শ্রীপতির নকশিকাঁথা

শনিবার, ২৫ জুলাই ২০১৫

শ্রীপতির নকশিকাঁথা

 

সুজিত হালদার
এমন একটা তুচ্ছ বিষয় নিয়ে কেউ থানায় এসে পুলিশেরর কাছে নালিশ জানাতে পারে, তা স্বপ্নেও ভাবতে পারেননি থানার সেকেন্ড অফিসার অরূপ সরখেল৷‌ সবাই ওঁকে মেজবাবু বলে সম্বোধন করে৷‌


তো, সেই তুচ্ছ বিষয়টি হল কাঁথা৷‌ তবে নকশিকাঁথা৷‌ শ্রীপতি বৈরাগীর জীবনে এই নকশিকাঁথার এক বিশেষ ভূমিকা আছে৷‌ আজও৷‌

Litearture 01শ্রীপতির স্হাবর-অস্হাবর সম্পত্তি বলতে আছে ছোট্ট কাঠা দুইয়ের বাস্তু জমি– তাতে একটা ছোট্ট কুঁড়েঘর আর একটা ছোট্ট ঠাকুরঘর৷‌ ঠাকুরঘরটা কিন্তু ছাদ আঁটা পাকা ঘর৷‌ শ্রীপতির বাপ-ঠাকুরদারা দুয়ারে দুয়ারে হরিগুণ গান গেয়ে, ঠাকুরদেবতার গান ও গল্প করে, শিষ্য বাড়ি থেকে দান সংগ্রহ করে এবং সর্বোপরি হাটেবাজারে ভিক্ষে সিক্কে করে এই রাধামাধবের মন্দিরটা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন৷‌ ওই মন্দিরের আছে বেশ প্রমাণ আকারের পিতলের রাধামাধবের যুগল মূর্তি, তামা ও কাঁসার বাসন-কোশন, কয়েকজোড়া করতাল, একটা শ্রীখোল, একতারা, ঘুঙুর, নামাবলি, একটা মান্ধাতার আমলের সিঙ্গল রিড-এর হারমোনিয়াম….৷‌ এইসব৷‌ আর আছে বেশ কয়েকটি কাঁথা৷‌ নকশিকাঁথা৷‌ এমনকি, মাধুকরী করার জন্য যে সব ঝোলাঝুলি আছে, সে সবও তৈরি হয়েছে নকশিকাঁথা দিয়ে৷‌

শ্রীপতি জন্ম থেকে অন্ধ৷‌ দু’চোখে দেখতে না পেলে কী হবে, হাতের স্পর্শে আর গন্ধ শুঁকে সব কিছু বুঝতে পারে৷‌ ওইসব ফুল লতাপাতা মাছ ও কলকা আঁকা কাঁথাগুলোর ওপর হাত বুলিয়ে বলে দিতে পারে কোনটা তার মায়ের তৈরি, কোনটা তার ঠাকুমা কিংবা কোন কাঁথাগুলো তার বাবার ঠাকুরমার হাতে তৈরি৷‌ স্পর্শ ও গন্ধের মাধ্যমে জগৎকে চেনা ও জানার যে ক্ষমতা আছে শ্রীপতির– তা দেখে অন্য লোকে তো অবাক হয়, এমনকি তার বউ রেবতীও এসব দেখে প্রথম প্রথম হাঁ করে তাকিয়ে থাকত৷‌

কেউ কেউ মজা করে কিংবা অনেকে অবজ্ঞা করে ওকে বলে ‘বুল ডগ’৷‌ এসব কথা গায়ে মাখে না শ্রীপতি, বরং মিটিমিটি করে হাসতে হাসতে সে বলে: কার দরজার গোড়ায় মরণের রাজা এসে কড়া নাড়ে তা আমি বলে দিতে পারি গন্ধ শুঁকে৷‌ মরণের রাজার গায়ের সেই স্বর্গীয় সুগন্ধটা আমার নাকে আসে৷‌ আবার সেই মরণের রাজার মন্ত্রী- কোটাল পাত্র-মিত্র-জল্লাদ-বরকন্দাজ ও চেলাচামুন্ডাদের প্রত্যেকের গায়ে এক একরকম গন্ধ৷‌ শ্রীপতির এসব কথা কেউ বিশ্বাস করে, আবার অনেকে বলে, ওসব কানা শ্রীপতির গুলতাপ্পি৷‌

