সাঈদীর ফাঁসির জন্য রাষ্ট্রের শেষ চেষ্টা

বুধবার, ১৩ জানুয়ারি ২০১৬

সাঈদীর ফাঁসির জন্য  রাষ্ট্রের শেষ চেষ্টা

সাঈদীর ফাঁসির জন্য  রাষ্ট্রের শেষ চেষ্টা
আমিনুল ইসলাম মল্লিক

Opinoinমানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে আমৃত্যু কারাদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর সর্বোচ্চ সাজার (ফাঁসি) জন্য শেষ বিচারিক চেষ্টা চালাচ্ছে রাষ্ট্রপক্ষ। মঙ্গলবার আদালতের কাছে সাঈদীর আমৃত্যু কারাদণ্ডের পরিবর্তে ফাঁসির সাজা চেয়ে সর্বশেষ আবেদন করা হয়েছে।


মানবতারিবোধী অপরাধে ট্রাইব্যুনাল ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি সাঈদীকে ফাঁসির সাজা দিয়ে রায় ঘোষণা করে। সে রায়ের বিরুদ্ধে সাঈদী ও রাষ্ট্রপক্ষ উভয়ই পাল্টাপাল্টি আপিল করে। আপিলে সাঈদী খালাস চাইলেও রাষ্ট্রপক্ষ চায় ফাঁসি। শুনানি শেষে আসামি ও রাষ্ট্রপক্ষের করা কোনো আবেদন গ্রহণ করে না আদালত। আপিল বিভাগ ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সাঈদীকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেয়। অর্থাৎ মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সাঈদী কারাগারে থাকবেন। আদালত সাঈদীর এ রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি প্রকাশ করে দীর্ঘ ১৫ মাস পর। রায় প্রকাশের পর এ মামলার পক্ষ সমুহের রিভিউ আবেদন করার পথ তৈরি হয়।

এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সাঈদীর রায়ের পুর্নবিবেচনা (রিভিউ) করে তাকে মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রাখতে শেষে সুযোগটি নিচ্ছে সরকার। এখন দেখার পালা এ মামলায় সাঈদীর ফাঁসি হবে নাকি আপিলের রায় বহাল থাকবে।

মঙ্গলবার রাষ্ট্রপক্ষ সাঈদীর সাজা বৃদ্ধি চেয়ে সর্বশেষ আবেদন করে। আবেদনের পর অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মাহবুবে আলম বলেন, ‘একাত্তরে সাঈদী জনবিরোধী ছিলেন, সে সময় তিনি অনেক কু-কর্ম করেছেন।’

অ্যাটর্নি জেনারেল আরো বলেন, ‘ইব্রাহিম কুট্রি ও বিশা বালীকে হত্যা এবং হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের অনেক দোকান-পাট লুট ও পোড়ানোর অভিযোগের বিষয় পুনঃর্বিবেচনার (রিভিউ) আবেদন করেছি। আশা করছি রিভিউ আবেদনে সর্বোচ্চ শাস্তি হবে সাঈদীর।’

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দেলাওয়ার হোসইন সাঈদীর রিভিউ আবেদন শুনানিতে বেঞ্চে কোন কোন বিচারপতি থাকবেন তা ঠিক করে দেবেন প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা।’

মঙ্গলবার বিকেলে সাঈদীর আপিলের রায়ের পুনঃর্বিবেচনা (রিভিউ) আবেদন দায়েরের পর তিনি নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের কাছে এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, ‘নিয়মানুযায়ী এ মামলার রায় আপিল বিভাগের যে বেঞ্চে ঘোষণা করা হয়েছে তারাই রিভিউ আবেদনের ওপর শুনানি করবেন। তবে সাঈদীর আপিলের রায় ঘোষণাকারী ৫ বিচারপতির মধ্যে ইতোমধ্যে ২ জন বিচারপতি অবসরে গেছেন। রিভিউতে মূল ৩০ পৃষ্ঠার আবেদনের সঙ্গে মোট ৬শ’ ৫৩ পৃষ্ঠার নথিপত্র জমা দেয়া হয়েছে। যাতে পাঁচটি যুক্তি বা গ্রাউন্ড রয়েছে।’

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে গঠিত পাঁচ সদেস্যের আপিল বেঞ্চ সাঈদীকে ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে অমৃত্যু কারাদণ্ড ঘোষণা করেন। এখন ওই বেঞ্চের প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন ও বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী অবসরে চলে গেছেন।’

