মন্ত্রী বলেছেন আবেদন করলে সংশোধন করা হবে

রাজাকার তালিকা নিয়ে তোলপাড়-ক্ষোভ বাংলাদেশে

মঙ্গলবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৯

রাজাকার তালিকা নিয়ে তোলপাড়-ক্ষোভ বাংলাদেশে
১৯৭১-এ পাকিস্তানী বাহিনীকে সহায়তার অভিযোগে কয়েকজনকে ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে - ফাইল ছবি

বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৪৮ বছর পর প্রকাশিত রাজাকারের তালিকায় কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধার নাম উল্লেখ করা হয়েছে, এমন অভিযোগ ওঠার পর তা নিয়ে ক্ষোভের মুখে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী দুঃখ প্রকাশ করে রাজাকারের তালিকা সংশোধন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

বিবিসি বাংলাকে আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেছেন, ভুলভাবে কোনো মুক্তিযোদ্ধার নাম এলে তাদের পক্ষ থেকে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হলে তা তদন্ত করে তালিকা সংশোধন করা হবে।


রাজাকারের তালিকা প্রকাশের পর মঙ্গলবার কয়েকজনের নাম অর্ন্তভূক্তির প্রতিবাদে দেশের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিবাদ সমাবেশ বা মিছিল করার খবর পাওয়া গেছে।

১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি গোলাম আরিফ টিপু এক সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, মুক্তিযোদ্ধা হয়েও নিজের নাম রাজাকারের তালিকায় দেখে তিনি বিস্মিত হয়েছেন।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলনকারী সংগঠনগুলো ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান বাহিনীকে সহায়তাকারী রাজাকার, আল-বদরসহ স্বাধীনতা বিরোধীদের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের নাম আসার বিষয়ে তদন্তের দাবি তুলেছে।

তালিকায় যাদের নাম নিয়ে বেশী সমালোচনা হচ্ছে, তাদের একজন বরিশালের আইনজীবী তপন কুমার চক্রবর্তী, যিনি একজন গেজেটভূক্ত মুক্তিযোদ্ধা। তার নাম এসেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের রাজাকারের তালিকায়। মি: চক্রবর্তীর সাথে তার মা প্রয়াত ঊষা চক্রবর্তীর নামও তালিকায় রয়েছে।

তপন কুমার চক্রবর্তীর বাবা সুধীর কুমার চক্রবর্তীকে মুক্তিযুদ্ধের সময়ই পাকিস্তানী বাহিনী বাসা থেকে ধরে নিয়ে হত্যা করেছিল মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করার জন্য।

মুক্তিযোদ্ধা হয়েও তপন কুমার চক্রবর্তীর নাম রাজাকারের তালিকায় আসায় বরিশাল নগরীতে বিক্ষোভ হয়েছে।

মি: চক্রবর্তীর মেয়ে এবং রাজনৈতিক দল বাসদের বরিশাল শাখার নেত্রী ডা: মণীষা চক্রবর্তী বলেন, রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের নাম দিয়ে তাদের অপমান করার দায় সরকার এড়াতে পারে না।

তিনি বলেন, “আমার বাবা একজন গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা, আর আমার দাদীর স্বামী মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। এ রকম দু’জনের নাম রাজাকারের তালিকায় এসেছে। আমরা মনে করি, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে একই পরিবারের দু’জন সদস্যের নাম দেয়া হয়েছে।”

“এমন একটি চক্রান্তের অংশ হিসেবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের একটি স্পর্শকাতর তালিকা ব্যবহৃত হতে পারে, সেটি খুবই দুঃখজনক।”

মণীষা চক্রবর্তী বলেন, “আমরা এই তালিকা অবিলম্বে বাতিল করার দাবি জানাচ্ছি। এটা প্রণয়ন করে যারা রাষ্ট্রের শ্রেষ্ঠ সন্তান অপমান করলেন, তাদেরও চিহ্নিত করে শাস্তি হওয়া দরকার।”

মুক্তিযুদ্ধের সময় বরগুনার পাথরঘাটায় আওয়ামী লীগের সভাপতি ছিলেন মজিবুল হক। তিনি সহ সেখানকার প্রয়াত চারজন মুক্তিযোদ্ধার নাম রাজাকারের তালিকায় আসার প্রতিবাদ করেছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ।

