স্বপ্নভঙ্গ

শনিবার, ০২ মার্চ ২০১৯

স্বপ্নভঙ্গ
অলংকরণঃ মামুন হোসাইন

Litearture 01মুরগিটোলা ফার্মেসি দুই সপ্তাহ ধরে বন্ধ।
এলাকার লোকজন ওষুধ-পথ্য নিতে এসে ফিরে যায়। সদা হাসি খুশি ফার্মেসির মালিক মকবুল মিয়া। দীর্ঘদিন ফার্মেসিতে ওষুধ বিক্রি করতে করতে এলাকায় সবার কাছে এখন তিনি মকবুল ডাক্তার হিসেবে পরিচিত। বড় ছেলে সালাম ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে ইন্টার্ন করছে বরিশাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। ছোট ছেলে সেলিম কলেজে, একমাত্র মেয়ে শেলী মাধ্যমিক স্কুলে পড়ছে। এই তিন সন্তানের সুখী সংসার মকবুল মিয়ার। সেদিন ফজর নামাজের অজু করতে গিয়ে কলপাড়ে পড়ে কোমরে ব্যথা পেয়েছেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন তিনি। সেই থেকে ফার্মেসি বন্ধ।
সারা রাত স্বামীর মাথার কাছে বসে বসে বিনিদ্র রজনী কেটে যায় শিরিন বেগমের। তন্দ্রা এসে ঝুঁকে পড়ল তাঁর মাথার ওপর। তন্দ্রা ভেঙে গেল শিরিন বেগমের। চোখ মেলে দেখলেন স্বামী একমনে তাকিয়ে আছেন জানালার দিকে। যেখান থেকে চাঁদের আলো ছিটকে এসে পড়ছে রুমের মধ্যে।
স্বামীর নড়াচড়া টের পেয়ে শিরিন বেগম জিজ্ঞেস করলেন, কিছু বলবেন?
—না, কী আর বলব, জবাব দিলেন মকবুল হোসেন।
তা অমন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছেন ক্যান? একটু ঘুমাতে চেষ্টা করেন।
না, ঘুম তো চোখে আসে না সালামের মা। তোমায় না বললাম ,তুমি একটু ঘুমিয়ে নাও। না ঘুমালে শেষে তুমিও অসুস্থ হয়ে পড়বে। তখন দুজন রোগী হয়ে পড়লে ওদের কে দেখবে?
না, আমি অসুস্থ হব না। আপনি সারা রাত জেগে কাটাবেন আর আমি পাশে ঘুমিয়ে কাটাব, তা তো হয় না, সালামের বাবা। বাবা। লতা মঙ্গেস্কারের একটা হিন্দি গান শুনেছিলাম ,‘তুমহি মেরে মন্দির তুমহি মেরে পুজা তুমহি দেবতা হো, কই মেরে আখুছে দেখেতো সামঝে তুম মেরো ক্যা হো।’ আর মাকে বলতে শুনেছি ,‘ স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহস্ত।’ সেই স্বামীকে সেবা-যত্ন করা স্ত্রীর কর্তব্য।
বাহ্‌, তুমি দেখি আজকাল বাংলা হিন্দি সবই অনুসরণ করছ। বেহেস্তে তোমার যেতেই হবে।
তাই না তো কি ?
মাকে বলতে শুনেছি, ‘স্বামীর পায়ের নিচে স্ত্রীর বেহেশত।’ সেই স্বামীকে সেবা-যত্ন করা স্ত্রীর কর্তব্য।
-বাহ্‌, বেহেশতে তোমার যেতেই হবে।
-তাই না তো কী?
-ঠিক আছে স্বামীর সেবা করে তুমি যদি বেহেশতে যেতে পার তাতে আমি বাধা দেব না। তোমার কি মনে আছে সালামের মা, আজ থেকে ৪৫ বছর আগে তোমায় নিয়ে যখন আমি এই মুরগিটোলার বাসায় উঠি তুমি তখন ছোট্ট খুকি। সংসার করার মতো বয়স তোমার তখনো হয়নি। মাত্র ১২ আনা মাসিক ভাড়ায় এই বাসাটি ভাড়া নিলাম। সেই ১২ আনার বাসা ভাড়া আজ ৫ হাজার টাকা। ঢাকার অলিগলিতে দুই চারটা মোটর গাড়ি, দুই চারটা রিকশা চলত। রাস্তাঘাট ছিল যানজটমুক্ত। আজ সেই রাস্তাঘাটে এত যানজট যে পাঁচ মিনিটের রাস্তা পৌঁছাতে এখন ৪৫ মিনিটেও পারা যায় না।
-আপনি অত কথা বলেন না। নার্স আপা আপনাকে কথা কম বলে ঘুমাতে বলে গেল না?
