মিনি উপন্যাস ( ধারাবাহিক )

সহযাত্রী

সপ্তম এবং শেষ পর্ব

শনিবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১

সহযাত্রী

পূর্বে প্রকাশের পর…..

।। সপ্তম পর্ব ।।
আপনাকে দেখাতে তো অসুবিধা নেই। যা বলার তা তো বলা হয়েই গেছে। অন্য লোকে দেখে জানতে চাইত। আর আপনি জেনে দেখতে চাইছেন। আপনার ব্যাপারটা আলাদা। কিন্তু আমাদের কাছে তো কোন আলো নেই। যদি সামনে কোন দোকান পাওয়া যায় তবে দুই দাঁড়িয়ে আপনাকে দেখাবো। দোকানদার কিছু বুঝতে পারবে না।
হাত দেখার একটা সম্ভাবনা আছে, অর্ণব একটু স্বস্তি পায়। অপেক্ষায় থাকে আলোর। কিছুটা হাঁটার পর দূরে এটি দোকান চোখে পড়ে। অর্ণব খুশি হয়। একটু দ্রুত হাঁটার চেষ্টা করে। অনিন্দ্য গতির ব্যবধান লক্ষ্য করে।
ওরা একসময় দোকানের সন্মুখে এসে পড়ে। শীতের রাত। দোকানদার বসে আছে খরিদ্দার এর প্রত্যাশায়। নির্জনতা চারদিকে। দোকানের কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে পড়ে। আলো এসে পড়েছে রাস্তায়। অস্পষ্ট আলো। দোকানদার নির্বিকার। তার লক্ষ্য অবস্থা নেই।
অনিন্দ্য হাত দুটি বের করে পকেট থেকে। মেলে ধরে অর্ণবের সম্মুখে। কব্জি থেকে কেটে যেন হাত দুটি উল্টো লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। কী বিচিত্র এই পৃথিবী। কত অসম্ভব ঘটনা আছে আমরা জানি না। বৃদ্ধাঙ্গুলি বাইরের দিকে রেখে আর কনিষ্ঠা ভিতরের দিকে। এক অদ্ভুত দৃশ্য। অর্ণবের এই হাতের জন্য মায়া লাগে। না জানি ওর কতটা সমস্যা হয়। হয়ত হয়না। বেচারা হাত দুটি কত কাল লুকিয়ে কাল কাটাবে। অনিন্দর প্রতি সহমর্মিতা জাগে। অনিন্দ্য হাত দুটি আবার পকেটে পুরে দেয়।
ওরা আবার চলতে শুরু করে। কী কথা বলবে। বেশি কথা আবার কখনও কখনও করুণার সৃষ্টি করে। অর্ণব আর এই বিষয় নিয়ে কথা বলতে চায় না। নীরবতা নামে দুজনার মাঝে।
মনে পড়ে সুশান্তর কথা। বেশ ভালো লাগছিলো ওর বন্ধুর কথা শুনতে। যদিও দুঃখজনক ঘটনা। শুনতে শুনতে একটা কষ্ট বোধ হচ্ছিল। কিছু কিছু দুঃখের কথা বলতে ভালো লাগে। সুশান্তর কথা শোনার ইচ্ছা জাগে অর্নবের। বলে- আপনার বন্ধু সুশান্ত খুব ভালো লোক ছিল বোধহয়।
