেতে যেতে আর গ্রাম থেকে ফিরতি পথে আমি রাঙাবৌয়ের এসব কথা ভাবছিলাম। আমি শ্যামাকে আদর করে রাঙাবৌ বলি। তাতে ও খুব খুশি। গাঁয়ের লোক না কি বৌকে আদর করে তাই বলে। পথ চলতে চলতে মনে হচ্ছিল ওকে গ্রামে নিয়ে যেতে পারতাম। দাপ্তরিক কাজে যাচ্ছি, সে কারণে দ্বিধা ছিল, মনের ভেতর সঙ্কোচ ছিল। আর গাড়ির সামনের সিটে পেশকার বসেছিল। বিয়ে করে ক’দিন হলো মাত্র বাসা নিয়েছি, বাসায় নতুন বৌ তুলেছি। সময়টা আমাদের রঙিন এটাই যেন বৌ সাথে নিয়ে যাবার বড় বাধা। পেশকারকে না আনলে হতো, কিন্তু সে গাড়িচালককে পথ চিনিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। তবু কোনো কোনো পথ দু’দিকে ডাল হয়ে চলে গেলে গাড়ি থামিয়ে পথচারীদের জিজ্ঞেস করে করে কোন পথে যেতে হবে জেনে নিতে হচ্ছিল। একবার পেছনে ফিরে এসে অন্য পথ পথে যেতে হয়েছিল। আমি কিছু বলিনি। শ্যামাকে বাসায় একলা রেখে আসায় এমনিতেই মনটা ভালো ছিল না। আর ফেরার পথে আরও মনখারাপ লাগছিল। গ্রামে যাওয়াটাই অনর্থক মনে হচ্ছিল। আমি যথাসম্ভব আমার রাঙাবৌয়ের কাছে ফেরার জন্য অধীর হয়ে ছিলাম। কিন্তু গ্রামের আঁকাবাঁকা অপরিসর ভাঙাচোরা পথে গাড়ি গতি নিতেই পারছিল না। আবার কিছুদূর এসে সেই তেপথের মাথায় গাড়ির গতি আরো কমাতে হলো। অতঃপর গাড়িটা থামাতেই হলো। একজন হাত তুলে গাড়ির সামনে দাঁড়াল।

পেশকার আমার দিকে তাকালে আমি কাচ নামিয়ে জিজ্ঞেস করি, কিছু বলবেন?

লোকটা হ্যাঁ-সূচক মাথা ঝাঁকায়। দুপুরের কড়া রোদ থেকে বাঁচাতে সে তার মাথা আর মুখ গামছা দিয়ে ঢেকে রেখেছে। হাতের ইশারায় আমাকে সে নামতেও বলল। আমি কয়েক মুহূর্ত ভেবে নেমেই গেলাম। গাড়ির পেছনে গিয়ে দাঁড়াল সে। কানের কাছে মুখ এনে আমাকে দুটো কথা বলে দ্রুত হেঁটে মাঠে নেমে গেল। আমিও দেরি না করে গাড়িতে উঠে বসলাম।

গাড়ি আবার চলতে থাকলে ফিরে গিয়ে রাঙাবৌয়ের মুখে হাসি ফোটাবার কথা ভাবছিলাম। কিন্তু বাসায় ফিরে গিয়ে ওর অভিমান ভাঙানোর সুযোগ ও আর দিলাই না। দরজা খুলে দিয়ে সে গিয়ে বিছানায় পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল। আমি গোসল সেরে টেবিলে ঢেকে রাখা ঠান্ডা ভাত আর ডাল মাখিয়ে গলাধকরণ করে রাঙাবৌয়ের পাশে শুয়ে পড়ি। বাতি আগেই নিভিয়ে দিয়েছিল ও। ক্লান্ত হয়ে শোবার পরও আমার ঘুম আসছিল না। অন্ধকার যেন আরো ঘন হয়ে নেমেছে। ঘুমের প্রত্যাশায় আঁধার ঘরে চোখ বুজে আছি। আর তখন পথ আটকানো লোকটা আবার সামনে এসে দাঁড়াল।

ঘটনা নিজের চোখে দেখেও লোকটা নিজেকে আড়ালে রাখতে চায়। সে কি সত্য কথাই বলেছে! ওর নামধাম কিছু বলেনি। মুখটাও আমাকে দেখাতে চায়নি। সে যা বলল ওরকম কিছু আমার চোখে পড়েনি। আমি কতকিছুই তো সরিয়ে দেখেছি।

তুমি আমাকে মুক্তি দাও।

কী! কী বললে?

