মানুষ চাই, মানুষ

শনিবার, ২৩ জুলাই ২০১৬

মানুষ চাই, মানুষ

মানুষ চাই, মানুষ

ইমদাদুল হক মিলন 


 

মুক্তভদ্রলোক ভীতু স্বভাবের। তাঁর একটিমাত্র ছেলে। ছেলে অতি দুরন্ত, সাহসী এবং শিকারপ্রিয়। ভদ্রলোক একদিন স্বপ্ন দেখলেন, তাঁর শিকারে বেরোনো ছেলেকে একটা সিংহ মেরে ফেলেছে। ভদ্রলোক খুবই ভয় পেলেন। ভাবলেন, ছেলের যেহেতু শিকারের নেশা, তার ভাগ্যে নিশ্চয় সিংহের হাতেই মৃত্যু। ছেলের জন্য তিনি উঁচু দেয়ালঘেরা একটা ঘর তৈরি করলেন। চারদিকে প্রহরী নিযুক্ত করলেন। ছেলেকে সেই ঘরে আটকে রাখলেন, যেন সে কিছুতেই ঘর থেকে বেরোতে না পারে। কিন্তু ঘরবন্দি ছেলের সময় কাটবে কী করে? এ জন্য তিনি ছেলের মনোরঞ্জনের ব্যবস্থা করলেন ঘরের ভেতর। বহু টাকা খরচ করে ঘরের দেয়াল ভরে দিলেন জন্তু-জানোয়ারের ছবিতে, যেন দেয়ালের দিকে তাকালেই বনের স্বাদ পায় ছেলে।

সেখানে সিংহের ছবিও ছিল।

কিন্তু শিকারপাগল ছেলের কি ওসব ছবি দেখে মন ভরবে? ছবি দেখে সে বিরক্ত ও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। একদিন সিংহের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বলল, ধিক তোমাকে! তোমার জন্য আর আমার বাবার মিথ্যা স্বপ্নের জন্য আমাকে বন্দিজীবন যাপন করতে হচ্ছে। আমি তোমাকে এখন উচিত শিক্ষা দেব।

রাগে-ক্রোধে অন্ধ হয়ে সিংহের ছবিতে শরীরের সব শক্তি দিয়ে সে একটা ঘুষি মারল। ঘুষি গিয়ে লাগল দেয়ালে। প্রচণ্ড ব্যথা পেল সে। নখ ছিন্নভিন্ন হলো, আঙুল ফুলে গেল। প্রবল জ্বরে আক্রান্ত হলো সে। এই জ্বর আর সারল না। ছেলে মারা গেল।

এটা ঈশপের গল্প।

আমরা এ রকম বাবা চাই না। আমরা চাই সেই বাবার মতো বাবা, সেই মায়ের মতো মা। বাবা ছোট চাকরি করেন। দশটা ছেলেমেয়ে। তাদের ভরণ-পোষণে প্রাণান্তকর অবস্থা। অফিসের আগে-পরে টিউশনি করেন ভদ্রলোক। সকালবেলা বেরিয়ে বাড়ি ফেরেন অনেকটা রাত করে। কিন্তু নাশতা করতে বসে ছেলেমেয়েদের খোঁজখবর নেন। সকালবেলা তারা কে কী পড়ল আজ, স্কুলের পড়া ঠিকঠাকমতো করেছে কি না! তারপর সারা দিনের কর্মপরিকল্পনা বলে দিয়ে যাচ্ছেন ছেলেমেয়েদের। স্কুলে অবশ্যই যেতে হবে, ফিরে এসে খেয়েদেয়ে যাবে মাঠে খেলা করতে, কারো ইচ্ছা হলে যাবে পাড়ার পাঠাগারে, বই পড়বে। পাড়ায় সংস্কৃতিচর্চার ক্লাব আছে। কেউ কেউ সেখানেও যায়। তা যাবে, কিন্তু সন্ধ্যার আগে অবশ্যই বাড়ি ফিরতে হবে। পড়তে বসতে হবে। রাতের বেলা বাড়ি ফিরে স্ত্রীর কাছ থেকে তিনি খবর নেন, তাঁর কথামতো চলেছে কি না ছেলেমেয়েরা!