হ্যাঁ আপনি ঠিকই অনুমান করেছেন। সুশান্ত মানুষের প্রতি ছিল খুবই সহানুভূতিশীল। অসহায় মানুষের জন্য ছিল অনেক ভালোবাসা। বলে আবার থেমে যায অনিন্দ্য । বোধহয় বন্ধু নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছে নেই। খানিকটা বাদে আবার বলল, সুশান্তকে নাকি কেউ কেউ রাতের বেলায় মোটর সাইকেলে যেতে দেখেছে। অর্ণব এবারে আর নীরব থাকতে পারে না। নিজের মনোভাব লুকিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে। তাই কখনও হয় নাকি?
কী জানি ?
সুশান্তর সকল ঘটনা ওর চোখের সামনে ঘটেছে এমন ভাবে মনে হচ্ছিল। কিন্তু মোটর সাইকেলের কথাটা বলতে কেমন যেন অবাস্তব মনে হল।
বলে- ভূতেরা কি কখনো মোটর সাইকেল চলতে পারে ? সাইকেল হলেও একটা কথা ছিল।
মোটর সাইকেল আর সাইকেল এর মধ্যে পার্থক্য কী?
পার্থক্য নেই এমন না।  মোটর সাইকেলে আলো থাকে। আলোর মাঝে ভূত আসবে কী করে?
আমি তো এসব ভেবে দেখিনি।
এটা মানুষকে ভয় দেখানোর একটা বুদ্ধি। কোন অকর্মা লোকের গল্প। অর্নবের এই অবিশ্বাসে অনিন্দ্য একটু ক্ষুন্ন হল। বলল-আমি তো আর বলছি না। যারা দেখেছে তারা বলেছে। এতে তো আমার কিছু করার নেই। আমি লোকের কথা বলছি মাত্র।
ও আচ্ছা। অর্ণব একটু বোকার মত ভাব করে নিজেকে সামলে নেয়।
অনিন্দ্য আবার বলে- যারা দেখেছে তারা বলেছে। ও নাকি মোটর সাইকেলে চড়ে ওর বাড়ি থেকে শ্বশুর বাড়ি যেত।  আমি অবশ্য কোন দিন দেখার চেষ্টা করিনি।
অনিন্দ্যর ভাব লক্ষ্য করে অর্ণব ব্যাপারটা হালকা করতে চেষ্টা করে।
রসিকতা করে বলে – আজকাল যা পেট্রোলের দাম। লোকজনেরই মোটর সাইকেল চালাতে কষ্ট হচ্ছে। তা ভূত  চলবে কী করে? ওদের তো আর টাকা পয়সা নেই।
অনিন্দ্য বুঝতে পারে অবিশ্বাসী এই লোকটাকে আর কিছু বলা উচিত হবে না। ওকে বিশ্বাস করানো যাবে না। ও সাহসী মানুষ। তাই এ প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলতে চাইল না।
একটু নীরবতা দুজনের মাঝে খেলা করে। এভাবেই দুজনের খানিকটা মত পার্থক্যে থমকে দাঁড়ায় কথোপকথন।


