মামা ভাগ্নে

ছোট গল্পঃ

শনিবার, ১১ জুলাই ২০২০

মামা ভাগ্নে
অলংকরণঃ মামুন হোসাইন

মহামারি করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবে দীর্ঘদিন লকডাউনে অনির্ধারিত বন্ধের পর প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পেয়েছে ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাসগুলো। অপ্রতাশিত ছুটির মধ্যে দিয়েই কেটে গেল ঈদ,রোজা পূজা। আতংকের মধ্যে কেটেছে সবার। চিনের উহানে মহামারি নভেল করোনাভাইরাস উৎপন্ন হয়ে তা বিশ্বব্যাপি ছড়িয়ে পড়ে । প্রভাব বাংলাদেশেও ছড়িয়ে পড়ায় এর প্রাদুর্ভাব প্রতিরোধে দেশের সকল স্কুল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয় সরকার । সম্প্রতি তার প্রাদূর্ভাব কিছুটা হ্রাস পাওয়ায় সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার শর্ত দিয়ে আবার খুলে গেল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান । প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ের টিএসসি, মধুর ক্যান্টিন, মল চত্বর লাইব্রেরী চত্বর, হাকিম চত্বর, ডাকসু ভবনসহ সবগুলো স্পট শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে আবার।
বিশ্ববিদ্যালয় খোলার পরেই স্থগিত পরীক্ষাগুলো শীঘ্রই হতে পারে জেনে কেন্দ্রীয় লাইব্রেরীর দিকে যাচ্ছিল গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী নীপা ইয়াসমিন নিপু। এ সময়ে ডাকুস সংগ্রহশালার বেদীতে বসে সহপাঠিদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিল একই বিভাগের ছাত্র সাইফুল। নিপুকে লাইব্রেরির দিকে যেতে দেখে ডাক দেয়, “নিপু এই নিপু? ওদিকে কোথায় যাচ্ছ?”
ফিরে তাকায় নিপু। “সাইফুল তুমি এখানে? আর আমি সারা ক্যাম্পাস খুঁজে ফিরেছি , লাইব্রেরিতে যাচ্ছি। তুমি যাবে আমার সাথে?”
“দাঁড়াও। আমি আসছি।”
সাইফুল আড্ডার আসরের সকলকে বলল, “বন্ধুরা, তোরা কিছু মনে করিসনে। আমাকে একটু উঠতে হয়। সে কল করেছে। বুঝিস তো অনেকদিন দেখা হয় না।”
“যা, যা ঠিক আছে একজন বলে উঠল। ভার্সিটি যখন খুলেছে পরে দেখা হবে। তোর ওনাকে আমাদের পক্ষ থেকে ঈদের শুভেচ্ছা জানাস, কেমন ?”
“ওকে, বলে এক দৌড়ে সাইফুল নিপুর কাছে গেল।”
লাল টুকটুকে শালওয়ার কামিজের উপর রূপালী কাজ করার পোশাকে দারুণ লাগছে নিপুকে। লাল ড্রেসের পর রূপালী কাজের উপর সূর্য রশ্মি যেন ছিটকে ছিটকে পড়ছে চারদিকে। মনে হচ্ছে স্বর্গের ঊর্বশী বুঝি মর্ত্যে নেমে এলো। একজন তো বলেই ফেলল, সাইফুল সত্যিই একটা চীজ ধরেছে। পোলাটার পছন্দ আছে।
সাইফুল কাছে গেলে আপাদমস্তক দর্শন করে নিপু বলে উঠল “বাঃ, আই লাভ নিউইর্য়ক।”
“না, না, আই লাভ নিউইর্য়ক নয়।”
“তবে?”
