সুন্দরবনের নতুন ’বাঘ’ মুস্তাফিজ!

বুধবার, ২৪ জুন ২০১৫

সুন্দরবনের নতুন ’বাঘ’ মুস্তাফিজ!

 

এস,এম শহীদুল ইসলাম,সাতক্ষীরাঃ
অজ পাড়া গাঁয়ে জন্ম নেয়া সাতক্ষীরার মুস্তাফিজুর রহমান আলোচনার ঝড় তুলেছেন ক্রিকেট দুনিয়ায়। বিস্ময় বালক মুস্তাফিজকে নিয়ে চলছে তুমুল আলোচনা। তাকে ঘিরে এখন বাংলাদেশ নতুন করে স্বপ্ন দেখছে বিশ্ব জয়ের। সেই স্বপ্নের নায়ক সাতক্ষীরার বিস্ময় বালক মুস্তাফিজ।


দেশের মাটিতে পরপর দুটি ওয়ানডেতে ভারতকে কাঁপিয়ে দিয়ে ইতিহাসের অংশ হয়ে দাঁড়ালেন সাতক্ষীরার এই বিস্ময় বালক। ভারত বধের নায়ক মুস্তাফিজের গ্রাম আর শহর জুড়ে চলছে আনন্দের বন্যা । মুস্তাফিজপ্রেমীরা নেচে গেয়ে হৈ হুল্লোড় করে বৃষ্টিঝরা দিনেও আনন্দে মেতে উঠছেন। সন্তানের অভাবনীয় সাফল্যে স্পন্দিত হয়ে উঠছেন তার পরিবারের সদস্যরাও। তাদের প্রত্যাশা আগামী বিশ্বকাপে ট্রফি জয় করবে বাংলাদেশ। আর সেই ট্রফিই নিয়ে আসবে সুন্দরবনের টাইগার মুস্তাফিজ।

বৃষ্টিস্নাত দিনে সাতক্ষীরা শহর থেকে ৪৫কিলোমিটার দূরে কালীগঞ্জের তারালি ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া গ্রামে পৌঁছেই দেখা মিলল মাঠের কাদামাটির মধ্যে ক্রিকেটপ্রেমীদের উল্লাস। বন্ধু মুস্তাফিজ ক্রিকেট জগতের নতুন ইতিহাস তৈরী করায় তারা গর্বিত।

মুস্তাফিজের বাড়িতেও পাড়া প্রতিবেশীদের ভিড়। তাকে না পেয়ে বাবা ও স্বজনদের কাছে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছেন তারা। হয়ে উঠছেন আনন্দে মাতোয়ারা। মুস্তাফিজদের বাড়িতে রোববার রাতেও ছিল গ্রামের মানুষের ভিড়। ভারতের বিপক্ষে নিজেদের কৃতি সন্তানের খেলা দেখে উল্লসিত হয়েছেন আর তার জন্য মোনাজাত করেছেন। গ্রামের মানুষের খেলা দেখার জন্য মুস্তাফিজের পরিবার তাদের বাড়িতেই বড় টিভি দিয়ে বিশেষ ব্যবস্থা করে। ভারতের বিপক্ষে ম্যাচের দিন যেন মুস্তাফিজের বাড়িই কিছুক্ষণের জন্য হয়ে উঠেছিল মিরপুর জাতীয় স্টেডিয়াম ।

মুস্তাফিজের বাবা আবুল কাসেম ও মা মাহমুদা খাতুন বলেন, ১৯৯৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর জন্ম মুস্তাফিজের। চার ভাই ও দু’ বোনের মধ্যে বেড়ে ওঠা তার। বড় ছেলে গ্রামীন ফোনের টেরিটরি অফিসার হিসেবে কর্মরত আছে। অন্য দু’ছেলে ঘের ব্যবসায়ি। মুস্তাফিজ লেখাপড়ায় তেমন ভাল ছিল না। সে বরেয়া মিলনী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র। অনুর্ধ ১৬, ১৮ ও ১৯ দলে জেলা পর্যায়ে খেলেছে সে।

বাবা চেয়েছিল সে ডাক্তার হোক। কিন্তু সে হয়েছে বিশ্বজোড়া নামকরা ক্রিকেটার। তারা বলেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী আমার আত্মীয় জানিয়েছেন জনপ্রিয় ডাক্তার হয়েও বহু লোকের মনে স্থান করতে পারিনি, যা মুস্তাফিজ তার ক্রীড়া নৈপুণ্য দিয়েই অল্প সময়ে অর্জন করে ফেলেছে।

