রাজনীতির সমীকরণ মেলে না কুলাউড়ায়!

রবিবার, ০৩ জানুয়ারি ২০১৬

রাজনীতির সমীকরণ মেলে না কুলাউড়ায়!

Nirbaconসেলিম আহমেদ, মৌলভীবাজারঃনৌকা আর ধানের শীষ প্রতীকের প্রতি ক্রমেই বিরাগভাজন হয়ে উঠছে মানুষ। বাড়ছে অনাস্থাও। বিগত জাতীয় নির্বাচনগুলোর ভোট বিশ্লেষণ করে এমন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।

নির্বাচনী মাঠে এমন পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে বৃহত্তর সিলেটের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু কুলাউড়ায়। মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া-কমলগঞ্জ) আসনে বিগত ২০০১ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিন দফায় জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়েছেন তিনজন সংসদ সদস্য (এমপি)। সর্বশেষ কুলাউড়ায় নির্বাচিত হয়েছেন একজন মেয়র। এসব নির্বাচতরা সবাই আওয়ামী লীগ (নৌকা ) আর বিএনপির (ধানের শীষ) বিদ্রোহী প্রার্থী।


রাজনীতিকরা বৃহত্তর সিলেটের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু কুলাউড়াকে রাজনৈতিক সচেতন এলাকা হিসেবে জেনে আসছেন। বিগতকালের বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বাধীনতা আন্দোলন পর্যন্ত কুলাউড়ার নাম রয়েছে ইতিহাসে। এরপর বাংলাদেশের সবকটি আন্দোলন সংগ্রামে আলাদা একটা ভূমিকা রয়েছে কুলাউড়ার।

মহাত্মাগান্ধী, ইন্দিরা গান্ধী থেকে শুরু করে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বিশেষ স্মৃতি বিজড়িত এই কুলাউড়া।

নৌকা ও ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে এ উপজেলা বাসীর রয়েছে বিরূপ মনোভাব। গত পনের বছর ধরেই জাতীয় নির্বাচনে এসে মনোভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নৌকা প্রতীকের বিপক্ষে যতোবারই একক প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছে ততোবারই হারতে হয়েছে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীকে।

১৯৮৬ সালে কুলাউড়া-কমলগঞ্জ সংসদীয় আসনে হারিকেন প্রতীকের প্রার্থী মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট এএনএম ইউছুফ বিজয়ী হয়েছিলেন। এরপর থেকে জাতীয় পর্যায়ে যতগুলো নির্বাচন হয়েছে তার একটিতেও জয়ের স্বাদ নিতে পারেনি ধানের শীষের প্রতীকের প্রার্থী। বরং জামানত হারাতে হয়েছে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে।

নৌকা আর ধানের শীষ প্রতীকের প্রতি ভোটারদের বিরূপ মনোভাবের প্রমাণ মিলেছে ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে। সেবার দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত হন বিএনপির বহিষ্কৃত নেতা (সংস্কারপন্থি) এমএম শাহীন। ওই নির্বাচনে তৎকালীন প্রভাবশালী এমপি ও কেন্দ্রিয় ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি, ডাকসুর সাবেক ভিপি ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক সুলতান মোহাম্মদ মনসুর নৌকা প্রতীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন।

অপরদিকে, চারদলীয় জোট থেকে মনোনয়ন পান জামায়াত নেতা ড. শফিকুর রহমান। নৌকা আর ধানের শীষের এই বাঘা দুই প্রার্থীর সঙ্গে ফুলবল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামেন বিএনপির বিদ্রোহী এমএম শাহীন। ফলাফলে নৌকা প্রতীকের চেয়ে ২৩ হাজার ভোট বেশি পেয়ে বিজয়ী হয় ফুটবল প্রতীক। এ নির্বাচনে বিএনপির বিদ্রোহী এমএম শাহিনের পক্ষে ভোট পড়ে ৭৮ হাজার ৯ শতাধিক। যা দেশজুড়ে আলোচনায় আসে।

২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে মৌলভীবাজার-২ (কুলাউড়া-কমলগঞ্জ) আসনে নৌকা প্রতীক পেলেন নতুন মুখের প্রার্থী জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য অ্যাডভোকেট আতাউর রহমান শামীম। ধানের শীষ গেল কেন্দ্রীয় বিএনপির সদস্য অ্যাডভোকেট আবেদ রাজার হাতে। ফের স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটের পুরোনো লড়াইয়ে নামলেন এমএম শাহীন।

ভোট শেষে জামানত হারালেন নৌকা আর ধানের শীষের দুই প্রার্থী। স্বতন্ত্র প্রার্থী এমএম শাহীনের বাক্সে পড়লো ৬৮ হাজারের বেশি ভোট। তবে শেষ অবধি লাঙল প্রতীকের প্রার্থী জাতীয় পার্টির তৎকালীন কেন্দ্রিয় ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট নওয়াব আলী আব্বাছ খান এক লাখ ৩০ হাজারের বেশি ভোট পেয়ে বিজয়ীর হাসি হাসলেন।

সর্বশেষ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে লাঙল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন মুহিবুল কাদের চৌধুরী পিন্টু। তবে এবারও সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্দুল মতিন। তিনি ‘ভোটারশূন্য কেন্দ্র’ আনারস প্রতীকের পক্ষে পান প্রায় ৩০ হাজার ভোট।

নৌকা আর ধানের শীষের বিপক্ষে যাওয়া জাতীয় নির্বাচনের ধারাবাহিকতা গিয়ে ঠেকেছে সদ্য সমাপ্ত পৌর নির্বাচনে। গেল বছরের ৩০ ডিসেম্বর কুলাউড়া পৌর নির্বাচনের ভোটে নারকেল গাছ প্রতীক নিয়ে চমক দেখালেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আলহাজ্ব শফি আলম ইউনুছ। দলীয় মনোনয়ন বঞ্চিত হয়ে তিনি বিজয়ী হন ৪ হাজার ২শ ৩০ ভোট পেয়ে।

অথচ বিএনপি মনোনীত প্রার্থী বর্তমান মেয়র কামাল উদ্দিন আহমদ জুনেদ পেলেন তার খুব কাছাকাছি ভোট ৪ হাজার ১৭৪টি। আর আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী একেএম সফি আহমদ সলমানও কম যাননি। তিনি পেয়েছেন ৩ হাজার ৭৮৩ ভোট। তবে এত হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পরে বিজয়ের স্বাদ পেলেন না কেউই।

সচেতন ভোটারদের অভিমত, বিদ্রোহী প্রার্থীদের বিজয়ের মাধ্যমে কুলাউড়ার মানুষ বরাবরই প্রমাণ করছে কেন্দ্র থেকে চাপিয়ে দেয়া সিদ্ধান্তের ফলাফল ভালো হয় না। সময়ের প্রয়োজনে কুলাউড়ার মানুষ যোগ্য প্রার্থীকে বেছে নিতে ভুল করেন না।

শনিবারের চিঠি/ আটলান্টা/ ০৩ জানুয়ারি ২০১৬

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৭:৪৭ অপরাহ্ণ | রবিবার, ০৩ জানুয়ারি ২০১৬

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com