ধারাবাহিক উপন্যাস

রূপসার রূপসী / ৫

পঞ্চম পর্ব

শনিবার, ২০ জুন ২০২০

রূপসার রূপসী / ৫
অলংকরণঃ মামুন হোসাইন

Litearture 02বিকেল থেকে রাজুর শরীরটা ভাল যাচ্ছে না।জ্বর বা সর্দি কাশি কিছুই নয়। তবুও কেন যেন ভাল যাচেছ না। মাথাটা কেমন যেন ভার ভার। রাতে বিছানায়  যাবার পূর্বে দু’টো প্যারাসিটামল খেয়ে শুয়ে পড়ল। সতীর্থ রুম মেটরা যে যার ক্লাসে যাবার প্রস্ততি নিলে ও রাজু  তখনও  বিছান ছেড়ে না  উঠেই সেখানে গড়াগড়ি যাচ্ছে। শরীরের ম্যজ ম্যাজ ভাবটা তখনও কাটেনি। রুমমেট সেলিম এসে জিজ্ঞেস করল, তুই যে এখনও উঠছিস না ক্লাশে যাবি না ?
না, শরীরটা ভাল লাগছে না। তোরা যা। আমি আজ  যাব না।
লায়লাকে ডেকে দেই ? কোমল হাতের পরশ ছোঁয়ায় নাসিং সেবা দিলে ভাল লাগবে ।
তোর সব সময় ফাজলামি।
আরে ফাজলামি না , ফাজলামি না । মাইরি বলছি।
তুই গেলি !
আরে বাবা যাচ্ছি তো। দেখছিস না ক্লাশ বসার মাত্র দশ মিনিট বাকি । আমি বেরিয়ে গেলে লুকিয়ে লুকিয়ে গার্ল ফ্রেন্ডের ছবি দেখবে তাই না?
হ্যাঁ দেখবো তো । তাতে তোর কোন অসুবিধা আছে ?
ঠিক আছে দেখ। ক্লাশ ফাঁকি দিয়ে শুধু সারাদিন ধরে তার ছবিই দেখ বলে সেলিম তাড়াতাড়ি প্যান্ট শার্ট গলিয়ে বেরিয়ে গেল।
সেলিম বেরিয়ে গেলে রাজু মনে মনে ভাবল লায়লাকে তাহলে সত্যি সত্যিই একটা কল দিবে নাকি ?  টেবিলের উপর রাখা মোবাইল ফোনটার দিকে বার বার দৃষ্টি যাচ্ছে। আর ভাবছে করবে কি করবে না ? পাশে থাকলে নিশ্চয় ভাল লাগত। পরক্ষণে আবার ভাবল নিশ্চয় সে ক্লাশে  না, এ সময় মোবাইল করা ঠিক হবে না
এমন সময় বাইরে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ। রাজু একটু অপ্রস্তত হলো। সে ডাক ছাড়ল , হুইস দেয়ার ?
সেখান থেকে আওয়াজ  এলো , পোষ্টম্যান।
ও, পত্রবাহক ভাই ?
আসেন, আসেন ।
কার জন্যে কি পত্র নিয়ে এসেছেন ? সুখের না দুঃখের ?
সুখের না দুঃখের জানি না। ধবে এ রুমে আব্দুর রাজ্জাক বলে  কেউ আছেন ? তার নামে ইউএস এ্যামবাসি থেকে একটা রেজিস্টারি চিঠি এসেছে বলল, পোষ্টম্যান।
পোষ্টম্যানের মুখে নিজের নামটা শুনেই আতঁকে উঠল রাজু।
কী ? বলেন কি ? আমিই তো আব্দুর রাজ্জাক। আসেন আসেন।
রাজু এক লাফে বিছানার উপর উঠে বসে পড়ল।
প্রাপ্তি স্বীকার  পত্রে স্বাক্ষর পোস্টম্যান নিয়ে বেড়িয়ে গেলেন।
কয়েক মাস আগে সাহেব বাজারের এক সাইবার ক্যাফে থেকে অনলাইনে আমেরিকায় ডাইভারসিটি ভিসা লটারীর ফরম ফিলাপ করে পাঠায়েছিল। এটা তারই ফলাফল। নিজের কাছে নিজেই প্রশ্ন রাখল, তা হলে সে ডিভি লটারী বিজয়ী ? আমেরিকা যাবার সূবর্ণ সুযোগ এখন তার হাতের মুঠোয়।মন তার স্বপনের সোনার হরিণে সওয়ার হয়ে হেলে দুলে উঠল। আনন্দে খাট থেকে লাফ দিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠল।