ছোট গল্প

সময়ের স্রোত

শনিবার, ০৯ জানুয়ারি ২০২১

সময়ের স্রোত
সময়ের স্রোতঃ মিন্টু চৌধুরি

সন্ধ্যা নামার পরে প্রতিদিন বাসা থেকে বের হয় রাসেল রহমান। বছর চল্লিশেকের এ যুবক কাজ করে দেশিয় শীর্ষ এক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে। চাকরি-বেতন নিয়ে কোন ধরণের টেনশন তার মধ্যে নেই।বিবাহিত হলেও পরিবারের প্রতি তার টানও নেই তেমন একটা।
প্রতিদিন অফিস শেষ করে করে বাসা থেকে সন্ধ্যার পর বের হওয়াই তার একমাত্র নেশা। করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের মধ্যেও তার এ নেশায় তেমন একটা ব্যতয় ঘটেনি। অফিস শেষে বাসায় ফিরে ডিসকভার ১২৫ সিসির মোটরসাইকেল নিয়ে প্রতিদিন বের হওয়াটাই তার একমাত্র সৌখিনতা।

সন্ধ্যা থেকে রাত নয়টা-দশটা পর্যন্ত বাইরে ঘোরা ও আড্ডা দেয়াটাই তার বিলাসিতা। আর আড্ডার ফাঁকে একটা সিগারেট ধরিয়ে দীর্ঘক্ষণ পরপর লম্বা টান দেয়ার মধ্যে সে যেনো সুখ খোঁজার চেষ্টা করে। আসলে এ সুখ খোঁজার মধ্য দিয়ে নিজের কোন গোপন দুঃখ ভোলার চেষ্টা করে কি না তাও বোঝা মুস্কিল।


তবে তার সাথে কথা বলে অনেকবারই বন্ধু আরাফাত শাহরিয়ার জানার চেষ্টা করেছে সব বিষয়ে এমন উদাসী ভাব কেনো, বা কোন দুঃখ ঢাকতে এ উদাসীনতা কি না। কোনভাবেই আরাফাত তার চাকরিজীবী বন্ধুর মনের গোপন ডেরায় প্রবেশ করতে পারেনি।

পেশায় রিপোর্টার আরাফাত শাহরিয়ারের কাজ ঝানু ঝানু মানুষদের কাবু করে আড়ালের ঘটনা তুলে আনার। কিন্তু রাসেলের মনের ডেরায় হানা দিয়েও তেমন কিছু আবিষ্কার করতে পারে নি সে। এ নিয়ে তার কোন আফসোস নেই। সবসময় রাসেলের সাথে নানা প্রকার আমোদে মেতে থাকার চেষ্টা করে।

সারাদিনে কাজের ফাঁকে একমাত্র বিনোদনই হল রাতের বেলার ঘন্টাখানেকের আড্ডা ও ফাঁকে সিগারেটে সুখটান। দিনের ক্লান্তি যেনো এর মধ্য দিয়ে ধুয়ে মুছে যায়, তারা ফিরে পায় পরদিনের কাজের উদ্যম।
করোনাভাইরাসের সংক্রমণ শুরুর দিকে কয়েকদিন নিজেকে একটু গুটিয়ে রাখার চেষ্টা করে রাসেল। কিন্তু ঘরে কোনভাবেই নিজেকে আটকে রাখতে পারে না। শুরুর দিকে অফিস বন্ধ থাকায় ঘরে অবস্থান করাটাই কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায় তার জন্য।
কিভাবে যে একেকটি দিন পার করেছে সে কল্পনাই করতে পারে না। তারপরও তার সাধের মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়ে কয়েকটা সড়ক ঘুরে বাসায় ফিরে আসতো।নিঝুম সন্ধ্যার পরিবেশ তার মনে এক অন্যরকম দোলা দিয়ে যায়। তবে এসময়ে বন্ধু আরাফাতের সাথে দেখা না হওয়াটা ছিল সবচেয়ে দুঃখের।

কোনরকমে কয়েকটা দিন পার করে আবারও আগের নিয়মে ফিরে যাবার সুযোগ খুঁজতে থাকে রাসেল। করোনাভাইরাসের মহামারির মধ্যে ধীরে ধীরে অনেককিছুই স্বাভাবিক হতে শুরু করে।জট খুলতে থাকে বিধিনিষেধের।সীমিত পরিসরে তাকে চাকরিতেও যেতে হচ্ছে এখন।

