স্মরণ সভা

শনিবার, ২৫ জুলাই ২০১৫

স্মরণ সভা

 

মূহ শরীফ উল ইসলাম
আফাজ উদ্দিন মিয়া বিএর সঠিক পেশা কি তা পরিষ্কার নয়। চাকরিজীবী , না তিনি জীবনে সরকারি বেসরকারি কোন চাকরি করেন নাই ।ব্যবসায়ী,না  ব্যবসার নাম গন্ধ তার জীবনে নাই। তা হলে কি রাজনীতিবিদ? কোন সরকারি বা বেসরকারি রাজনৈতিক কোন দলের তিনি সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় সদস্যও তিনি নন। আসলে তিনি দীর্ঘ দিন মানে ৩৫ বছর আমেরিকায় ছিলেন। ১০ দিন হল দেশে এসেছেন। জীবনে বিবাহ শাদী করেন নাই। বাবা মা মারা গেছে অনেক দিন আগে ।আপন কোন ভাই নেই, আছে ৫টা বোন। বোনদের বিয়ে হয়েছে তার প্রবাস জীবনে, তাদের সাথে তার কোন যোগাযোগ নাই বললেই চলে। তবে মনে হয় তাকে আমরা রাজনীতিবিদদের গোত্রে ফেলতে পারি। কারণ তিনি আমেরিকা যাওয়ার আগে দু’দুবার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করেছিলেন। দুবারই জামানত বাতিল হয়েছিল। তবে আমেরিকায় তিনি বলতেন ১ম বার ৩ ভোটে ২য় বার মাত্র ১০ ভোটে হেরেছিলেন।


 Litearture 01চির কুমার আফাজ উদ্দিন মিয়া বিএ দেশে এসে চমকপ্রদ একটা কিছু করার জন্য অস্থির হয়ে পড়লেন। আমেরিকা ফেরত আফাজ উদ্দিনের সহায়তায় এগিয়ে আসে কিছু বখাটে যুবক। তাদের মতলব আমেরিকা থেকে এসেছে, নিশ্চয়ই মাল-পানি আছে ফুসলায় ফাসলাইয়া যা ভাঙ্গান য়ায়। আফাজ উদ্দিন এই সব ছেলেদের বলল , চল আমরা সবাই মিলে এমন একটা কিছু করি যা দেশের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

ভাইয়া তা করতে তো বেশ টাকার প্রয়োজন।

টাকা পয়সার চিন্তা তোমাদের করা লাগবেনা ওটা আমার উপর ছেড়ে দাও। তোমরা শুধু কাজে লেগে যাও। কি করা যায় তা খুঁজে বের করো।

বিকাল বেলা সঙ্গীদের নিয়ে আফাজ উদ্দিন গোরস্থানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। দেখতে পেলেন এক মহিলা কবরের উপর উপুড় হয়ে কাঁদছে। জানা গেল কয়েকদিন আগে মহিলার এক মাত্র ষোড়শী কন্যা আত্মহত্যা করেছে। গ্রাম থেকে ২২ জন মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছিল। ২১ জন পাস করেছে। সে-ই একমাত্র মেয়ে যে ফেল করেছে। অভিমানে সে আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে।

আফাজ উদ্দিন বিএ চিৎকার করে উঠলেন, ইউরেকা ইউরেকা ।

সকলে ভাইয়া আপনি এরূপ আনন্দিত হয়ে চিৎকার করছেন কেন ?  আর ইউরেকা মানে কী ?    

ও তোমরা জান না ? ইউরেকা গ্রীক শব্দ এর মানে পেয়েছি।

কি পেয়েছেন ?

ওই যে তোমরা বিষয় খুঁজতেছিলে , তা পেয়েছি।

কি পেলেন, বুঝায়ে বলেন।

বলছি বলছি, বিষয়টা খুবই আকর্ষণীয় , তোমরা সবাই একযোগে কাজে নেমে পড়। এই যে মেয়েটি পাস করে নাই বলে আত্মহত্যা করেছে, ওকে নিয়েই আমরা স্মরণ সভা করব । তোমরা একটা তারিখ ঠিক কর। ওই তারিখে আমরা অত্র এলাকার সবাইকে নিয়ে মেয়েটির জন্য স্মরণ সভা করব। সভা মঞ্চের পিছনে থাকবে মেয়েটির বিরাট রঙিন ছবি। মেয়েটির ছবি দিয়ে রঙিন পোস্টার ছাপাও। এলাকার আনাচে কানাচে পোস্টারে পোস্টারে ভরে ফেল। চারিদিকে মাইকিং শুরু কর। সভার মূল বক্তা আমি।

