সুন্দরবনে বন্যপ্রাণী শিকারের মহোৎসব

মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০১৫

সুন্দরবনে বন্যপ্রাণী শিকারের মহোৎসব

 

শুভ্র শচীন


 

imagesসুন্দরবনে প্রতিনিয়ত বন্যপ্রাণী শিকার চলছেই। এখানে ভাড়ায় মেলে আগ্নেয়াস্ত্র। একশ্রেণির শিকারি গডফাদার মহাজনের কাছ থেকে অগ্রিম ‘দাদন’ নিয়ে সুন্দরবনে ঢোকার পাস সংগ্রহ করে নির্বিচারে হরিণ, বাঘ, বানর, পাখি, সাপ, কুমিরসহ শিকার করছে নানা বন্যপ্রাণী। বনরক্ষীদের অগোচরে চোরা শিকারিচক্র এখন খুবই তৎপর। একশ্রেণির অসাধু বন কর্মকর্তা-কর্মচারী উৎকোচের বিনিময়ে এই শিকারিদের বনে ঢোকার সুযোগ করে দিচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া একই সঙ্গে সুন্দরবন অভ্যন্তরের নদী ও খালে বিষ দিয়ে মাছ এবং কাঁকড়া শিকার চলছে।

প্রচার রয়েছে, টাকার যোগান থাকলেই সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় যে কেউ সহজেই সংগ্রহ করতে পারেন সুস্বাদু হরিণের মাংস। তাছাড়া ওই সব এলাকায় বিভিন্ন উৎসব-পার্বণের ভোজ অনুষ্ঠানে বিশেষ আকর্ষণ থাকে হরিণের মাংস। অনেকে কাজ বাগাতে এখান থেকে হরিণের মাংস সংগ্রহ করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠান। বন এলাকার গ্রামগুলোতে কেজিপ্রতি ৫০০ টাকায় মেলে সুস্বাদু হরিণের মাংস। বনের মায়াবি হরিণের শিং নয় এখন জ্যান্ত হরিণই শোভা পায় ভিআইপি-সিআইপিদের ড্রয়িং রুমে।

সুন্দরবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ রয়েল বেঙ্গল টাইগার বাংলাদেশকে দিয়েছে বিশ্বখ্যাতি। সেই রয়েল বেঙ্গল টাইগারই এখন অস্তিত্ব সংকটে। বিশ্বখ্যাত এ বাঘের শেষ আশ্রয়স্থল সুন্দরবনও এখন তাদের জন্য নিরাপদ নয়। শুধু হত্যাই নয়, বাঘের চলাফেরা, প্রজনন, বংশ বৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশেও হানা দিচ্ছে শিকারিচক্র। এমনকি সরকার ঘোষিত ৩টি অভয়ারণ্য এলাকায়ও বন্যপ্রাণীরা নিরাপদে নেই। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি বন ধ্বংস করে নতুন বসতি গড়ে উঠায় বন-নিভর্রশীল মানুষের সংখ্যা বাড়ছে এবং বাঘের স্বাভাবিক চলাচলের জায়গা দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। অন্যদিকে ঘূর্ণিঝড়, সিডর, আইলার পর জোয়ারের পানি দ্রুত জঙ্গলে প্রবেশ করে বাধাপ্রাপ্ত হওয়ায় মিষ্টি পানির পুকুরগুলোয় লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়ছে, ফলে বাঘ মিষ্টি পানি ও খাবারের সন্ধানে হঠাৎ করেই লোকালয়ে চলে আসছে এবং গণপিটুনির শিকার হচ্ছে।

সুন্দরবন বনবিভাগের একজন শীর্ষ বন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শিকারিদের ও স্থানীয় গ্রামবাসীর হাতে গণপিটুনিতে বাঘ মারা যাওয়ার ঘটনা নতুন কিছু নয়। তবে সম্প্রতি শিকারিদের হাতে বাঘ হত্যাকা-ের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে সুন্দরবন একাডেমির নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, বাঘ ও হরিণ শিকারের সব ঘটনা প্রশাসনের নজরে আসে না। বন্যপ্রাণী শিকারি এবং এর ক্রেতাদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

sundarban-deerঅভিযোগ ওঠেছে, সম্প্রতি একের পর এক বাঘ ও হরিণ শিকার হলেও তা বন্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না বনবিভাগ। বাঘ ও হরিণের চামড়ার দাম লোভনীয় হওয়ায় গুপ্ত শিকারিরা বেপরোয়া হয়ে ওঠেছে। তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে নির্বিঘ্নে এ কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। বনবিভাগের কিছু অসাধু কর্মী এ কাজে সহযোগিতা করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া চোরা শিকারিদের পাশাপাশি বনদস্যুরাও এখন বন্যপ্রাণী শিকারে মেতে ওঠেছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সুন্দরবনের চারটি রেঞ্জ সংলগ্ন গ্রামগুলোতে প্রায় দেড়শর অধিক সংঘবদ্ধ শিকারি দল রয়েছে। বন সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সূত্র জানায়, এদের অবস্থান বরগুনা জেলার পাথরঘাটার চরদুয়ানী, সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বাগেরহাট জেলার শরণখোলা, রামপাল, মংলা, মোড়েলগঞ্জ, সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের খুলনা জেলার পাইকগাছা, দাকোপ, কয়রা এবং সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি, শ্যামনগর ও কালিগঞ্জ উপজেলায়।