দিনে চাকরির পর বাসায় ফিরে কিছুক্ষণ নিজের দুই বছর বয়েসী মেয়ের সাথে খুনসুটি শেষে মোটর সাইকেলে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে রাসেল।রাতেরবেলা নগর ভ্রমণের সাথে বন্ধু আরাফাতের সাথে আড্ডাটাও তার প্রতিদিনকার লোভ।
করোনাকালের এমনই একটি দিনের সন্ধ্যায় বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ে রাসেল, মনের ভেতর একধরণের অস্থিরতা। মোটর সাইকেল নিয়ে তার প্রিয় টাইগার পাস রোডে কয়েকটি চক্কর দেয়। উদ্দেশ্যহীন ঘুরতে থাকে। একবার ভাবে আরাফাতের সাথে দেখা করা দরকার। আরেকবার ভাবে সে এখন কাজ করছে, গেলে কাজের ব্যাঘাত হবে।

লালখানবাজার মোড় হয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে ফ্লাইওভারে উঠে পড়ে। গতি বাড়িয়ে উদ্দেশ্যহীন টান দেয়। মুরাদপুর অংশে গিয়ে বাইকের মুখ ঘুরিয়ে আবারও ফ্লাইওভারে উঠে পড়ে। এবারে গতি অনেকটাইধীর। জিইসি মোড়ের অংশে এসে বাইক থামায় রাসেল। চট্টগ্রামের অভিজাত হোটেল পেনিনসুলার সুউচ্চ ভবনের দিকে চোখ পড়ে তার।
সুউচ্চ ভবনটির ওপরে লাগানো নিয়ন সাইনে দৃষ্টি দেয় রাসেল রহমান।
‘পেনিনসুলা হোটেল’ লেখাটি কতক্ষণ পর পর জ্বলছে আর নিভছে। নিয়নবাতি জ্বলা-নেভা দেখতে দেখতে পকেট থেকে সিগারেট বের করে ফস করে ধরায়। লম্বা করে ধোঁয়া টেনে রিং করে ছাড়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। আবারও চেষ্টা করে ধোঁয়ার রিং বানানোর।

সিগারেটের ধোঁয়াগুলো যেন পেনিনসুলা হোটেলের সাইনবোর্ডের নিয়নবাতি জ্বলা-নেভার সাথে একাকার হয়ে গেছে।
হঠাৎ রাসেলের চোখে পড়ে পেনিনসুলা বানানের মাঝখানের একটি অক্ষর যেন জ্বলছে না। না জ্বলা অক্ষরের কারণে অন্যরকম অর্থ মাথায় আসতেই নিজের অজান্তে হেসে ওঠে সে।
এত কিছু থাকতে এসব কেন তার চোখে পড়বে বুঝে উঠতে পারে না, কত ভাল কিছুই তো আছে চোখে পড়ার।এসময় বন্ধু আরাফাতের অভাব অনুভব করে সে।
সিগারেটের শেষ টুকরোটুকু ছুঁড়ে ফেলে মোবাইলে ফোন দেয়, জিজ্ঞেস করে পেনিনসুলা শব্দে যদি কোন একটি অক্ষর না থাকলে এর উচ্চারণ ও অর্থ কেমন দাঁড়াতে পারে?
ওপার থেকে আরাফাত কোন কথা না বলে হো হো করে হেসে প্রতি উত্তর দেয়।
এ পাশ থেকে রাসেলও হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করে, কখন বের হবেন আপনি?
জবাব এল, কাজ শেষ-এখনই বের হব।আসবেন নাকি?
১০ মিনিটের মধ্যে আসছি, বলে লাইনটা কেটে দিল রাসেল।
মোটর সাইকেল নিয়ে আগ্রাবাদের বাদামতলীর দিকে রওনা দিল রাসেল। কিছুক্ষণের মধ্যে আরাফাতের অফিসের নিচে গিয়ে দেখল সে আগে থেকেই দাঁড়িয়ে আছে। দেখা হতেই স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে স্বাগত জানায় রাসেলকে।
হেসে বলে, কেমন আছেন হুজুর।
বলতে হয় বলা এমনভাবে ‘ভাল’ প্রতি উত্তরে বলে।
কোনদিকে যাবেন? জিজ্ঞেস করলেও কোন জবাব না দিয়ে রাসেল বলে, আগে উঠেন। পথই দেবে পথের দিশা।
জবাব আসে, আপনাকে আজ সাহিত্য পেয়ে বসছে মনে হয়?
হাসতে হাসতে বলে, একদিন পেয়ে বসলে ক্ষতি কি? আপনার কোন সমস্যা আছে? এমন রাতে সাহিত্যই তো পেয়ে বসার কথা।চলেন কতক্ষণ ঘুরি।