আই লাভ নীপা ইয়াসমিন। এই দেখ বলে টিশার্টের উপর আঙ্গুল দিয়ে আই লাভ এন ওয়াই এর অর্থ নিউ ইর্য়ক নয় নীপা ইয়াসমিন। বুঝলে বেবী, বুঝলে? “বলে হো হো কারে হেসে উঠল সাকিব।”
আই লাভ নীপা ইয়াসমিন না, ছাই। আমি ভার্সিটিতে এসে ক্যাম্পাসময় খুঁজে ফিরেছি তোমায় আর তুমি এখানে বসে বসে আড্ডা দিচ্ছ।
“আমি? আমি কি তোমায় খুঁজিনি ? গরু খোঁজা খুঁজেছি। অবশেষে ক্লান্ত হয়ে ওদের সাথে বসে পড়েছি।”
“হয়েছে, হয়েছে। চল, এখন লাইব্রেরিতে যাই। আমার একটা বই নিতে হবে। ক্লাশ শুরু হলেই ক’দিন পর পরীক্ষা। আমার তো তোমার মতো মামু খালু ইংল্যান্ড, আমেরিকা থাকে না যে তাদের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাব। পড়ালেখা করে পরীক্ষায় পাশ করতে হবে আমাদের। আসলে টি-শার্টটি তোমাকে দারুণ মানিয়েছে। আমেরিকা থেকে তোমার মামা পাঠিয়েছে বুঝি?
“না, না মামা পাঠায়নি, নিয়ে এসেছে। তোমাকে বলা হয়নি। ছোট মামা বিগত পাঁচ বছর করোনার লক ডাউনের মাত্র ক’ দিন আগেই বাড়ি এসেছেন, বলবইবা কখন। ভার্সিটিতো এ সময়ে বন্ধ ছিল।”
“তাই নাকি?”
গল্প করতে করতে সাকিব ও নিপু লাইব্রেরিতে ঢুকে পড়ল। লাইব্রেরি কার্ড দেখিয়ে নিপু একটা বই নিল। ফাঁকা একসেট চেয়ারটেবিল দেখে সাকিব বলল, “চল ওখানে গিয়ে বসে কিছুক্ষণ গল্প করি।”
এমন সময় সাকিবের পকেটে রাখা মোবাইল ফোনটি বেজে উঠল।
মোবাইলের আওয়াজ শুনে নিপু চমকে উঠল। “তোমার পকেটে মোবাইল, কবে নিলে?”
“কবে আবার? মামার কাছ থেকে আদায় করলাম। দাঁড়াও মোবাইলটা রিসিভ করে নেই।”
মোবাইলে সাকিব শুধু আঃ ঠিক আছে ইত্যাদি ইত্যাদি বলে গেল। শেষে আমি বিজি পরে তোকে কল ব্যাক করছি, কেমন? বলে টেলিফোন কেটে দিল। নিপু জিজ্ঞেস করল, “কে?”
“আমার ছোট বোন লিপি। মামা বাড়ি কোন মেহমান এসেছে তা নিয়ে বিরাট লঙ্কা কান্ড। মেহমানদের উপলক্ষে পুকুর থেকে অনেক রুই কাৎলা ধরেছে তার মধ্যে একটা নাকি ছিল বিরাট বড়। কামু ভাই,মানে আমার খালাতো ভাই । সে মাছের ছবি তুলেছে। এই সব গপ্পো। সেজোমামা তো এখনও বিয়ে করেনি তো । নানি, বড় মামা তার জন্য মেয়ে দেখছে এবার আমেরিকা ফিরে যাবার আগে এর একটা ব্যবস্থা করতে চায়। মনে হচ্ছে এটা তারই আলামত।”
লাইব্রেরি থেকে বের হয়ে দু’জনে পাশাপাশি হেঁটে কলা ভবনের দিকে যাচ্ছিল। অপরাজেয় বাংলার কাছে আসতেই দেখল ফুলার রোড থেকে একটা পুলিশের একটা ভ্যান গাড়ি ভো করে চলে গেল। সাইফুল তাদের দিকে তাকিয়ে বলল “দেখ, পুলিশের গাড়ি।”
“পুলিশের গাড়ি তাতে কি হয়েছে? মনে হলো তুমি যেন আজ নতুন দেখলে?”
“আরে না। নতুন না।”
“তবে?”
“গাড়িটা দেখে মামার একটা গল্প মনে পড়ে গেল।”
“কি গল্প?”
