শেষ থেকে শুরু

শনিবার, ০৫ মার্চ ২০১৬

শেষ থেকে শুরু

শেষ থেকে শুরু
অমৃতা দে

 


Litearture 01জীবনের নিঃসঙ্গ ক্লান্ত বিকেলগুলো একে একে পার হয়ে যায়। শেষ বিকেলের রক্তিম আভায় আবার একটা ভাবি দিনের রেশ। চরম ব্যবস্ততাপূর্ন নতুন ভোরের সংজোযন পৃথিবীর ক্যালেন্ডারে। ঝটপট সারা চান খাওয়া। তাড়াতাড়ি নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এক দৌড়ে বাস স্ট্যান্ড। ব্যস্ত জনতার গুঁতোগুঁতি খেয়ে বাসে ওঠা। গন্তব্য সেই এক ঘেয়ে কলেজ।

মালবিকার সকালটা এরকমই। দুপুরে বয়ে চলা ক্লাস, এস,বি,এম -এর দ্রুত লেকচার, পাতায় পাতায় গ্যাপ থেকে যাওয়া ব্যস্ত ক্লাস নোট। অবশেষে বেলা শেষের ঘন্টা। তবুও নিস্তার নেই মালবিকার। কারন শেষ থেকেই তো শুরু। শুরু – বন্ধুদের কাছে মেকি হাসির পেছনে লুকিয়ে ফেলা একাকিত্ব, বস্তাপচা প্রেমের কীর্ত্তন আর পি,এন,পি,সি। উফ! দিন দিন ক্রমশ অসহ্য হয়ে উঠেছে সব কিছু।

আজ মালবিকা সবকিছু এড়িয়ে চটপট চলে এল রাস্তায়। ভিড়ে গা মিশিয়ে কলেজ পেরিয়ে সজা রাস্তা ধরে চলল। এদিকটা তুলনা মুলক ফাঁকা। তবুও ভয় হয়, কোথা থেকে চেনা মুখ বেরিয়ে পড়ে। তা হলেই তো আবার কৌতুহল, একা মালবিকা ঐ পথে! নিশ্চই এপো আছে। কার সাথে? মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশী আর কি। এই সব ভাবতে ভাবতে অনেকখানি চলে এসেছে মালবিকা। পাশেই ছত একটা পার্ক, তবে বেশ টিপটপ। একটা ফাঁকা বেঞ্চ দেখে মালবিকা পার্কে ঢুকে পড়ল। গা এলিয়ে দিল সাদা বেঞ্চে। বেঞ্চের উপর কদম গাছের স্নেহ ছায়া। নিস্তব্ধ পার্ক। শীতের দুপুরে গাছের শ্রান্ত পাতা।

মালবিকার দৃষ্টি কদম গাছটায়। ক্রমশ ভীড় করে আসে অতীত। স্মৃতির পাতা একে একে ওল্টাতে থাকে মালবিকা, আর চখের সামনে ভেসে ওঠে কত জলছবি। ছবিগুলো দেড় বছরের বস্তাপচা, তবু ছবিগুলো ওর মনে আজও তাজা গোলাপের মতই, শুধু গন্ধটা উবে গেছে এই যা।
মালবিকা – একটা চুলবুলি মিষ্টি মেয়ে। কখনো ছেলেমানুষি, তো কখনও গিন্নিপনা। এই বেঞ্চ পিতিয়ে গান করছে আবার কখনও বন্ধুর মুখের ফুচকা ছঁ মেরে নিয়ে পালাচ্ছে। কলেজে সবার প্রিয় মালবিকা। স্যার-ম্যাম থেকে বন্ধুরা, জুনিয়াররা, সিনিয়াররা – সবাই ওর প্রসংশায় পঞ্চমুখ। আসলে মালবিকা ছিল সবার থেকে আলাদা। অতি সাধারন, তবুও অনেকখানি অসাধারন। চেহরা পোশাক খুবই সাধারন। অসাধারন ওর ব্যবহার। সেই কারনে কলেজে ওর পরিচিতিও প্রচুর। মালবিকা এক কথায় বিন্দাস।