এই শিকারিরা বনে ঢুকে খাদ্যে বিষ অথবা ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে ফাঁদ পেতে কিংবা বন্দুক দিয়ে গুলি করে বাঘ ও হরিণ হত্যা করে। তারপর স্থানীয় পদ্ধতিতে চামড়া, মাংসসহ বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংরক্ষণ করে এবং তা গোপনে ঢাকা কিংবা চট্টগ্রামে নিয়ে যাওয়ার পর কৌশলে চোরাচালানিদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। পৃথিবীর প্রায় ৪০টি দেশের কালোবাজারে বাঘের চামড়া কেনাবেচা হয়। স্থানীয়ভাবে একটি বাঘের চামড়ার জন্য শিকারিরা দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা পেলেও বিদেশে একটি বাঘের চামড়ার মূল্য এর কয়েকগুণ বেশি। কুমিরের চামড়া, বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ এবং বাঘ ও হরিণের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মূল্যও অতি চড়া। তাছাড়া বাঘের শুকনো মাংস ও হাড়চূর্ণ কাজে লাগছে বুড়ো কোটিপতিদের। তাদের বিশ্বাস, এসব সেবনে হারানো পৌরুষ ফিরে পাবে তারা।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শিকারিরা বাঘ ও হরিণ ছাড়াও বিশেষ কায়দায় বনের বানর ধরে এনে দেশে-বিদেশে পাচার করছে। সার্কাস খেলা ছাড়াও অনেকে বাড়িতে শখ করে বানর পোষে। তবে পাচারকারীদের কাছে বাচ্চা বানরের চাহিদা বেশি। একশ্রেণির শিকারি সুন্দরবন থেকে হরেক রকম পাখি শিকার করে তা খুলনার নিউমার্কেট, চিত্রালী ও বয়রা বাজার এবং ঢাকার কাঁটাবন এলাকার পাখির দোকানে সরবরাহ করে। মানিকগঞ্জ এলাকার কিছু সাপুড়িয়া স্থানীয় সাপুড়িয়াদের সহযোগিতায় জেলের ছদ্মবেশে সুন্দরবনে প্রবেশ করে বিষধর সাপ ধরে বিষ প্রসেসিং করে তা বিদেশে বিক্রি করে। ওই চক্রটি কুমির ও গুইসাপ মেরে তার চামড়া, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ মোটা অঙ্কের বিনিময়ে পাচার করছে।

১৯৬০ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সুন্দরবনে অবৈধভাবে প্রায় ১৫০টি বাঘ হত্যার খবর পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে বহুগুণ বেশি। তাছাড়া এ সময় প্রায় শতাধিক বাঘের চামড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আটক হয়েছে। তবে এর গডফাদাররা ধরা পড়েনি। অন্যদিকে বনবিভাগের কাছে এ ব্যাপারে কোনো সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে ১৯৮১ সাল থেকে এ পর্যন্ত সুন্দরবনে প্রায় শতাধিক বাঘ হত্যার শিকার হয়েছে বলে জানা যায়। সুন্দরবনের চাঁদপাই এলাকায় সবচেয়ে বেশি রয়েল বেঙ্গল টাইগার হত্যার শিকার হচ্ছে। সুন্দরবনের হরিণ এত হরহামেশাই শিকারে পরিণত হয় যে, এর কোনো পরিসংখ্যান কেউ রাখে না।

