শিশু জিহাদ মরিয়াই প্রমাণ করিল যে, সে পাইপের ভিতরেই ছিল

মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০১৪

শিশু জিহাদ মরিয়াই প্রমাণ করিল যে, সে পাইপের ভিতরেই ছিল

 

সাজ্জাদুর রহমান  পলিন


 

 

Opinoinগত শুক্রবার রাজধানীর শাহজাহানপুর রেলওয়ে কলোনীর বালু মাঠের পাশে খেলতে গিয়ে পানির পাম্পের পরিত্যাক্ত একটি গভীর কূপের ভেতরে পড়ে যায় সাড়ে তিন বছরের শিশু জিহাদ। খবর পেয়ে তার আত্মীয়-স্বজন, এলাকাবাসীর সঙ্গে ছুটে আসে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ, র‍্যাবসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কর্মী ও কর্তাব্যক্তিরা। পাশাপাশি ছুটে আসে গণমাধ্যম কর্মীরাও। শুরু হয় জিহাদকে উদ্ধারের অভিযান। ‘প্রশিক্ষিত’ ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা নানা পদ্ধতি ব্যবহার করতে থাকে। কয়েকটি টিভি চ্যানেল সরাসরি সম্প্রচার করতে থাকে জিহাদকে উদ্ধারের অভিযান। সারাদেশে সৃষ্টি হয় গভীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। শঙ্কিত হন সবাই শিশুটির পরিণতির কথা চিন্তা করে। টিভি চ্যানেলের সরাসরি সম্প্রচারের কল্যাণে প্রতিটি মুহূর্তের ঘটনা সবাই জেনে যেতে থাকেন। হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয় ঘটনাস্থলে।

ফায়ার সার্ভিস সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক স্বয়ং উপস্থিত থেকে উদ্ধার অভিযান তদারক করতে থাকেন। উপস্থিত হন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীও। মাঝে মাঝে টিভি চ্যানেলে তাদের বক্তব্য-মন্তব্য প্রচারিত হতে থাকে। উদ্ধারকারী দলের পক্ষ থেকে একবার বলা হলো- পাইপের গভীরে শিশুটি বেঁচে আছে। তাকে জুস ও খাবার পাঠানো হয়েছে এবং সে তা গ্রহণ করেছে। সবাই এ তথ্য জেনে আশান্বিত হলেন। গভীর কুপটির মধ্য থেকে একের পর এক পাইপ তুলে আনা হলো। কিন্তু শিশু জিহাদকে তুলে আনা গেল না। এক পর্যায়ে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীসহ পদস্থ ব্যক্তিরা এ সন্দেহও পোষণ করলেন যে, জিহাদ আদৌ কূপের মধ্যে পড়েছে কী না। প্রায় ২৩ ঘন্টা পর ফায়ার সার্ভিসের কর্তারা ঘোষণা করলেন যে, পাইপের মধ্যে কোনো শিশু নেই, প্রাণের অস্তিত্বও নেই। তারা উদ্ধার অভিযান স্থগিত ঘোষণা করলেন। হতাশায় ভেঙ্গে পড়ে সবাই। কেউ কেউ সন্দেহ পোষণ করতে শুরু করেন যে, বিশেষ কোনো উদ্দেশ্যে হয়তো একটা ‘নাটক’ সৃষ্টি করা হয়েছে। জনমনে যখন নানা জল্পনা-কল্পনা ডালপালা মেলছিল, তখনই সবাইকে বিস্মিত করে কয়েকজন স্বেচ্ছাসেবী যুবক নিজেদের উদ্ভারিত পদ্ধতি ব্যবহার করে ওই পাইপের ২৩৫ ফুট নীচ থেকে তুলে আনে অচেতন জিহাদকে। এ ঘটনা ঘটে ফায়ার সার্ভিস কর্তৃক উদ্ধার অভিযান স্থগিত ঘোষণার মাত্র ১৩ মিনিটের মাথায়।