তবে যে কথাটা না বললে মালবিকা সম্পর্কে অনেক কিছুই বলা হয়না – ও খুব ভালো কবিতা লিখত। এতো গভীরে সব কিছু ভাবত যে ওর সেই চিন্তা ভাবনার প্রতিফলন পড়ত কবিতায়। যে কোন সম্পর্কের ব্যাপারে ও ভিষন সিরিয়াস ছিল, তা সে বন্ধুত্ব বা প্রেম যাই হক না কেন। খুব সুন্দরভাবে জটিল সমস্যার সমাধান করতে পারত। আর পারত খেতে। রোজ ফুচকা, পাঁপড়ি চাট, আলুকাবলি খেত আর কাকুদের সাথে ভাব জমাত। ক্যান্টিনের বুড়োদের সাথে ছিল ব্যাপক দোসতি। যেখানে খাবার, সেখানে মালবিকা। ওকে বন্ধুরা উপাধি দিয়েছিল ‘পেটুক’।

ফার্স্ট ইয়ারের পড়ার সময় কলেজে কবিতার প্রতিযোগিতা হয়েছিল। তাতে মালবিকা কলেজের সেরা কবির পুরস্কার পেয়েছিল। দিনটা ছিল ২৩শে নভেম্বর। আজো মনে আছে মালবিকার।

আসলে ঐদিন মালবিকা নিজের মধ্যে একজন অন্য আমিকে আবিষ্কার করেছিল। সেই আমিটা ওপরে ওপরে ঝড়ের পূর্বাভাসের মত থম্থমে, কিন্তু ভিতরে ভিতরে তার হবু উদ্দামতা। সেই আমির কানে শ্যামার বাঁশি, বুকে হেমন্তের কূজন। তবু কোথায় যেন চাপা ভয় প্রথম প্রেমের। প্রথম কাউকে দেখা, শোনা। প্রথম কাউকে কাছে পাবার চাপা আকর্ষণ। প্রথম কারোর স্পর্শে শরীরে উত্তরে হাওয়ার শিহরণ।
২৩শে নভেম্বর মালবিকার সাথে প্রথম আলাপ হয় অভিষেকের।
– মালবিকা রাইট। হাই! আমি অভিষেক
– হাই! কিন্তু তোমাকে তো ঠিক-
– চিনলে না তো। বিগত দু বছর সেরা কবির মুকুটটা আমার মাথায়ই ছিল।
জীবনে কারোর কাছে হারিনি। আজ প্রথম তোমার কাছে হারলাম। এত দিন জানতাম আমিই সেরা। আজ মনে যোগ্য বিপক্ষ পাওয়া গেছে। এবার থেকে লড়াইটা ভালই জমবে। সাথে বন্ধুত্বও। অবশ্য তোমার যদি আপত্তি না থাকে।
– এমা, ছি ছি! আপত্তি থাকবে কেন? বরং যোগ্য বিপক্ষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে বড়ই বাধিত হলাম।

সেই প্রথম আলাপ। এরপর ধীরে ধীরে গাঢ় হতে থাকে সম্পর্ক। মালবিকা বুঝতে পারে, কি এক আমোঘ আকর্ষণে ও ক্রমশ এগিয়ে চলেছে অভিষেকের দিকে। জীবনে এরকমটা প্রথমই। এমন নয় যে মালবিকার বয়ফ্রেন্ড নেই। সুভাশিষ, রূপক, পুপু, ববি, অর্পণ, ঋজু, কৌস্তব- বলতে গেলে একটা লম্বা লিস্ট পড়ে যাবে। কোন দিনও ওদের বন্ধু ছাড়া ক্ষণিকের জন্যও মালবিকার কিছু মনে হয়নি। কোন দিনই কারোর কথা ভেবে রাতে ঘুম আসেনি- এমন হয়নি। কোন দিনও মনে হয়নি পূর্ণিমার রাত জাগা চাঁদটা এত রোম্যান্টিক হতে পারে। এখন কিন্তু অন্ধকার ঘরে রাঘবের ‘চাঁদ কেন আসে না’ গানটা শুনলে মালবিকার গায়ে কাঁটা দেয়। আগে এমনটা হত না। আগে ভাই দুটো কথা শোনালে ও চারটে কথা শোনাত, এখন মনে হয়- থাকনা, অবুঝ তো। চুলবুলি মালবিকা আজ হঠাৎই কেমন ধীর, স্থির।