আমি পাশ ফিরে রাঙাবৌয়ের দিকে তাকালাম। দৃষ্টিসহা আঁধারে রাঙাবৌয়ের মুখে তাকালাম। ঘুমিয়ে থাকলে ওকে ফাঁকি দিয়ে আমি মাঝে মাঝেই মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি। কোনো কোনো সময় ওর কাছে ধরাও পড়ে যাই। আজ অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেও সেরকম কিছু ঘটে না। মনে হয় আজ ও গভীর ঘুমে অচেতন। কিন্তু ঘুমের মধ্যে রাঙাবৌ মুক্তি দিতে বলল! তাহলে কি ও আমাকে পছন্দ করে না। জাগ্রত অবস্থায় যা বলতে পারে না ঘুমের ঘোরে তাই বলে ফেলল! নাকি জেগেই আছে। ঘুমের ভান করছে না তো? জেগে থেকে কেউ ঘুমোলে বোঝা যায় না। আমার কী প্রতিক্রিয়া হয় চোখ বুজে সেটা বুঝতে চাইছে? না, রাঙাবৌ আমার সঙ্গে অভিনয় করবে, ছলনা করবে কিংবা আমাকে ভালোবাসে না আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারব না। এ ক’দিনেই আমি ওকে চিনেছি। আমি মনে করি, সেও আমাকে চিনেছে। আমাদের কারো মনের কোনো কোণে কোনো অন্ধকার নেই।

আমি ভাবি, সকাল হোক, ঘুম ভাঙুক, ওর মান আমি ভাঙাব। আমি ওর মান ভাঙানোর জন্য ওর পছন্দের জিনিস ফেরার পথে কিনে নিয়ে এসেছি। ওর অবাক হওয়া চোখও আমাকে পাগল করে তোলে। ফিরে এসে যখন দেখলাম ওর মেজাজ বিগড়ে আছে তখন আর হাতে তুলে দেইনি। ভাবি, তপ্ত কড়াইয়ে ঘি দিলেও জ্বলে ওঠে। যত লাগে ঘি ঢালব ঠান্ডা হলে। এমন মান-অভিমান স্বামী-স্ত্রীতে হয়েই থাকে।

ভাঙা রাস্তায় গাড়ির ঝাঁকুনিতে শরীর যেন কিলিয়ে পাকানো কাঁঠাল হয়ে আছে। আমি ঘুমানোর চেষ্টা করি। কাল অফিসে গিয়ে চিফ স্যারের সঙ্গে বিষয়টা নিয়ে পরামর্শ করতে হবে। যা করতে বলেন সেরকম করব। যেতে বললে আবার যাব। তখন আবার লোকটা আমার চোখের সামনে দিয়ে হেঁটে চলে যায়। আর আমি তাকিয়ে থাকতে থাকতেই সে শূন্য মাঠে উধাও হয়ে যায়। এরপর অন্ধকারে চুড়ির ঝনঝন কানে বাজে। চুড়ির শিঞ্জন! শ্যামা বাসর ঘরেই আমাকে চুড়ির কথা বলেছিল। বলেছিল, একদিন অনেকগুলো চুড়ি পরবে। আর গ্রামের মেয়েদের মতো করে লাল শাড়ি পরবে। ফিতা দিয়ে চিল বাঁধবে। পায়ে আলতা লাগাবে।

‘দেবে না তুমি?’

