ছোট গল্প

রঙিন শাড়ি

শনিবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২১

রঙিন শাড়ি
অলঙ্করনঃ শনিবার মিডিয়া

আমার মাকে কখনও এই শাড়িটা পরতে দেখিনি। বারো হাত জর্জেটের ফুরফুরা শাড়ি , আবিরের রঙে রাঙানো। গোলাপির সঙ্গে হলুদ গড়িয়ে পড়েছে নীলের উপর । তার মাঝে জানালার শিক গলিয়ে রোদের মত উঁকি দিচ্ছে হালকা কমলা ।
কলেজের পিকনিকে যাব বলে আলমারি থেক এই শাড়িটা বের করলাম ।
কলেজের পিকনিকে যাব বলে আলমারি থেকে এই শাড়িটা বের করলাম।
মা জিজ্ঞেস করল, এই শাড়িটা তোর ভালো লাগলো ?
-হ্যাঁ মা, কী সুন্দর শাড়িটা তোমাকে তো কোনদিন পরতে দেখিনি!
-না, পরেছি শুরুতে- মানে মাঝে মাঝে পরি। হয়তো দেখিসনি কোনদিন ।
কলেজ থেকে ফিরে এসে মাকে বললাম, মা, সবাই পছন্দ করেছে শাড়িটা । কে কিনেছিল শাড়িটা ?
কে আর কিনবে ? তোর বাবা। আমার সব শাড়ি তো তোর বাবাই কিনত । আমি কি দোকানে গিয়ে কখনও কেনাকাটা করেছি নাকি ? যা এবার শাড়ি-টারি বদলে খেতে আয় ।
মার কন্ঠে বিরক্তি । পরদিন সকালে বাথরুমে গিয়ে শাড়িটা না দেখে ছুটে এলাম মার কাছে ।
-মা , শাড়িটা বাথরুমে নেই । তুমি কি দেখেছ ?
মা একটু আনমনা হ্য়ে বলল,
-আমি তুলে রেখেছি । মোমেনা ধুতে গিয়ে হয়তো নষ্টই করে ফেলবে । তোর বাবার এটা অনেক প্রিয় শাড়ি।
সেদিনই বুঝতে পেরেছিলাম এই শাড়ির সাথে মার এক্টা প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে। হয়তো কোন বিশেষদিনে বাবা কিনেছিল।
হতে পারে সেদিনটা ছিল মার জন্মদিন কিংবা বিয়েবার্ষিকী । আচ্ছা। এমনটা কি হয়েছিল , বাবা শাড়িটা কিনে রঙিন কাগজে মুড়ে বালিশের তলায় রেখে দিয়েছিলেন। অনেক রাতে সংসারের কাজকর্মসেরে বাচ্চাদের ঘুম পাড়িয়ে মা নিজের ঘরে এসে দেখেন, বাতি নিভিয়ে বাবা ঘুম। খুব মন খারাপ নিয়ে বিছানায় এসেছিলেন। আজকের দিনটাও ভুলে গেল । পাশে শুয়ে বালিশে মাথা দিতেই কীরকম একটা কাগজের মচমচে শব্দ না ? ব্যাপারটা কী বুঝতে চেয়ে মা বালিশের তলায় হাত দিয়ে অবাক ! বাতি জ্বালিয়ে দেখেন বাবা মিটমিটিয়ে হাসছেন। মোড়ক খুলে শাড়িটা মেলে মা বললেন,
এ কী করেছ ? এতো রঙিন শাড়ি কি আমি পরি ? ছেলেমেয়েরা বড় হয়েছে না এখন ?
-তাতে কী হয়েছে ? ওদের সামনে পরতে না চাইলে তুমি শাড়িটা শুধু আমার সামনে পরবে ।
আমি যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি মা সেদিন শাড়িটা পরে ড্রেসিংটেবিলের সামনে বসে সাজলেন। চুলে ফুল গুঁজে দিলেন। মায়ের অমন লাজুক অবয়ব দেখে আমারই কেমন লজ্জা করতে লাগল। এই শাড়িটা নিয়ে মায়ের অনেক স্মৃতি থাকলে থাকতেও পারে । তাই আমি শাড়িটা আর কখনো পরতে চাইনি ।
বাবা ছাপান্ন বছর বয়েসে চলে গেলেন না ফেরার দেশে । মা বাবার চেয়ে  দশ কি বারো বছরের ছোট হবেন । মা এরপর আর কখনো রঙিন শাড়ি পরেন নাই । আমরা ভাইবোনেরা রঙিন শাড়ি কিনে দিলে আলমারিতে তুলে রাখতেন। বাবা মারা যাবার তিন বছর না যেতেই মা স্টক করে বিছানা নিলেন। সমস্ত স্মৃতি হারিয়ে শুধু একটি নামই তাঁর মনে ছিল। তাঁর নিজের না, মরিয়ম ।