সে চিৎকার প্রতিধ্বনি হয়ে আবার তার কাছেই ফিরে এলো। এ সময়ে রুমে কেহ নেই সবাই ক্লাশে  গিয়েছে। আনন্দের সংবাদটা কারো সাথে শেয়ার না করলে নয়। সংবাদটা জানাতে যার কথা প্রথম মনে পড়ল সে হলো লায়লা। ঠিক এ মূহুর্তে ক্লাশে আছে। এ সময়ে তাকে মোবাইল করা ঠিক হবে না। আনন্দের সংবাদটা আনন্দের মূহুর্তে না জানাতে পেরে  নিজেকে তা হজম করতে হলো। তার মাথা ধরা, জ্বর সর্দি তাকে ছেড়ে পালিয়েছে। নতুন পোকা মাথায়  ঢুকেছে ডিভি । ডিভি  বিজয়ের খবরটি  মগজে বিষ মাখাবে যতক্ষণ না পর্যন্ত লায়লার  সাথে শেয়ার করতে পারবে।
হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে  কেবল সকাল এগারটা। আজকে লায়লার ক্লাশ শেষ হবে তিনটায় । পাক্কা চার ঘন্টা তাকে অপেক্ষা করতে হবে লায়লার সাথে  কথা বলতে। চারঘন্টা নয় যেন চারটা যুগ।সময় যেন আর কাটছে না রাজুর।
ক্লাশ শেষে ডিপার্টমেন্ট থেকে পা বাড়াতেই লায়লার মোবাইল বেজে উঠল। সে মোবাইল রিসিভ করল।
হ্যালো কে রাজু ভাই ?
হ্যাঁ আমি রাজু।
কি খবর ?
না  খবর তেমন কিছু না। আমার শরীরটা বেশী ভাল যাচ্ছে না। আজকে ক্লাশেও যাইনি। বিকালে ভার্সিটির বাগান বাড়িতে একবার আসবে ? তোমার সাথে কথা আছে।
আচ্ছা।
বসন্তের পড়ন্ত বিকেল । সূর্যটা কেবল পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। বাগান বাড়ির পাতা বাহারী দেবদারু আর সিরিস গাছের ফাঁক ফোঁকর দিয়ে সূর্যের মিষ্টি আলো তখনও বিকিরণ ছড়াচ্ছে গাছপালা লতা পাতার উপর। ভার্সিটির বাগান বাড়ির প্রতিটি গাছের গোড়ায় কপোত-কপোতি , বন্ধু-বান্ধবীর কল কাকলীতে পরিপূর্ণ ।রাজুও আগে ভাগে গিয়ে একটা আম গাছের গোড়া  দখল করে বসেছে।এক একটা মিনিট যেন তার কাছে এক একটা ঘন্টা মনে হচ্ছে। রাজুর আর তর সইছে না। হঠাৎ দেখা গেল মন্নুজান হলের ঐ প্রান্ত থেকে  লালটুকটুকে শালওয়ার কামিজের পড়ে সোনালী কাজ করা দোপাট্টা উড়িয়ে উড়িয়ে লায়লা ধীর গতিতে বাগানের দিকে আসছে। রাজু আজ তন্ময় হয়ে তাকিয়ে আছে সেদিকে। একি লায়লা ? নাকি স্বর্গের উবর্শী। এমন অপরূপ রূপে তাকে আর কোনদিন যেন দেখেনি। লায়লা কাছে আসতেই রাজু যেন তার বাকশক্তি হারিয়ে ফেলেছে।  তখনও সে অবাক চোখে তাকিয়ে ভাবটা এমন সে যেন লায়লাকে আর কখনও দেখেনি  এই-ই প্রথম তার দর্শন। অমন করে তাকিয়ে থাকতে দেখে লায়লা লজ্জা পেল। সে জিজ্ঞেস করল , অমন করে কি দেখছেন রাজু ভাই ?
না,কই ? তেমন কিছু না। রাজু জবাব দিল।
কেন আসতে বলেছেন?
তোমার সাথে কথা আছে । এখানে নয়। চলো, আমরা হাঁটতে হাঁটতে  বলি।