মামা আমেরিকাতে একটা গ্যাস ফিলিং ষ্টেশনে চাকরি করেন। সেখানে অনেক আছে ষ্টেশন যা ২৪ ঘণ্টা খোলা। জানুয়ারি ফেব্রুয়ারিতে আমেরিকায় তীব্র শীত পড়ে। আর শীতের সাথে সাথে বৃষ্টি এবং তুষারপাত হয় প্রচুর। সে দেশে আমাদের দেশের মতো ছয়টি ঋতু নয় মাত্র চারটি। সামার, ফল, স্পিরিং ও উইন্টার। সারা বছরই কম বেশি বৃষ্টিপাত হয় বলে সেখানে বর্ষাকালের একটা আলাদা স্থান নাই। তবে শীতকালে বৃষ্টির পরিমাণটাই বেশি।
যাই হোক, গেল শীতের একটা ঘটনা, ‘মামার ডিউটি পড়েছে এক রাতে। আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। হাড় কাঁপানো শীতল হাওয়া সাথে টিপ টিপিয়ে বৃষ্টি। সকাল থেকে সূর্যের মুখ দেখাই যায়নি। সন্ধ্যার আগ থেকে তুষার পড়তে শুরু করেছে। রাত যত বাড়ছে তার পরিমাণটা যেন বেড়েই চলছে। এক সময় রাত গভীর হলো। নীরব নিথর নিশুতি। রাস্তা-ঘাট ফাঁকা। কোথাও কোন গাড়ি-ঘোড়া, যানবাহনের সাড়া শব্দ নেই। মাঝে মধ্যে দু’ একটা এ্যাম্বুলেন্স হু হুয়া করে ছুটে যাচ্ছে। এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগে কোন খদ্দের আসার লক্ষণ নাই ভেবে মামা ষ্টোরের দরজা বন্ধ করে, ‘ক্লোজড ফর ফিফটিন মিনিটস’ একটা সাইন জানালায় লটকায়ে ষ্টোরের পিছনে গিয়ে টানা ঘুম। কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলেন জানেন না। হঠাৎ গাড়ির হেডলাইটের তির্যক আলোতে ঘুম ভেঙে যায় তার। সে দেশের দোকান-পাঠ, ব্যবসায়-প্রতিষ্ঠানে আমাদের দেশের মতো কাঠ বা ইট পাটকেল দিয়ে বেড়া দেওয়া হয় না। বেড়াগুলো থাকে স্বচ্ছ কাঁচের। অতএব, স্বচ্ছ কাঁচের ভিতর দিয়ে তো আলো প্রবেশে বাধা নেই। সজাগ হয়ে দেখেন দরজার সামনে একটা পুলিশের গাড়ি। এবং গাড়ির মধ্যে একজন পুলিশ অফিসার দরজার দিকে মুখ করে তাকিয়ে আছে। মামা তো ভরকে গেলেন।” তাড়াতাড়ি দরজা খুলে জিজ্ঞেস করলেন :
“মে আই হেলপ্ ইউ?”
“ইয়েস, আই নীড টু বাই এ সিগ্রেট।”
মামা একটু স্বস্তি ফিরে পেল তার কোমল বাণী শুনে। মামা এবার হাসি মুখে জিজ্ঞেস করলেন, “ডিড ইউ ওয়েটিং সো লং?”
“নো, নো। মেবি কপল মিনিটস।”
“হোয়াই ইউ ডিড নট হর্ণ ইওর কার অর নকড দ্য ডোর?”
“দ্যাটস ওকে। আই স দ্যা সাইন ‘ক্লোজড ফর ফিফটিন মিনিট’। আই এ্যাম হিয়ার নট ইভেন ফাইভ মিনিটস।”
মামা দরজা খুলে দিয়ে বললেন, “কাম অন ইন স্যার।”
সে ভিতরে এসে সিগারেটের মূল্য পরিশোধ করে চলে গেল। যাবার সময় বলে গেল “থ্যাং য়্যু ভেরিমাচ ওপেন দ্যা ডোর ফর মি।”
“এমন সুন্দর ব্যবহার আমেরিকার পুলিশের।”
“তবে আর কি? আর আমার দেশের পুলিশ হলে?