জিহাদকে টেনে তোলা হয়েছে-এ খবরে উপস্থিত জনতা উল্লসিত হয়ে উঠে। কিন্তু মুহূর্তেই সবার মুখে নেমে আসে বিষাদের ছায়া। কারণ জিহাদ তখন আর নেই। চলে গেছে না ফেরার দেশে। জিহাদকে নেয়া হল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে গঠিত মেডিক্যাল বোর্ড জিহাদকে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর মৃত ঘোষণা করে।

জিহাদের কূপে পড়ে যাওয়া থেকে শুরু করে উদ্ধার হওয়া পর্যন্ত পুরো ঘটনা পর্যালোচনা করলে সরকারি সংস্থা সমূহের ব্যর্থতাই সবার আগে ধরা পড়বে। প্রথমত এমন একটি ‘মৃত্যুকূপ’ কিভাবে দিনের পর দিন খোলা অবস্থা থাকলো এটা একটা বড়ো প্রশ্ন। যদিও জিহাদ তাতে পড়ে যাবার পর রেলওয়ের একজন সিনিয়র এ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ারকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে এবং একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে ‘কালো তালিকাভুক্ত’ করা হয়েছে। তবে অনেকেই এটাকে বলছেন ‘ইনস্ট্যান্ট আই ওয়াশ’। ওই প্রকৌশলীর সাময়িক বরখাস্ত আদেশ এক সময় প্রত্যাহার হবে এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটিও কালো থেকে সাদা তালিকায় চলে আসবে। কীভাবে কোন প্রক্রিয়ায় আসবে সেটা ব্যাখ্যা করে বলার দরকার পড়ে না।

এখন যে প্রশ্নটি বড়ো হয়ে দেখা দিয়েছে তাহলো-সরকারি উদ্ধারকারি দলটি কোন তথ্যের ভিত্তিতে বলে দিয়েছিল যে, পাইপের মধ্যে জিহাদ কেন, কোনো শিশুরই অস্তিত্ব নেই? যদি এটাই সত্যি হতো, তাহলে প্রথম দিকে কেন তারা বলেছিল পাইপে খাবার পাঠানো হয়েছে এবং শিশুটি তা গ্রহণ করেছে? এই যে পরস্পর বিরোধী তথ্য, এ থেকেই পরিষ্কার হয়ে যায় যে, শিশু জিহাদের পাইপে পড়ে যাবার ঘটনাকে ধামাচাপা দেয়ার একটা অপকৌশল তারা করেছিল। কিন্তু উদ্বিগ্ন জনতা ও মিডিয়ার সরব ও সর্তক উপস্থিতির কারণে সেটা সম্ভব হয়নি। সরকারি সংস্থার উদ্ধার অভিযান স্থগিত ঘোষণার পরপরই যদি স্বেচ্ছাসেবী যুবকরা জিহাদের লাশ তুলে না আনত, তাহলে ‘আরেকটি দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কার’ কথা বলে কর্তৃপক্ষ হয়তো পাইপের মুখটি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দিত। আর সেটা করতে পারলেই ‘জিহাদ ট্র্যাজেডি’ চাপা দেয়া সম্ভব হতো নানা রকম কল্প-কাহিনীর সু্তপের নিচে।

কিন্তু উদ্যমী ও উদ্যোগী যুবকদের আন্তরিক চেষ্টা সরকারি সংস্থার সে অপচেষ্টার গুড়ে বালি ছিটিয়ে দিয়েছে। সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, প্রায় সাড়ে ছয়শ’ ফুট গভীর পাইপের নিচ পড়ে গেছে জিহাদ। তারপর বলা হলো ২৮০ ফুট নীচে আছে। তারা সিসি ক্যামেরা ঢোকালো পাইপের ভেতর। তাতে টিকটিকি আর আরশোলার ছবি ছাড়া অন্য কিছুই দেখতে পায়নি সংস্থাটির ‘দায়িত্বশীল’ ও কর্তব্যরত কর্মকর্তারা। অথচ যুবকরা ২৩৫ ফুট গভীর থেকেই জিহাদকে তুলে নিয়ে এলো সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে। সবাই বলছেন যে, ওই সংস্থা যদি অযথা সময় নষ্ট না করে বশিরউদ্দিনকে কূপে নামতে দিত, তাহলে হয়তো জিহাদকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হতো। কিন্তু সরকারি সংস্থার কর্তাব্যক্তিরা তাতে বাঁধ সেধেছেন।

