রাঙামাটিতে যুবলীগ নেতাকে হত্যা

সোমবার, ১২ জুন ২০১৭

রাঙামাটিতে  যুবলীগ নেতাকে হত্যা

নাজিম মুহম্মদ জহুরুল হক, রাঙামাটিঃ পাহাড়ের কোন রাজনৈতিক সমীকরণ নয়। মোটরসাইকেল ছিনিয়ে নিয়ে রাঙামাটির লংগদু সদর ইউনিয়ন যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নুুরুল ইসলাম নয়নকে হত্যা করেছে তিন আদিবাসী যুবক। হত্যার পর ছিনিয়ে নেয়া নয়নের মোটরসাইকেলটি খাগড়াছড়ির মায়ানি নদীতে ফেলে দেয়া হয়েছে। গত শনিবার নৌ বাহিনীর একদল ডুবুরি মাইনী নদী থেকে সেই মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করেছে। অথচ নয়ন হত্যাকান্ডে জের ধরে উত্তাল পাহাড়। পোড়ানো হয়েছে আদিবাসী পাড়া। গৃহহারা হয়েছে কয়েকশত নারী পুরুষ। সৃষ্টি হয়েছে পাহাড়ি-বাঙালির মধ্যে আস্থার সংকট। নয়ন হত্যায় সরাসরি জড়িত তিন আদিবাসী যুবকের মধ্যে দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। ঘটনার দশ দিনের মাথায় নয়ন হত্যায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করেছে পিবিআই’র পরিদর্শক (ওসি) সন্তোষ কুমার চাকমা। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন, লংগদুর রঙ্গিপাড়ার শঙ্খমনি চাকমার ছেলে জুনেল চাকমা (১৭) ও খাগড়ছড়ির দীঘিনালার রাজমোহন চাকমার ছেলে রুনেল চাকমা। হত্যাকান্ডে অংশ নেয়া বাবুরাজ চাকমা নামে আরো এক যুবক পলাতক রয়েছে। খাগড়ছাড়ির পুলিশ সুপার আলী আহমদ খান জানান, মোটরসাইকেল ছিনতাই করতে নয়নকে হত্যা করা হয়েছে। নয়ন হত্যায় জড়িত জুনেল চাকমাকে গত শুক্রবার (৯ জুন) চট্টগ্রামের কর্ণফুলী এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরবর্তীতে তার দেয়া স্বীকারোক্তি অনুযায়ী একইদিন সন্ধ্যায় দীঘিনালার বাবুছড়া এলাকার রুনেল চাকমাকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা হত্যাকা-ের কথা স্বীকার করে এবং মটরসাইকেলটি মাইনী নদীতে ফেলে দিয়েছে বলে জানায়। তাদের স্বীকারোক্তি মতে মাইনী নদীতে তল্লাশি চালিয়ে নয়নের মটরসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়। মূলত মটরসাইকেল ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যে নয়নকে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে। আঞ্চলিক কোন সংগঠনের সাথে গ্রেপ্তারকৃতরা সম্পৃক্ত কিনা তা তদন্ত করা হচ্ছে।

তিন বোন এক ভাইয়ের মধ্যে সবার বড় জুনেল মারিশ্যা তুলাবান উচ্চ বিদ্যালয়ে অস্টম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া করেছে। নগরীর কর্ণফুলী থানা এলাকা থেকে জুনেলকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। জুনেলের বাবা শঙ্খমনি গ্রামে কৃষি কাজ করেন।


নয়ন হত্যা্কান্ডের বর্ণনা দিতে গিয়ে পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জুনেল চাকমা জানায়, নয়ন মোটরসাইকেলে যাত্রী বহন করে। বাবুরাজ ও রুনেলসহ তিনজনে মিলে নয়নের মোটর সাইকেল ছিনিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী খাগড়াছড়ি যাবার কথা বলে সাতশো টাকায় নয়নকে ভাড়া করে। গত ১ জুন সকাল আনুমানিক সাড়ে সাতটা জুনেল ও বাবু রাজকে মোটরসাইকেলে নিয়ে লংগদু থেকে রওনা দেয় নয়ন। তিনজনের সাথে একই মোটরসাইকেলে গাদাগাদি করে দীঘিনালা থেকে রুনেলও উঠে।

জুনেলের বক্তব্য অনুযায়ী পলিকল্পনা ছিল যাবার পথে নয়নকে হত্যা করে তারা মোটরসাইকেলটি নিয়ে যাবে। কিন্তু রাস্তায় যানবাহনের চলাচল বেশী থাকায় সুবিধা করতে পারেনি। তারা খাগড়ছড়ির খাগড়াপোল পর্যন্ত যায় সেখানে একটি দোকানে তারা চা পান করে। খাগড়াপোল সেতুর সংস্কার কাজ চলছিলো, সেতুর কাজে ব্যবহৃত একটি লোহার রড প্রয়োজন আছে জানিয়ে চেয়ে নেয় রুনেল। তারপর তারা ফিরিতি পথে দীঘিনালার উদ্দেশ্যে রওনা হয়।