আগামীকাল বুধবার চেম্বার আদালতে সাঈদীর রায়ের রিভিউ উপস্থাপন করা হবে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বুধবার না করলেও বৃহস্পতিবার করা হতে পারে।’

এ দিকে রিভিউ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাঈদীপুত্র জিয়া নগর উপজেলা চেয়ারম্যান মাসুদ সাঈদী বাংলামেইলকে বলেন, ‘আমরা এ রায়ের বিরুদ্ধে অবশ্যই রিভিউ আবেদন করবো।’

তিনি বলেন, ‘আগামীকাল (বুধবার) আমাদের আইনজীবীরা আব্বার সঙ্গে স্বাক্ষাৎ করে রিভিউয়ের বিষয়ে সাংবাদিকদের বিস্তারিত জানাবেন।’

তিনি বলেন, ‘কাদের মোল্লা সাহেবের রিভিউয়ের রায়ে বলা আছে আপিলের পুর্ণাঙ্গ রায় অভিযুক্ত ব্যক্তি পড়ার পর রিভিউ করতে ১৫ দিন সময় পাবেন। গত ৬ জানুয়ারি কাশিমপুর কারাগারে বাবা রায়ের কপি পড়ে দেখেছেন, কেন্দ্রীয় কারা কর্তৃপক্ষ সেটি বাবাকে পড়ে শুনিয়েছেন। সে হিসেবে রিভিউ আবেদন করতে আমরা আগামী ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত সময় পাবো।’

এক প্রশ্নের জবাবে সাঈদীর মাসুদ সাঈদী বলেন, ‘বাবা কারাগারে অনেক ভালো আছেন, তবে ৭৭ বছর বয়স হওয়ায় তিনি মাঝে মধ্যে অসুস্থ বোধ করেন।’ গত ৬ জানুয়ারি সাঈদী পরিবারের সদস্যরা সাঈদীর সঙ্গে দেখা করেছেন বলে জানান মাসুদ।

মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ট্রাইব্যুনালে প্রথম অভিযুক্ত ব্যক্তি হিসাবে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির দেলওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিচার শুর হয়েছিল ২০১১ সালের ৩ অক্টোবর। হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, নির্যাতন ও ধর্মান্তরে বাধ্য করার মতো মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ফাঁসির সাজা দেয় ট্রাইব্যুনাল। এরপর সাঈদী আপিল করলে গত বছর ১৭ সেপ্টেম্বর পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে যে রায় দেয়, তাতে সাঈদীর সাজা কমে আমৃত্যু সাজাভোগের রায় আসে। সে সময় তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এই জামায়াত নেতার ছেলে মাসুদ সাঈদী ও আইনজীবী মিজানুল ইসলাম বলেছিলেন, তারাও রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি হাতে পেলে পুনঃবিবেচনার আবেদন করে খালাস চাইবেন।

সাঈদীর আপিলের রায়ে ১০, ১৬ ও ১৯ নম্বর অভিযোগে হত্যা, নিপীড়ন, অপহরণ, নির্যাতন, ধর্ষণ ও ধর্মান্তরে বাধ্য করায় সাঈদীকে ‘আমৃত্যু’ কারাদণ্ড দেয়া হয়। আমৃত্যু কারাদণ্ড বলতে ‘স্বাভাবিক মৃত্যুর সময় পর্যন্ত কারাবাস বোঝাবে। এছাড়া ৮ নম্বর অভিযোগের একাংশের জন্য সাঈদীকে ১২ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ৭ নম্বর অভিযোগে ১০ বছর কারাদণ্ডের রায় দেয় আপিল বিভাগ। এর মধ্যে ৮ ও ১০ নম্বর অভিযোগে ইব্রাহিম কুট্টি ও বিসা বালীকে হত্যা এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়ি ঘরে আগুন দেয়ার ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাঈদীর ফাঁসির রায় দিয়েছিল। আপিল বিভাগ থেকে এ পর্যন্ত মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার যে পাঁচটি রায় এসেছে, তার মধ্যে কেবল সাঈদীর ক্ষেত্রেই রিভিউ বাকি রয়েছে।

শনিবারের চিঠি/ আটলান্টা / ১৩ জানুয়ারি ২০১৬

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১০:২৩ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ১৩ জানুয়ারি ২০১৬

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com