রাজু তার আসন ছেড়ে হাঁটতে লাগল। লায়লাও তাকে অনুসরন করল।বাগানবাড়ি ছেড়ে রাজু ও লায়লা প্যারিস রোড ধরে সোজা জুবেরী ভবনের দিকে হাঁটতে লাগল। ডঃ ইৎরাত হোসাইন জুবেরী ছিলেন রাজশাহী  বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম উপাচার্য। রাজু ও লায়লা হাঁটতে হাঁটতে জুবেরী ভবনের পিছনে  সানবাঁধানো  পুকুর ঘাটে এসে বসল।  পুকুরে একঝাঁক দেশি হাঁস সাঁতার কাটছিল।সম্ভবত পুকুরে কোন এক জলজ প্রাণী দেখে একটি হাঁসি প্যাক প্যাক করে  দ্রুত সাঁতার কেটে ডাঙ্গায় গিয়ে  উঠল। সঙ্গে সঙ্গে তার সাথী হাঁসাটি ও হ্যাঁস হ্যাঁস  রবে তাকে অনুসরণ করল। রাজু  ও লায়লা অবাক  দৃষ্টিতে  সে দৃশ্য দেখছিল । লায়লার ডাকে রাজু ফিরে তাকালো । সে বলে উঠল , দেখছেন রাজু ভাই, হাঁস দু’টোর মধ্যে কি মহব্বত !  হাঁসিটা কি যেন দেখে ভয় পেয়ে ডাঙ্গায় গিয়ে উঠল আর সঙ্গে সে তার সাথী হাঁসটাও তাকে অনুসরণ করল।
হ্যাঁ, তা ইতো দেখলা। পরের মহব্বতের কথা কি বলব আমি  নিজেই কোন এক অদৃশ্য মহব্বতে  জড়িয়ে পড়েছি যা ঐ হাঁসের পাখনার মত আমার অন্তরেও দাপাদাপি করছে।
এ তুমি কি বলছ রাজু …… ।
কথাটি  সম্পন্ন না করেই  লায়লা লজ্জা পেয়ে অন্যদিকে মুখ লুকালো।
লায়লার মুখে এমন আপনি থেকে হঠাৎ তুমি শব্দ বেরিয়ে আসায় রাজুও হতভম্ব  হয়ে  গেল। উভয়ে কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। কারো মুখ থেকে  কোন কথা বের হল না। স্তব্ধতা ভেঙ্গে রাজুই প্রথম  কথা বলল, কি একেবারে থেমে গেলে যে ? কিছু বলো ।
কি বলব ? আপনিই তো ডেকে এনেছেন যা বলার আপনিই বলেন।
আবার আপনি কেন?
লায়লা লজ্জা পেল।
হ্যাঁ লায়লা । আজ তোমাকে যে কথ বলতে ডেকেছি ভেবেছিলাম ঠিক  এ সময়ে তোমাকে জানাব না । কিন্তু  সে কথা ধরে রাখতে পারলাম না। ডিভি বা ডাইভারসিটি প্রোগ্রাম নামে ইউএস গর্ভমেন্টের একটা প্রোগ্রাম ।  সেই প্রোগ্রামের মাধ্যমে  তারা  প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে সে দেশে জনবল নিয়ে থাকে। গত কয়েক মাস আগে সাহেব বাজারের এক সাইবার ক্যাফে থেকে সে প্রোগ্রামে একটা এ্যাপলিকেশান করেছিলাম। এ্যাপলিকেশানে আমি  বিজয়ী  হয়েছি বলে সকাল বেলায় পোস্টম্যানের ম্যানের আগমন এবং প্রত্যাবর্তনের ঘটনা সবিস্তারে লায়লার কাছে বর্ণনা করতে করতে রাজু প্যান্টের পকেটে রাখা ইউএস এ্যামবাসি থেকে পাওয়া  বিজয় বার্তার খামটি লায়লার দিকে তুলে ধরল। লায়লা খামটি  হাতে নিয়ে খুলে ফেলল। ধবধবে সাদা তিন ভাজকরা একটা চিঠি । সেখানে কম্পিটারাইজ কম্পোজে রাজুর নামটি ঝক ঝক করছে।
ইউ আর এ লাকি ম্যান মিস্টার রাজু বলে লায়লা রাজুকে জড়িয়ে ধরল।
হ্যাঁ । লাকিম্যান হলেও এই মূহুর্তে  আমাকে লাকি মনে হচ্ছে না । রাজু বলল।
কেন?
সেই কথা তো জানাতে তোমাকে ডেকেছি। মতিহারে প্রথম তোমায় যেদিন দেখেছি সেদিন থেকেই তোমার ঐ মায়াবি চোখে আমি বন্দি হয়ে আছি। ভেবেছিলাম এখন নয় ,সময় হলে একদিন জানাব। কিন্তু সেই একদিনের অপেক্ষায় আর আমাকে থাকতে দিল না। ডিভির ঐ চিঠিটা তোমাকে সেই কথাটি আগেভাগে বলতে বাধ্য করল। তোমার কাছে মুখ খুলতেই হলো। তোমাকে আমি ভালোবাসি ।
রাজুর কথা শুনে লায়লা লজ্জা পেলেও মুখে এক ফালি চাঁদের হাসি হেসে জিজ্ঞেস করল , সত্যি ।
