মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধে জব্বারের আমৃত্যু কারাদণ্ড

বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধে জব্বারের  আমৃত্যু কারাদণ্ড

 

ঢাকাঃ একাত্তরে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে জাতীয় পার্টির সাবেক এমপি পিরোজপুরের ইঞ্জিনিয়ার আব্দুল জব্বারকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। রায়ে বলা হয়, আবদুল জব্বার একাত্তরে বর্বর মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করেছেন এবং অপরাধ সংঘটনে সহযোগিতা করেছেন। এসব ভয়ংকর অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডই তাঁর একমাত্র উপযুক্ত শাস্তি। কিন্তু জব্বারের বয়সের বিষয়টিও ট্রাইব্যুনাল তাঁর বিবেচনায় এড়িয়ে যেতে পারেন না। তাই মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে তাঁকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হলো।


 বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহীমের নেতৃত্বাধীন ১ নম্বর ট্রাইব্যুনাল গতকাল মঙ্গলবার এই রায় ঘোষণা করেন। ট্রাইব্যুনালের অন্য দুজন সদস্য হলেন বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও বিচারপতি আনোয়ারুল হক।

 গণহত্যা এবং হত্যা, লুট, ধর্মান্তরিতকরণসহ পাঁচটি অভিযোগের মধ্যে চারটিতে (১, ২, ৩ ও ৫ নম্বর) জব্বারকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। ৪ নম্বর অভিযোগে দেওয়া হয়েছে ২০ বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরো দুই বছর কারাদণ্ড। রায়ে বলা হয়, পলাতক আব্দুল জব্বার আত্মসমর্পণ করে আপিল করতে পারবেন। একই সঙ্গে দণ্ডপ্রাপ্ত এই অপরাধীকে দেশে ফিরিয়ে এনে সাজা কার্যকর করার জন্য সরকারের প্রতি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ জন্য স্বরাষ্ট্রসচিব ও পুলিশের মহাপরিদর্শককে (আইজিপি) ইন্টারপোলের সহযোগিতায় জব্বারকে দেশে ফেরত আনার ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিচার শুরু হওয়ার আগে থেকেই পলাতক আছেন আব্দুল জব্বার। তদন্ত সংস্থা ও প্রসিকিউশন সূত্রে জানা যায়, জব্বার যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় তাঁর মেয়ের বাসায় অবস্থান করছেন।

একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া থানার শান্তি কমিটির সভাপতি হিসেবে ইঞ্জিনিয়ার জব্বার তাঁর বাহিনী ও পাকিস্তানি সেনাদের নিয়ে মঠবাড়িয়া থানায় নারকীয় হত্যাকাণ্ডসহ যেসব অপরাধ করেছেন তা উঠে এসেছে রায়ে।

 এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের ১৭তম মামলার রায় এবং ১ নম্বর ট্রাইব্যুনালের অষ্টম রায়। এর আগে এই ট্রাইব্যুনাল থেকে গোলাম আযম, মতিউর রহমান নিজামী, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী, এ টি এম আজহারুল ইসলাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোবারক হোসেন ও ফরিদপুরের জাহিদ হোসেন খোকনের বিরুদ্ধে মামলার রায় দেওয়া হয়েছে।

 এর আগে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার নকশাকার গোলাম আযমকেও মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধে বয়স বিবেচনায় ৯০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। গোলাম আযম রায় ঘোষণার এক বছরের মধ্যেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান.

জব্বারের বিরুদ্ধে মামলার রায়ে ট্রাইব্যুনাল বলেন, ‘১৯৭১ সালে জব্বার ইঞ্জিনিয়ার যে ধরনের মানবতাবিরোধী জঘন্যতম অপরাধ করেছেন তা গোটা জাতিকে বেদনাহত করেছে। এটি সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে আবদুল জব্বার একাত্তরে বর্বর মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করেছেন ও অপরাধ সংঘটনে সহযোগিতা করেছেন। এসব ভয়ংকর অপরাধের জন্য একমাত্র মৃত্যুদণ্ডই তাঁর উপযুক্ত শাস্তি।’ রায়ে বলা হয়, একাত্তরে জব্বারের অবস্থান ও কর্মকাণ্ড বিবেচনায় ট্রাইব্যুনালের বিচারকরা একমত যে, মৃত্যুদণ্ডই জব্বারের একমাত্র উপযুক্ত শাস্তি। কিন্তু একই সঙ্গে জব্বারের বয়সের বিষয়টিও ট্রাইব্যুনাল তাঁর বিবেচনায় এড়িয়ে যেতে পারেন না। এখন আবদুল জব্বার ৮২ বছরের একজন বয়োবৃদ্ধ। তাই তাঁর প্রতি ক্ষমাশীল (কোমল) দৃষ্টিতে অভিযোগ ১, ২, ৩ ও ৫-এ মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হলো