কোনদিকে যাবেন? আবারও জানতে চায় আরাফাত।
কোন জবাব না দিয়ে রাসেল মোটরসাইকেলে টান দেয়।তাদের যাবার জায়গা যেন ঠিক করা।কয়েক রাউন্ড রাস্তায় রাস্তায় চক্কর, সিআরবি না হলে আউটার স্টেডিয়ামের কোনায় বসে আড্ডা, এই তাদের দৌড়।তবে মন চাইলে কোন কোন দিন অভয়মিত্র ঘাটে কর্ণফুলীর তীরেও তাদের আড্ডা বসে।
পথ উদ্দেশ্যহীন হলেও ঠিকই আউটার স্টেডিয়ামের কোনায় গিয়ে মোটরসাইকেল দাঁড় করায় রাসেল।দুজনে নেমেই ফুটপাথে রহিমের টং দোকানে দুই কাপ চায়ের অর্ডার দেয়।
আরাফাতই কথা শুরু করে।করোনাকালের দিন আর কাটতে চাইছে না। কেমন এক দমবন্ধ জীবন। ভালো লাগছে না কিছুই।কবে যে এর থেকে মুক্তি মিলবে কে জানে।
রাসেল তার কথায় তেমন গুরুত্ব নাদিয়ে বলে, দমবন্ধ ভাবলেই তেমন, না ভাবলেই না। জীবনটাকে সহজভাবে ভাবুন। তাহলে দেখবেন আরও উপভোগ্য মনে হবে।

মৃদু হেসে আরাফাতের জবাব, আপনার তো কোন সমস্যা নেই। চাকরি করছেন, বেতন পাচ্ছেন, জীবনের কষ্ট নেই। যারা দিনে এনে দিনে খায় তাদের কথা কে ভাবে।দিনমজুর, খেটে খাওয়া মানুষ, নিম্ন মধ্যবিত্ত মানুষের কষ্ট শুরু হয়েছে। বুঝতে পারছেন না পরিস্থিতি, সামনে কি অবস্থা হয় দেখেন।
ঈষৎ বিরক্তি প্রকাশ করে রাসেল বলে, সবসময়ই হতাশার কথা বলতে থাকেন। এতক্ষণ কাজ করেছেন, এখন একটু জীবনমুখী চিন্তা বাদ দিয়ে রিলাক্স করুন, দেখবেন জীবন অনেক সুন্দর।
আরাফাত বলে, পেটের চিন্তা বড়, সব তো ভুলে থাকতে চাই, দিন শেষে যদি চাকরিটা নাই থাকে তাহলে জীবনের সৌন্দর্য্যই বা থাকে কি করে বলুন। করোনাকালে মানুষের জীবনটাই অনেক পাল্টে গেছে, অর্থনীতি পুরো পাল্টে দিয়েছে। কত লোকের যে কাজ নেই তার খবর তো রাখেন না।
আমাদের মিডিয়া হাউজগুলোতেও চাকরি থেকে ছাটাই চলছে, যারা করছে না তারা বেতন কমিয়ে দিচ্ছে, বকেয়া রাখছে।কার ভাগ্যে কি ঘটছে বলা মুস্কিল।
পাল্টা প্রশ্ন রেখে রাসেল বলে, বেশি বেশি ভাবলে বুঝি জীবনটা পাল্টে যাবে!
না, তা হয়তো পাল্টাবে না, কিন্তু আজ চলছি, কালকের দিনের জন্য না ভাবলে তো চলে না।
আপনাকে ভাবতে বারণ করেছে কে? ভাবনা ভাবুন আবার জীবনে সহজ থাকার চেষ্টাও করুন। লড়াইয়ে টিকে থাকতে হবে নাকি!