এদিকে জিহাদের বাবা শনিবার অনির্ধারিত এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ওইদিন প্রশাসনের উদ্ধার তৎপরতার ব্যর্থতা ঢাকতে এক পর্যায়ে তাকে থানায় ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে নানা রকম হয়রানিমূলক প্রশ্ন করা হয় এবং এক পর্যায়ে র‌্যাবের হাতে তুলে দিয়ে ক্রস ফায়ারে দেয়ার হুমকিও দেয়া হয়। এ ব্যাপারে ডিএমপির মতিঝিল জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার আনোয়ার হোসেন শনিবার রাতে একটি দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিককে বলেন, ‘পুলিশ এত নিষ্ঠুর হয়ে যায় নি যে, যার সন্তান হারিয়ে গেছে তাকে ধরে নিয়ে এসে নির্যাতন করবে বা ক্রস ফায়ারের ভয় দেখাবে। পুলিশ সব সময় সত্য উদঘাটনের চেষ্টা করেছে। জিহাদের বাবা ও অন্য চারজন প্রত্যক্ষদর্শীকে থানায় নিয়ে এসে সম্মানের সঙ্গে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং পুলিশ নিশ্চিত হয় যে, জিহাদ ওই পাইপের মধ্যে পড়ে গিয়েছে।’ বর্তমানে পুলিশের কাছে নাগরিকদের সম্মান কতোটা আছে বা তারা মানুষের সঙ্গে কতোটা ্‌ভালো ব্যবহার করেন তা ভুক্তভোগীরা তো বটেই অন্যেরাও ভালো করেই জানেন। ফলে জিহাদের বাবা যে অভিযোগ করেছেন তার সত্যতা নিয়ে কারো সন্দেহ আছে বলে মনে হয় না।

এদিকে রবিবার পোষ্টমর্টেম রিপোর্টে বলা হয়েছে, মাথায় আঘাত এবং পানিতে ডুবে জিহাদের মৃত্যু হয়েছে। জিহাদের এ মর্মান্তিক মৃত্যু স্বাভাবিক কোনো মৃত্যু নয়। এটাকে যদি কেউ হত্যাকান্ড বলেন, তাও অযৌক্তিক হবে না। কেননা, পরিত্যাক্ত কূপের মুখ বন্ধ না করে কর্তৃপক্ষ ওখানে যেন মৃত্যু ফাঁদই পেতে রেখেছিল। এ মৃত্যুর দায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এড়াতে পারবে না।

জিহাদের বাবা বলেছেন, তার ছেলেকে জীবিত উদ্ধারে যারা গাফলতি করেছে তাদের বিরুদ্ধে তিনি মামলা করবেন। শুধু একটি নয়, আরো মামলা হওয়া দরকার। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধেও মামলা হওয়া দরকার। সরকারের বিরুদ্ধে তিনি ইচ্ছে করলে ক্ষতিপূরণের মামলাও করতে পারেন।

সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো-সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো ভাষ্য এখনো পর্যন্ত পাওয়া গেল না। রেলওয়ে কলোনীতে ঘটনাটি ঘটলেও রেলমন্ত্রী একটি শব্দও উচ্চারণ করেন নি। তিনি না হয় নববধুকে নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু রেল কর্তৃপক্ষের অন্যসব কোথায়?

নিষ্পাপ শিশু জিহাদ মরে গিয়ে কিছু প্রশ্নের জন্ম দিয়ে গেল। সরকারি সংস্থার অবহেলা, অদক্ষতা আর খামখেয়ালীপনার বিষয়ে উত্থাপিত সেসব প্রশ্নের জবাব দেবে কে ?

 

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১০:৩৭ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর ২০১৪

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com