তা হলে শোন আমার বন্ধু প্রদীপ চক্রবর্তী। বলা চলে সে আমার বাল্য বন্ধু। ক্লাশ এইটে খুলনা সেন্ট জোসেপ হাই স্কুল থেকে শুরু করে খুলনা সিটি কলেজে আমরা ছিলাম সতীর্থ। ইন্টারমেডিয়েট পাশ করে আমি ভর্তি হলাম এসে ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে আর সে ভর্তি হয়েছে খুলনা আযম খান বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে। তারও ইচ্ছা ছিল ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পড়ার কিন্তু বাবার আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে তা আর হয়নি। ওদের গ্রামের বাড়ি বটিয়াঘাটা। খুলনায় আমার মামা বাড়ির পাশেই ওর মামা বাড়ি। সেখানে থেকে সে পড়াশুনা করে।”
লকডাউনে ভার্সিটি যখন বন্ধ হলো আমি খুলনায় চলে গেলাম। ওদের কলেজও বন্ধ হলে সে বটিয়াঘাটা যায়নি। বলল, আর ক’দিন বাদেই তাদের দুর্গাপূজা। পূজার সময় তো বাড়ি যেতে হবে তাই একবারেই যাবে। এ সময়ে ওদের বাড়িতে খুব আমোদ ফুর্তি হয়। সে আমাকে তাদের বাড়িতে যাবার আমন্ত্রণ জানাল। আমারও সময় কাটছিল না সারা দিন বাড়িতে বসে বসে বোরিং। তাই রাজি হয়ে গেলাম।
যেদিন পূর্জা তার পরের দিন। অনেক রাত পর্যন্ত তাসের আড্ডা চলল। ঘুমাতে যাবার কিছুক্ষণ পর টের পাচ্ছি খুব চড়া গলার ডাক.।
চক্রবর্তী মহাশয় ও চক্রবর্তী মহাশয় ঘুমিয়ে আছেন। ওঠেন, ওঠেন তো। আমি চুপচাপ খেয়াল করলাম কে যেন প্রদীপের বাবা মাখনলাল চক্রবর্তীকে ডাকছে।
বাড়ির সামনে রাস্তার পাশে ছোটখাট একটা পান বিড়ির দোকান আছে প্রদীপের বাবার। তাদের ডাক শুনে ঘুম থেকে উঠে একটি ফ্লাস লাইট হাতে ধীরগতিতে তিনি দোকানের কাছে উপস্থিত হলেন। জোসনা রাতের ফিক ফিকে আলোতে দেখতে পেলাম পেট্রল পুলিশের দু’জন সিপাহি এবং একজন কনেষ্টবল সেখানে দাঁড়িয়ে তাকে ডাকছে। তাকে দেখেই একজন জিজ্ঞেস করল আপনি মাখন চক্রবর্তী?
“আজ্ঞে হ্যাঁ।”
“দোকান খুলুন। আপনার দোকানে গোল্ড লীফ আছে?”
“জ্বী না।”
“মার্বোরো, ডানহীল বা ব্যানসান এন্ড হেজিজ?”
“না এগুলো কিছুই নাই স্যার। গাঁও গ্রামে এ সব নামী দামী বিলেতি সিগারেট কে খায়? তাই রাখি না।”
“তবে আছেটা কি?”
“সিগারেটের দাম তো অনেক বেশি গ্রামের মানুষ বিড়িই বেশি খায়। আমার কাছে গোপাল বিড়ি আছে।”
“তবে তাই দেন। তাড়াতাড়ি দোকান খোলেন। দোকানে ভাল মুড়ি চানাচুর আছে?”