পরের দিন এলাকার বিভিন্ন দোকানে রাস্তার মোড়ে মোড়ে পোস্টারে ছেয়ে গেল। চারিদিকে মাইকিং শুরু হল, ভাইসব ‘আগামি ৫ জুন স্থানীয় হাই স্কুল মাঠে বিকাল ৫ ঘটিকায় রোকশানারা স্মরণে এক বিরাট জনসভা। উক্ত সভায় বক্তব্য রাখবেন এলাকার গর্ব, দীর্ঘদিন আমেরিকা

প্রবাসী জনাব আফাজ উদ্দিন বি এ । ইতিপূর্বে বাংলাদেশের কোথায়ও এমন স্মরণ সভা অনুষ্ঠিত হয় নাই। আপনারা সবাই আমন্ত্রিত।

বিকেলে যুবকগুলি বিষণ্ণ মনে এসে বলল ভাইয়া বিভিন্ন গ্রামের যুবক ছেলেরা তাদের মাইক কেড়ে রেখে দেছে এবং পোস্টার গুলি ছিঁড়ে ফেলেছে।  

কোন গ্রামে পোস্টারিং বা মাইকিং করতে হলে সে গ্রামের মাতবরদের পারমিশন নিতে হবে এবং যুবকদের চাঁদা দিতে হবে, চাঁদা না দিলে মাইক ফেরত দেওয়া হবে না। এমনকি সভার দিলে সভায় আক্রমণ করা হবে বলে হুমকি দিয়েছে। আফাজ উদ্দিন এলাকার সব গ্রামের মাতবর ও বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত যুবকদের সহিত কয়েকদিন ধরে আলোচনা করে বিভিন্ন শর্তে নির্ধারিত দিনে সভা করতে সক্ষম হলেন বটে কিন্তু তাতে তার বিশাল আকারের অর্থ ব্যয় হল। সভার কয়েকদিন পূর্বে এলাকার সব মেম্বার চেয়ারম্যান একত্রিত হয়ে আফাজ উদ্দিনের সাথে দেখা করে বলে তারা হল এলাকার নির্বাচিত জন প্রতিনিধি।তাদের সাথে কোনরূপ পূর্ব আলোচনা ছাড়া সে কিরুপে এলাকায় এত বড় একটা কাণ্ড ঘটতে চলেছে, আফাজ উদ্দিন তার ভুল স্বীকার করে হাতজোড়ে অনুনয় বিনয় করে সবাইকে বখশিশ দিয়ে রাজী করালেন।

সভার আর মাত্র ১ দিন বাকী। উপজেলা চেয়ারম্যান ৪/৫ জন সঙ্গী নিয়ে রাতে আফাজ উদ্দিনের বাড়িতে হাজির।আফাজ উদ্দিন সাহেব আপনি অনেকদিন পর দেশে এসেছেন তাই দেশের নিয়ম কানুন ভুলে গেছেন, আমি উপজেলা চেয়ারম্যান , আপনি সভা সমিতি করবেন,তাতে আমাকে অতিথি করবেন না। আমার এলাকায় একটা স্মরণ সভা হবে তাতে আমার আমন্ত্রণ নাই, এটা কি আমাকে অপমান করা না।

আমাকে না হয় বাদ দিলেন কিন্তু আপনি কি থানার সম্মতি নিয়েছেন?

আফাজ উদ্দিন বড়ই বিপদে পড়লেন, তিনি করজোড়ে উপজেলা চেয়ারম্যানের কাছে মাফ চাইলেন, চেয়ারম্যান সাহেব আমি ভুল করে ফেলেছি। আমাকে মাফ করে দিন, আপনাকেই সভার প্রধান অতিথি করা হবে।

ঠিক আছে ঠিক আছে তবে থানার অনুমতি আনতে ১০ লাখ টাকা লাগবে, ওটা এখন আমাকে দিয়ে দিন। সব ঝামেলা আমি দেখব।

নির্ধারিত দিনে সভা শুরু হল । সভার উপস্থাপক বললেন এবার বক্তৃতা করবেন, সভার প্রধান আকর্ষণ দীর্ঘদিন প্রবাসী জনাব আফাজ উদ্দিন। আফাজ উদ্দিন

উপস্থাপকের দিকে বাঁকা চোখে বলল বি এ । উপস্থাপক সংশোধন করে বলল জনাব আফাজ উদ্দিন বি এ ।

আফাজ উদ্দিন বি এ – উপস্থিত ভাইবোনেরা আপনারা জানেন দুনিয়ার ১৫ আনা মানুষই সাধারণ আর ১ আনা মানুষ অসাধারণ। এই ১ ভাগ অসাধারণ

মানুষই স্মরণীয় বরণীয় অনুকরণীয়। যদি এই ১ ভাগ অসাধারণ মানুষ না থাকত তবে কাদের আমরা অনুস্মরণ করতাম। গাছের ১৫ আনা মুকুল ঝরিয়া যায় ১ আনায় ফল হয়। ১ আনাই মূল্যবান।