যেসব অভিযোগে আমৃত্যু কারাদণ্ড : জব্বারের নেতৃত্বে রাজাকাররা মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালের ১৬ মে পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার ফুলঝুড়ি গ্রামের দুই মুক্তিযোদ্ধা রাজ্জাক বিশ্বাস ও মোতালেব শরীফকে হত্যা করে। এ ছাড়া গ্রামের নাথপাড়া ও কুলুপাড়ার প্রায় ১৬০টি বাড়িতে লুটপাটের পর অগ্নিসংযোগ করে। এটি ছিল জব্বারের বিরুদ্ধে এক নম্বর অভিযোগ। এই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

একাত্তরের ১৭ মে জব্বারের নেতৃত্বে পাকিস্তানি সেনা ও রাজাকাররা ফুলঝুড়ি গ্রামে আক্রমণ করে শারদা কান্ত পাইককে হত্যা এবং ৩৬০টি বাড়িঘরে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করে। এই অপরাধের দায়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হলো জব্বারকে।

 ১৯৭১ সালের ২২ মে আবদুল জব্বার শান্তি কমিটির সদস্য ও রাজাকারদের নিয়ে মঠবাড়িয়ার নলী গ্রামে আক্রমণ করেন। জব্বার নিজে তাঁর হাতের রাইফেল দিয়ে গুলি করে হত্যা করেন গ্রামের সখানাথ খরাতীকে। জব্বারের নির্দেশে রাজাকাররা এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে গ্রামের নিশিকান্ত বিশ্বাস ও তাঁর ছেলে সুরেন্দ্রনাথ বিশ্বাস, উপেন্দ্রনাথ বিশ্বাস, জিতেন্দ্র নাথ বিশ্বাস, গণেশ চন্দ্র মিস্ত্রি, উপেন্দ্র নাথ মিস্ত্রি, বসন্ত হালদার, বলরাম মিস্ত্রি, ষষ্ঠী হালদারকে গুলি করে হত্যা করে। সেদিন গ্রামের মোট ১১ জন শহীদ হন। রাজাকাররা গ্রামের ৬০টি বাড়ির মালপত্র লুট ও অগ্নিসংযোগ করে। এ অভিযোগেও জব্বারকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

একাত্তরের ৬ অক্টোবর মঠবাড়িয়ার আঙ্গুলকাটা ও মঠবাড়িয়া গ্রাম থেকে ৩৭ জনকে আটক, অপহরণ, নির্যাতন ও তাদের মালপত্র লুট করে রাজাকাররা। জব্বার ইঞ্জিনিয়ার তাঁদের মধ্য থেকে সাতজনকে টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেন। বাকি ৩০ জনকে সূর্যমণি নদীর পাড়ে নিয়ে গিয়ে গুলি করা হয় জব্বারের নির্দেশে। ওই সময় ২২ জন ঘটনাস্থলেই শহীদ হন এবং আটজন গুরুতর আহত হন। এ অভিযোগেও জব্বারকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

২০ বছর কারাদণ্ড ও জরিমানা যে অভিযোগে : একাত্তরের মে মাসের শেষ সপ্তাহের কোনো একদিন জব্বারের নির্দেশে রাজাকাররা ফুলঝুড়ি গ্রামের হিন্দুপাড়ার প্রায় ২০০ নিরস্ত্র লোককে জোর করে মুসলমান বানিয়ে তাঁদের নাম পরিবর্তন করে। এটি ছিল জব্বারের বিরুদ্ধে চার নম্বর অভিযোগ। এই অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় জব্বারকে ২০ বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানা অনাদায়ে দুই বছর কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।

রাষ্ট্রপক্ষের সন্তোষ : রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনাকারী প্রসিকিউটর জাহিদ ইমাম এ রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন সাংবাদিকদের কাছে। প্রসিকিউটর ড. তুরিন আফরোজ বলেন, এই মামলায় জব্বারকে বয়স বিবেচনায় আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একটি অভিযোগে ১০ লাখ টাকা জরিমানাও করা হয়েছে, তবে এটি ক্ষতিপূরণ নয়।

