ছোট গল্প

সাত রঙের শাড়ি

শনিবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২১

সাত রঙের শাড়ি
প্রচ্ছদ সংগৃহীত

ঈদের আর মাত্র তিন দিন বাকি, ইতিমধ্যে ঈদ সংক্রান্ত সব কেনাকাটা করে ফেলেছে রায়হান। কিন্তু বাকি আছে শুধু বউয়ের শাড়ি কেনা। যতো রকমের কেনাকাটাই হোক না কেনো, বউয়ের শাড়ি না কিনলে কি আর ঈদ হয়, নাকি ঈদের আনন্দ থাকে। বউ যদি থাকে গোমড়া মুখে তাহলে তো সকল আয়োজনই বৃথা। তাই দুপুরে খাওয়ার পরে একটু ঘুমানোর অভ্যাসটাকে আজকের মতো পরিত্যাগ করে বন্ধু সোহেলকে তাড়া দিলো রায়হান। সোহেলের চোখটাও একটু ধরে এসেছে কেবল, কিন্তু রায়হানের হাঁক ডাকে ঘুমোবার ইচ্ছেটাকে পরিত্যাগ করে শেষমেশ রেডি হয়ে বেড়োল সোহেল।

রায়হানকে জিজ্ঞেস করলো এতো ডাকাডাকি কেনো? কোথায় যাবি? রায়হান বললো আমার আসল খরচটাই করা হয়নি। সোহেল বললো কি সেটা? রায়হান বললো তোর ভাবীর শাড়ি এখনো কেনা হয়নি।
যাইহোক দুই বন্ধু মিলে গেলো নিউমার্কেটে। অনেক ঘুরেফিরে একটা শাড়ির দোকানে ঢুকে পরলো। দোকানের কর্মচারী দুজনকে বসতে বলে একের পর এক ভাঁজ খুলে সামনে শাড়ির ঢিবি তৈরী করে ফেললো। হরেক রকম শাড়ি, কমদামী বেশী দামী বিভিন্ন রংয়ের বিভিন্ন প্রিন্টের অনেক শাড়ি। কিন্তু রায়হান সেলসম্যান ছেলেটাকে বললো, আমার সাত রঙের সাতটি শাড়ি চাই। কথা শুনেতো ছেলেটি আহ্লাদে গদোগদো, এক কাস্টমারই কিনবে সাতটি শাড়ি। ছেলেটি বললো স্যার বসেন, সাত নয় আমাদের দোকানে সাইত্রিশ রংয়ের শাড়ি আছে, আপনার যেমন যেমন পছন্দ সবই আছে।


রায়হান যখন ছেলেটির সাথে এমন আলাপ আলোচনা করছে, তখন সোহেল রীতিমতো হতবাক। সোহেল একরকম জোর করেই রায়হানকে বাইরে ডেকে নিয়ে গেলো, এবং জিজ্ঞেস করলো, এতো শাড়ি দিয়ে তুই কি করবি?

এখানে পুর্বের কিছু কথা বলা দরকার। রায়হান একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পিওনের চাকরি করে। পড়াশোনা মাত্র সেভেন পাশ। মোটামুটি কমবয়সেই বিয়েটা সেরে ফেলেছিলো। রায়হান যখন বিয়ে করে তখন টাকাপয়সা ছিলোনা বললেই চলে। শুধু মনের জোরে, আর নিপাকে তার খুব পছন্দ হয়েছিলো বলেই সামর্থ্য না থাকা সত্ত্বেও বয়সের তুলনায় একটু আগেভাগেই বিয়েটা করে ফেলেছিলো। রায়হানের বউয়ের পুরো নাম নাজমুন্নাহার নিপা। যেহেতু রায়হানের তেমন পয়সা টাকা ছিলোনা, তাই বিয়ের সময় নিপাকে সে প্রকৃত অর্থে বিয়ের শাড়ি যাকে বলে তা কিনে দেওয়া হয়নি।

লেখা পাঠান
শনিবারের চিঠির সাহিত্য পাতায় প্রতি শনিবার  কবিতা, প্রবন্ধ, ভ্রমণ কাহিনী প্রভৃতি প্রকাশিত হয় । আপনি লেখা  পাঠাতে চাইলে আপনার লেখা সংযুক্ত করে নিচের ইমেইল ঠিকানায় পাঠিয়ে দিন। লেখার সঙ্গে অবশ্যই ঠিকানা ও যোগাযোগ নম্বর দিতে হবে। ইমেইলঃ editor@thesaturdaynews.com । দুঃখিত হাতে লেখা স্ক্যান করা লেখা গ্রহণ করা হয় না।
——————————————————————————————————–