-ঘুম যে আসে না, সালামের মা। আমার জীবন আয়ু শেষ হয়ে এসেছে। বেশি দিন আর বাঁচব না। ছেলে-মেয়েদের যে মানুষ করে যেতে পারলাম না।
-আপনি খালি হাতে যা করেছেন এই দূর্মূল্যের বাজারে তা ক’জন বাবা পেরেছে?
-তোমার মতো একটা লক্ষ্মী বউ পাশে ছিল বলে তা সম্ভব হয়েছে। তাই তো বলে, ‘সংসার সুখের হয় রমণীর গুণে। তুমিই তার জ্বলন্ত উদাহরণ।’ পৃথিবীর সব নারী যদি তোমার মতো আদর্শবতী হতো তা হলে কোনো সংসারেই অশান্তির দাবানল জ্বলত না।
শিরিন বেগম এবার একটু গম্ভীর হয়ে বললেন, হয়েছে হয়েছে আমাকে অত পটাতে হবে না। আমার বাবার বাড়ি কিছু একটা দিতে বললে আপনার সংসারে অভাব এসে যেত। অমনি ঝগড়া।
-টাকা-পয়সা তো তোমার হাতেই ছিল সেখান থেকে চুপিচুপি দিলে আমি কি টের পেতাম?
-সে শিক্ষা আমি পাইনি। মাকে দেখছি বাবার অনুমতি ছাড়া তিনি কাউকে কিছু দান করতেন না। আমি সেই মায়েরই সন্তান। মায়ের কাছ থেকে শিক্ষা পেয়েছি স্বামীর অনুমতি ছাড়া কাউকে কিছু না দেওয়ার। সে ভাই হোক আর বাবা হোক।
-তাই তো হওয়া উচিত একজন নারীর আদর্শ। আমার ছোট্ট মুদিখানার দোকান থেকে যা উপার্জন হতো সেখান থেকে অল্প অল্প সঞ্চয় করে একদিন বিশ হাজার টাকা আমার হাতে তুলে দিলে। সেই টাকা দিয়েই আমি ওষুধের ফার্মেসি দিলাম। তোমার মতো একজন আদর্শ গৃহিণী ঘরে ছিল বলেই সম্ভব হয়েছে। সেই ফার্মেসি থেকে মানুষকে সামান্য চিকিৎসা দিতে দিতে এলাকায় লোকজন আমাকে ডাক্তার ডাকা শুরু করল।
-আর ক’দিন পরে ডাক্তার না, ডাকবে ডাক্তারের বাবা। হেসে হেসে বললেন, শিরিন বেগম।
-হ্যাঁ, সালামের মা তাই ভেবে বহু কষ্ট করে ছেলেটাকে ডাক্তারি পড়িয়েছি। ছেলে আমার সত্যি সত্যি ডাক্তার হয়ে আমার মনোবাসনা পূরণ করবে। তিনি সে আশা পূরণ করেছেন। শরীরের যে অবস্থা তা কি দেখে যেতে পারব? ঢাকা মেডিকেল থেকে পাস করল আর ইন্টার্ন করতে পাঠাল বরিশাল। ঢাকা থাকলে ভালো হতো না? সময় অসময়ে এসে আমাকে দেখে যেতে পারত।
-বরিশাল থেকেও এখানকার ডাক্তারদের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে রোজ আপনার খবর নিচ্ছে। এখানে থাকলে কি এর চেয়ে বেশি পারত ? সেলিম বলেছে, সে এই উইকেন্ডে আপনাকে দেখতে আসবে, বলল শিরিন বেগম।
-হ্যাঁ, তা তো আসবেই। ইন্টার্ন শেষ হলে কোথায় পোস্টিং হয় কে জানে? ছেলে আমার যেমন সৎ, তেমন একটা বউ ঘরে তুলতে পারলে শান্তি পেতাম।
শিরিন বেগম সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন, মেয়ে তো একটা ঠিক করে রেখেছি।
-কোথায় ?