কথা শেষ করে দুই কাপ রংচা রহিমের কাছ থেকে নিয়ে একটা আরাফাতের দিকে বাড়িয়ে ধরে।
করোনাকাল শুরুর পর থেকে তারা বাইরের খাবার তেমন একটা খায় না। তবে রংচা খাওয়ার লোভটা তারা ছাড়তে পারে নি। পার্থক্যের মধ্যে কাচের কাপের বদলে কাগজের তৈরি এককালীন কাপে চা খাচ্ছে।
আয়েস করে চায়ে চুমুক দেয় দুজনই।
আউটার স্টেডিয়ামের কাছে কাজীর দেউড়ি মোড়ের রাস্তায় যানবাহন তেমন একটা নেই। মোড়ের গোল চত্বরটিতে চার থেকে পাঁচজন ভাসমান লোক বসে বিড়ি ফুঁকছে। রাসেল চায়ে চুমুক দিয়ে তাদের দিকে চোখ দেয়। কারোর গায়ে ছেঁড়া শার্ট, ময়লা প্যান্ট বা লুঙ্গি থাকলেও মুখে কোন মাস্ক নেই।
হঠাৎ তাদের দেখিয়ে আরাফাতকে বলে, দেখেন হুজুর ওদের। কারো মুখে মাস্ক নেই। তাদের চোখে মুখে করোনা নিয়ে ভাবনাও নেই। সব খালি আপনাদের-আমাদের নাকি।
চা শেষ করে কাগজের কাপটি দুমড়ে মুচড়ে রাস্তায় জোরে ছুড়ে মারে সে। এ ধরণের কাজ সাধারণত সে করে না।ছুঁড়ে দেয়ার পর ভাবতে থাকে ময়লা ঝুড়িতে না ফেলে কেনো রাস্তায় ফেলল। মনে মনে আফসোস করতে লাগল রাসেল।আনমনে নিজের ডান হাতটি উঠে আসে তার মুখে। থুতনিতে আটকে থাকা মাস্কটি হাত দিয়ে ঠিক করে মুখে পরে নেয়।

তার মনে পড়ে করোনাকাল চলছে, প্রতিদিন সারাদেশে আড়াই থেকে তিন হাজারের মতো আক্রান্ত হচ্ছে। তবে সরকারের দেয়া এই হিসেবে তার কোন আস্থা নেই। এর বাইরে যে কতো বেশি আক্রান্ত হচ্ছে তারও কোন ঠিক নেই। তবে বিশ্বাস করে সরকারি হিসেবের বাইরে আক্রান্ত অনেক বেশি। করোনাভাইরাস থেকে দূরে থাকতে মানুষকে সচেতন থাকা, দূরত্ব মানার কোন বিকল্প নেই বলেও মনে করে সে।

কিন্তু কার জন্যে মানবে এসব। নিজের জন্য? না সকলের জন্য? বাসায় তার দুই বছর বয়েসী মেয়ের কথা ভেবে মাস্ক পড়া, হাত সাবান দিয়ে ঘন ঘন ধোয়া, নিয়মিত স্যানিটাইজ করার চেষ্টা করে সে। তারপরও ভাবে দেশের মানুষের বাইরে বের হওয়া এবং নিয়ম ভাঙ্গার চেষ্টার মধ্যে তার এই প্রচেষ্টা কতটুকু নিরাপদ।
রাসেল বন্ধু আরাফাতকে তাগাদা দিয়ে বলে, হুজুর, করোনা আর কতদিন রাজত্ব করবে! আপনাদের কাছে কি কোনো সংবাদ আছে? মানুষ আর কত নিজেকে আটকে রাখবে? এমন লুকোচুরির জীবন আর ভাল্লাগে না।
বিরক্ত হয়ে আরাফাত বলে, কিছুক্ষণ আগে না বললেন জীবনকে সহজভাবে দেখতে, এখন আবার কি হল। এত ভাবুক হয়ে গেলেন জীবন নিয়ে? ক্ষণে ক্ষণে আপনার মনের রং এত বদলায় কিভাবে, এখন তো শরৎকাল না, ঘোর বরষা।
করোনাকাল মানুষের জীবন পাল্টে দিয়েছে, উদাস ভঙ্গিতে জবাব দেয় রাসেল। পাল্টে দিয়েছে মনের গতি প্রকৃতিও।
মাস্কটা আবারও মুখ থেকে থুতনিতে নামিয়ে আনে সে। পকেট থেকে সিগারেটের প্যাকেট বের করে। একটা আরাফাতকে দিয়ে নিজেও নেয়। সিগারেটে আগুন ধরিয়ে লম্বা টান দেয়। এবারে ধোঁয়ায় রিং বানানোর চেষ্টার বদলে জোরে ছাড়ে।
মাথাটা আকাশের দিকে ফেরাতেই সার্কিট হাউজের পাশ ধরে উঁচু হয়ে দাঁড়ানো পাঁচ তারকা রেডিসন হোটেলের আলো চোখে পড়ে। আবারও লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়াটা যেন পাঁচ তারকা হোটেলটার দিকে ছুঁড়ে দেয় একপ্রকার নিরসভাবে।
একবার জ্বলন্ত সিগারেট, আরেকবার মাথার ওপর আলোয় মোড়া রেডিসনের নামের বানানটা দেখার চেষ্টা করে রাসেল রহমান।