আমি স্পষ্ট শুনতে পাই। মনে মনে হাসি আর বলি, ফেরার সময় নিয়েই তো এসেছি। শ্যামা ঘুমের ভেতর কথা বলে আমার জানা ছিল না। কিন্তু গলাটা যেন শ্যামার নয়! ঘুমের ঘোরে কথা বললে গলার স্বর অন্যরকম হতেও পারে। স্বরযন্ত্রে বালিশের চাপ লেগেও উচ্চারণ ফ্যাসফেসে হতে পারে। আমি জানি, যা এনেছি ঘুম ভাঙলে পর ওসব হাতে তুলে দিলেই শ্যামা খুশি হয়ে অভিমান ভুলে যাবে। আর মনে মনেই বলি, লাল শাড়ি আর চুড়ি-ফিতে কিনে এনেছি গো, রাঙাবৌ।

আমি আর কোনো দিন শাড়ি-চুড়ি পরব না।

কী বলছ?

বলছি, আমি অন্ধকারে আছি। আমাকে মুক্ত করে আনো।

এর পর আর আমার শোনার ভুল হতে পারে না। আমি উঠে বসি। শ্যামার মুখের দিকে তাকিয়েই হাত বাড়িয়ে সুইচটা খুঁজতে থাকি। তখন আবার চুড়ির ঝনঝনানি শুনতে পাই। অন্ধকারেই চোখ ফেরাই। দেখি, লাল শাড়িপরা একটা নতুন বৌ হেঁটে চলে যাচ্ছে! আমি সুইচ টিপে বাতি জ্বালাই। দেখি, রাঙাবৌ বেঘোরে ঘুমোচ্ছে।

তাহলে আমি কি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম! আর যা দেখেছি—স্বপ্ন দেখেছি? না, আমি তো ঘুমোয়নি! তবে কি আমি বিভ্রমে ছিলাম?

দেয়ালঘড়ি বলছে রাত প্রায় শেষ। তিনবার পেঁচার ডাক শুনতে পাই। এটা তাহলে শেষ প্রহরের ডাক। আর ঘুম হয়তো আসবে না। যদি রাঙাবৌ জেগে ওঠে তাহলে ভোরের আলোয় ওকে শাড়ি চুড়ি পরতে বলব। আমি নিজে ওর পায়ে আলতা মাখিয়ে দেবো। আমার ইচ্ছে করে কাকচক্ষুর মতো জলে ডুব দিয়ে উঠে শানবাঁধানো ঘাটে পিঠে ভেজা চুল এলিয়ে দিয়ে জলের তলের সিঁড়িতে নতুন বৌ পায়ের পাতা ডুবিয়ে বসে জন ছিটোবে আর আমি ওর পা আর পিঠের পরে লুটিয়ে থাকা ভেজা চুল অনিমেষ তাকিয়ে দেখব।

তুমি জেগে বসে আছো!

কিছু না। ভাবছিলাম।

ভাবছিলে! কী, ভাবছিলে?

তোমাকে ছাড়া আমি আর কাকে নিয়ে ভাববো?

সারা রাত বসে বসে আমাকে নিয়ে ভাবছিলে!

বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি?

তোমার মাথায় কি আগে থেকেই গোলমাল ছিল?

না। তোমাকে পাওয়ার পর থেকেই শুরু হয়েছে।

হ্যাঁ। আমিও মাঝেমধ্যে টের পাই।

আমি দুষ্টুমি করে বলি, আমার পাগলামি করতে ইচ্ছে করছে।

আচ্ছা, মতলবের পাগল!

আমি বুঝে ফেলি, রাঙাবৌ অভিমান ভুলে গেছে। আমি বিছানা থেকে নেমে লুকিয়ে রাখা শাড়ি, চুড়ি আর আলতা নিয়ে এসে ওর সামনে বিছানায় রাখি। চুড়িগুলো সঙ্গে সঙ্গেই পরতে থাকে। পরে নিয়ে খুশিতে চুড়ি নাড়তে থাকে। আমার তখন আবার অন্ধকারে শোনা নিক্কণের ঝণকার কানে বাজে। নিজেকে তবু সামলে রাখি। আর আমি আবদার করবার আগেই ও শাড়িটা পরতে থাকে। আমি তাকিয়ে থাকি, ওর দেহের ভাজ আমার চোখের সামনে সুষমা ছড়াতে থাকে, আমার ভেতরে উথালপাতাল ঢেউ খেলতে থাকে। শাড়ি পরা হয়ে গেলে আমি আলতার শিশির ছিপি খুলে ওর পায়ের পাতার চারপাশে মাখাতে থাকি আর শানবাঁধানো ঘাটের ছবিটা মনে মনে আঁকতে থাকি। নতুন বউ একসময় আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। দু’হাত আমার কাঁধের উপর রেখে ঊষ্ণ অধর আমাকে দেয়। ওর নিশ্বাস ঘন হয়ে আসে।