একদিন তো ক্যান্টিনের বুড়োদা বলেই বসল ‘মালবিকা, তুই কেমন পালটে গেছিস। কি হয়েছে তোর?’ ওমনি ওপাশ থেকে সুভাশিষ বলে উঠ লো ‘রাধার কি হইল অন্তরে ব্যথা। বসিয়া বিরলে, থাকায় একলে, না শুনে কাহারো কথা।’ অভিষেকদা কিন্তু বলেছিল ‘সখী, ভালবাসা কারে কয়? সে কি কেবলি যাতনা ময়।’

মালবিকার আজো মনে পড়ে সেদিনের সব কথা। সে দিনটা ছিল মঙ্গলবার। মালবিকা তার এক গুচ্ছ বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ক্যাম্পাসে বসে বিন্দাস আড্ডা মারছে। হঠাৎই ওর চোখ পড়ে মাঠের অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে অভিষেকদা। অপলকভাবে ওরই দিকে তাকিয়ে আছে। চোখাচুখি হতেই অভিষেকদা এমন ভান করেছিল- কবি কবি ভাব, ছন্দের অভাব। যেন অভিষেকদা শেষ বিকেলের পড়ন্ত সূর্যকেই দেখছিল।

মালবিকা বরাবরই অনার্স ক্লাসে সেকেন্ড বেঞ্চের ধারে বসত। একদিন ক্লাসে গিয়ে দেখি ওর বসার জায়গায় একটা ভাঁজ করা কাগজ বেশ পরিপাটি করে রাখা আছে। কৌতুহল বশতই ও কাগজটা খুলি। তাতে লেখা ছিল, “পড়ন্ত বিকালে কলেজে ক্যাম্পাসে আমার বিপাশা নদী। তাতে চিক চিক করছে শেষ বিকেলের লাল আভা। আমি ভালবাসি আমার বিপাশা নদীকে।” বড় অদ্ভূত চিঠি। হাতের লেখাটাও চেনা চেনা লাগে। তবু কার, সেটা তখন মনে করতে পারেনি মালবিকা। এর দু-সপ্তাহ পরেই এসে পড়ে মালবিকার ১৯ বছরের জন্মদিন। সকালে ঘুম থেকে উঠে সবে দাঁত মাজছিল। হঠাৎ দরজায় কলিং বেল। যথারীতি মালবিকাই দরজাটা খোলে। কিন্তু একি! কেউ কোথাও নেই। শুধু দরজার গোড়ায় রাখা লাল গোলাপের বড় একটা তোড়া। তাতে লেখা ‘জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে বিপাশা নদীকে।’ মালবিকা ভেবেছিল এ নিশ্চই তার বিচ্ছু বন্ধুদের কীর্তি। কিন্তু ‘বিপাশা নদী’ নামটাই ভাবনায় বাঁধ সেধেছিল। হঠাৎ মালবিকার মনে পড়ে যায় সেই অদ্ভূত চিঠিটার কথা। সেখানেও তো এই নামটাই লেখাছিল। হাতের লেখাও একই। মালবিকা এক দৌড়ে ওর ঘরে গিয়ে ড্রয়ার খুলে অভিষেকদার New Year-এ দেওয়া কার্ডটা বের করে। হুবহু এক হাতের লেখা। মালবিকার কাছে সব কিছুই জলের মত পরিষ্কার হয়ে যায়। হিসেব ও দুই-এ দুই-এ মিলে চার।
অমৃতা দে

জীবনের নিঃসঙ্গ ক্লান্ত বিকেলগুলো একে একে পার হয়ে যায়। শেষ বিকেলের রক্তিম আভায় আবার একটা ভাবি দিনের রেশ। চরম ব্যবস্ততাপূর্ন নতুন ভোরের সংজোযন পৃথিবীর ক্যালেন্ডারে। ঝটপট সারা চান খাওয়া। তাড়াতাড়ি নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এক দৌড়ে বাস স্ট্যান্ড। ব্যস্ত জনতার গুঁতোগুঁতি খেয়ে বাসে ওঠা। গন্তব্য সেই এক ঘেয়ে কলেজ।