তো, হয়েছে কী, কে বা কারা যেন শ্রীপতির একটা নকশিকাঁথা ও একটা ছেঁড়াকাঁথার টুকরো চুরি করেছে বা মজা করে লুকিয়ে রেখেছে৷‌ ওই কাঁথাটা তার মায়ের হাতে তৈরি এবং শ্রীপতির মা ও বাবা ওই কাঁথাটা নিয়ে গয়া-বৃন্দাবন-কাশীতে তীর্থ করে এসেছিলেন৷‌ আজও শ্রীপতি প্রতি রাতে ওই কাঁথা পেতে বা মুড়ি দিয়ে ঘুমোয়৷‌ সে ওই কাঁথার ভেতরে তার প্রয়াত মায়ের গায়ের গন্ধ পায়৷‌ শ্রীপতি তার মায়ের গায়ের গন্ধ নিতে নিতে ঘুমিয়ে পড়ে৷‌ আঃ! কী প্রশান্তি! শ্রীপতি আর রেবতী দু-চারদিনের জন্য বাইরে কোথাও গেলে নিয়ে যায় এক টুকরো ছেঁড়া কাঁথা৷‌ ওই কাঁথার টুকরোটা সঙ্গে থাকলে সে মনে করে তার মা সঙ্গে আছে৷‌ বিদেশে বিভুঁয়ে রাতে ঘুমটাও হয় তার মায়ের স্নেহ ও ভালবাসায়৷‌

আর দুঃখের বিষয় ওই দুটি– একটা কাঁথা ও একটা কাঁথার টুকরো কে বা কারা চুরি করেছে৷‌ সেদিন, পৌষ মাসের শীতে রেবতী ওই কাঁথাটা আর কাঁথার টুকরো শুকোতে দিয়েছিল উঠোনে টাঙানো দড়িতে৷‌

এক ফাঁকে ওই দুটি উধাও হয়ে গেছে৷‌ খোঁজ খোঁজ খোঁজ! আর কোথাও পাওয়া গেল না৷‌ কিন্তু, কে নেবে এই আপাত তুচ্ছ জিনিস? এই কম্পিউটার– এস এম এস, ফেসবুকে চ্যাটিং-এর যুগে কাঁথা চুরি? তাও আবার পুরনো কাঁথা ও কাঁথার টুকরো!

তিনদিন হয়ে গেল– তিনরাত শ্রীপতির চোখে ঘুম নেই৷‌ কান্নাকাটি হাহুতাশ অনেক কিছু হল৷‌ হরিনাম করার সুবাদে এলাকার প্রায় সবাই ওদের চেনে৷‌ শ্রীপতির বউ রেবতী থানার মেজবাবুর হাতে-পায়ে ধরে বলল, স্যার, আমার লোকটার যে চোখে ঘুম নেই পেটে খিদে নেই৷‌ কী যে করি স্যার? ও যেন নতুন করে মাতৃহারা হল৷‌ থানার সেকেন্ড অফিসার মিস্টার অরূপ সরখেল কী করবেন আর করবেন না তা ঠিক করতে পারছেন না৷‌ শ্রীপতি আর শ্রীপতির বউ প্রায়শই তাঁদের বাড়িতে এসে নামগান শোনায়৷‌ কাজেই, চেনা-জানার ক্ষেত্রে যেমন হয় তেমনটাই হওয়া উচিৎ ৷‌ কিন্তু, বিষযটা এমন, যে এটা নিয়ে বেশিদূর এগোনোও পাগলামি হবে৷‌ অনেক ভেবেচিন্তে বললেন: ঠিক আছে, দেখি কী করতে পারি৷‌