ছেলে-মেয়ে কারো নামই মনে করতে পারতেন না। বললে উল্টোপাল্টা নাম বলেন। মেয়েকে ডাকেন ছেলের নাম, ছেলেকে মেয়ের নাম। আর তাঁর মনে আছে কেবল বাল্যকালের গল্প । কবে সেই বালিকাবেলায় রিকশা থেকে পরে পায়ে ব্যথা পেয়েছিলেন, সেই ব্যথা এখনও অনুভব করেন। কাউকে কাছে পেলেই বলবেন,
-কাল রিকশা থেকে পড়ে গিয়েছিলাম । আমার পায়ে একটু  মালিশ দিয়ে দে । ব্যথায় ঘুমাতে পারি না। আবার কখনও জানালা খুলে দিতে বলতে চেয়ে বলছেন – ‘ আমার পা খুলে দে।
সারাদিন আমরা ভাইবোনেরা মিলে রীতিমত গবেষণা করি। কোন কথার সূত্রে ধরে মা  কোন শব্দ বলেন।
ধীরে ধীরে আমরা মা’র সীমিত শব্দ ভান্ডার থেকে তাঁর মনের কথা বুঝতে শিখে গেলাম। মাংসের রেজালায় ঘি কম হয়েছে বলতে চেয়ে যখন বলেন, এইটা গরু আর গাছ কম হয়েছে ।আমরা ঠিক বুঝে যেতাম ঘি আর ঝাল কম হয়েছে । আমরা তাঁর কথা বুঝতে না পারলে যততা বিরক্ত হতেন, বুঝতে পারলে ততটাই খুশি হন। শিশুসুলভ হাসি চোখেমুখে ছড়িয়ে পড়ত, বুঝাতে পেরেছেন বলে ।
বছর দূয়েক ফিজিওথেরাপি দিয়ে বেশ সেরে উঠেছেন। ডান হাত-পা যা মোতেই নড়াচরা করতে পারতেন না ইদানিং ধরে ধরে হাঁটতেও পারেন। হাতও কিছুটা ব্যবহার করতে পারেন । চিকিৎসায় স্মৃতি শক্তি ফিরে পেতে শুরু করেছেন। কথা ভালোই গুছিয়ে বলতে পারেন। নামও ঠিকঠাক বলছেন সবার । বাল্যকাল থেকে ফিরে এসে সবাইকে চিনতে শুরু করেছেন । এখন যদি আমরা জিজ্ঞেস করি,
-মা, লায়লা খালামনিকে চিনতে পারছ ?
-লায়লাকে চিনব না ? তোরা কী শুরু করলি ?
উলটা আমাদেরই ধমক খেতে হয় ।
মা-বাবা দুজনের রুমটি এখন একজনের রুম হয়ে গিয়েছে ।বাবা মারা যাবার পরও রুমটি একইরকম ছিল । কিন্তু চিকিৎসার সুবিধার জন্যে বড় খাটটি সরিয়ে সেখানে ছোট একটি খাট পাতা হলো সেই রুমে । রুমের  ড্রেসিং টেবিল সরিয়ে সেখানটায় এলো ছোট্ট একটা ফ্রিজ। মার  ওষুধপত্র আর খাবার রাখার সুবিধের জন্যে । মা মন খারাপ করে করে চেয়ে চেয়ে দেখলেন , কিছুই বললেন না। শুধু মার শাড়ির আলনাটা যথাস্থানে রয়ে গেছে।
মা এখন আর শাড়ি পরেন না। পরেন ম্যাক্সি । ম্যক্সি শরীরে ঠিক রাখতে পারেন না । আজানের সময় মাঝে মাঝে ওড়না মাথায় টেনে দেন। আমি সেই ওড়নাটা শুকে দেখি , এতে শাড়ির আঁচলের গন্ধ আছে কি না ? কিন্তু শাড়ির আঁচলের পান আর জর্দার সুগন্ধ ওড়নাতে পাই না।
যতই বলা হোক মা কিছুতেই হাঁটাহাঁটি করতে পছন্দ করেন না। প্রকৃতির ডাক ছাড়া কিছুতেই বিছানা থেকে নামবেন না। অথচ ডাক্তার বারবার বলেন, হাঁটাহাঁটি করলে উঁনি সুস্থ হয়ে উঠবেন । ডাক্তারের পরামর্শ বার বার বলে সবাই ক্লান্ত । আত্নীয়স্বজন যারা মাকে দেখতে আসেন তাদেরকেও আড়ালে ডেকে নিয়ে শিখিয়ে দেয়া হ্য, তারাও যেন মাকে হাঁটার কথা বলেন । প্রথম দিকে কিছু বলতেন না। পড়ে নিজেই বিরক্ত হ্যে বলতেন, অন্য কিছু বলো , নইলে আমাকে একা থাকতে দাও ।আমার সব দেখা শেষ । এখন আর আমি হেঁটেহেঁটে কী দেখব ? এখন শুধু মৃত্যুর প্রহর গোণা।