মালবিকার সকালটা এরকমই। দুপুরে বয়ে চলা ক্লাস, এস,বি,এম -এর দ্রুত লেকচার, পাতায় পাতায় গ্যাপ থেকে যাওয়া ব্যস্ত ক্লাস নোট। অবশেষে বেলা শেষের ঘন্টা। তবুও নিস্তার নেই মালবিকার। কারন শেষ থেকেই তো শুরু। শুরু – বন্ধুদের কাছে মেকি হাসির পেছনে লুকিয়ে ফেলা একাকিত্ব, বস্তাপচা প্রেমের কীর্ত্তন আর পি,এন,পি,সি। উফ! দিন দিন ক্রমশ অসহ্য হয়ে উঠেছে সব কিছু।

আজ মালবিকা সবকিছু এড়িয়ে চটপট চলে এল রাস্তায়। ভিড়ে গা মিশিয়ে কলেজ পেরিয়ে সজা রাস্তা ধরে চলল। এদিকটা তুলনা মুলক ফাঁকা। তবুও ভয় হয়, কোথা থেকে চেনা মুখ বেরিয়ে পড়ে। তা হলেই তো আবার কৌতুহল, একা মালবিকা ঐ পথে! নিশ্চই এপো আছে। কার সাথে? মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশী আর কি। এই সব ভাবতে ভাবতে অনেকখানি চলে এসেছে মালবিকা। পাশেই ছত একটা পার্ক, তবে বেশ টিপটপ। একটা ফাঁকা বেঞ্চ দেখে মালবিকা পার্কে ঢুকে পড়ল। গা এলিয়ে দিল সাদা বেঞ্চে। বেঞ্চের উপর কদম গাছের স্নেহ ছায়া। নিস্তব্ধ পার্ক। শীতের দুপুরে গাছের শ্রান্ত পাতা।

মালবিকার দৃষ্টি কদম গাছটায়। ক্রমশ ভীড় করে আসে অতীত। স্মৃতির পাতা একে একে ওল্টাতে থাকে মালবিকা, আর চখের সামনে ভেসে ওঠে কত জলছবি। ছবিগুলো দেড় বছরের বস্তাপচা, তবু ছবিগুলো ওর মনে আজও তাজা গোলাপের মতই, শুধু গন্ধটা উবে গেছে এই যা।

মালবিকা – একটা চুলবুলি মিষ্টি মেয়ে। কখনো ছেলেমানুষি, তো কখনও গিন্নিপনা। এই বেঞ্চ পিতিয়ে গান করছে আবার কখনও বন্ধুর মুখের ফুচকা ছঁ মেরে নিয়ে পালাচ্ছে। কলেজে সবার প্রিয় মালবিকা। স্যার-ম্যাম থেকে বন্ধুরা, জুনিয়াররা, সিনিয়াররা – সবাই ওর প্রসংশায় পঞ্চমুখ। আসলে মালবিকা ছিল সবার থেকে আলাদা। অতি সাধারন, তবুও অনেকখানি অসাধারন। চেহরা পোশাক খুবই সাধারন। অসাধারন ওর ব্যবহার। সেই কারনে কলেজে ওর পরিচিতিও প্রচুর। মালবিকা এক কথায় বিন্দাস।

তবে যে কথাটা না বললে মালবিকা সম্পর্কে অনেক কিছুই বলা হয়না – ও খুব ভালো কবিতা লিখত। এতো গভীরে সব কিছু ভাবত যে ওর সেই চিন্তা ভাবনার প্রতিফলন পড়ত কবিতায়। যে কোন সম্পর্কের ব্যাপারে ও ভিষন সিরিয়াস ছিল, তা সে বন্ধুত্ব বা প্রেম যাই হক না কেন। খুব সুন্দরভাবে জটিল সমস্যার সমাধান করতে পারত। আর পারত খেতে। রোজ ফুচকা, পাঁপড়ি চাট, আলুকাবলি খেত আর কাকুদের সাথে ভাব জমাত। ক্যান্টিনের বুড়োদের সাথে ছিল ব্যাপক দোসতি। যেখানে খাবার, সেখানে মালবিকা। ওকে বন্ধুরা উপাধি দিয়েছিল ‘পেটুক’।

ফার্স্ট ইয়ারের পড়ার সময় কলেজে কবিতার প্রতিযোগিতা হয়েছিল। তাতে মালবিকা কলেজের সেরা কবির পুরস্কার পেয়েছিল। দিনটা ছিল ২৩শে নভেম্বর। আজো মনে আছে মালবিকার।

