সন্ত্রাস, সহিংসতা চাই নাঃ সমস্যার সমাধান চাই

বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারি ২০১৫

সন্ত্রাস, সহিংসতা চাই নাঃ  সমস্যার সমাধান চাই

 

মাহমুদুর  রহমান মান্না


 

মাঘের শুরুতে কনকনে শীতের মধ্যেও রাজনীতির উত্তাপ একটুও কমছে না। সহিংসতার আগুনে জ্বলছে যানবাহন, দগ্ধ হচ্ছে মানুষ। নারী-শিশুরাও বাদ যাচ্ছে না। বিএনপির টানা অবরোধ শান্তিপূর্ণ বলা হলেও বাস্তবে সহিংসতার আগুন ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে।

রাজধানীতে চলন্ত বাসে পেট্রলবোমা হামলায় দগ্ধ হয়েছেন ইডেন কলেজের দুই ছাত্রী। বরিশালে পুড়ে কয়লা ট্রাক হেলপার। নারায়ণগঞ্জে যাত্রীবাহী বাসের আগুনে মা-শিশু দগ্ধ হয়েছে। চট্টগ্রামে বরযাত্রী বাসে বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। এর আগে রাজধানীতে পুলিশের গাড়িতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। এবার রাজশাহীতে র্যাবের গাড়িতে ককটেল হামলা হয়েছে। সহিংসতা থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এর মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপির নেতা-কর্মীরাও আক্রান্ত হতে শুরু করেছেন। রাজধানীতে খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা রিয়াজ রহমানের গাড়িতে আগুন দেওয়া ও গুলিবিদ্ধ করার ঘটনা নিয়েও কথা উঠেছে। এখন জানা যাচ্ছে, দেশের বাইরে থেকে এই ঘটনার ভিডিও সরবরাহ করা হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতারও করা যায়নি। ফলে এ নিয়ে ধোয়াশা অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ভাড়াটে বোমাবাজ চক্র আর পেট্রলবোমা যেন হয়ে উঠেছে রাজনৈতিক সহিংসতার প্রধান হাতিয়ার। পুলিশের ধরপাকড় এড়াতে কেন্দ্রীয় নেতারা দূরে থাক, মাঠ পর্যায়ের দলীয় নেতা-কর্মীদের দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে রাস্তায় এমনকি খণ্ড মিছিলও হচ্ছে না। যারা বোমাবাজি করছে তারা কারা সে প্রশ্ন বড় হয়ে উঠেছে। বিএনপি নেতারা শান্তিপূর্ণ অবরোধের কথা বলেছেন কিন্তু শান্তি যে থাকছে না সেটা দেখাই যাচ্ছে। তাহলে কি ভাড়াটে সন্ত্রাসীরাই বোমাবাজি চালাচ্ছে? নাকি অন্য কোনো নাটক? রাজনীতিতে নিরাপত্তা বেষ্টনীর মধ্যেও চোরাগোপ্তা, জ্বালাও-পোড়াও, বোমাবাজি চলছে। মানুষের উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় কেউ কান দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করছে বলে মনে হয় না।

রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান রাজনৈতিকভাবে করার আহ্বানও উপেক্ষিত হচ্ছে। সহিংসতা দমনে শুরু হয়েছে যৌথবাহিনীর অভিযান। শুরুতেই চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে যা হয়েছে তাকে কেউ কেউ একাত্তরের সঙ্গে তুলনা করেছেন। দৈনিক পত্রিকার প্রথম পাতায় প্রকাশিত সচিত্র রিপোর্টে মানুষের গ্রাম ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটে চলার ছবির সঙ্গে আর কিসের তুলনা হতে পারে? দেশ কি একই ভয়াবহ অবস্থার মুখে এসে দাঁড়িয়েছে?