প্রদীপের বাবা দোকান খুলে দুই সিপাহীকে দুই প্যাকেট গোপাল বিড়ি দিল। কনেষ্টবল পুলিশটা একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল তাকেও এক প্যাকেট দিতে উদ্যত হলে একজন সিপাহী বলল,স্যার বিড়ি খান না। তাকে ভালো দেখে এক প্যাকেট চানাচুর ও কিছু মুড়ি দেন। এত কিছু হচ্ছে কিন্তু পয়সা কড়ি দেওয়ার নাম নেই। দোকানের পাশে একটা নারকেল গাছ। বেশ সুন্দর নারকেল ধরেছে গাছে। এক সিপাহীর চোখ পড়ল সে দিকে।
“মাখন বাবু এ নারকেল গাছটা কার?”
“আজ্ঞে, ভগবানের কৃপায় আমার।”
“আমাদের তো খুব পিয়াস পেয়েছে, ডাব পাড়তে পারেন?”
“আমি বুড়া মানুষ। এই বয়সে কি গাছে চড়তে পারি?”
“তবে কে পারে?”
“এত রাতে কাকে পাব স্যার?”
“আপনার বাড়িতে বড় ছেলে পেলে নেই?”
“আছে স্যার। ভার্সিটিতে পড়ে। সে গাছে চড়তে পারে না।”
“ভার্সিটিতে পড়ে গাছে চড়তে পারে না ? ডাকেন আপনার ছেলেকে।” প্রদীপের বাবা এসে প্রদীপকে ডাকল-
“প্রদীপ, প্রদীপ উঠত বাবা! এদিকে আয়। থানা থেকে ক’জন বাবু এসেছেন তারা ডাব খেতে চান। এত রাতে তো কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না, কে তাদের ডাব পেড়ে দিবে। দেখতো তুই কোন একটা ব্যবস্থা করতে পারিস কি না?”
বাবার ডাক শুনে আস্তে আস্তে সে দোকানের দিকে গেল। প্রদীপের পিছনে পিছনে আমিও। সে কাছে যেতেই এক সিপাহী জোরে সোরে জিজ্ঞেস করল, এই ছেলে তোর নাম কিরে?
“প্রদীপ চক্রবর্তী।”
“গাছে চড়তে পারিস?”
“না, আমি গাছে চড়তে পারি না।”
“তোর সাথে ওটা কে?”
“আমার বন্ধু সাইফুল।”
তখন পুলিশটি আমায় জিজ্ঞেস করল, তুই পারিস? আমি একটু চুপ থেকে বললাম, “হ্যাঁ পারি।”
“ঠিক আছে চড়।”
এ সময়ে প্রদীপ বলল না না, সাইফুল তোর গাছে চড়তে হবে না। আমি কাউকে ডেকে আনছি। আমি বললাম, ঠিক আছে আমি পারব। ঘর থেকে একটা গামছা নিয়ে আসি। ঘরে ফিরে আমার ব্রিফ কেসটা খুলে মেজোমামা খুলনা রেঞ্জের র্যা ব অধিনায়ক উটিং কমান্ডার মেজবাহ উদ্দিন আহমেদের একটাগ্রুপ ছবি নিয়ে সেখানে হাজির হলাম। যে ছবিতে মামা র‍্যাবের পোশাক পরা। সাথে সেজো মামা, লিপি ও আমি। ছবিটা সেজো মামার ডিজিটাল ক্যামরায় তোলা। সেদিন রেটিনা ষ্টুডিও থেকে প্রিন্ট করেছিলাম। ছবিগুলো আমার ব্রিফকেসেই ছিল। গামছা না নিয়ে একটা কলম ও একটা খাতা নিয়ে হাজির হলাম সেখানে। আমাকে খালি হাতে ফিরতে দেখে এক সিপাহী রেগে গিয়ে জিজ্ঞেস করল-
“এই ছেলে গামছা এনেছিস, গামছা কই ?
“হ্যাঁ” বলেই মামার ছবিটা তুলে ধরলাম দেখেছেন এটা কে? তার পাশে দাঁড়ানো ছেলেটা?
এই ছেলে আমি আর আমার পাশের ব্যক্তি খুলনা রেঞ্জের র্যা ব অধিনায়ক উইিং কমান্ডার জনাব মেজবাহ উদ্দিন আহমেদ। বোনাস হিসেবে এই নিন তার পার্সোনাল কার্ড ।
কার্ডটি হাতে নিয়ে পুলিশ অফিসার থমকে গেল ।
আমি তখন জিজ্ঞেস করলাম , কি ব্যাপার ভাবছেন কী ?