turtlesএদিকে মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে বাঘের ৭টি, হরিণের ৬৫টি এবং ১টি গন্ধগোকুলের চামড়া উদ্ধার করেছে র‌্যাব ও পুলিশ। তবে বাঘ ও হরিণ শিকারের সব ঘটনা নজরে আসছে না বলে মনে করছেন সুন্দরবন বিশেষজ্ঞরা। র‌্যাব-৬ (খুলনা), র‌্যাব-৮ (বরিশাল), র‌্যাব-১০ এবং পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ১৬ অক্টোবর সাতক্ষীরা থেকে বাঘের দুটি চামড়াসহ আটক করা হয় ৬ জনকে। চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ থেকে বাঘের একটি চামড়াসহ তিনজনকে আটক করে র‌্যাব সদস্যরা। ১৮ জানুয়ারি র‌্যাব-১০ রাজধানীর কলাবাগান এলাকা থেকে ১টি বাঘের চামড়াসহ আলম, জনি ও রুবেল নামে ৩ যুবক এবং মোস্তাফিজ এবং সবুজ নামে ১টি হরিণের চামড়াসহ আটক করে। ৩ ফেব্রুয়ারি বরগুনার পাথরঘাটা থেকে হরিণের ৩৬টি চামড়াসহ উজ্জ্বল ও শাহীন এবং বাগেরহাটের শরণখোলা থেকে হরিণের একটি চামড়াসহ শরণখোলার ছইলবুনিয়া গ্রামের শাহাবাজ খানকে আটক করা হয়। ৫ ফেব্রুয়ারি সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটার কুমিরা এলাকার কদমতলা থেকে ১টি বাঘের চামড়াসহ শ্যামনগর উপজেলার খুলশীবুনিয়া গ্রামের গোলাম হোসেনের ছেলে দীন মোহাম্মদকে আটক করা হয়। ২০ ফেব্রুয়ারি পিরোজপুর জেলার ভা-ারিয়া উপজেলার ইকড়ি বাজার থেকে বাঘের ১টি চামড়া ও হরিণের ১৪টি চামড়াসহ দুজনকে আটক করে র‌্যাব। ২৪ ফেব্রুয়ারি সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার বুধহাটা এলাকা থেকে একটি বাঘের ও ৪টি হরিণের চামড়াসহ তিন শিকারি আশাশুনির দুর্গাপুর গ্রামের মনতাজ মোড়লের ছেলে ইসমাইল হোসেন, খুলনার দাকোপের কালাবগি গ্রামের মনসুর গাজীর ছেলে আমান উল্লাহ গাজী ও দেবহাটার কড়া গ্রামের ওহাব আলী সরদারের ছেলে আবু সালেককে আটক করা হয়। এছাড়া ৪ মার্চ মোড়েলগঞ্জের কচুবুনিয়া এলাকা থেকে পুলিশ ৫টি চিত্রল হরিণের এবং গন্ধগোকুলের চামড়াসহ আবদুর রশিদ নামের এক ব্যক্তিকে আটক করে।

বাংলার গর্বঃ রয়েল বেঙ্গল টাইগার

বাংলার গর্বঃ রয়েল বেঙ্গল টাইগার

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জহির উদ্দিন আহমেদ বলেন, শিকারি ও বনদস্যুদের গ্রেফতারের জন্য বনবিভাগ, র‌্যাব, পুলিশ ও কোস্টগার্ড যৌথভাবে কাজ করছে। তিনি জানান, বন্যপ্রাণী শিকার ও পাচার বন্ধে সুন্দরবনে ঢোকা এবং বের হওয়ার নদী-খালগুলোর মুখে তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে। এছাড়া বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে পশ্চিম সুন্দরবনে ইঞ্জিনচালিত ট্রলার চলাচল। র‌্যাব-৬ পরিচালক এনামুল আরিফ সুমন জানান, বন্যপ্রাণী শিকার ও পাচারের সঙ্গে জড়িতদের ধরতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। র‌্যাব-৮ উপ-অধিনায়ক মেজর আদনান কবীর বলেন, বন্যপ্রাণী শিকার ও পাচারে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে কাজ চলছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সুন্দরবনে অতীতে বহু প্রজাতির বিরল প্রাণীর উপস্থিতি ছিল, যেগুলো কালের বিবর্তনে বিলুপ্ত হয়েছে। বুনো মহিষ, পারা হরিণ, বুনো ষাঁড়, ছোট ও বড় , চিতা বাঘ বিলুপ্ত হয়েছে অনেক আগেই। নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে সাদা মানিক জোড়া, গগন বেড়, তিতিরসহ ১৬ প্রজাতির বিভিন্ন বন্যপ্রাণী। সুন্দরবনের ভেতর বন মোরগের ডাক শোনা এখন অনেকটা ভাগ্যের ব্যাপার।

সুন্দরবন বিশেষজ্ঞদের অভিমত, সুন্দরবনে বাঘ, হরিণ, বানর, পাখি, সাপ, কুমিরসহ অন্যান্য বিরল প্রজাতির প্রাণী শিকারের যে মহোৎসব চলছে তাতে এরা কতদিন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবে তা বলা মুশকিল। তাই জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সুন্দরবনকে রক্ষা করতে এখনই যুগোপযোগী পদক্ষেপ নিতে হবে। এটা খুব কঠিন কাজ নয়। শুধু প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ ও সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা। তবে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দেশপ্রেম, সততা ও আন্তরিকতা। সুত্রঃ সাপ্তাহিক এই সময় ।

 

শনিবারের চিঠি / আটলান্টা / ১৯ মে ২০১৫

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৬:২২ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০১৫

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com