আমাদের ষাট কেজি ওজনের মা শুকিয়ে চল্লিশ কেজি হয়ে গেছেন ।সবাই ভাবলাম ডায়াবেটিকস হলো কিনা ? না, সেরকম কিছুই নয় । কোন কিছু খেতে ভালো লাগে না। শুরতে চামচ দিয়ে বাঁ হাতে খেতেন, ডাক্তারের পরামর্শ মতো । স্ট্রোকের পর ডান হাতে জোর পান না । তাই সে হাতে কিছু করেন না। কিছুদিন পর নিজের হাতে খেতে হবে বলতেন , আমার খিদে নেই । কেউ খাইয়ে দিতে চাইলে তবে খেতেন । তাও খুব সামান্য । দূর্বলতার কারণে প্রায় পড়ে যান বিছানা থেকে নামতে গিয়ে । এত করে বলা হয় একা একা বাথরুমে যেও না। কিন্তু কথা শুনবেন না। কাউকে ডাকবেনও না। শুধু একটা কাজ খুব আগ্রহসহ করেন , পান সাজিয়ে খাওয়া। পানগুলো যত্ন করে ধুয়ে অনেকটা সময় নিয়ে সাজান । তারপর এক গালে পুরে চিবুতে থাকেন। সেই সময় মার মুখখানি সুখি মানুষের মুখের মতো তৃপ্ত হয়ে ওঠে । তাঁর নিজের একটা মোবাইল ফোন আছে, সাপ্তাহিক ছুটি শুক্রবার হলেই ডাকাডাকি শুরু করেন ছেলেমেয়েদের । না যেতে পারলে অভিমান করে ফোন করা বন্ধ করে দেন। পরের সপ্তাহে গেলে কিছুক্ষণ কান্নাকাটি করবেন। তারপর , কেন এলি ? আমাকে দেখার তো তোদের সময় হয় না।
মাকে একটি হুইলচেয়ার কিনে দেয়া হলো । যদি বিছান ছেড়ে বাইরে একটু ঘোরাঘুরি করেন । দুদিন বাবার রুমে এসে সবার সঙ্গে গল্পগুজব করলেন। তিন দিনের দিন আবার সেই বিছানাতেই বসে থাকলেন। আমি যদি মা, তোমার ইচ্ছে করে না ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরের জগতটা দেখতে ?
নারে বেটি , আমার কিছুই দেখতে মন চায় না। এখন চলে যেতে পারলেই ভালো লাগবে । আমার বেঁচে থাকতেই ইচ্ছে করে না।
-তোমার প্রিয় রান্নাঘর, সেখানেও যেতে মন চায় না ?
– না। আমি  তো এখন আর রান্না করতে পারিনা, যেয়ে কী করব ?
ছুটির দিনে মাকে দেখতে গেলাম। বললেন, ‘আমার আলমারিটা খোল ।
– কেন কী হবে ?
-সবাই এক এক করে আমার শাড়িগুলো নিচ্ছে , তুইও একটা নিবি সেখান থেকে ।
-নিয়ে কী করব মা ?
-নে । আমি যখন থাকব না  তোর ছেলেমেয়েদের দেখাবি ।
– কী সব যে বলো তুমি !
আলমারি খুলে জিজ্ঞেস করলাম ?
কোনটা নেব তুমি বলো মা ?
ওই যে নিচের দিকে একটা শাড়ি আছে ওটা নে ।
মাকে দেখাই এটা তো ওটা …. সবটাতেই বলেন না, না । এটা না ওটা না।
মা বিরক্ত । আমি ক্লান্ত । কোন শাড়িটা মা আমাকে দিতে চান বুঝে উঠতে পারছি না।
অবশেষে ঠিকঠাক মতো হাত গেল শাড়িটায় । মা খুশি হয়ে বললেন,হ্যাঁ, হ্যাঁ। ওইটাই তো এতক্ষণ চাচ্ছিলাম।
এই সেই শাড়ি, কলেজে থাকতে পিকনিকে যেতে পরেছিলাম।
মা আজ নেই । তাঁর দেয়া সেই শাড়িটা হাতে নিয়ে বসে আছি। শাড়িটার রঙ ঠিক তেমনি আছে। শুধু মা নেই । একটা রঙ থেকে আর একটা রঙ গড়িয়ে পড়ছে, আর আমি দেখতে পাচ্ছি গুলোর সঙ্গে গড়িয়ে পড়ছে বাবার জন্য মা’য়ের অটুট ভালবাসা।

শনিবারের চিঠি / আটলান্টা / জানুয়ারি ২৩, ২০২১
আমাদের সাইডে আরও গল্প দেখতে এখানে ক্লিক করুন


Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১:০৯ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ২৩ জানুয়ারি ২০২১

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com