প্রচণ্ড গরম পড়েছে। ফ্যান কেনার সামর্থ্য নেই। ছেলেমেয়েরা শুয়ে আছে লাইন ধরে। গরমে ঘামে অতিষ্ঠ। হাড়ভাঙা ক্লান্তির পরও ভদ্রলোক তালপাখায় ঘুমন্ত ছেলেমেয়েদের বাতাস করছেন। সংসারের রান্নাবান্না, ছেলেমেয়েদের সামলে রাখা স্ত্রী ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন। ভদ্রলোক ঘুমে ঢলে পড়ছেন, কিন্তু তাঁর হাতের পাখা থামছে না।

একাত্তর সালে এই ভদ্রলোক মারা গেলেন। ঘরে দশটা টাকা নেই। এতগুলো ছেলেমেয়ে নিয়ে মায়ের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। দেশে চলছে মুক্তিযুদ্ধ, এই মা যুদ্ধ শুরু করলেন দশটা ছেলেমেয়েকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য, মানুষ করার জন্য। পৈতৃক সম্পত্তি কিছু পেয়েছিলেন, ওই বিক্রি করে করে, একবেলা ভাত দুবেলা উপোস, ছেলেমেয়ে মানুষ করতে লাগলেন। সেই মায়ের বয়স তখন চল্লিশ। স্বামী মারা গেলেন চুয়াল্লিশ বছর বয়সে। কিন্তু একটি ছেলেমেয়েকেও বখে যেতে দিলেন না মা। আদরে-শাসনে মানুষ করলেন তাদের। শিক্ষিত করলেন প্রত্যেককে। মেয়েদের ভালো ঘরে বিয়ে হলো, ছেলেরা কেউ ব্যবসায়ী, কেউ চাকরিজীবী, কেউ বিদেশে কর্মরত।

আমরা এ রকম বাবা-মা চাই।

হাজার বছর আগে চানক্য পণ্ডিত বলেছিলেন, ‘পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত সন্তানকে আদর দাও। তারপর আঠারো বছর বয়স পর্যন্ত তাদের শাসনে রাখো। তার পর থেকে বাকি জীবন সন্তানের বন্ধু হও।

’ আমরা এ কথা মনে রাখি না।

প্রবোধকুমার সান্যাল পুরনো বাঙালি লেখক। বলেছিলেন, ‘সন্তান জন্ম দেওয়া সহজ, পিতা হওয়া কঠিন।’

এ কথাও আমরা মনে রাখি না।

ভেতরে ভেতরে অনেক সর্বনাশ হয়ে গেছে আমাদের। আমাদের স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে উধাও হয়ে গেছে মাঠ। ছেলেমেয়েদের খেলার জায়গা নেই। পাড়ায় পাড়ায় পাঠাগার ছিল একসময়। উধাও হয়ে গেছে। সংস্কৃতিচর্চার ক্লাব ছিল। নানা রকমের অনুষ্ঠান করত সেই ক্লাবগুলো। ছেলেমেয়েরা ব্যস্ত থাকত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে। উধাও হয়ে গেছে সেই সব ক্লাব। আমাদের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোতে একটা বইয়ের আলমারি ছিল। শুধু শহরে না, গ্রামে-গঞ্জেও ছিল। উধাও হয়ে গেছে সেই আলমারি। নতুন নতুন প্রযুক্তি এসে জীবনধারা বদলে দিয়েছে। প্রযুক্তির সুফল আমরা পাচ্ছি ঠিক আছে, কুফলগুলো এড়াতে পারছি না। আমরা আমাদের সন্তানদের ঘরে বন্দি করে ফেলেছি। শুধু সন্তানদের দোষ দিয়ে লাভ কি, আমরা অভিভাবকরাই তো নষ্ট হয়ে গেছি! একটু অবস্থাপন্ন ঘরের ছেলেমেয়েদের পড়তে পাঠাচ্ছি বিদেশে। সেখানে গিয়ে সে কতটা পড়ছে, কী করছে, কাদের সঙ্গে মিশছে, খবর নেই। দেশেই বা কী করছে আমার সন্তান? তার স্কুল ঠিক আছে কি না, কলেজ ইউনিভার্সিটি ঠিক আছে কি না, সে কার সঙ্গে মিশছে, কী করছে, কজন অভিভাবক সেই খোঁজখবর রাখছি?