বেলা দুটার সময় খাগড়ছড়ি-দীঘিনালা সড়কের চার মাইল (কৃষি গবেষণা এলাকা সংলগ্ন) এলাকায় পৌঁছালে প্রসাবব করার কথা বলে নয়নকে মোটরসাইকেল থামাতে বলে। গাড়ি থামানোর সাথে সাথে লোহার রড দিয়ে নয়নের মাথায় আঘাত করে লাশ রাস্তার পাশে ফেলে মোটরসাইকেল নিয়ে তিনজন চলে যায়।

জুনেলের দাবি, ঘটনার দিন (১জুন) তারা বাবুছড়া এলাকায় রুনেলের বাড়িতে ছিল। নয়ন হত্যার জের ধরে পরদিন (২জুন) লংগদুর তিনটিলা পাড়াসহ আশেপাশের আদিবাসী পাড়ায় আগুন দেয়া হলে তিনজনেই দিঘিনালা বাস স্ট্যান্ডে চলে আসে। এর মধ্যে একদফা মোটারসাইকেলটি বিক্রির চেষ্টা করেছে তারা। গত ৪ জুন মাইনীখালে মোটরসাইকেলটি ফেলে দিয়ে জুনেল চট্টগ্রামে চলে আসে। রুনেল দিঘিনালায় থেকে যায় আর বাবুরাজ সাজেক এলাকায় চলে যায়।

নয়ন হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তাল হয়ে উঠে পাহাড়। এ সুযোগে লংগদুর তিনটিলা পাড়া, বাইট্ট্যা পাড়া, উত্তর ও দক্ষিণ মানিকজোড় ও বড়দম এলাকায় আদিবাসীদের প্রায় তিন শতাধিক বাড়ি পুড়িয়ে দেয় সুবিধাবাদী মহল। আস্থার সংকট বেড়ে যায় পাহাড়ি-বাঙালির মধ্যে। আদিবাসী পাড়ায় আগুন দেয়ার ঘটনা ও নয়নের হত্যার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়ে গত কয়দিন ধরে নগরীতে প্রতিদিন প্রতিবাদ সমাবেশ করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) পাহাড়ি ছাত্র পরিষদ (পিসিপি), জনসংহতি সমিতি (জেএসএস সংস্কারপন্থী), হিলি উইম্যান্স ফেডারেশন ও গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম।

উল্লেখ্য, গত ১ জুন লংগদু উপজেলা থেকে ভাড়ায়চালিত মোটরসাইকেলের চালক ও স্থানীয় সদর ইউনিয়ন যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন দুইজন যাত্রী নিয়ে দীঘিনালার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। কিন্তু দুপুরের পর দীঘিনালার চারমাইল এলাকায় তার লাশ পড়ে থাকতে দেখে পুলিশকে খবর দেয় স্থানীয় লোকজন। পরে সন্ধ্যায় ফেসবুকে তার লাশের ছবি দেখে শনাক্ত করেন নিহতের পরিবারের সদস্য ও বন্ধুরা। পরদিন (২জুন) সকালে নয়নের লাশ লংগদুতে তার গ্রামের বাড়ি বাইট্টাপাড়া আনা হয়। সেখান থেকে লংগদুবাসীর ব্যানারে কয়েক হাজার বাঙালির একটি বিশাল শোক মিছিল উপজেলা সদরের দিকে যাচ্ছিল জানাজার উদ্দেশ্যে। হঠাৎ একই উপজেলার ঝর্ণাটিলা এলাকায় মারফত আলী নামের এক বাঙালির বাড়িতে দুর্বৃত্তরা আগুন দিয়েছে- এমন খবর পেয়ে ওই মিছিল থেকেই প্রধান সড়কের পাশের লংগদু উপজেলা জনসংহতি সমিতির কার্যালয়সহ আশপাশের পাহাড়িদের বাড়িঘরে ব্যাপক অগ্নিসংযোগ শুরু হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাহাড়ি অধ্যুষিত তিনটিলা পাড়ায় ব্যাপক অগ্নিসংযোগ করা হয়। ঘটনাস্থলে বিপুল সংখ্যক পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রাক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা থাকলেও তারাও নিরুপায় হয়ে পড়েন।

শনিবারের চিঠি /আটলান্টা/ ১২ জুন, ২০১৭

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৯:২৩ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ১২ জুন ২০১৭

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com