আসলে ঐদিন মালবিকা নিজের মধ্যে একজন অন্য আমিকে আবিষ্কার করেছিল। সেই আমিটা ওপরে ওপরে ঝড়ের পূর্বাভাসের মত থম্থমে, কিন্তু ভিতরে ভিতরে তার হবু উদ্দামতা। সেই আমির কানে শ্যামার বাঁশি, বুকে হেমন্তের কূজন। তবু কোথায় যেন চাপা ভয় প্রথম প্রেমের। প্রথম কাউকে দেখা, শোনা। প্রথম কাউকে কাছে পাবার চাপা আকর্ষণ। প্রথম কারোর স্পর্শে শরীরে উত্তরে হাওয়ার শিহরণ।
২৩শে নভেম্বর মালবিকার সাথে প্রথম আলাপ হয় অভিষেকের।
– মালবিকা রাইট। হাই! আমি অভিষেক
– হাই! কিন্তু তোমাকে তো ঠিক-
– চিনলে না তো। বিগত দু বছর সেরা কবির মুকুটটা আমার মাথায়ই ছিল।
জীবনে কারোর কাছে হারিনি। আজ প্রথম তোমার কাছে হারলাম। এত দিন জানতাম আমিই সেরা। আজ মনে যোগ্য বিপক্ষ পাওয়া গেছে। এবার থেকে লড়াইটা ভালই জমবে। সাথে বন্ধুত্বও। অবশ্য তোমার যদি আপত্তি না থাকে।
– এমা, ছি ছি! আপত্তি থাকবে কেন? বরং যোগ্য বিপক্ষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে বড়ই বাধিত হলাম।

সেই প্রথম আলাপ। এরপর ধীরে ধীরে গাঢ় হতে থাকে সম্পর্ক। মালবিকা বুঝতে পারে, কি এক আমোঘ আকর্ষণে ও ক্রমশ এগিয়ে চলেছে অভিষেকের দিকে। জীবনে এরকমটা প্রথমই। এমন নয় যে মালবিকার বয়ফ্রেন্ড নেই। সুভাশিষ, রূপক, পুপু, ববি, অর্পণ, ঋজু, কৌস্তব- বলতে গেলে একটা লম্বা লিস্ট পড়ে যাবে। কোন দিনও ওদের বন্ধু ছাড়া ক্ষণিকের জন্যও মালবিকার কিছু মনে হয়নি। কোন দিনই কারোর কথা ভেবে রাতে ঘুম আসেনি- এমন হয়নি। কোন দিনও মনে হয়নি পূর্ণিমার রাত জাগা চাঁদটা এত রোম্যান্টিক হতে পারে। এখন কিন্তু অন্ধকার ঘরে রাঘবের ‘চাঁদ কেন আসে না’ গানটা শুনলে মালবিকার গায়ে কাঁটা দেয়। আগে এমনটা হত না। আগে ভাই দুটো কথা শোনালে ও চারটে কথা শোনাত, এখন মনে হয়- থাকনা, অবুঝ তো। চুলবুলি মালবিকা আজ হঠাৎই কেমন ধীর, স্থির।

একদিন তো ক্যান্টিনের বুড়োদা বলেই বসল ‘মালবিকা, তুই কেমন পালটে গেছিস। কি হয়েছে তোর?’ ওমনি ওপাশ থেকে সুভাশিষ বলে উঠ লো ‘রাধার কি হইল অন্তরে ব্যথা। বসিয়া বিরলে, থাকায় একলে, না শুনে কাহারো কথা।’ অভিষেকদা কিন্তু বলেছিল ‘সখী, ভালবাসা কারে কয়? সে কি কেবলি যাতনা ময়।’

মালবিকার আজো মনে পড়ে সেদিনের সব কথা। সে দিনটা ছিল মঙ্গলবার। মালবিকা তার এক গুচ্ছ বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ক্যাম্পাসে বসে বিন্দাস আড্ডা মারছে। হঠাৎই ওর চোখ পড়ে মাঠের অন্য প্রান্তে দাঁড়িয়ে অভিষেকদা। অপলকভাবে ওরই দিকে তাকিয়ে আছে। চোখাচুখি হতেই অভিষেকদা এমন ভান করেছিল- কবি কবি ভাব, ছন্দের অভাব। যেন অভিষেকদা শেষ বিকেলের পড়ন্ত সূর্যকেই দেখছিল।