‘আমাকে তুমি মুক্তি দাও।’

আমি আবার সেই কর্কশ নারীকণ্ঠ শুনতে পাই। রাঙাবৌ যে আমাকে এ কথা বলেনি আমি নিশ্চিত। আমার সমস্ত আবেগ অনুভুতি মুহূর্তে উবে যায়। আমাকে অচেনা হিম গ্রাস করে নেয়। রাঙাবৌয়ের কোমল বন্ধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে আমি বিছানায় বসে পড়ি। আমার কানে বাজতে থাকে ‘আমাকে তুমি মুক্তি দাও, আমাকে মুক্তি দাও’। শ্যামার দু’চোখে অতৃপ্তি আর অপ্রাপ্তির আগুন।

আমি দুঃখিত।

কী হয়েছে তোমার?

আমি শ্যামার প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি না। চুপ করে থাকলে শ্যামা বলেই ফেলে, তুমি তাহলে আমাকে ভালোবাসতে পারোনি।

না। তা নয়।

তাহলে?

আসলে—

আসলে কী?

আমি শ্যামাকে কিছুই বলতে পারি না। ওর মতোই আরেকটা একটা নারী রাঙা শাড়ি পরে আমাকে বলছে ‘মুক্তি দাও’ এ কথা ওকে বলা যায়!

অতঃপর শ্যামা পাশ ফিরে শুয়ে কাঁদতে থাকে। আর আমি আরো অন্ধকারে তলিয়ে যেতে থাকি, অসহায় বোধ করতে থাকি। তবু ভাবি—না, একটা সুরাহা আমাকে করতেই হবে।

সকালে সেই গ্রামে যাবার সময় থানা ঘুরে যাই। পুলিশ সঙ্গে নিয়েই গিয়ে হাজির হই। আর পৌঁছেও যাই সহজে এবং দ্রুত। গতকাল যে জায়গাটার কথা লোকটা বলেছিল সেখানে চলে যাই। যা কিছু চোখে পড়ছে এসব কালকেও উল্টে পাল্টে দেখে গেছি। হ্যাঁ, একটা বাঁশের ধাঁড়া, ভাঙা কুলা পড়ে আছে। ধাঁড়াটা সরাবার জন্য টান দিতেই ওটার বুনন খসে পড়ে গেল। মাটিতে পড়ে থাকা একটা বাঁশের কঞ্চি দিয়ে জঞ্জাল সরাতেই দেখতে পাই ভেজা মাটি দেবে গেছে। সাব ইন্সপেক্টর নিতাই ওদিকে একপলক তাকিয়েই বলে, স্যার, আছে।

আছে?

জি, স্যার। আপনি কি আগে কখনো ডিজেন্টার করেছেন?

না।

তাহলে কী করে এমন নিখুঁত নিশানা করলেন!

আমি কিছু বলি না। দেবে যাওয়া মাটির গর্তের দিকে তাকিয়ে থাকি।

সাব ইন্সপেক্টর নিতাই বলে, এই রামচরণ রেডি হয়ে যা। তুলতে হবে।

বাবু একটু গলায় না ঢাললে কেমনে হবে?

ঢালবি। তোর জিনিস এনেছি। সরাফত বোতল দে ওকে।

রামচরণ হা করে বোতলের সবটুকু গলায় ঢেলে দিয়ে ঢক ঢক গিলে ফেলে।

বাবু, ইতটুকু দিলে হয়?