পরদিন সকালে চারজন পুলিশকর্মী এসে হাজির শ্রীপতির বাড়িতে৷‌ ওরা এসে দেখল, অন্ধ শ্রীপতি পা ছড়িয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে চুপচাপ বসে আছে৷‌ সামনে পড়ে আছে তার জপমালার থলেটা৷‌ এইভাবে নাকি সে তিনদিন তিনরাত বসে আছে না খেয়ে না ঘুমিয়ে৷‌

মেজবাবু অরূপ সরখেল তাঁর সেই লাল রঙের বুলেট বাইকে চেপে যখন এ পাড়ায় এলেন, তখন পাড়ায় ইয়াং ছেলেদের টনক নড়ল৷‌ বদমেজাজি ও কড়া অফিসার হিসেবে মিঃ সরখেলের সুনাম ও বদনাম দুই আছে৷‌ উনি শুধু পাড়ায় রামুর চায়ের দোকানে চা খেতে খেতে বললেন: রামু, শ্রীপতির বাড়িতে কারা বদমায়েশি করে আর কারা ওদের বিরক্ত করে খবরটা আমাকে দিস৷‌ আজ আমি চললাম৷‌ কাল যেন আবার না আসতে হয়৷‌ কথাটা মনে থাকবে তো?

ব্যাস, এইটুকুতেই কাজ হল৷‌ পরদিন ভোরবেলা রেবতী একটা শালপাতার ঠোঙায় করে রাধামাধবের প্রসাদ হিসেবে মুঠোখানেক চিঁড়ে-মুড়কি, দুটো কাঁঠালি কলা ও খানকয়েক বাতাসা নিয়ে হাজির হল মিঃ সরখেলের বাড়িতে৷‌

–কী হল, রেবতী!

–স্যার, ও ঘুমোচ্ছে৷‌ অঘোরে ঘুমিয়ে পড়েছে স্যার৷‌

–কী করে হল রেবতী?

–স্যার, কে যেন কখন সেই কাঁথাটা আর ছেঁড়া টুকরোটা ওর পেছনে রেখে গেছে৷‌ চুপিচুপি৷‌ আমি তখন অন্য কাজে ব্যস্ত ছিলাম, স্যার৷‌

–তারপর?

–স্যার, দেখলাম সে তার মায়ের কাঁথার ছোঁয়া পেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে৷‌ কী শান্তি, মানুষটা তিনদিন ঘুমোয়নি, দাঁতে কুটো কাটেনি৷‌ এই নিন স্যার, আমাদের রাধামাধবের পেসাদ এনেছি৷‌

অরূপবাবু হাত বাড়িয়ে প্রসাদের ঠোঙাটা নিয়ে নিলেন৷‌ অন্যদিন হলে হয়ত বলতেন, রেবতী ওখানে রেখে যা, বা বলতেন, তোর বউদির হাতে দিয়ে যা৷‌

অরূপবাবু একে পুরুষমানুষ তার ওপর থানার মেজবাবু, তাই কাঁদতে পারছেন না৷‌ অথচ তাঁর বুকটা ফেটে যাচ্ছে এই জন্যে– কতদিন তিনি দেশের বাড়িতে তাঁর বাবা-মাকে দেখতে যাননি৷‌ চাকরির সুবাদে এই জেলা থেকে সেই জেলা, এই থানা থেকে সেই থানা করছেন৷‌

অন্ধ শ্রীপতি বৈরাগী ও তার বউ রেবতী আর তাদের নকশিকাঁথা তাঁকে মনে করিয়ে দিল– দেশের বাড়িতে তাঁর বৃদ্ধ বাবা ও বৃদ্ধা মা দিনের পর দিন তাঁদের ছেলে-বৌমা ও নাতি-নাতনিদের দেখার জন্য হাঁকপাঁক করছেন৷‌

শনিবারের চিঠি / আটলান্টা/ ২৫ জুলাই ২০১৫

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১০:১৪ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ২৫ জুলাই ২০১৫

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com