শয়তানের গুঁতো

বুধবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৪

শয়তানের গুঁতো

 

মুহম্মদ শরিফ ইসলাম


 

আমার মামা-বাড়ির পাশেই মসজিদ। দিনে রাতে মামাদের ঘর থেকে পাঁচ ওয়াক্তের আজান শোনা যায়। আজান শোনা-মাত্রই নানীজান মসজিদে যাওয়ার জন্য তাগাদা শুরু করেন। তিনি বলেন, যারা আজান শুনে নামাজ পড়তে মসজিদে যায় না, তাদের শয়তানের গুঁতো খেতে হয়।

ss1মসজিদে আজান হচ্ছে, আমি নানীজানের হাত থেকে একটা আম নিয়ে মসজিদে না গিয়ে উত্তর দিকে হাঁটা শুরু করলাম। হঠাৎ কে যেন আমার পশ্চাৎদেশে খুব জোরে লাথি মারল। আমি ধাক্কা সামলোতে পারলাম না। গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ে যাচ্ছি। আশ্চর্য মামা-বাড়ি সমতলে হলেও আমি গড়িয়ে গড়িয়ে ৫০ হাত নীচে পড়লাম। উঠে দাঁড়িয়ে কিছুই চিনতে পারলাম না। পশ্চাতে অনেক উঁচু পাহাড়, ঘাড় উঁচু করে কিছু দেখতে পারলাম না। সামনে ঘন গাছগাছালি পরিপূর্ণ সমতল ভূমি। পাশ দিয়ে একটা পুরাতন পাকা-রাস্তা চলে গেছে| কোথাও কোনো মানুষ নেই, হাঁস-মুরগী-গরু-ছাগল-কুত্তা-বিড়ালের চলাচল দেখতে পেলাম। পাকা-রাস্তার মাঝখানে একটা গাড়ি দাঁড়ানো, গাড়ির দরজাগুলো খোলা।

আমি তন্ন-তন্ন করে গাড়ির ভেতরে ও বাইরে দেখলাম। কোথায়ও কেউ নেই। তাহলে গাড়ির মালিক কে? গাড়ির ড্রাইভার বা কোথায়? অনেকক্ষণ কারোর দেখা না পেয়ে আমার ভয় ভয় করতে লাগল। খোলা দরজা পেয়ে আমি গাড়ির ভেতর গিয়ে বসলাম। দড়াম্ শব্দে গাড়ির দরজাগুলো বন্ধ হয়ে গেল। ভীত-সন্ত্রস্ত্র হয়ে গাড়ির দরজা খোলার চেষ্টা করলাম। সব চেষ্টাই বিফল। দরজা এমনভাবে বন্ধ আমার দ্বারা খোলা সম্ভব নয়। আমার আর গাড়ি থেকে বের হওয়ার কোনো পথ নেই।

কে যেন ড্রাইভার সিটে বসল, আমি অনুভব করছি, কিন্তু দেখতে পারছি না। ড্রাইভারের নিঃশ্বাসের শব্দ পাচ্ছি।

– ড্রাইভার সিটে কেউ আছেন?

কোনো জবাব এল না। ভয়ে আমার প্রাণ যায় যায় অবস্থা, তেষ্টা পেয়ে গেল এক বোতল পানি পেলে ভালো হতো। নানীজানের কাছ থেকে যে আমটা আনলাম সেটাই বা গেল কোথায়?

– কে যেন গাড়ি চালাতে শুরু করল। আমি উচ্চ শব্দে বললাম, কে গাড়ি চালাচ্ছেন, আমি আপনাকে অনুভব করছি দেখতে পারছি না কেন?

– আমি একজন সরকারী ড্রাইভার, আমার দায়িত্ব পড়েছে আপনাকে দেশটা ঘুরিয়ে দেখানোর জন্য।

– আমি আপনাদের দেশ দেখতে চাই না। অনুগ্রহ করে আমাকে নামিয়ে দিন। আমি আপনাকে দেখতে পারছি না কেন?

– আমি একজন ভুয়া ড্রাইভার, আসল হলে দেখতে পেতেন, ভুয়া ড্রাইভার দেখা যায় না।

– যে গাড়ি চালায় সেই ড্রাইভার, তা আবার আসল-নকল হয় কীভাবে?