হবে। আগে তুলবার ব্যবস্থা কর।

রামচরণ নরম মাটি দু’হাতে শেয়ালের মতো আঁচড়ে খামচে সরাতে থাকে। পাড়ার দু’একজন নারী দূর থেকে মুখে আঁচলচাপা দিয়ে দেখতে থাকে। কোথা থেকে একটা কুকুর এসে আমার পাশে বসে মাথা সামনে বাড়িয়ে তাকিয়ে আছে। আড়ালে দাঁড়ানো নারী শিশুর মতো ওটাও নীরবে ঘটনা প্রত্যক্ষ করছে। এমন কি ম্যাজিস্ট্রেট কী করছে সেটাও তারা খেয়াল করছে। আমি জানি, গ্রামীণ নারীদের আড়ালে দাঁড়িয়ে ঘটনা পর্যবেক্ষণ তাদের একধরনের বিনোদন। শিশুকালে পুকুরঘাটে মা-চাচিদের কত রকম গল্প করতে দেখেছি! এ গাঁয়ের নারীরাও আজকের ঘটনা নিয়ে হয়তো পুকুরঘাটে কলতলায় গল্প করবে বহুদিন।

সাব ইন্সপেক্টর নিতাই রামচরণের কাজ তদারকি করছে। মাঝে মাঝে বলছে, সাবধান, কোথাও যেন ঘা না লাগে।

রামচরণের আড়ষ্ট কণ্ঠ শুনতে পাই, ইকটু আঁচড়ও লাগবে না, বাবু আপনি দেখে লিয়েন।

কিছুক্ষণের মধ্যেই লাল কাপড়ে মোড়ানো একটা পুঁটলি গর্ত থেকে তুলে রামচরণ আলতো করে পলিথিনের উপর রাখে। কনস্টেবল সরাফত কেরোসিন ছিটিয়ে দেয়।

সাব ইন্সপেক্টর এগিয়ে আমার কাছে এসে বলে, স্যার কি মুখটা দেখবেন একটুখানি? হয়তো পচে গলে শেষ। কঙকালও জোড়া ছেড়ে গেছে।

আমি উঠে দাঁড়ালে নিতাই বলে, নাকে কর্পুর মেখে নিন, স্যার। সেন্টে কাজ হবে না। বমি হয়ে যেতে পারে।

সেন্ট আর কর্পুর দুটোই নাকে লাগিয়ে মুখে রুমাল পেঁচিয়ে লাশের কাছে এগিয়ে যাই। পুতিগন্ধের একটা প্রচণ্ড ধাকা এসে আমার নাকে লাগে। আমি সামাল দিতে কয়েক পা সরে দাঁড়াই। লাল শাড়িতে মাটি মিশে রক্তবর্ণ হয়ে গেলেও সোনালি জড়ির পাড় ঝলমল করছে। যে শাড়িটা গতকাল আমি কিনেছি এটা হুবহু সেই শাড়িটাই যেন। ভ্যানে তুলবার জন্য পলিথিনে মোড়ানোর সময় কঙ্কালের একটা হাতের অস্থি ঝুলে পড়ে। আর ঝনঝনিয়ে বেজে ওঠে নানা রঙের কাচের চুড়ি।

আবারও আমি একটা ধাক্কা অনুভব করি। এটা অন্যরকম। আমার চোখ তখন আর সইতে পারে না। আমি বলি, ঢেকে ফেলুন। ঢেকে ফেলুন তাড়াতাড়ি।

রামচরণ ডোম আমার আতঙ্কিত চোখ দেখে হাসে। সে বলে, ইমুন কত কত লাশ তুলেছি বড় ছাব। সব লাশ কি আপনাদের কাছে পৌঁছাতে পারে? ইটার ভাগ্য, আদালতে পৌঁছাতে পারবে।

আমি আর কোনো কথা বলি না। আমার চোখে লাল শাড়ি আর বেলোয়াড়ি চুড়িপরা এক শ্যামকন্যার মুখ ভেসে ওঠে। সকল রাজকন্যার রূপ নিয়ে পৃথিবী থেকে সে চলে গেছে।

ঢাকা ।

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৬:২৭ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ২৬ জুন ২০২১

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com