সাতক্ষীরা গণমুখী সংঘের কোচ আলতাফই প্রথম ধরতে পেরেছিলেন মুস্তাফিজের ভেতরের ‘প্রতিভা’টা। হিরে চিনে নিয়ে ঘষামাজার কাজটি শুরু করে দেন তিনিই। জেলা পর্যায়ে এসে মুস্তাফিজকে আরও পরিণত করে তুলতে পরিশ্রম করেন সাতক্ষীরার জেলা কোচ মুফাসসিনুল ইসলাম তপু।

সকলের পরিশ্রমের প্রতিদান দিতে পেরেছেন মুস্তাফিজ। পাকিস্তানের বিপক্ষে টি২০ ম্যাচে তাঁর পারফরম্যান্সই বলছে সে কথা। জেলা পর্যায়ের পর খুব বেশি দিন তাঁকে অপেক্ষা করতে হয়নি। ডাক পেয়ে যান খুলনার বিভাগীয় দলে খেলার। বছর তিনেক আগে শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে ফাস্ট বোলিং ক্যাম্পে ট্রায়াল দিতে এসে কোচরা আর ছাড়েননি এই প্রতিভাকে।

নিয়মিতই অনূর্দ্ধ-১৯দলে খেলেছেন। বল করতেন জাতীয় দলের নেটেও। তবে সম্ভবনার দ্যুতি ছড়িয়েছেন গত বছর অনূর্দ্ধ-১৯ বিশ্বকাপে। তার ঝুলিতে ভরেছিলেন নয়টি উইকেট। হয়েছিলেন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী।

গত বছরের মে মাসে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে বাংলাদেশ ‘এ’ দলেও স্থান পেয়েছিলেন মুস্তাফিজ। রীতিমতো চমক দিলেন তিনি। মুস্তাফিজ প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটে খেলা শুরু করেন গত বছর এপ্রিলে। এই তো ছয় মাস আগে অভিষেক হয়েছে ঘরোয়া এক দিনের ক্রিকেটে। মুস্তাফিজুরের বাড়িতে এসেছেন তার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল মান্নান । এসেছেন পাড়া প্রতিবেশীরাও। আবদুল মান্নান বলেন ‘লেখাপড়ায় তেমন মন ছিল না, শুধুই খেলতে চাইতো। আর সেই খেলাই তাকে চরম শিখরে নিয়ে গেছে। সে তেঁতুলিয়া গ্রাম ও বাংলাদেশকে নতুনভাবে পরিচিত করেছে বিশ্বদরবারে’।

তিনি আরও বলেন, ‘আমার স্কুল থেকে ৩৪জন ছাত্র বৃত্তি পেল, আশা ছিল সেও পাবে। কিন্তু বৃত্তি পাওয়া নয় মুস্তাফিজ হয়েছে আরও বেশি মর্যাদার ছাত্র’।

খেলাধুলায় অতি অনাগ্রহী মুস্তাফিজ স্কুলে যাবার নাম করে ছেলেবেলায় চলে যেত সাতক্ষীরায় অনুশীলন করতে। এভাবেই সে একদিন সাতক্ষীরার কোচ আলতাফ হোসেনের নজরে আসে। আর তাকে প্রতিদিন ভোরে মোটর সাইকেলে বাড়ি থেকে ৪৫ কিলোমিটার দূরে অনুশীলন করাতে নিয়ে যেতেন সহোদর মোখলেসুর রহমান পল্টু।

পল্টু বলেন, আমি নিজেও একজন ক্রিকেটার। আমার সাথেই সে খেলতো। অনেক সময় জুটি হয়েও খেলতো। ওর মধ্যে আমি প্রতিভা দেখতে পেয়েছিলাম। কষ্ট করে হলেও প্রতিদিন নিয়ে যেতাম সাতক্ষীরায়। কেনো এতো ভোরে রোজ কষ্ট করে যেতে হবে এমন প্রশ্নও করতো সে। তিনি বলেন, আমার বড় ভাই ও আমি বড় মাপের ক্রিকেটারদের নৈপুণ্য সিডিতে তুলে এনে দেখাতাম। মুস্তাফিজ তা অনুকরণ করতো বলেও জানালেন পল্টু।