এই যে আমি বিএ । কোন সালের বি এ , ১৯৭২ সালের বি এ। সেবার পরীক্ষায় কি হয়েছিল , আপনারা জানেন না আমি জানি, পরীক্ষার পরিদর্শকরা বলতেছিল, সবাই নকল কর, যে নকল না করবে সে রাজাকার। সবাই নকল করল সবাই পাস করল। সে পাশের কোন মূল্য নাই। আমি কোন চাকুরীপেলাম না। যেখানেই ইন্টার্ভিউ দিয়েছি, যখন শুনেছে ১৯৭২ এর বিএ, তখনই নাক সিটকানি, আমাদের গ্রাম থেকে এবার ২২ জন মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে। পাশ করেছে ২১ জন। ১ জনই মাত্র ফেল করেছে। তাহলে দাঁড়াল কি?  পাশ করা যত সহজ ফেল করা তত সহজ নয়। জানি না কেন সে আত্মহত্যা করল। আমাদের সবার উচিৎ এক মাত্র ফেলকে মিষ্টি খাওয়ান। রোকসানারা আমাদের সে সুযোগ দিল না। আল্লাহ তাকে বেহেস্ত নসিব করুক। আসুন আমরা সবাই তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। সবাই ১ মিনিট দাঁড়িয়ে নিরাবতা পালন করুন। আমি আমার নিজ খরচে তার জন্য স্মৃতি স্তম্ভ বানাব।

সভাশেষে আফাজ উদ্দিন বাড়িতে যেয়ে দেখে তার জন্য তারই বাড়িতে রোকসানার বাবা ও দুই ব্যক্তি অপেক্ষা করছে।

কি ব্যাপার আপনারা আমার বাড়িতে ?

রোকশানার বাবা, আপনি আমার মেয়ের জন্য সভা করলেন, আমার ধারণা আপনি এ সব করার জন্য প্লান করে আমার মেয়েকে মেরেছেন। সে আত্মহত্যা করে নাই। আমি আপনার নামে মামলা করব। এরা দুজন সাক্ষী।

অন্য দুজন দেখুন আফাজ সাহেব মামলা মোকাদ্দমা করলে আপনার অনেক টাকা কড়ি নষ্ট ও মান সম্মান যাবে, তার চেয়ে ওকে কিছু দিয়ে ঝামেলা মিটিয়ে ফেলুন আর আমরাও যাতে সাক্ষী না হই তার জন্য আমাদেরও কিছু দেন।

অগত্যা আফাজ উদ্দিন”””””””’

ভোরবেলা দরজার কড়া নাড়াতে আফাজ উদ্দিনের ঘুম ভেঙ্গে গেল। দরজা খুলেই দেখতে পেল, থানার দারোগা ও কয়েকজন কনস্টেবল।

দারোগা গতকাল আপনি যে বক্তৃতা করেছেন তা রাষ্ট্র বিরোধী। আমরা আপনাকে রাষ্ট্র দ্রোহীতার মামলায় গ্রেফতার করব। আফাজ উদ্দিন দারোগাকে একলা একটু দূরে নিয়ে কানে কানে কিছু বলল। দারোগা খুশীতে গদগদ হয়ে বলল , আপনারা আমেরিকাতে থাকেন, কেন যে এই হাবিয়া দোজখে আসেন, যত তাড়াতাড়ি পারেন ফিরে যান। আপনার না যাওয়া পর্যন্ত আমি সব দেখব, কোন চিন্তা করবেন না।

পরেরদিন আফাজ উদ্দিন যখন বাসে উঠবে তখন যুবক ছেলেরা এগিয়ে এসে বলল ভাইয়া আমাদের এলাকায় এত বড় সভা এর আগে কখনও হয় যা আপনি করে দেখালেন কিন্তু এখন আপনি চলে যাচ্ছেন। ভবিষ্যতে কি আর এমনটা হবে?

দেখ এখানে সবাই মাতবর , তাদেরকে খুশি না করে কিছুই করা সম্ভব নয়।তাদের খুশির রেট এত বেশী তা সাধ্যতিত । আবার তাদের খুশি না করলে নিজেরই বিপদ ডেকে আনতে হয় । নেড়া বেলতলায় একবারই যায় । উদ্যোগতার অবস্থা ভিক্ষায় কাজ নেই, কুত্তা ঠেকাওরে বাবা । আমি যাই তোমরা সবাই ভাল থেক। দোয়া করি মানুষ হও।

আটলান্টা , জর্জিয়া
জুন ১৪, ২০১৫

শনিবারের চিঠি / আটলান্টা / ২৫ জুলাই ২০১৫

 

বিদ্রঃ আমাদের সাইডে প্রকাশিত কোন আর্টিকেল পূর্ব অনুমোতি ছাড়া প্রকাশ করা যাবে না।

 

 

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১০:১৩ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ২৫ জুলাই ২০১৫

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com