চট্টগ্রাম এবং বগুড়া থেকেও কয়েকজন আওয়ামী লীগ নেতার নাম রাজাকার তালিকায় এসেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

রাজশাহীর তালিকায় আইনজীবী গোলাম আরিফের নাম আছে। কিন্তু তার বিস্তারিত পরিচয় সেখানে দেয়া হয়নি।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলি গোলাম আরিফ টিপু ঢাকায় ট্রাইব্যুনালের অন্য আইনজীবীদের নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ট্রাইব্যুনালকে বিতর্কিত করার জন্য তার নাম দেয়া হয়েছে রাজাকারের তালিকায়।

“আমি মুক্তিযোদ্ধা হয়ে এই তালিকা দেখে বিস্মিত হয়েছি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে যারা রাজাকার, আল-বদরের তালিকায় অর্ন্তক্ত করেছে, সেটা কিভাবে হলো এবং কারা এটা করেছে -এটা খুঁজে বের করে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া উচিত।”

তবে রাজাকারের তালিকা নিয়ে ক্ষোভের মুখে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক তালিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের নাম আসায় দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

মন্ত্রী অবশ্য অনেকদিন ধরে যাচাই করে রাজাকারের তালিকা তৈরি এবং তা প্রকাশ করার কথা বলে আসছিলেন। এখন তা প্রকাশ করার পর অনেক প্রশ্ন উঠলে তিনি দায় চাপাতে চাইছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওপর।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, “তালিকা আমরা প্রণয়ন করি নাই। প্রকাশ করেছি।”

“যে তালিকা আমরা পেয়েছি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে, তার দাড়ি কমা সেমিকোলন – কিছুই আমরা পরিবর্তন করি নাই। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান বাহিনী যেভাবে তালিকা করেছিল, সেটাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আমাদের দিলে আমরা সেটাই প্রকাশ করেছি।”

পরে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় মন্ত্রীর ব্যাখ্যা সম্বলিত একটি বিবৃতিও প্রকাশ করে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, দালাল আইনে যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল, তাদের তালিকাই তারা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু অনেকের মামলা প্রত্যাহার হওয়ার ব্যাপারে নথিতে থাকা ব্যাখ্যা প্রকাশ না করায় এখন বিভ্রান্তি হচ্ছে।

তিনি মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় তালিকাটি খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেবে।

এদিকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলনকারী একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নেতা শাহরিয়ার কবির বলেছেন, তারা তাদের সংগঠনের পক্ষ থেকেই তালিকা নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগের তদন্ত করছেন।

“মন্ত্রণালয় একটা আমলানির্ভর তালিকা করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে একটা জগাখিচুড়ি তালিকা ছিল, সেটাই তারা প্রকাশ করে দিয়েছে। যার ফলে এত বিভ্রান্তি এবং বিতর্ক দেখা দিয়েছে।”

শাহরিয়ার কবির বলেন, যে মুক্তিযোদ্ধাদের নাম এই তালিকায় এসেছে, আমরা সেগুলো তদন্ত করছি। আমরা তদন্তে দেখছি কিভাবে এই নামগুলো এই তালিকায় এলো।

“স্থানীয়ভাবে তালিকা যাচাই করা খুব কঠিন কাজ ছিল না। ফলে তালিকা তৈরির পদ্ধতির কারণে বিতর্ক হচ্ছে।। আমরা বৃহস্পতিবার আমাদের তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করার চেষ্টা করবো।”

বিরোধী দল বিএনপিও এই তালিকার পিছনে সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকার অভিযোগ তুলেছে। তবে সরকার তা অস্বীকার করেছে।

প্রথম ধাপে রাজাকার, আল-বদর, আল-শামসসহ স্বাধীনতা বিরোধীদের ১০ হাজার ৭৮৯ জনের নামের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে গত রোববার।

শনিবারের চিঠি / আটলান্টা/ ডিসেম্বরর ১৭, ২০১৯

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৮:০২ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৯

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com