সত্যি না তো মেকি নাকি ?
আমিও তথৈবচ ।
তার মানে ?
মানে হলো আমি যে  কখন তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি নিজেও টের পাইনি । আমি টের পা ওয়ার পুর্বেই তা মা টের পেয়েছে।
মা, তা ক্যামন ?
তুমি যেদিন মোবাইল  করে ভার্সিটি খোলার সংবাদ দিলে সে সংবাদটা  মাকে  জানাতেই তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন ,  ” রাজু কে ? আমি জানালাম,  ‘ আমাদের এক সিনিয়ার ভাই মনোবিজ্ঞান বিভাগে পড়ে। সোনাডাঙ্গায় তাদের বাসা। তোমাকে তো বলাই হয়নি সেদিন ভার্সিটি থেকে আমরা একই ট্রেনে এসেছি। খুব ভাল ছেলে, তোমার সাথে একদিন পরিচয় করিয়ে দেব। মা একটু থেমে বলল, দেখিস !
তাই নাকি ?
হ্যাঁ। মার সেই সতর্কবাণী শুনে আমিও যেন ক্যামন বেসতর্ক হয়ে গেলাম। বলতে বলতে সে রাজুর দিকে এগিয়ে বসল।
রাজু তার দুই হাত বাড়িয়ে লায়লাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে  ধরল।
বাহুবলয়ে আটকে লায়লা হারিয়ে গেল অন্য জগতে । লায়লার মুকখানি আলগে ধরে রক্তিম অধরে দু’টো ভালোবাসার চিহৃ এঁকে দিল রাজু এবং বলে উঠল আই লাভ ইউ লায়লা, আই লাভ ইউ। লায়লাও তার  প্রতিদানে রাজুকে দু’টো চুমু দিল। পরক্ষণে সে সম্বিত ফিরে পেয়ে বলে উঠল,  এই ছাড় কেউ দেখে ফেলবে তো ?  রাজুর বাহু বন্ধন থেকে  সটকে গিয়ে লায়লা বেঞ্চের কোনায় সড়ে বসল।
হয়ে গেল তো ?
রাজুর কথা শুনে লায়লা জিজ্ঞেস করল, কি হয়ে গেল ?
দু’জনের মনের অজানা কথা দু’জনের জানা হয়ে গেল ।
লায়লা ঠোঁটে মিষ্টি হাসি দিয়ে বলল, চলো হলে যাই ।
না, হলে নয় । চলো আমরা আজ বাইরে কোন রেস্টুরেন্টে  খাই । বলল, রাজু ।
খাবে ? লায়লা জিজ্ঞেস করল ।
কেন তোমার কোন আপত্তি আছে ?
সে একটু ভেবে বলল, না, আপত্তি নয় ।
তবে ?
ঠিক আছে  চলো । লায়লা উঠে দাঁড়াল।
রাজুও  উঠল ।
দু’জনে পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে  আবারও জুবেরী  ভবনের সামনে এসে দাঁড়াল ।
রাজু বলল, মতিহারে তো কোন ভাল রেস্টুরেন্টে  নেই। তাছাড়া এখানে কোন বন্ধু-বান্ধব হঠাৎ আমাদের এক সঙ্গে খেতে দেখলে প্রশ্ন তুলবে ।তার চেয়ে চলো আমরা সাহেব বাজার যাই।
লায়লা সম্মতি দিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে গিয়ে রাজু ও লায়লা সাহেব বাজারে যাবার উদ্দেশ্যে দু’জনে  একই রিকশায় চেপে বসল।

শনিবারের চিঠি / আটলান্টা/ জুন ২০, ২০২০


লেখকের অন্যান্য বই অনলাইনে কিনতে এখানে ক্লিক করুনঃ রকমারি ডট কম

পরবর্তি পর্বের জন্য চোখ রাখুন শনিবারের চিঠির সাহিত্য পাতায় ।  ষষ্ঠ পর্ব প্রকাশ হবে ২৭ জুন শনিবার।

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৫:০০ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ২০ জুন ২০২০

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com