– আপনি মানুষ তাই আসল-নকল বুঝছেন না। যে গাড়ি চালানোর নিয়ম-কানুন শিখে সরকারীভাবে পরীক্ষা দিয়ে পাস করে গাড়ি চালাবার অনুমতি পায় সেই ড্রাইভার। আর যে গাড়ি চালানোর কোনো নিয়ম-কানুন জানে না, কোনো লাইসেন্স নেই অথচ গাড়ি চালায় সেই নকল ড্রাইভার। আমি হলাম নকল ড্রাইভার। নকল ড্রাইভার দেখা যায় না।

– আপনি গাড়ি চালাবার নিয়ম-কানুন কিছু জানেন না অথচ গাড়ি চালাচ্ছেন, যে-কোনো মুহূর্তে এক্সিডেন্ট হতে পারে। আপনি নিজেও মরতে পারেন যাত্রীকেও মারবেন। ভাই অনুগ্রহ করে গাড়ি থামান আমাকে নামতে দিন।

– এই আপনারা যারা মানুষ, তাদের নিয়ে যত সব সমস্যা। সব সময়ই মরার ভয় পান। মরতে একদিন হবেই, তাতে এত ভয়ের কী আছে?

– ড্রাইভার ভাই, আশপাশে কোনো মানুষ দেখতে পারছি না কেন? এখানে কি কোনো মানুষ নেই!

– থাকবে না কেন, আশপাশে লাখ লাখ মানুষ কিলবিল করছে আপনি দেখতে পারছেন না। মন থাকলে মানুষ হয়, এখানে যারা বাস করে তাদের মন নেই, আছে প্রাণ। প্রাণ তাকলে প্রাণী হয়, আপনি তাই আশপাশে অসংখ্য প্রাণী দেখছেন। আর একটি কথা স্যার আমাকে আপনি বলবেন না। আমি ছোট কাজ করি, আমার আবার মান-সম্মান। ধমকের সুরে কথা বলবেন, ‘হেই ড্রাইভার’। এখানে কেউ আমাকে সম্মান দেয় না। শুধু আমি না স্যার এ দেশে শিক্ষাবিদ বলেন, রাজনীতিবিদ বলেন, বুদ্ধিজীবী বলেন কেউ কাউকে সম্মান করতে জানে না। সম্মান দেয় না। সবাই নিজেকে ‘হাম বড় মিয়া’ মনে করে, নিজেই সবার সেরা, অন্যেরা গরু-ছাগল-ভেড়া!

– অন্যদের কথা বাদ দেন, আপনার কথা বলেন, আপনি কেন জেনে-শুনে এই ভয়ঙ্কার পেশায় আছেন? আপনি তো নিজের ও অন্যদের জীবন নিয়ে খেলা করছেন।

– আপনি যদি আমার মতো চাকর শ্রেণীর লোককে অত সম্মান দিয়ে কথা বলেন, আপনার কোনো কথার জবাব আমি দেব না। শুধু আমি না এ দেশে সবাই জীবন নিয়ে খেলা করে। এখানে বাজার-ঘাট রেস্টুরেন্টে জেনে-শুনে খাদ্যে বিষ মিশিয়ে বিক্রি হয়। এটা ভুয়ার স্বর্গরাজ্য, আসলের ন্যূনতম জায়গা নেই। জীবনে কোনো দিন মেডিক্যালে পড়ে নি, ডাক্তারি লাইসেন্স নেই অথচ ডাক্তারি করে। আশ্চর্য হবেন এ দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক শিক্ষকের কোনো পিএইচডি ডিগ্রি নেই অথচ ভুয়া ডিগ্রি দেখিয়ে চাকরি করছে, বুদ্ধিজীবী হিসেবে সমাজের উঁচু কাতারে চলে বেড়াচ্ছেন। আমার মতো মূর্খের মুখে এ সব শোভা পায় না। আমার কথা শোনেন- কীভাবে ড্রাইভার হলাম :