অন্য একটি পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, ১৮ জানুয়ারি দিবাগত মধ্যরাত থেকে দেশের ১৯টি জেলায় একযোগে র্যাব, পুলিশ, বিজিবির যৌথ অভিযান শুরু হয়েছে। বলা হয়েছে, চলতি সপ্তাহের মধ্যেই দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সহনীয় পর্যায়ে আসতে যৌথবাহিনীর এই বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে। এ রকম অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা আগেও দেখা গেছে। এবার কি হয় সেটা দেখার জন্য অন্তত সপ্তাহখানেক অপেক্ষা করতেই হবে। এদিকে বিএনপির পক্ষ থেকে অর্থবহ সংলাপের মাধ্যমে চলমান সংকট নিরসন না হলে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করার কথা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। অন্যদিকে সহিংসতা বন্ধ না হলে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে আটক করা হবে সরকারের সিদ্ধান্তের কথাও প্রকাশিত হয়েছে। যদি তেমনটি হয় বিএনপি কি তাদের চেইন অব কমান্ড ধরে রাখতে পারবে? আওয়ামী লীগ নেতারা অবশ্য আগে থেকে বলে আসছিলেন বিএনপি ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে অংশ না নিয়ে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। তাদের পক্ষে কোনো আন্দোলন করা সম্ভব নয়। তবে এখন তারা বিএনপির অবরোধ-হরতালের নিন্দা করে জঙ্গিবাদের বিরোধিতায় মাঠ গরম করছেন। যদিও এ ধরনের জঙ্গিপনা আমাদের রাজনীতিতে নতুন নয়। স্বাধীনতার পর বিশেষ করে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে এবং পরবর্তীকালে প্রায় প্রতিটি নির্বাচিত সরকারের আমলে বিরোধী দল যে আন্দোলন-সংগ্রাম চালিয়েছে সেগুলো ছিল এমনই ‘জঙ্গি’ কর্মকাণ্ড। বোমাবাজি, গাড়ি পোড়ানো এমনকি গান পাউডার দিয়ে গাড়ি পুড়িয়ে দগ্ধ করার মতো ঘটনাও সবাই দেখেছে। শেষ পর্যন্ত এসবের সমাপ্তি ঘটেছে সরকার পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। যদিও এই পরিবর্তন পরিস্থিতির গুণগত পরিবর্তন ঘটায়নি। ফলে আবারও ফিরে এসেছে সেই জঙ্গিপনা। যে কোনো সময়ে, যে কোনো কারণেই হোক, আমরা সন্ত্রাসের বিপক্ষে। এর ফলে গণতন্ত্রের আন্দোলন বিজয়ী হয় না, বিধ্বস্ত হয়। তবে এবারের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। ক্ষমতাসীনরা মুখে যাই বলুন না কেন তাদের কাছ থেকেই সেটা বোঝা যায়। ইন্টারনেটে জনপ্রিয় যোগাযোগ মাধ্যম ভাইবার ও ট্যাঙ্গো বন্ধের ঘটনাই তার প্রমাণ। যৌথবাহিনীর অভিযানেও সেটা দেখা গেছে।

সাধারণ মানুষের দৃষ্টিতে বড় দল দুটির ক্ষমতার লড়াই থেকেই এ অবস্থার সৃষ্টি। গত বছরের ৫ জানুয়ারির প্রহসনের নির্বাচনে শেখ হাসিনার ক্ষমতা গ্রহণ থেকে যার শুরু। সে সময় সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কথা বলা হয়েছিল। আরও বলা হয়েছিল দশম নির্বাচন হয়ে যাক তারপর একাদশ নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হবে। কিন্তু পরবর্তীতে ক্ষমতা হাতে পেয়ে সেটা ভুলে যাওয়া হয়েছে। এক বছর সময়ে সরকার নিজেদের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার দিকে নজর দিয়েছে। তারা উন্নয়ন দিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ চাপা দিতে চেয়েছে। কিন্তু এক বছরের মাথায় দেখা গেল সব কিছু গ্রাস করে রাজনৈতিক বিরোধই সহিংসভাবে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বিরোধী দলের দোষ তুলে ধরার বদলে যদি সমঝোতার পথ ধরা হতো তাহলে কি পরিস্থিতি ভিন্ন কিছু হতো? এ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন চিন্তার কথা কে না জানে? স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষের কথা বলে সংলাপকে যতই অস্বীকার করার চেষ্টা হোক না কেন সবাই জানে বিরোধের আসল কারণ কি? সেটা যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব কেউ কি তা অস্বীকার করতে পারেন। এ অবস্থায় দুই দলের মধ্যে রাজনৈতিক বিরোধ মীমাংসার গ্রহণযোগ্য কোনো পথ খুঁজে বের করা মোটেই অসম্ভব নয়। তবে যদি রাজনীতির ঊর্ধ্বে অরাজনৈতিক কোনো বিষয় থেকে থাকে তবে ভিন্ন কথা।