_______________________________________________________________
শনিবারের চিঠিতে প্রতি শনিবার সাহিত্য সাময়িকীতে ছোট গল্প, কবিতা , প্রবন্ধ  প্রকাশিত হয় । আপনিও লেখা পাঠেতে পারেন। মনোনিত হলে প্রকাশ করা হবে । লেখা পাঠাতে ক্লিক করুন
_______________________________________________________________

পাশে দাঁড়ানো আরাফাতকে উদাস ভঙ্গিতে বলে, চলেন রেডিসন হোটেলে যাই, বিয়ার খেতে ইচ্ছে করছে খুব।
রাত নয়টা ছুই ছুই, ঘড়িতে সময় দেখে আরাফাত চিন্তা করে তার বাসায় ফিরতে হবে। সেখানে বুড়ো বাবা-মা আছেন। তাদের স্বাস্থ্যের নিরাপত্তার কথা ভাবা উচিত। পেটের তাগিদে প্রতিদিন বিকেল বেলা সীমিত আকারে অফিস করতে হচ্ছে। কোন কোন এসাইনমেন্টেও যেতে হচ্ছে তাকে।
প্রতিনিয়তই করোনাভাইরাসে সংক্রমণের ঝুঁকি নিয়ে তাদের কাজ। এরপরও যত পারে সাবধানতা নিয়ে কাজ করছে সে।
রাতে দেরি করে ফিরলে বাবা-মা ভাববে। তাই ইতস্তত করে রাসেলকে বলে, আজকে না গেলেই কি নয়। আর বিয়ার খেতে হলে পাঁচতারকাতেই কেনো যেতে হবে।
খেলে আপনার সমস্যা কি! কতদিন বিয়ার খাই না! করোনা ভাইরাস তো আমাদের সব ভুলিয়ে দিতে বসেছে।
আরাফত ভাবে, একদিন খেলে তো আরেকদিন খাওয়ানোর বিষয়টা চলে আসে। রাসেলের বড় দোষ তার কোন কাজের ঠিক নেই, যখন যা মাথায় আসবে তার তা করতে হবে। কি যে করে তাকে নিয়ে।
হুজুগে মেতে ওঠা রাসেলকে উদ্দেশ্য করে বলে, আপনারে আজ তারকা হোটেল পেয়ে বসল কেনো। সন্ধ্যা বেলা পেনিনসুলা হোটেল, রাতের বেলা রেডিসন।
তার জবাব, খেতে ইচ্ছে করছে তাই বললাম, না করলে তো আর রেডিসন বলতাম না।
চলেন বলে তাগাদা দেয় আরাফাতকে।
রাসেলের ডাক উপক্ষো করতে না পেরে মুখের মাস্ক ঠিক করে মোটরসাইকেলের পেছনে উঠে পড়ে আরাফাত।
জীবন নিয়ে এত হিসেব না করে না করে তার নিয়মেই চলতে দেয়া উচিত বলে মনে মনে ভাবে সে।
কাজীর দেউড়ি মোড় থেকে রেডিসন হোটেলের মোড়ের দিকে মোটর সাইকেল চলতে থাকে।
রাস্তার ওপর পড়ে থাকে দুমড়ানো-মুচড়ানো কাগজে তৈরি খালি দুটি চায়ের কাপ, মোড়ের গোলচত্বরের চার-পাঁচজন মাস্কবিহীন ছিন্নমূল মানুষ।

শনিবারের চিঠি / আটলান্টা/ জানুয়ারি ০৯, ২০২১

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৬:০৬ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ০৯ জানুয়ারি ২০২১

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com