-আমার ছোট বোন জামিলার মেয়ে, বিউটি। স্কুল মাধ্যমিকে জিপিএ পেয়ে কলেজে ভর্তি হয়েছে। নামে যেমন বিউটি আর দেখতেও তেমন বিউটি কুইন সিনেমার নায়িকার মতো। কাজ-কর্মেও তেমন স্মার্ট। আমার সালামের সঙ্গে বেশ মানাবে।
আমাকে না জানিয়েই ছেলের বউ ঠিক করে রেখেছ?—মকবুল হোসেন একটু উত্তেজিত হয়ে বললেন।
-এতে রাগের কি আছে? বউ তো এখনো ঘরে আনিনি। মেয়েটা আমার পছন্দ হয়েছে তা আপনাকে জানালাম। যখন সময় হবে সবই তো জানবেন। আপনাকে না জানিয়ে আমি কিছু করব তাই ভেবেছেন?
-না, তাতো কখনো ভাবতে পারি না।
-তবে ওসব দুশ্চিন্তা মাথায় না এনে একটু ঘুমাতে চেষ্টা করেন। আমি পাশেই আছি।
বরিশাল মেডিকেল কলেজের ইন্টার্ন ডাক্তার আবদুস সালাম সেদিন সকাল ১০টায় বরিশাল থেকে গাবতলী বাস টার্মিনালে এসে পৌঁছাল। ছোট ভাই সেলিম আগে ভাগে সেখানে গিয়ে তাঁর প্রতীক্ষায় বসে আছে। বরিশাল থেকে চন্দ্রদ্বীপ এক্সপ্রেস বাসটি টার্মিনালে পৌঁছাতেই সেলিম গিয়ে বাসের দরজায় দাঁড়াল। বাসে উঠতে গেলে কন্ডাক্টরের বাঁধার মুখে সে বাইরে দাঁড়িয়ে থাকল। অনেক যাত্রীর সঙ্গে সালামও নেমে এল বাস থেকে।
সালামকে নামতে দেখেই সেলিম দৌড়ে গিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরল। ছোট ভাই আকস্মিক জড়িয়ে ধরলে সালাম চমকে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, কি রে কখন এসেছিস?
সেই সকালে। গতকাল তোমার মোবাইল পাওয়ার পর মা বলল, আমি যেন সকাল সকাল টার্মিনালে চলে আসি।
-ও আচ্ছা। তোর আজকে কলেজ ছিল না ?
-ছিল, জবাব দিল সেলিম।
-কলেজ কামাই দিয়ে আসলি কেন? আমি একাই তো বাসায় পৌঁছাতে পারতাম।
-একদিন কামাই দিলে কিছু হবে না বলতে বলতে সে সালামের ঘাড়ে ঝোলানো ব্যাগটি ধরে বলল দাও আমার কাছে এটা।
-না, আমি বইতে পারব, বলল সালাম।
-না, তুমি দাও তো আমার কাছে বলে সেলিম ঘাড় থেকে ব্যাগটি নিজের ঘাড়ে নিল।
সালাম বাঁধা দিল না।
সালাম ডাক দিল, সেলিম? জ্বী ভাইয়া, জবাব দিল সেলিম। মা ক্যামন আছে রে?
-ভালো।
-বাবার অবস্থা কি?