আরেকটি সমস্যা হয়েছে ভালো রেজাল্ট। জিপিএ ৫ পেতে হবে, গোল্ডেন জিপিএ পেতে হবে। এক মাকে দেখলাম ঢাকার এক নামকরা স্কুলে। মেয়ে রেজাল্ট নিয়ে বেরিয়েছে। রেজাল্ট ভালো হয়নি। ওখানেই মেয়েকে তিনি মারতে লাগলেন।

আমরা এ রকম মা চাই না।

প্রত্যেক সন্তান মেধাবী ছাত্র হবে; জিপিএ ৫ পাবে, দরকার নেই। সন্তানদের দরকার প্রকৃত মানুষ হয়ে ওঠার শিক্ষা। আমার সন্তান প্রকৃত অর্থেই শিক্ষিত হলো কি না, সৎ চরিত্রের হলো কি না, দেশপ্রেমিক হলো কি না, কর্তব্যপরায়ণ হলো কি না, আমরা তা-ই চাই।

আমরা এমন অভিভাবক চাই না।

আমরা চাই, সন্তানকে সময় দেবেন অভিভাবক। তার প্রতিদিনকার জীবনের খবরটা রাখবেন। সে কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে, তার বন্ধুবান্ধব কারা? রাত জেগে সে কম্পিউটারে কী কাজ করে? ফেসবুক আসক্তি কতটা? তার মধ্যে কোনো শূন্যতাবোধ তৈরি হলো কি না, মানসিকভাবে সে বদলে যাচ্ছে কি না, অসৎ সঙ্গে পড়ল কি না! চারদিকে নষ্ট হয়ে যাওয়ার এত উপকরণ, সে কোনো খারাপ পথে পা বাড়াল কি না! আমরা অভিভাবকরা যদি মনে করি, ভালো স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটিতে আমার ছেলেমেয়ে পড়ছে, গাড়ি বাড়ি ফ্ল্যাট টাকা, জৌলুসের অভাব রাখিনি, তার দিকে আর ফিরে তাকাবার দরকার কী? সে তো মানুষ হচ্ছেই!

মানুষ হওয়া কি এত সহজ?

মুরব্বিদের দোয়া চাইতে গেলে তাঁরা বলেন, মানুষ হও। কী অর্থ এই মানুষ হওয়ার, সেটা বুঝতে হবে। মা বাবা অভিভাবকের যত্ন ও সাহচর্য ছাড়া সন্তান মানুষ হবে না। অভিভাবক, শুধু অভিভাবকরাই পারেন তাঁর সন্তানকে মানুষ করতে। অভিভাবকদের সচেতনতা ছাড়া গতি নেই।

আমরা ফার্মের মুরগি চাই না, আমরা মানুষ চাই। ‘আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে’—শুধু দুধেভাতে আমরা সন্তান রাখতে চাই না। আমরা চাই, তারা মানুষ হোক। এমন অভিভাবক যেন আমাদের হতে না হয়, সন্তানের লাশ পড়ে থাকবে মর্গে, আমরা তার লাশও আনতে যাব না। সন্তানের অপরাধের জন্য দেশের মানুষের কাছে, পৃথিবীর মানুষের কাছে যেন ক্ষমা চাইতে না হয়।

আমরা মানুষ চাই, মানুষ। এই মানুষ তৈরির দায়িত্ব অভিভাবকদের।

শনিবারের চিঠি /আটলান্টা/ জুলাই ২৩ , ২০১৬

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১১:০০ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ২৩ জুলাই ২০১৬

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com