মালবিকা বরাবরই অনার্স ক্লাসে সেকেন্ড বেঞ্চের ধারে বসত। একদিন ক্লাসে গিয়ে দেখি ওর বসার জায়গায় একটা ভাঁজ করা কাগজ বেশ পরিপাটি করে রাখা আছে। কৌতুহল বশতই ও কাগজটা খুলি। তাতে লেখা ছিল, “পড়ন্ত বিকালে কলেজে ক্যাম্পাসে আমার বিপাশা নদী। তাতে চিক চিক করছে শেষ বিকেলের লাল আভা। আমি ভালবাসি আমার বিপাশা নদীকে।” বড় অদ্ভূত চিঠি। হাতের লেখাটাও চেনা চেনা লাগে। তবু কার, সেটা তখন মনে করতে পারেনি মালবিকা। এর দু-সপ্তাহ পরেই এসে পড়ে মালবিকার ১৯ বছরের জন্মদিন। সকালে ঘুম থেকে উঠে সবে দাঁত মাজছিল। হঠাৎ দরজায় কলিং বেল। যথারীতি মালবিকাই দরজাটা খোলে। কিন্তু একি! কেউ কোথাও নেই। শুধু দরজার গোড়ায় রাখা লাল গোলাপের বড় একটা তোড়া। তাতে লেখা ‘জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়ে বিপাশা নদীকে।’ মালবিকা ভেবেছিল এ নিশ্চই তার বিচ্ছু বন্ধুদের কীর্তি। কিন্তু ‘বিপাশা নদী’ নামটাই ভাবনায় বাঁধ সেধেছিল। হঠাৎ মালবিকার মনে পড়ে যায় সেই অদ্ভূত চিঠিটার কথা। সেখানেও তো এই নামটাই লেখাছিল। হাতের লেখাও একই। মালবিকা এক দৌড়ে ওর ঘরে গিয়ে ড্রয়ার খুলে অভিষেকদার New Year-এ দেওয়া কার্ডটা বের করে। হুবহু এক হাতের লেখা। মালবিকার কাছে সব কিছুই জলের মত পরিষ্কার হয়ে যায়। হিসেব ও দুই-এ দুই-এ মিলে চার।

মালবিকার মনে প্রাণে সেদিন এক অদ্ভূত পুলক। মনে মনে ভেবেছিল ‘এটাই বোধয় পূর্বরাগ। ক্লাস ইলেভেনে সাহিত্যের ইতিহাসে পড়েছিলাম।’ আজও এসব কথা মনে করে মালবিকার ভিতরটা গুমড়ে উঠেছে। গলার কাছে দলাপাকানো বদ্ধ কান্নাটা আজ সমস্ত অবগুন্ঠন সারিয়ে তীব্র বেগে ফেটে পড়তে চাইছে। চোখ থেকে গড়িয়ে আসা এক ফোটা জল টুক করে মালবিকার ডান হাতের উপর পড়ল। আবার ও মনে পড়ে গেল মালবিকার।

একদিন মালবিকাকে অবাক করে দিয়ে অভিষেকদা ওদের বাড়িতে চলে এসেছিল। তখন মালবিকা বাড়ি ছিল না, পড়তে গেছিল। অবশ্য তাতে অভিষেকদার কোন অসুবিধাই হচ্ছিল না। কারণ অভিষেকদা তখন ওর মায়ের সাথেই গল্পে মশগুল ছিল। শনিবার হওয়ার দরুণ মা তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরেছিল, তাই রক্ষে। মালবিকা বাড়ি ফিরে হতবাক! দরজা খুলেই মা বলে, ‘দেখ মলি কে এসেছে?’
– কে?
– অভিষেক দা।
মা যথারীতি রান্নাঘরে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। সেই ফাঁকে মালবিকা আর অভিষেকদা ওদের দোতলার বারান্দায়। একথা সে কথায় সময় বয়ে যেতে থাকে। মালবিকা বুঝতে পারে বই ফেরত দেওয়ার ছুতোয় অভিষেকদা আজ ওদের বাড়ি আসলেও উদ্দেশ্য অন্য। বার বারই অভিষেকদা কিছু একটা বলতে চাইছে। কিন্তু কথার স্রোত বার বারই মেন লাইন ছেড়ে কোন লাইনে বেঁকে যাচ্ছে। অবশেষে হঠাৎই মালবিকার ডান হাতটা খপ করে ওর হাতের মধ্যে নিয়ে বলে ফেলে ‘বিপাশা নদী, তুই কি কিছুই বুঝিস না?’