-তাঁর শরীর আছে মোটামুটি। ডাক্তার বলেছে, আরও কিছুদিন হাসপাতালে থাকতে হবে।
-হ্যাঁ, সেদিন আমি টেলিফোনে যখন খবর নিলাম তাঁরা আমাকেও তাই বলেছে।
-ঠিক আছে, চল। বাসায় কী বাসে যাবি না ট্যাক্সিতে? সালাম জিজ্ঞেস করল।
-না, না। ট্যাক্সিতে যাব। আমাদের পাড়ার লিপু ট্যাক্সি চালায় তাঁকে নিয়ে এসেছি। তর্জনী উঁচিয়ে সেলিম দেখাল, ওই যে ময়ূর মার্কা ট্যাক্সিটা লিপুর।
লিপু ও সেলিম এক সঙ্গে একই স্কুলে পড়েছে। হঠাৎ লিপুর বাবা মারা যাওয়ায় তাঁর আর পড়াশোনা হয়নি।এখনো তারা অভিন্ন বন্ধু। এমন সময় লিপুও হাত উঁচিয়ে উচ্চ স্বরে ডাক দেয়, ডাক্তার ভাই, আসেন আসেন। আমার ময়ূর পঙ্খী এক টানে বাসায় পৌঁছে যাবে। আপনি ট্যাক্সিতে উঠতে যা দেরি।
-তাই নাকি ? ঠিক আছে আসছি সালাম হেসে বলল।
অনেক দিন পর বড় ভাই বাড়ি এসেছ তাই মহানন্দে তিন ভাই বোন দুপুরে এক সঙ্গে খেতে বসেছে। খাবারের তালিকায় আছে ইলিশ মাছের ঝোল, মুরগির মাংস, সবজি, ডাল এবং অন্যান্য সুস্বাদু তরিতরকারি। খাবার পরিবেশন করছে মা শিরিন বেগম। ঘরোয়া আতিথেয়তায় মায়ের পরিবেশনায় খুব তৃপ্তি নিয়ে খাচ্ছে সালাম। ইলিশের একটা টুকরা মুখে দিয়ে তা থেকে কাঁটা ছাড়াতে ছাড়াতে সালাম জিজ্ঞেস করল, সবগুলো রেসিপি দারুণ স্বাদ হয়েছে মার রান্নার মতো। তবুও কেন জানি একটু আলাদা লাগছে কে রেঁধেছে?
-কে আবার তোমার বুনডি, শেলী। মা জবাব দিল।
এমন সময় শেলী মাকে বলল, ও মা, ভাইয়াকে ইলিশের মাথাটা তুলে দাও না! বরিশালে ম্যাচে বাবুর্চির রান্না কী খায় ? চাঁদপুরের পদ্মার ইলিশ ওখানে পাওয়া যায় ভাইয়া? সে সালামের মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল।
-হ্যাঁ পাওয়া যায়। আমরা মাঝে মাঝে কীর্তনখোলার তাজা ইলিশও খেয়ে থাকি। তা-ও পদ্মার ইলিশের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। সালাম শেলীর দিকে মুখ ফিরিয়ে জবাব দিল। সে আরও বলল, তুই এত সুন্দর রান্না করতে পারিস আগে তো জানতাম না। তুই দেখি মাকেও হার মানাবি। শ্বশুর বাড়ি গেলে তোর রান্না খাওয়ায়ে শ্বশুর-শাশুড়ির মন জয় করতে পারবি।
অবিবাহিতা মেয়েরা শ্বশুর বাড়ির কথা শুনলে একটু লজ্জা পায়। শেলীও পেল। সে মুখটাকে নিচু করে লজ্জাভরা মুখে জবাব দিল, আমি আর কী রাঁধতে জানি। তোমার জন্য মজার মজার রেসিপি রেঁধে বিউটি প্রতীক্ষায় আছে। খাবার আসরে হঠাৎ বিউটির নাম আসায় সালাম মুখ তুলে তাকাল মায়ের দিকে ।
মা বলল, নে, খেয়ে ওঠ। তোকে পরে বলব।
-পরে বলবে কেন? এখন অসুবিধা কি? আমরা কি রাঙা ভাবি দেখব না? বলল শেলী।
-তুই চুপ কর। তোর সব সময় আগবাড়িয়ে কথা। সময় হলে সবই বলব একটু ধমকের সুরে বললেন মা।
বিউটি! রাঙা ভাবি! কোথায় যেন একটু গোলমেলে মনে হচ্ছে। ইলিশের মাথা খেতে খেতে সালাম ভাবতে লাগল। বিউটি ছোট খালার মেয়ে। সে যখন ক্লাস নাইনে পড়ে তখন তার সঙ্গে সালামের শেষবারের মতো দেখা হয়েছিল তাদের বাড়িতে। সে তখন মেডিকেলের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। মাথায় একরাশ লম্বা চুল কোমর পর্যন্ত ঝুলে পড়েছে। মিষ্টি মিষ্টি চেহারা। হাঁটলে পদ্মা-মেঘনার ঢেউ খেলতো তার কোমরে। তা হলে কি মা-বোনেরা বিউটিকে নিয়ে কিছু ভাবছে? সালাম ইলিশের কাঁটার একটা অংশ সামনের বোনপ্লেটে রাখল।
-ও মা, ছোট খালা ভাইয়াকে বাসায় যেতে বলেছে। তা কী বলেছ? গতকালও খালার সঙ্গে যখন মোবাইলে কথা হলো জিজ্ঞেস করল ভাইয়া কবে আসবে? বলল শেলী।
তিন ভাইবোন গল্পগুজব আর হাসি-তামাসার মধ্য দিয়ে তাদের দুপুরের খাবার খেয়ে উঠল।সালাম ড্রয়িং রুমে সোফায় বসে রিলাক্স করে বসে টিভিটা অন করে দিল। এমন সময় মা এক কাপ চা হাতে নিয়ে সালামের কাছে এলেন। মাকে চা নিয়ে আসতে দেখে সে বলল, আপনি চা আনতে গেলেন কেন? শেলী কোথায়?