মামলার কার্যক্রম : গত ৩ ডিসেম্বর এই মামলার বিচারকাজ শেষ হলে রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রাখেন ট্রাইব্যুনাল। গত বছরের ২৫ থেকে ৩০ নভেম্বর এবং ৩ ডিসেম্বর চার কার্যদিবসে জব্বারের বিরুদ্ধে যুক্তি উপস্থাপন করে রাষ্ট্রপক্ষ। এর আগে ৭ সেপ্টেম্বর থেকে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত জব্বারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষে সাক্ষ্য দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তাসহ ২৪ জন সাক্ষী। গত ৮ জুলাই পলাতক অবস্থায় বিচার শুরু করার জন্য আসামি আবদুল জব্বারের পক্ষে মোহাম্মদ আবুল হাসানকে সরকারি খরচে নিয়োগ দেওয়া হয়। গত বছরের ১২ মে জব্বারের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের আনা পাঁচটি অভিযোগ আমলে নিয়ে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল।

 গণজাগরণ মঞ্চের বিক্ষোভ : রায় শোনার পর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে থেকে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করে গণজাগরণ মঞ্চের নেতা-কর্মীরা। মিছিলটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি হয়ে আবার শাহবাগে গিয়ে শেষ হয়। রায়ের প্রতিক্রিয়ায় গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার বলেন, ‘মানবতাবিরোধী অপরাধে আবদুল জব্বারের আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায় দেওয়া হয়েছে। এই রায় আমরা প্রত্যাখ্যান করছি। তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে, কিন্তু মঠবাড়িয়ার কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী জব্বারকে বয়স বিবেচনায় আমৃত্যু কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এই অপরাধীর রায় বয়স বিবেচনায় নয়, তাঁর অপরাধের ওপর ভিত্তি করে দেওয়া উচিত ছিল। তাই এই রায় পুনর্বিবেচনার দাবি জানাই আদালতের কাছে।’

 মঠবাড়িয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের বিক্ষোভ : পিরোজপুর থেকে আমাদের আঞ্চলিক প্রতিনিধি দেবদাস মজুমদার জানান, ইঞ্জিনিয়ার জব্বারের রায়ে সর্বোচ্চ সাজা না হওয়ায় অসন্তুষ্ট পিরোজপুরের মঠবাড়িয়ার মুক্তিযোদ্ধারা। গতকাল দুপুরে রায় ঘোষণার পরপরই মুক্তিযোদ্ধারা পৌর শহরে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলটি মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয় থেকে বেরিয়ে পৌর শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ঘুরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শেষ হয়। সেখানে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশে বক্তব্য দেন মুক্তিযোদ্ধা মুজিবুল হক খান মজনু, মোস্তফা শাহ আলম দুলাল, অ্যাডভোকেট দিলীপ কুমার পাইক, শহীদ পরিবারের সন্তান মুক্তিযোদ্ধা পরিমল হালদার প্রমুখ।

বক্তারা বলেন, ইঞ্জিনিয়ার জব্বার ১৯৭১ সালে মঠবাড়িয়ায় শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান ও রাজাকারের সংগঠক ছিলেন। তাঁর নির্দেশেই মঠবাড়িয়ায় গণহত্যা, লুটসহ নানা অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। তাঁর শাস্তি আমৃত্যু কারাদণ্ড হওয়ায় মঠবাড়িয়াবাসী হতাশ।

 ‘স্বামীই বাইচ্চা নাই রায় দিয়া কী করমু’ : মুক্তিযুদ্ধের সময় মঠবাড়িয়ার সূর্যমণি গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের ২৪ জনকে হত্যার অভিযোগে ২০১১ সালের ৬ সেপ্টেম্বর জব্বার ইঞ্জিনিয়ারসহ সাতজনের বিরুদ্ধে আদালতে একটি মামলা দায়ের করা হয়। ওই সময়ে সূর্যমণিতে রাজাকারদের গুলি খেয়ে বেঁচে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধা জ্ঞানেন্দ্র মিত্র (৬২) বাদী হয়ে মঠবাড়িয়ার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটি করেছিলেন। মামলার নথিপত্র ওই বছরের ২১ সেপ্টেম্বর স্থানান্তর করা হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। দরিদ্র জ্ঞানেন্দ্র মিত্র গত বছর মারা গেছেন। তাঁর স্ত্রী ঝর্ণা রানী (৪৫) কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মামলার রায়ে কী অইছে হুনছি। এ রায় নিয়া আমাগো আর কোনো কথা নাই। আমার স্বামী মামলা কইরা হতাশায় মরছে। অর্থকষ্টে তাঁর সুচিকিৎসা হয় নাই। স্বামী অকালে মরার পর কেউ আমাগো খোঁজ নেয় নাই। খাইয়া, না খাইয়া জীবন বাঁচাইতেছি।’

 

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১০:৫২ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com