মালবিকা তখন অপ্রত্যাশিত আক্রমনে এক্কেবারে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। অভিষেকদাও সেই ফাঁকে ফুড়ুৎ।

সেই দিন ঠিক রাত বারোটার সময় মালবিকার মোবাইলটা বেজে ওঠে। হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসা কন্ঠস্বর বলে, ‘বিপাশা নদীর উত্তরটা কি শোনা হল না।’
– কাপুরুষের মত পালিয়ে গেলে আর উত্তর পাবে কেমন করে।
– বারে, কাকিমা এসে পরেছিল না!
উত্তরে মালবিকা খিল খিল করে হেসেছিল।

এরপর কয়েকটা মাস যে কোথা দিয়ে কেটে গেল, বুঝতেই পারল না মালবিকা। পানসি মেঘে ভর করে কেতে যাওয়া সকাল, দুপুর, বিকেলগুলো কত রোম্যান্টিক লাগত। প্রতিটি দিনকে নতুন বলে মনে হত ওর। মালবিকার মা বাবারো অভিষেককে খুব পছন্দ হয়েছিল। ফলে মালবিকার প্রেমের তরী শান্ত সমুদ্রে তর তর করে এগিয়ে চলছিল।

কিন্তু এত সুখ মালবিকার কপালে বেশী দিন সইল না। অভিষেকদা বি.এ. পাশ করে পুনেতে পড়াশোনা করতে চলে গেল। কথা ছিল পুনেতে গিয়ে অভিষেকদা মালবিকাকে ওরটঠিকানা, ফোন নাম্বার, সব জানাবে। মালবিকাও অনেক স্বপ্ন নিয়ে অভিষেকদাকে বিদায় জানিয়েছিল। যদিও অভিষেকদাকে কাছ ছাড়া করতে ওর বুকটা দুমড়ে যাচ্ছিল, তবুও ভাবি সুখের তাগিদে নিজেকে সামলে নিয়েছিল। বিরহী প্রিয়ার মত অভিষেকদার একটা ফোনের জন্য একের পর এক দিন গুনে চলেছে মালবিকা। কিন্তু না, অভিষেকদার ফোন আর কোনোদিনও আসেনি। মালবিকা কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিল না যে ও অভিষেকদার জীবন থেকে চিরদিনের মত গারিয়ে গেছে। কেন অভিষেকদা ওর সাথে এমন করল, তার উত্তর মালবিকা আজও পায়নি।

মালবিকা অনেক চেষ্টা করেছিল অভিষেকদা সাথে যোগাযোগ করবার। ও অভিষেকদার এক নিকট বন্ধুর কাছ থেকে জানতে পেরেছিল অভিষেকদার পরিবার বাড়ি বিক্রী করে পুনেতে চলে গেছে। কিন্তু কারোর কাছেই অভিষেকদার ফোন নাম্বার বা ঠিকানা পায় না।

উত্তরে হাওয়ার ঝাপটায় মালবিকার ঘোর কাটে। ঘড়িতে দেখে পাঁচটা বেজে গেছে। পার্কটা ক্রমশ নীরব আধারের চাদর মুড়ি দিচ্ছে। পার্কের এক দিকে ঘর মুখি কচি কাচাদের ব্যস্ত কোলাহল, অন্যদিকে গাছের তলায় দু-একটা কপোত-কপোতীর জুটি। মালবিকা উঠে পড়ে। পার্ক ছেড়ে সোজা রাস্তা ধরে বাসস্ট্যান্ড। কিছুক্ষণ দাঁড়াবার পরই বাসটা এসে পড়ে। সৌভাগ্যবসত জানলার পাশে একটা জায়গাও পেয়ে যায়।

মালবিকা কিন্তু এখনও ভাবে যে কোনদিন অভিষেকদার একটা ফোন আসলেও আসতে পারে। রোজই, রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে ভাবে, কাল হয়তো ফোন আসতে পারে। বলে না, বৃথা আশা মরিতে মরিতেও মরে না। মালবিকার অবস্থাও একে বারেই তাই।