-সে তো তৈরি করে নিয়ে আসছিল। আমি এদিকে আসছিলাম বললাম আমার কাছে দে। নে, ধর ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
মায়ের হাত থেকে চায়ের কাপ নিতে যাচ্ছে ঠিক এমন সময় দপ করে বিদ্যুৎ চলে গেল। সঙ্গে সঙ্গে সিলিং ফ্যান, টিভি সব বন্ধ হয়ে গেল।
-না, আমাদের দেশের এই বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অবসান যে কবে হবে মা বলতে পারেন? বলতে বলতে মায়ের হাত থেকে চায়ের কাপটা নিল। মা সালামের সামনে আরেকটা সোফায় বসল।
মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সালাম বলল, আপনার ভাব দেখে মনে হচ্ছে কিছু বলবেন?
-হ্যাঁ, কিছু বলব বলেই তো তোর কাছে এসেছি। মিরপুরে তোর ছোট খালা যেতে বলেছে ।
-হ্যাঁ তা তো শুনলাম, খাওয়ার সময় শেলী বলল।
-তোর ছোট খালার মেয়ে বিউটি এবার স্কুল মাধ্যমিকে জিপিএ পেয়ে কলেজে ভর্তি হয়েছে।
ভারী লক্ষ্মী মেয়ে। তাকে আমরা বউ করে ঘরে আনতে চাই।
মায়ের মুখে এমন কথা শুনে সালাম চমকে গেল না। খাবার টেবিলে সে এমনই একটা আভাস পেয়েছিল। তাই সে স্বাভাবিক ভাবে বলল, এখন ওসব চিন্তা না করলে ভালো হয় না।
এমন সময় সেলিম ডেকে জিজ্ঞেস করল, ভাইয়া তুমি কি আজ মিরপুরে খালার বাসায় যাবে?
-সে একা যাবে কেন? তুইও যা। মা বললেন সেলিমকে।
-না আমি যেতে পারব না। শেলী বলল ঘরে মাছ তরকারি কিছু নেই বিকেলে বাজারে যেতে হবে। এ ছাড়া বাবার জন্য কিছু ওষুধ কিনতে হবে। ফলমূলও নেই-বলল সেলিম। গেলে বিকেলেই যাও। কাল সকালে তো বাবার কাছে হাসপাতালে যেতে হবে। তা ছাড়া শুনলাম কাল নাকি সকাল-সন্ধ্যা হরতাল। তুমি যদি যেতে চাও আমি লিপুকে ডেকে দিই তাঁর ট্যাক্সিতে যাবে। তাঁর সঙ্গেই চলে আসবে।
-ঠিক আছে তাই কর লিপুকে ডেকে দে, সেলিমের উদ্দেশ্যে মা বললেন।
-হরতাল তো কাল। আজকে তো কোনো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। ঠিক আছে সন্ধ্যার আগেই ফিরে আসব, সালাম বলল।
মা বললেন, বাবা তুমি দেরি কোরো না, সময় মতো বাসায় ফিরে এসো।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে এল। রাতের আঁধারে চারিদিক অন্ধকার হয়ে আসছে। রাস্তার পাশের লাইট পোস্টের বাতিগুলো দপ করে জ্বলে উঠল। সেলিম ইতিমধ্যে বাজার থেকে ফিরেছে। সালাম এখনো বাসায় ফিরল না। সেলিম সালামের মোবাইলে কল করে কোনো সাড়া পাচ্ছে না। অগত্যা মা মোবাইল করলেন তাঁর ছোট বোন জমিলার বাসায়। সেখান থেকে জবাব এসেছে সে সেখানে নেই। সন্ধ্যার আগেই বাড়ির দিকে রওনা দিয়েছে। কোথাও কোনো খোঁজ খবর না পেয়ে সবাই অস্থির হয়ে পড়ল। গেল কোথায়? কী হলো?