শুধু ডাব খাবেন কেন? ডাবের পানি দিয়ে গোসলও করবেন। প্রদীপ আমার মোবাইলটা নিয়ে আয় তো। এখনই মামাকে কল করে দেই। মামাই এদের গোসলের ব্যবস্থা করবে।
ওরে বাবা, সে কি কাণ্ড! ক্ষীপ্ত কেউটের লেজে বেজীর পা পড়লে কেউটে যেমন ফোঁস ফোঁসানি বন্ধ করে গর্তে পালাবার রাস্তা খোঁজে ঠিক তেমনি পানি পিপাসা ভুলে পুলিশদল পালাবার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ল। এক পুলিশ বলল,
“আরে ভাগ্নে, এত রাতে কে ডাব খায়? আমরা একটু মসকরা করেছিলাম মাত্র।”
আমি তখন শক্ত ভাষায় বললাম, না, না ডাব আপনাদের খেতেই হবে। আর কেউই আপনাদের ডাব পেড়ে দিবে না। নিজেরা পেড়ে খান। না পারলে ডু নট ডিসটার্ব এ্যনিবডি ওকে। সামনে এক পুলিশের নেম ট্যাগ দেখে বললাম আপনার নাম আব্দুল মালিক ব্যাজ নাম্বার কত ? আরেক জনের দিকে আঙ্গুল নির্দেশনা করে জিজ্ঞেস করলাম ওনার নাম? আব্দুল মালিক বলল, তার নাম আব্দুর রহিম।
“রহিম? মানে রাজকুমার রহিম! আপনাদের কারো আর রূপবানের কাছে ফিরে যেতে হবে না কাল থেকে স্থান হবে শ্রীঘরে।”
পাশে দাঁড়ানো কনেষ্টবল পুলিশটা এবার মুখ খুলল, আমাদের মাফ করে দাও ভাগ্নে। তারা না বুঝে এত বাড়াবাড়ি করেছে, এমন কাজ আর কখনও হবে না বাবা! সত্যি সত্যি এমন ভুল আর হবে না। চাকরিটা হারালে আমাদের পরিবার পরিজনযে পথে বসবে।
“পরিবার পরিজন ? সে জ্ঞান আপনাদের আছে?
ঠিক আছে। এ এলাকায় যেন এমনটি দ্বিতীয়বার আর না ঘটে। প্রদীপকে দেখেছেন? সে আমার বন্ধু। তাদের এলাকায় এমনটি হলে আপনাদের কারো রক্ষে থাকবে না, বুঝলেন?
আর শুনুন, দোকান থেকে যেসব বিড়ি ও মুড়ি চানাচুর নিয়েছেন তার মূল্য পরিশোধ করুন। নইলে আপনাদের খবর আছে ? এটা মগের মুল্লুক না , যে পুলিশ বলে যা খুশী তাই করবেন । এটা বাংলাদেশ ।
আমাদের কোলাহল শুনে সেই মধ্যরাতেই অনেক লোকজনের সমাগম হয়ে গেল। পাশের বাড়ির এক ভদ্রলোক বলে উঠলেন, ভাগ্নে তুমি মানব, নাকি ভগবানের অবতার? তোমার জন্য আমরা আজ এমন একটা অত্যাচার থেকে রক্ষা পেলাম। আমাদের এই এলাকায় এ অত্যাচার নিত্যদিনের প্রতিচ্ছবি। শুধু নিরবে সহ্য করে যাচ্ছি। ভগবান তোমার মঙ্গল করুন,বাবা।
উৎফুল্ল জনতা আনন্দে চিৎকার দিয়ে উঠল মামা ভাগ্নে- জিন্দাবাদ।

শনিবারের চিঠি/আটলান্টা/ জুলাই ১১,২০২০


Please click here to read English in Google Docs.

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১২:২৩ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ১১ জুলাই ২০২০

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com