– লেখাপড়া কিছু জানি না। আমার ফুফাত ভাই ড্রাইভার। তারও কোনো লাইসেন্স নেই, বড়-বড় বাস চালায়। সে শিখেছিল তার গুরুর কাছে থেকে। আমি তার সাগরেদ। আমি শিখেছি কিছুটা আমার ফুফাত ভাইয়ের কাছে হাতে-কলমে। একদিন ফুফাত ভাই বললেন, ছোট ভাই, তুমি এক কাজ কর, ড্রাইভিং স্কুলে ভর্তি হয়ে যাও। তার কথা মতো ড্রাইভিং স্কুলে ভর্তি হলাম। ইন্সট্রাক্টর সাহেব গাড়ি রাস্তায় নিয়ে বললেন, “রাস্তায় মহাজ্যাম গাড়ি চালান শিখান যাবে না। আর শিখেই বা কী লাভ? পুলিশে ঘুষ না দিলে পাস করাবে না। তার চাইতে এক কাজ করেন, আমাকে ৫ হাজার টাকা দেন বিনা ঝামেলায় লাইসেন্স বের করে দেই। আমাদের কাছে সিল-ছাপ্পর লাইসেন্সের ফরম সবই আছে, এমন সই করব যে পুলিশের বাবারও সাধ্য নেই নকল লাইসেন্স বুঝতে পারে। আর বুঝতে পারলেই বা কী? পুলিশ সার্জেন্ট গাড়ি ধরলে বা লাইসেন্স চেক করলে কাগজপত্র লাইসেন্স ঠিক থাকলেও কি হবে তাদের অধিকাংশের ঘুষ দিতে হয়। ঘুষ দিলে সব ঠিক, না দিলেই ঝামেলা। দুই মাস ট্রেনিং দিয়ে পুলিশের পেছনে মাসের পর মাস ঘুরেও লাইসেন্স পাবেন না। অত ঝামেলার কী দরকার? আয়েশে লাইসেন্স পাবেন।” তাকে টাকা দিয়ে ভুয়া লাইসেন্স বানালাম। জীবনে ২০টা বছর ভুয়া লাইসেন্স দিয়ে চাকরি করে খাচ্ছি কোনো সমস্যা হয় নি।

– এক্সিডেন্ট করেন নি?

– করেছি, যে যত এক্সিডেন্ট করে সে তত বড় দক্ষ ড্রাইভার। এক্সিডেন্ট করে প্রথম কাজ হল ঘটনা স্থলে থেকে পালিয়ে যাওয়া। নিজের গা বাঁচানো। দুই দিন পর সব শেষ। পাবলিক প্রথম প্রথম দুই-একদিন গরম থাকে, গাড়ি ভাঙ্চুর করে, ড্রাইভারকে ধরতে পারলে গণপিটুনী দেয়।

– তা ড্রাইভার সা’ব গাড়ি এত আস্তে চালাচ্ছেন কেন?

– রাস্তার চেহারা দেখছেন না। ভাঙ্গা-চোরা খানাখন্দকে পরিপূর্ণ আর কত বাঁক। গাড়ি চালাব কীভাবে। শালার পাকা রাস্তাকে বলে রাজপথ। রাজপথ হবে টানা-সোজা। এ দেশে রাজপথকে প্রতিটা বাড়ি বাঁক দিয়ে যেতে হয়। আগেই বলেছিলাম না এ দেশে সবাই হোমরা-চোমরা। একটা রাস্তা বানাবার সময় কারোর বাড়ি ভেঙ্গে রাস্তা সোজা করে এমন ক্ষমতা সরকারের আছে নাকি? আর ভাঙ্গা চোরা, নতুন রাস্তা বানাবার ৬ মাসের ভেতর সব ভেঙ্গে একাকার। রাস্তা করার সময় শালার ঠিকাদাররা ঠিকমত মাল-মসলা দেয় না। — দিবেই বা কীভাবে। ঠিকাদারী করাও সোজা নয়। একটা কাজের জন্য হাজার জন ঠিকাদার, নিজেদের মধ্যে প্রথমে পেশীশক্তির পরিচয় দিয়ে টিকতে হয়। কে কার গুলিতে মরে আল্লাহ মালুম! পেশীশক্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও টেন্ডার জমা দিলেই কি কাজ পাওয়া যায়? যায় না। টেন্ডার জমা দেওয়ার আগেই টেন্ডারদাতাদের পারসেন্টেজ দিয়ে হয়। এরপর কাজ শুরু করলেও বিড়ম্বনার শেষ নেই, লোকাল হোমরা-চোমরা বড় ও ক্ষুদে চাঁদাবাজ সবাইকে খুশী করে কাজ চালিয়ে যেতে হয়।

 