এমন সময় ঘরের ওপর দিয়ে একটা কাক কা কা করে উড়ে গেল। অবেলায় কাকের ডাক অমঙ্গলেরই সংকেত এমনই ধারণা সবার। কাকের ডাক শুনে মায়ের উৎকণ্ঠা আরও বেড়ে গেল। তিনি কাউকে কিছু বুঝতে না দিয়ে নিজের বুকে চেপে রাখলেন।
রাত সাড়ে আটটার দিকে সেলিমের মোবাইল বেজে উঠল। মোবাইল করেছে ট্যাক্সি ড্রাইভার লিপু।
‘হ্যালো, সেলিম ।
-কে লিপু? সেলিম জবাব দিল।
-হ্যাঁ, আমি লিপু।
-খবর কী? ভাইয়া কোথায়?
-লিপু করুণ কণ্ঠে বলল খবর খুবই খারাপ ভাই, আমরা হাসপাতালে।
-সেলিম চিৎকার দিয়ে উঠল, কী? বলিস কি লিপু?
-হ্যাঁ, সেলিম হরতালকারীরা আমার ট্যাক্সিটি জ্বালিয়ে দিয়েছে সালাম ভাই মারাত্মক অগ্নিদগ্ধ হয়েছেন। ডাক্তারেরা তাঁকে বার্ন ইউনিটে ভর্তি করেছে। আমি আছি পাশের ইউনিটে। তাড়াতাড়ি চলে আয় মোটেও দেরি করিসনে। এখানে এলে সবই জানতে পারবি।
সংবাদ পাওয়া মাত্র মা, ভাই-বোন তাৎক্ষণিক হাসপাতালে পৌঁছাল। সঙ্গে লিপুর মা-ও। মাথায় ব্যান্ডেজ বাঁধা লিপু হাসপাতালের বেডে বসে আছে। পাশে দাঁড়িয়ে আছে কয়েকজন যুবক। লিপুকে জড়িয়ে ধরে তার মা কেঁদে ফেলল।
-কেঁদোনা, কেঁদোনা মা। আল্লাহ্‌র ইচ্ছায় আমি ভালো আছি। মাথায় সামান্য আঘাত লেগেছে মাত্র। মাকে সান্ত্বনা দিয়ে লিপু বলল। এমন সময় সেলিম জিজ্ঞেস করল, ভাইয়া কোথায় লিপু?
-সে অপারেশন থিয়েটারে আছে। নার্সের কাছে জিজ্ঞেস কর তোরা সেখানে যেতে পারবি কি না? লিপু জবাব দিল।
-কীভাবে কী হলো?
-আমরা মিরপুরে তোর খালার বাসা থেকে ফার্মগেট হয়ে ফিরছিলাম। মগবাজার টঙ্গী ডাইভারশন রোডে রেলক্রসিংয়ের কাছে আসলে রাস্তার পাশে ট্যাক্সি রেখে আমি পাশের দোকানে একটা সিগারেট কিনতে যাই। সালাম ভাই ট্যাক্সিতেই বসে ছিলেন। হঠাৎ গলি থেকে তিন-চারজন পিকেটার এসে আমার ট্যাক্সিতে পেট্রল দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। সালাম ভাই চিৎকার দিয়ে ওঠে। তাঁর চিৎকার শুনে দেখি ট্যাক্সিতে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছে। তিনি ট্যাক্সি থেকে বের হয়ে আসতে চেষ্টা করছেন। পিকেটাররা তাতে বাঁধা দিচ্ছে এবং তাঁকে ধাক্কা দিয়ে ট্যাক্সির ভেতর ফেলে দিয়ে বাইরের থেকে জানালা বন্ধ করে দিল। আমি তখন সিগারেট না কিনেই তাঁর সাহায্যের জন্য ছুটে আসি। এসেই ট্যাক্সির জানালা ভাঙতে বাইরে থেকে লাথি মারতে থাকি। পিকেটারদের কেউ একজন আমার মাথায় আঘাত করে। সঙ্গে সঙ্গে আমি জ্ঞান হারাই। যখন জ্ঞান ফিরল তখন দেখি আমি হাসপাতালের বেডে।
পাশে দাঁড়ানো এক যুবক বললেন, ‘সে আমার দোকানেই সিগারেট কিনতে গিয়েছিল। লিপুর সাহায্যে আমরা এগিয়ে আসি এবং আমরাই জানালার কাচ ভেঙে সালাম সাহেবকে উদ্ধার করি। ততক্ষণে তাঁর শরীরের বেশির ভাগ পুড়ে গেছে। তিনি ট্যাক্সিতেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছেন। তাৎক্ষণিক অ্যাম্বুলেন্স ডেকে সালাম সাহেব ও লিপুকে মেডিকেলে নিয়ে আসি।