মালবিকার কলেজ লাইফটা নিরলঙ্কার। নীরস গতিতে চলছিল। দেখতে দেখতে পার্ট-টু এর গন্ডিটাও পেরিয়ে গেল। কলেজের কান্নাভেজা ফেয়ারওয়েল পর্বটা মালবিকাকে বার বার নস্টালজিক করে তুলেছিল। সেই দিন সকালে শাড়ি পড়তে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মালবিকা তৈরি হচ্ছিল। সাজগোজ কমপ্লিট। তবু ওর মনে হচ্ছিল কোথায় একটা কমতি রয়েই যাচ্ছে। টঠাৎ মালবিকার খেয়াল হল, ঠিক এই শাড়িটাই ও অভিষেকদার ফেয়ারওয়েল পার্টিতে পরেছিল। লাল ইক্কত। অভিষেকদা সেদিন ওর পাওনা লাল গোলাপটা মালবিকার খোঁপায় লাগিয়ে দিয়ে বলেছিল, ‘বন্যেরা যেমন বনে সুন্দর তেমনি এই লাল গোলাপ তোর ঐ নিকষ কালো খোঁপায়।’

আজও ঠিক এই লাল গোলাপটারই কমতি রয়ে গেছে। বাদ-বাকি সব কিছুই ঠিকঠাক, তুবুও সবটাই বড় মলিন।

এই কমতিটাই মালবিকাকে সর্বদা তাড়া করে বেড়ায়। অনেক চেষ্টা করেছিল নিজেকে খাপ খাওয়ানোর, কিন্তু ঐ যে, খাপছাড়া কমতিটি, কিছুতেই হাত ছাড়ল না।

দেখতে দেখতে আটটা বছর পেরিয়ে গেল। এর মাঝে কার কি হল? কে কোথায় গেল? -কোন খবরই জানতে পারলাম না। হঠাৎ একদিন দমদম মেট্রো স্টেশনে মালবিকার সাথে দেখা। শাড়ি পড়ে একদম গিন্নী-গিন্নী হাবভাব। আমাকে দেখে তো প্রচণ্ড উৎফুল্ল। এত বছর বাদে দেখা, তাই কথা যেন ফুরাতেই চাইছিল না। এক প্রকার জোর করেই নিয়ে গেল ওর বাড়িতে। অবশ্য আমারো সুপ্ত ইচ্ছা ছিল চুলবুলি মালবিকার সংসার দেখার, ওর গিন্নীপণা পরখ করার। দরজায় বেল দিতে একটা ছোট্ট মিষ্টি মেয়ে দরজা খুলে মাথা বাড়াল আয়েষণা, মালবিকার মেয়ে। একদম মালবিকার মত চুলবুলি। রাস্তায় ওর জন্য একটা পার্ক কিনেছিলাম। দিতেই মিষ্টি করে ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ বলল। সাথে আমার গালে একটা ছোট্ট হামি- আমার উপহার। দু কামরার ছোট্ট ফ্ল্যাট, তাতে ছোট্ট সংসার মালবিকার। ও আর আয়েষণা।

কেমন খাপছাড়া, তাই না! এখানেও সেই কমতি।

মালবিকা কলেজের প্রফেসার। আয়েষণা একজন অনাথ। চ্যারিটি অফ হোম থেকে আয়েষণাকে দত্তক নেয়। আর তারপর, আয়েষণা, মালবিকার সবচেয়ে কাছের বন্ধু। আয়েষণাকে ঘিরেই মালবিকার স্বপ্ন, স্বাদ- আবার স্বপ্ন পূরণ।

আমাদের স্বার্থপর, নিষ্ঠুর, মুখোশধারী পুরুষতান্ত্রিক সমাজকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মালবিকার ছোট্ট ফ্ল্যাটে একটা নতুন পৃথিবী, একটা নতুন সমাজ, যেখানে পুরুষের কোন অধিকার নেই- একটা নারীতান্ত্রিক সংসার।
শনিবারের চিঠি/ আটলান্টা/ মার্চ ০৫, ২০১৬

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১২:৪৮ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০৫ মার্চ ২০১৬

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com