– সবাইকে ভাগবাটোয়ারা দিয়ে ভালো মতো কাজ করলে ঠিকাদারীতে টিকে থাকা যায়? যায় না। কোনো মতো ইট-সুড়কি বিছিয়ে বিটুমিন না দিয়ে কাজ শেষ করতে হয়। রাস্তার কাজ শুরু থেকে শেষে যেতে না যেতে ভাঙ্গা চোরা শুরু হয়। পারসেন্টেস তো সব জায়গায় দেওয়া আছে বিল পেতে কোনো অসুবিধা হয় না।

গাড়ি যেখানে থামল সেখানে ২০ ফুট উঁচু কাঁটা-তারের বেড়া। বেড়া ডিঙ্গিয়ে প্রাণী তো দূরের কথা কীটপতঙ্গেরও যাওয়া সম্ভব নয়।

– ড্রাইভার সা’ব এখানে কাঁটা-তারের বেড়া কেন?

– এটা দুই দেশের সীমান্ত, আপনাকে এখন এই কাঁটা-তারের বেড়া ডিঙ্গিয়ে অপর দেশে যেতে হবে। আমাদের দেশে আপনার সময় শেষ।

– অত-বড় বেড়া ডিঙ্গিয়ে আমি কীভাবে ওপারে যাব?

– আমি আপনাকে ঢিলের মতো ওপারে ছুঁড়ে মারব।

– তাহলে আমি মারা যাব।

– আপনি মারা যাবেন না। আপনি অত মরার ভয় পান কেন? এখানে কেউ মরে না।

– সকলে কি এভাবে বেড়া ডিঙ্গিয়ে ওই দেশে যায়? অবৈধ প্রবেশ ঠেকাতে এরূপ কাঁটা-তারের বেড়া দেওয়া হয়েছে, কথাটা সম্পূর্ণ সত্য নয়, কেউ কেউ পালিয়ে ও দেশে যায়। এই যে এত বড় কাঁটা-তারের বেড়া দেখছেন তার পেছনেও একটা ঘটনা আছে। অনেক বছর আগে আমাদের দেশে এক মহিলা পররাষ্ট্রমন্ত্রী হয়েছিলেন। মানুষের তো কত রকমের শখ থাকে, থাকে না? আমাদের ওই মন্ত্রীর ছিল মোরগ পোষার শখ। তার ছিল দুইটা বড় সাইজের মোরগ। মন্ত্রী যেখানে যেতেন মোরগ দুইটা সাথে যেত। একদা মন্ত্রী সাহেবা দুই দেশের সীমান্তে জনসভা করছিলেন। মোরগ দুইটা সকলের অজান্তে জনসভার অদূরে দুই দেশের সীমানায় ডিম পাড়া শুরু করল।

– ড্রাইভার সাহেব আপনি কি আমার সাথে রসিকতা করছেন? মোরগ কোনো দিন ডিম পাড়ে না কি?