ইতিহাসে রাজনৈতিক বিরোধ মীমাংসার ভূরি ভূরি উদাহরণ আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের জটিল বিরোধের মীমাংসায় শেখ হাসিনা নিজের সাফল্যের কথা বলতে কি কখনো ভুল করেন? সেটা তো আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়েই এসেছিল। যদিও শেষ ফল ভালো হয়েছে বলা যাবে না। প্রতিবেশী দেশ ভারতেও মাওবাদী, ঝাড়খণ্ডের আদিবাসীদের সঙ্গে বিরোধ মীমাংসার কথাও বলা যায়। সর্বত্রই সংলাপ, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করা হয়েছে। রাজনীতিকে সমঝোতার খেলা বলা হয়। শত্রুর সঙ্গে সমঝোতা করে নিজের লক্ষ্যে এগিয়ে চলার মধ্যেই শ্রেষ্ঠত্ব। আমাদের স্বাধীনতার আন্দোলনেও এমন কৌশলের ফল কী হয়েছে তা কি নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে? গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করতে সংলাপ-সমঝোতার ঊর্ধ্বে আর কিছু আছে কি?

শেষ পর্যন্ত অবশ্য জনগণের মতামতই শেষ ভরসা। নির্বাচনে ভোটের মাধ্যমে জনমতের প্রতিফলন নিশ্চিত করা না গেলে অবশ্য সব কিছুই ভেস্তে যায়। তারপরও যে সব কিছু উল্টে যায় তেমন উদাহরণও আছে। ‘৭০-এর নির্বাচনে জনগণের রায় অস্বীকার করাতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিতে হয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জন তাই বাঙালিদের শ্রেষ্ঠ অর্জন। সংবিধানে সব কিছুর মালিক বলা হলেও জনগণকে বঞ্চিত করার অপচেষ্টার শেষ নেই। সে জন্যই গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ব্যবস্থা গড়ে তোলা অসম্ভব হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের ৪৩ বছরে রাজনৈতিক পরিস্থিতির চরম অবনতির পেছনে এই কারণটির ভূমিকা কি অস্বীকার করা যায়? সে যাই হোক, উদ্ভূত পরিস্থিতির অবসানই এখন সবার কাম্য। চলমান সহিংসতা বন্ধ করার কার্যকর উদ্যোগ নিয়ে সর্বত্রই আলোচনা হচ্ছে। শুধু বিবদমান দুই পক্ষের সমঝোতার মধ্যেই যে স্থায়ী সমাধান পাওয়া যাবে না সেটাও সবার জানা। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার সে সমাধান এখন অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ক্ষমতাসীনরা সংবিধান থেকেই এ ব্যবস্থা মুছে ফেলেছে। তাই যারা চলমান সন্ত্রাস-সহিংসতার অবসান চাইবেন তাদের অবশ্যই জাতীয় সংলাপের মধ্য দিয়েই সামগ্রিক বিষয় নিয়ে সমাধানের পথ খুঁজতে হবে। সব রাজনৈতিক দল, নাগরিক সংগঠন, সামাজিক আন্দোলন, শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিদের নিয়ে সৃষ্ট সংকট সমাধানের উদ্যোগ নিলে পরিস্থিতির চাপেই হরতাল-অবরোধ ছাড়তে হবে বিএনপিকে। ইতিমধ্যে তারাও সংলাপের প্রস্তাব জানিয়ে দিয়েছে। প্রতিপক্ষকে দমন-পীড়ন বা নিশ্চিহ্ন করার প্রচেষ্টা কখনো কোনো দেশে রাজনৈতিক বিরোধের সমাধান দিয়েছে বলে জানা নেই। সৌজন্যে: বাংলাদেশ প্রতিদিন
 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১০:০৯ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ২২ জানুয়ারি ২০১৫

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com