-আপনাদের অনেক অনেক ধন্যবাদ। আপনারা আমার ভাইয়ের জন্য এতটুকু কষ্ট করেছেন। সেলিম তাঁদের কৃতজ্ঞতার সঙ্গে বলল।
এমন সময় সালামের মা কান্না জড়িত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, কই আমার বুকের ধন, আমার বাচা কই? আরেক যুবক তাঁকে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, খালা আপনি অত বিচলিত হবেন না। তিনি ভালো আছেন, সামান্য পুড়ে গেছেন। তাই অপারেশন হচ্ছে। একটু পরেই আপনি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পারবেন।
ঘণ্টা খানেক পরে সালামের মা সালামের সঙ্গে সত্যি সত্যিই দেখা করলেন। কিন্তু, সালাম কথা বলল না মা, ভাই বোনদের সঙ্গে। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল। তার আপাদমস্তক শুভ্র ব্যান্ডেজে মোড়া যেন একটি তুষার মানব সে। মা বোনদের দিকে তাকিয়ে সালামের দুই চোখের কোনা দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে গেল। সে অশ্রু মোছার শক্তিও তার নেই। মা দৌড়ে এসে শাড়ির আঁচল দিয়ে সে অশ্রু মুছে দিলেন। সালামের এ অবস্থা দেখে মা, ভাই-বোন কান্নায় ভেঙে পড়ল। ভাইয়া, ভাইয়া ও আল্লাহ্‌ এ কি হলো আমার ভাইয়ার বিলাপ করতে করতে সালামের ব্যান্ডেজ মোড়া শরীর জড়িয়ে ধরল শেলী। নার্স তাকে সরিয়ে নিলেন।
সালামের শরীরের ষাট শতাংশ পুড়ে গেছে। তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটতে থাকলে বার্ন ইউনিট থেকে দ্রুত ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে স্থানান্তর করা হয়। মায়ের আদর, বাবার স্নেহ আর ভাই-বোনের ভালোবাসাকে উপেক্ষা করে পাঁচ দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে সালাম পৃথিবী থেকে বিদায় নিল। মৃত্যুর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে তার শয্যাপাশে বসেছিল ছোট ভাই সেলিম। সালাম তাকে বলেছে, ভাইরে আমি আর বাঁচব না। তুই ঠিকমতো পড়াশোনা করিস। একজন ডাক্তার হয়ে মা-বাবার আশা পূর্ণ করিস। আমাকে নিয়ে তাঁরা যে স্বপ্ন দেখেছিলেন হরতাল নামের নিষ্ঠুর দানব সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার করে দিল। তুই তাঁদের সেই আশাকে পূর্ণ করিস, সেই স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করিস। এ কথা বলেই সালাম আস্তে আস্তে নিস্তেজ হতে লাগল। সোনালী আকাশের হাজার তারার মাঝ থেকে অকালে ঝড়ে গেল উজ্জ্বল একটি তারা। অস্তমিত হলো জাতির একটি ভবিষ্যৎ। ভেঙে গেল একটি স্বপ্ন।
মা শিরিন বেগম ও ভাই-বোনের আহাজারিতে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠলো। তাদের বুক ফাটা কান্নায় ডাক্তার, নার্স, উপস্থিত সাংবাদিকেরাও আবেগতাড়িত হয়ে পড়লেন।

আটলান্টা।


Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৯:২৯ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০২ মার্চ ২০১৯

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com