– পাড়ে পাড়ে, সে মোরগ যদি মন্ত্রীর হয়। মন্ত্রীর বলে কথা। মোরগ দুটি দুই দেশের সীমানায় ডিম পাড়ল মাত্র জনসভা চলাকালীন সময়ে একটা দুইটা নয়, পাকা দুই হাজার। জনসভা শেষে মোরগের খোঁজ পড়ল মোরগ কোথায়, মোরগ কোথায়? দুই দেশের সীমানায় মোরগ দু’টি ডিমের উপর দাঁড়িয়ে উচ্চস্বরে বাগ দিল। মোরগের ডাক শুনে সকলে সেখানে ছুটে গেল। সকলে হতবাক, মোরগে ডিম পেড়েছে, আহ্ মোরগে ডিম পেড়েছে! সেখানে ছিল এক কবিরাজ সে কয়েকটা ডিম হাতে নিয়ে ঘোষণা দিল, এ ডিম বড়ই ধনান্তরী! এ ডিম খেলে পুরুষের পুরুষত্ব বেড়ে যাবে। ৯০ বছরের বুড়া ১৫ বছরের মেয়েকে বিয়ে করে সুখী করতে পারবে। বাঁঝা মেয়েলোক খেলে সন্তানের জন্ম দিতে পারবে, সে যত বয়সের হোক না কেন? মন্ত্রী সাহেবা বললেন, এই ডিম আমাদের দেশে নেওয়া যাবে না। এই ডিম খেয়ে পুরুষের পুরুষত্ব বেড়ে গেলে তারা আর নারী শাসন মানবে না। ডিমগুলো রেখে মোরগ নিয়ে চলে এলেন। ও দেশের সীমান্ত রক্ষীরা ডিমগুলো নিয়ে গেল। যে সব নারী পুরুষ ডিম খেল তাদের প্রজনন ক্ষমতা গেল বেড়ে। ডিমের চাহিদা গেল অস্বাভাবিক হারে বেড়ে, ও দেশের কূটনীতিকরা আমাদের মন্ত্রীকে বিশেষভাবে অনুরোধ করল মোরগ দু’টি তাদের দেওয়ার জন্য। দেশ বিদেশে থেকে নানা আহ্বান আসতে থাকল। সবাই মোরগ দু’টি নিয়ে গবেষণা করতে চাইল। মন্ত্রী সাহেবা কিছুতেই মোরগ দু’টি দিলেন না। একদিন রাতের বেলা কিছু লোক মন্ত্রীর বাড়িতে আক্রমণ করল। মন্ত্রীর নিরাপত্তা রক্ষীদের সাথে গুলি বিনিময়ের সময়ে গুলি লেগে মোরগ দু’টি মারা যায়। এই ঘটনার জন্য আমাদের সরকার ওই দেশকে দায়ী করলে- বৈরী সম্পর্কের কারণে ওই দেশ সীমান্তে তখন থেকে কাঁটা-তারের বেড়া দিয়েছে। আমাদের জন্য ওরা কোনো ভিসা ইস্যু করে না। আপনার জন্য চেষ্টা করলেও ভিসা হবে না। তাই আপনাকে আমরা ছুঁড়ে মারব কোনো উপায় নেই। আমাদের দেশ গরীব, আমাদের নানা সমস্যা। আপনার মতো বহিরাগতকে আশ্রয় দেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়।

গাড়ির দরজা খুলে গেল, ড্রাইভার আমাকে জোর করে গাড়ি থেকে বের করে ছুঁড়ে মারল। আমি শুকনা পাতার মতো ভেসে এসে অন্য দেশের মাটিতে পড়লাম। আমি জ্ঞান হারালাম। কতক্ষণ অজ্ঞান ছিলাম জানি না। কারোর ধাক্কা-ধাক্কিতে আমি চোখ খুললাম। দেখলাম সমস্ত শরীর কালো কাপড়ে ঢাকা, একজন যার শুধু চোখ দু’টি দেখা যাচ্ছে, সে মিষ্টি করে আমাকে কী বলল বুঝলাম না। আমার তাকানো দেখে সে-ও বুঝতে পারল আমি তার কথা বুঝতে পারছি না। সে হাতের দ্বারা ইশারা করল তাতে বুঝলাম, সে তাকে অনুসরণ করতে বলছে। আমি দাঁড়াতে চেষ্টা করলাম। সে আমার পিঠে, মাথায় তার হাত দিয়ে ধাক্কা দিল তাতে আমার ওঠে দাঁড়াতে সহজ হল। সে আমার বাম হাত ধরে একপ্রকার টানতে টানতে নিয়ে চলল। সে বারে বারে পথের এদিক ওদিক তাকাল। আমাদের কি কেউ লক্ষ্য করছে, তা সে পরীক্ষা করে দেখছে। আমরা প্রায় ১৫ মিনিট হাঁটলাম কাউকে কোথায়ও দেখলাম না। হঠাৎ একটা সুড়ঙ্গ পথ দিয়ে আমরা মাটির তলে চলে গেলাম। ২০-২৫ মিনিট মাটির তলে সুড়ঙ্গ পথে চলার পর আমরা বড় একটা ঘর পেলাম। সে ইঙ্গিতে আমাকে কিছু বলল।