 

। শেষ পর্ব।।
নীরবতা ভেঙে অর্ণব প্রশ্ন করে- আপনি কতদূর যাবেন?
না, আমি আর বেশি দূরে যাব না। আর  একটু এগিয়েই আমার বন্ধুর শ্বশুর বাড়ি। আমি ওখানেই যাব । বলতে বলতে ওরা একটা প্রকাণ্ড গাছের নিচে পৌঁছে যায়। অনিন্দ্য বলে- এখানেই দুর্ঘটনাটা ঘটেছিল। আজ ওর বিবাহ বার্ষিকী। কেউ না জানলেও আমি জানি স্বর্ণালী বৌদির মনের অবস্থা। বেচারা বৌদির অপেক্ষার কোনদিন অবসান হবে না। কিন্তু তাকে কে বুঝবে। প্রতি বছর এ দিনে অপেক্ষায় সারা রাত কাটিয়ে দেবে। সেজেগুজে নির্বাক বসে থাকবে। আমি বুঝাতে চেষ্টা করছি। ওকে একটু সহানুভূতি জানাতে আমি ওর কাছে যাই।
আবার দুঃখের স্মৃতি গুলি জমাট বাঁধে। কণ্ঠস্বর গাঢ় হয় অনিন্দ্যের। বলে- মানুষ কত নিষ্ঠুর, কত অসভ্য হয় ভাবতে পারেন।
গোটা মানব জাতিকে ঢালাও ভাবে অভিযুক্ত করায় অর্ণব ক্ষুন্ন হয়। কিছু মানুষের জন্য গোটা জাতিকে, গোটা সমাজকে কলঙ্কিত করতে বাঁধে।  বলে – মহিমের মত মানুষও আছে, আবার অনিন্দ্যর মত বন্ধুও আছে। সমস্ত মানুষ তো আর এক হয় না। এভাবেই হালকা প্রতিবাদ জানায় অর্ণব।
অনিন্দ্য দাঁড়িয়ে পড়ে। বলে- আমি আর যাব না। আমার পথ এখানেই শেষ। আপনি যেতে পারবেন তো? কেন পারব না? আমি তো একা যাওয়ার জন্য বেরিয়ে ছিলাম।
ভয় করবেনা তো?
না না ভয় করবে না। নিশ্চয়ই যেতে পারব।
তা হয়তো পারবেন। আপনি তো একজন সাহসী মানুষ। আপনি ঠিকই বলেছেন। আমি ঐসব অশরীরি কিছু বিশ্বাস করি না। আর কিছু থাকলে ওরা মানুষকে ভয় পায়।
অনিন্দ্য মন খারাপ হয়েছে বলে মনে হয়।  আলোর অভাবে অর্ণব তা বুঝতে পারে না।
অনিন্দ্য আবার বলে আমি কিন্তু আপনাকে মিথ্যে বলিনি।
না না মিথ্যে বলবেন কেন? অর্ণব  বাঁধা দেয়। আপনার সাথে বেশ ভালো কাটলো এই টাই বড় কথা।
আপনার বিশ্বাস অটল। আমি তার প্রশংসা করি। আপনাকে আমি একটু মাত্র মিথ্যে বলেছি।
কী মিথ্যা কথা? অর্ণব জানতে চায়।
আমিই আমার বন্ধু। আমার দিকে তাকিয়ে দেখুন তো। এ কী দেখছে অর্ণব। এ কী ভয়াবহ দৃশ্য! অনিন্দ্য অদৃশ্য । কোটরাগত চোখ দুটি থেকে আলো বেরিয়ে আসছে। জ্বলজ্বল করছে সে আলো। বিকশিত দুটি দাঁতের পাটি। একটি জীবন্ত কঙ্কাল মাত্র দুই হাত দূরে দাঁড়িয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছে। এটা কী সত্যি না স্বপ্ন!
প্রচন্ড শক্তিশালী বিদ্যুৎ যেন সমস্ত শরীর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। স্নায়ুমণ্ডলী প্রচন্ড উত্তেজনায় প্রতিটি রোমকূপ খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। চুলগুলোও খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। অন্ধকার যেন মুহূর্তের মধ্যে আরও ঘনীভূত হয়ে উঠল। অস্পষ্ট হয়ে আসছে এই সব কিছু। চরম উত্তেজনায় জ্ঞান হারালো অর্ণব।
পরদিন জ্ঞান ফিরে  আসে অর্ণবের।  পাশে বসে আছেন দাদু। চোখদুটি মেলে ধরতে দাদুর মুখে একটা প্রসন্নতার ছাপ ক্রমাগত ছড়িয়ে পড়ছে। চোখে খুশির ঝিলিক। নিবিড় মমতায় হাত দুটি বুকের মাঝে চেপে ধরে।
দাদু বললেন – তুই আমাকে খুব ভালবাসিস তাই না দাদু?
অর্ণব নির্বাক। এক গ্লাস গরম দুধ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে অল্প বয়সী এক স্বর্ণময়ী তরুণী। অর্ণব জানেনা গতকালই ছিল ওর বিবাহ বার্ষিকী।

-০-

লেখকঃ শিক্ষক কচুয়া কলেজ , বাগেরহাট।

পূর্বের পর্বগুলো আরেকবার পড়তে নিন্মের লিঙ্কে ক্লিক করুন

প্রথম ও দ্বিতীয় ।  তৃতীয় ও চতুর্থ পর্বপঞ্চম ও ষষ্ঠ পর্ব 

শনিবারের চিঠি / আটলান্টা/ ফেব্রুয়ারি ০৬ ,২০২১

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ২:০৫ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com