মুস্তাফিজ প্রথম পর্যায়ে ফুটবল, ক্রিকেট দুইই খেলতো। স্থানীয় বরেয়া স্কুল মাঠ, তেঁতুলিয়া স্কুল মাঠ এই দুটি স্থানই ছিল তার অনুশীলনের জায়গা। স্থানীয়ভাবে চাম্পাফুল, সাঁইহাটি ছাড়াও বিভিন্ন স্থানে খেলার ডাক পড়তো মুস্তাফিজের। আর সব সময়ই সে ব্যস্ত থাকতো খেলা নিয়ে।

উপজেলা পর্যায়ের নানা খেলায় সে ও তার দল চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। খেলেছে সাতক্ষীরা স্টেডিয়ামেও। বরেয়া মিলনী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হীরালাল সরকার বলেন, মুস্তাফিজ বিদ্যালয়ের বহু খেলায় অংশ নিয়েছে। পুরষ্কৃতও হয়েছে। আগামী বিশ্বকাপে বাংলাদেশের পক্ষে ট্রফি নিয়ে আসবে আমাদের সাতক্ষীরার মুস্তাফিজ।

বরেয়া গ্রামের নবজীবন ক্লাবের একজন সদস্য মুস্তাফিজ। এই ক্লাবের কর্মকর্তা মিরাজ খালিদ বলেন, মুস্তাফিজ ‘সুন্দরবনের টাইগার’। সে ‘সাতক্ষীরা এক্সপ্রেস’। তাকে নিয়ে আমরা গর্বিত। গ্রামের বন্ধুরা বলেন মুস্তাফিজ খুবই পাখি প্রিয়। খেলা শেষে আমরা এক সাথে বিলে ও গাছে পাখি ধরতে যেতাম।

 

সাতক্ষীরার মুস্তাফিজের পরিবার

সাতক্ষীরার মুস্তাফিজের পরিবার ছবিঃ এস এম শহীদুল ইসলাম

মুস্তাফিজকে নিয়ে গ্রামের বাজারঘাট, দোকানপাটেও আলোচনার শেষ নেই। শেষ নেই প্রশংসারও। তারা বড় পর্দায় খেলা দেখে আনন্দ লাভ করেছেন। একই সাথে মুস্তাফিজ ও তার পরিবারকে নানাভাবে সম্মানিত করারও আয়োজন চলছে। এই রমজানে তাকে ও তার পরিবারকে ইফতারির দাওয়াত দিচ্ছেন গ্রামের মানুষ।

মুস্তাফিজের কোচ আলতাফ হোসেন বলেন, সে নিয়মিত অনুশীলন করতে আসতো। আমরা তাকে বাছাই করে বিভাগীয় পর্যায়ে পাঠাই। এভাবেই বিভাগীয় পর্যায় থেকে জাতীয় দলে প্রবেশ তার। মুস্তাফিজ বয়স ভিত্তিক খেলাতেও ৪-৫টি উইকেট লাভ করেছে বারবার। সাতক্ষীরার মুস্তাফিজ ও সৌম্য সরকার ক্রিকেটে বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে মর্যাদার আসনে নিয়ে গেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অত্যন্ত লাজুক প্রকৃতির ছাত্র মুস্তাফিজ বয়সভিত্তিক খেলা শেষে জাতীয় পর্যায়ে যেতে বয়সের কারণে বাধার মুখে পড়ে। জেলা ক্রীড়া সংস্থার কর্মকর্তারা বলেন, তাকে নিয়ে আমরা ফাইট করেছি। তার পারফরম্যান্স তাকে জাতীয় দলে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।

সাজেক্রীসের সাধারণ সম্পাদক শেখ নিজামউদ্দিন বলেন, বয়সে নবীন হলেও তার পারফরমেন্স ক্রিকেট জগতকে নতুন করে চিনিয়েছে। তিনি আরও বলেন, গ্রাম বাংলার আনাচে কানাচে মুস্তাফিজের মতো অনেক প্রতিভা পড়ে রয়েছে। এদের এভাবে তুলে আনার ব্যবস্থা করা গেলে বাংলাদেশ অনেকদুর এগিয়ে যেতে পারবে।

শনিবারের চিঠি / আটলান্টা/ ২৪ জুন ২০১৫

 

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৯:৪৬ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ২৪ জুন ২০১৫

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com