জীবনে কোনো শিক্ষাই বিফলে যায় না। এক সময় কিছু সাইন ল্যাঙ্গুয়েজ শিখেছিলাম আজ তা কাজে লাগল। সে আমাকে ইশারায় বলল, আমার দেশটা ধনী, আশপাশের গরীব দেশের লোকজন বৈধ অবৈধ যে-যেভাবে পারে এ দেশে আসে আয় করার জন্য। আমাদের দেশের মানুষের মানবিক গুণাবলী নেই। তারা এ সব গরীবদের নানাভাবে অত্যাচার করে। তুমি বিদেশী, অবৈধভাবে এ দেশে এসেছ, সরকারী লোকজন তোমাকে ধরে নিয়ে যাবে, অত্যাচার করবে। তোমার আবার পাসপোর্ট নাই, তুমি কোন দেশের নাগরিক তা অজানা, সাজার মেয়াদ শেষে তোমাকে কোথায় পাঠাবে। তুমি আবার ভাষা কিছুই বোঝ না। তুমি আমার এই গোপন ঘরে থাক, নিরাপদে থাকবে, আমাদের ভাষা রপ্ত করে। আমাদের ভাষা কিছুটা শিখলে তারপর ধরা পড়লে অন্তত তোমার দেশের কথা তোমার পরিজনদের কথা পুলিশকে বলতে পারবে।

আমি ইঙ্গিতে বললাম, তুমি খুবই ভালো। আমি তোমার মুখটা দেখতে পেলাম না। তুমি তো তোমার মুখ ঢেকে রেখেছ। চোখে চোখ রেখে কথা না বললে কি ভালো লাগে?

– তুমি পর পুরুষ, তোমাকে মুখ দেখানো আমার নিষেধ আছে।

– তোমার ঘরে যত ছবি দেখছি সবার পরিধানে একই পোশাক, কোনটা পুরুষ কোনটা মেয়ে বুঝব কীভাবে?

সে খল খল করে হেসে বলল, তুমি খুবই বোকা। ছবিগুলো ভালো করে লক্ষ্য কর। সবার পোশাক একই রকম হলেও দেখ, মেয়েদের মুখ ঢাকা। পুরুষের মুখ খোলা। পুরুষের মাথায় অতিরিক্ত একটা রুমাল আছে, তা গোলাকার কালো রিং দিয়ে মাথায় আটকানো। মেয়েদের মাথায় কোনো রিং নেই। শোনো আজ আমার হাতে কোনো সময় নেই আমাকে এখন যেতে হবে। আমার লোকেরা তোমাকে দেখতে আসবে। তাদের কাছ থেকে ভাষা শেখার চেষ্টা করবে আর ভুলেও কখন সুড়ঙ্গ পথে উপরে যাবে না।

– আপনি আমার জন্য এত কিছু করছেন আপনার কাছে আমি কৃতজ্ঞ। আপনার নাম কি জানতি পারি?

– নামের কি প্রয়োজন? আমরা দু’জনে বন্ধু। আমাকে হাবিবা বললেই হবে।

হাবিবা প্রত্যেক দিন একবার আমার সাথে দেখা করত, সে ভালো অস্ত্র চালনা করতে পারত। আমাকে সে তার ভাষা ও অস্ত্র চালনা শিখাতে লাগল। দুই মাসের ভেতর আমি তাদের ভাষা ভালোই রপ্ত করে ফেললাম। একদিন হাবিবা আমাকে বলল, আজ তুমি আমার সাথে যেতে পার তবে তোমাকে বোরকা পরতে হবে। তুমি উচ্চতায় আমার চেয়ে ছোট, কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করলে আমি বলব আমার ছোট বোন। তুমি কোনো কথা বলবে না। শুধু দেখবে কারোর প্রশ্নের জবাবে আমি বলব আমার বোন বোবা, কথা বলতে পারে না।

আমরা দু’জন শহরের মাঝ দিয়ে হেলেদুলে ধীরে ধীরে হেঁটে চলছি, বাস স্টেশনে দেখলাম দুই বিদেশী ছেলে বাসের জন্য অপেক্ষা করছে। সেখানে ছয়জন দেশী যুবক এসে তাদেরকে দেখিয়ে চাকর চাকর বলে চিৎকার পাড়ছে।

হাবিবা ওদেরকে ওরা চাকর চাকর বলে চিৎকার করছে কেন? ওরা কারা?