সেসময় দুইশ বিশ টাকা দামের দু-খানা শাড়ি দিয়েই বিয়ে করেছিলো রায়হান। এ নিয়ে প্রথম দিকে নিপা তেমন কিছু বলতো না। আস্তে আস্তে নিপা অন্যান্য পুরাতন পিওনদের বউদের সাথে চলাফেরা মেলামেশা করে মাঝে মধ্যেই শাড়ির প্রসঙ্গ তুলে রায়হানের সাথে খটমট করে। রায়হান তাকে শুধু বলে যে, আমিতো নতুন পিওন, এখনও আয় ইনকাম তেমন সুবিধার নয়। একটু পুরান হয়ে নেই, আমি তোমাকে সাত রঙের সাতটি শাড়ি কিনে দেবো। রায়হানের চাকরির বয়স এখন বারো বলছ পেরিয়েছে। আয় ইনকামও এখন আগের থেকে অনেক ভালো। টাকাপয়সাও ভালোই জমিয়েছে। তাই বউ আর এখন মানতে চায়না। সে এখন ঘনঘন-ই দামি শাড়ি কিনে চায়। রায়হানও নতুম পে-স্কেল পেয়েছে, তাতে বেতন বেড়েছে দ্বিগুণ, ঈদ বোনাসও পেয়েছে মোটা অংকের। তাই সে এই ঈদকে উপলক্ষ করে তার এক যুগের পুষে রাখা ইচ্ছেটা এবার পূরণ করতে চায়। এর আগে একদিন রাতের খাবার খেয়ে স্বামী-স্ত্রী দু-জন পাশাপাশি শুয়ে রায়হান নিপাকে বলেছিলো তার একটা স্বপ্নের কথা। সে বলেছিলো আমি তোমাকে সাত রঙের সাতটি শাড়ি কিনে দেবো, একটা করে রঙের শাড়িকে একটা করে বারের নাম দেবো। নাম অনুযায়ী যেদিন তুমি যে রঙের শাড়ি পড়বে, আমি শাড়ির রঙ দেখেই বুঝবো আজকে কি বার? শাড়ির রঙ দেখে বুঝতে পারবো যে, আজকে অফিস খোলা অথবা বন্ধ, আজ আমাকে ডিউটিতে যেতে হবে নাকি হবেনা। রায়হান বিস্তারিত সোহেলকে বুঝিয়ে বলার পরে, সোহেল অনেকটা সহানুভূতিশীল হয়ে খানিকটা আগ্রহ নিয়ে পুনরায় দোকানে ঢুকলো।

দোকানে ঢুকে রায়হান ছেলেটিকে বললো, এক রঙা সাত রঙের সাতটি শাড়ি দাও। এবারও সোহেল বাঁধা দিলো, বললো বন্ধু তোর বউ তো মধ্যবয়সী মেয়ে মানুষ না, তাই সাত রঙের সাতটি-ই নে, তবে ছাপার মধ্যে নে। একটা যুবতী মেয়েকে বুড়োদের কাপড় পড়ানো বেমানান হবে। কথাটা অবশ্য রায়হানের মনে ধরলো। শেষমেশ বিভিন্ন ধরনের ছাপার মধ্যে সাত রঙের সাতটি শাড়ি কিনলো। শাড়ির সাথে তো ব্লাউজ পিস ছিলোই, কিন্তু রঙ মিলিয়ে পেটিকোট মানে সায়ার কাপড়ও তো কিনতে হবে? তাই অনেক খুজে খুজে দুই বন্ধু গলদঘর্ম হয়ে সায়ার কাপড়ও কিনে ফেললো। এবার ঘরে ফেরার পালা। মাঝপথে দুই বন্ধু আয়েশ করে দু-কাপ চা খেলো, দুই খিলি পান মুখে পুরে দুইজনে দুটো সিগারেট জ্বালিয়ে মনের আনন্দে ঘরে ফিরলো। কিন্তু দরজায় পা রেখেই রায়হানের বুকটা ছ্যাত করে উঠলো। পুরো বাড়ি অন্ধকার, এমন সময়ে বাড়িতো অন্ধকার থাকবার কথা নয়, খারাপ কিছু হয়নি তো? এমন অনেক সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে রায়হান ঘরের দরজায় ধাক্কা দিলো, এ কি দরজা তো খোলা! ঘরে নিপাও নেই আর রায়হান একমাত্র ছেলে রাজুও নেই। রায়হান তাড়াতাড়ি ওর মায়ের ঘরে গেলো, মা-কে জিজ্ঞেস করলো, মা নিপা রাজু ওরা কই? মা গম্ভীর কিছু বলছেনা। এখন রায়হানের ধৈর্য্য কমে আসছে, মা-কে সে খুব জোরে জোরে জিজ্ঞেস করছে, তখন মা বললো খানিক আগে ঘটে যাওয়া ঘটনা।

রায়হানের ছোটবোন রোজী। ঈদ উপলক্ষে সে এ বাড়িতে এসেছে, এসেই ভাবীর সাথে লেগেছে ঝগড়া। নিপা এমনিতেই একটু চড়া মেয়েমানুষ, তার উপর ছোট ননদ বাপ তুলে কথা বলেছে, তাই ননদকে রুটি ডলা বেলুনী দিয়ে কয়টা বারি দিয়েছে। রোজী-ই বা এটা সইবে কেনো? ওর-ই বাপের বাড়িতে ভাইয়ের বউ গায়ে হাত তুলবে এটা কি মানা যায়? তাই রোজীও দু’ঘা দিয়েছে। নিপার কি আর সহ্য হয়? ননদ হয়ে গায়ে হাত তুলেছে, এতো বড় কথা, থাকবোইনা আর এ বাড়িতে, তোর ভাইয়ের সংসারও আর করবো না, আয় রাজু আমি এক্ষুনি বাপের বাড়ি যাবো।

যে কথা সেই কাজ, বাক্স পেট্রা গুটিয়ে নিপা চলে গেছে বাপের বাড়িতে। সে রাতে রায়হান আর শশুর বাড়িতে গেলোনা। পরদিন বন্ধু সোহেলকে সাথে নিয়ে গেলো শশুর বাড়িতে নিপাকে আনতে। দুই বন্ধু মিলে অনেক বোঝালো, কিন্তু নিপার একটাই কথা, হয় তোমার বোনকে বাদ দিতে হবে, নাহয় আমাকে। রায়হানের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পরলো, সে কাকে বাদ দিবে, কিভাবে বাদ দিবে? বোন হচ্ছে রক্তের সম্পর্ক আর তার তো তেমন দোষও নাই, বোনকে কিভাবে বাদ দিবে? আবার নিপাকেও এতো বেশি ভালোবাসে যে, তাকে বাদ দেওয়ার কথা কল্পনাও করতে পরেনা।

ঢাকা ।।

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১২:১৯ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২১

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com