তোমাকে না বলেছি কোনো কথা বলবে না। ওরা বিদেশী গরীব মানুষ, এ দেশে চাকরি করতে এসেছে। অপদার্থের দল ওদেরকে টিটকারি মারছে। বিদেশীদের প্রতি আমাদের এটাই স্বাভাবিক আচরণ।

বিদেশী যুবক দু’টি অসহায় দৃষ্টিতে দেশীয় যুবকদের দিকে তাকিয়ে আছে কিছুই বলছে না। এক পর্যায়ে স্বদেশীয় যুবকগুলো বিদেশী যুবকদের গায়ে থু থু মারল। হাবিবার কী হল বুঝতে পারলাম না, সে স্বদেশীয় যুবকদের কিলঘুষি মারা শুরু করল। তারাও পাল্টা হাবিবাকে কিলঘুষি মারতে লাগল। আমি বসে থেকে কী করব। হাবিবার পক্ষে মারামারি শুরু করলাম। কিছুক্ষণের ভেতর এক গাড়ি পুলিশ এসে আমাদেরকে পুলিশ স্টেশনে ধরে নিয়ে গেল। পুলিশ হাবিবাসহ স্বদেশীয় যুবকদের ছেড়ে দিল। শুধু আমাকেই হাজতে রাখা হল। শুনতে পারলাম পরের দিন আমাকে বিচারের জন্য কোর্টে চালান দেওয়া হবে।

কোর্ট আমাকে অবৈধ অনুপ্রবেশ, গোপনীয় অবস্থায় আত্মগোপন করে থাকা, স্বদেশীয় মেয়ের সাথে বন্ধুত্ব করা, স্বদেশীয় যুবকদের প্রহার করা এমনকি গোয়েন্দাগিরির অপরাধে অপরাধী সাব্যস্ত করল। আমার এ সব অপরাধের শাস্তি শিরশ্ছেদ। কাজী আমাকে শিরশ্ছেদের আদেশ দিল। আত্মপক্ষের কোনো সুযোগ নেই, এমনকি আমি আইনজীবী নিয়োগের সুবিধা পেলাম না।

আমার শিরশ্ছেদের দিন ধার্য হল। ইচ্ছা ছিল শিরশ্ছেদ দেখব কিন্তু নিজের শিরশ্ছেদ তো নিজে দেখা যায় না! মরার জন্য আমার কোনো ভয় হচ্ছিল না। মরতে তো একদিন হবেই। তা হেমলক বিষ পান করেই হোক, লেথাল ইনজেকশন দিয়েই হোক বা শিরশ্ছেদ হোক।

নির্ধারিত দিনে আমাকে ফাঁকা মাঠে নিয়ে যাওয়া হল। সেখানে হাজার হাজার স্বদেশী জড়ো হয়েছে। অনেক টিভি স্টেশন থেকে লোক এসেছে সরাসরি সম্প্রচার করার জন্য। প্রথমে আমার দু’হাত পেছনে নিয়ে বাঁধা হল, তারপর দুই চোখ কালো কাপড়ে শক্ত করে বান্দা হল যাতে আমি কিছু দেখতে না পাই। আমাকে দুই হাঁটুর উপর ভর দিয়ে পশুর মতো রাখা হল। কোতয়াল আমাকে বলল, তোমাকে পাঁচ মিনিট পরে শিরশ্ছেদ করা হবে। তুমি যদি ঈশ্বর, খোদা, দেবদেবী যাতে বিশ্বাস কর তার নাম এই পাঁচ মিনিট জপ করতে পার। আমার ঈশ্বর দেবদেবী কারুর নামই মুখে আসল না। আমার প্রাচীন গ্রীসের কথা মনে হল। দার্শনিককে বিষ পানে হত্যা করা হবে, তার হাতে এক কাপ হেমলক বিষ দিয়ে বলা হল তুমি পান কর। দার্শনিক বিষ পানের আগে বললেন, I to die you to live which is better only God knows. আমার গা শিহরিয়ে উঠল। কে যেন আমার চোখে মুখে পানি ছিটাল, গালে আস্তে আস্তে চড় দিল। আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। চোখ মেলে দেখলাম নানীজানের হাতে এক গ্লাস পানি। আঙ্গুলে পানি দেখে বুঝলাম উনি আমার মুখে পানি ছিটিয়েছেন। হেসে বললেন, কিরে ঘুমের ভেতর ও-রকম গোঙ্গাচ্ছিলি কেন? শয়তানের গুঁতো খেয়েছিস বুঝি। সুবহে সাদিক, ফজরের আজান হল- আসসালাতু খায়রুম মিনারনাউম। নিদ্রা অপেক্ষা নামাজ উত্তম। নামাজে না গিয়ে ঘুমে থাকবি, শয়তানের গুঁতো তো তোরাই খাবি।

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১১:৫৮ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৪

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com