ছোট গল্পঃ

মহামারির ভূত

মহামারির ভূত
অলঙ্করণঃ রৌদ্র মিত্র

উনিশ শতকের শেষের দিকে কথা। জামাই সরকারি কাজ করেন, হিল্লি না দিল্লি কোথায় যেন থাকেন। তাই শ্বশুরবাড়ি বিশেষ আসা হয় না। স্ত্রী অপেক্ষায় থাকেন বাপের বাড়িতেই। বহু কাল বাদে, অবশেষে মিলল ছুটি। জামাই শ্বশুরবাড়ি এলেন। শ্বশুর, শাশুড়ি, স্ত্রী সবাই অভ্যর্থনা করলেন। তবু কোথায় যেন একটা খটকা লাগছে। চার পাশটা যেন বড্ড নিশুতি। গ্রামের বাকি লোকজন সব কি সাততাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ল না কি! তা কী আর করা? পথের ক্লান্তি এবং এত দিন বাদে প্রিয়তমার দেখা পেয়ে জামাই আর অত মাথা ঘামান না। স্নানাদি করেই বসে যান খেতে। যথারীতি ধূমায়িত ভাত আর সঙ্গে রয়েছে চর্ব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয়। তবে প্রথম গ্রাসটি রসনাগ্রে দিয়েই জামাইয়ের মনে হল, একটু নেবু থাকলে আর জমত খাওয়াটা। স্ত্রীকে বললেন, “হ্যাঁ গো, একটা লেবু দেবে?”

স্ত্রী তো খুবই লজ্জিত। বললেন, “এ মা, ভুলে গেছি! এই দিচ্ছি।”


বলেই জানলা দিয়ে বাড়িয়ে দিলেন হাত পাশের মাঠের লেবুগাছটার দিকে। জামাইয়ের মুখের গ্রাস মুখেই রয়ে গেল। গেলা আর হল না। হবে কী করে? লেবু গাছটা যে প্রায় ২০ গজ দূরে! মানুষের হাত অমন লম্বা হয় না কি? ব্যস! জামাই তো অজ্ঞান। জ্ঞান ফিরতে পড়শিরা বললেন, “খুব বেঁচে গেছ বাছা। তোমার শ্বশুরকুল তো কবেই কলেরায় গত হয়েছেন। যাঁদের দেখেছ তাঁরা সবাই প্রেতযোনি।”

আমার মতো আমার বয়সি অনেক বাঙালিই হয়তো ছোটবেলায় এ গল্প পড়েছেন। কারও কারও স্মৃতিতে হয়তো আজও জাগ্রত রয়েছে গল্পের সঙ্গের আঁকা ছবিখানা। তবে এই গল্প কিন্তু বিশ শতকের গল্প নয়। এ গল্প প্রথম শোনা যায় ১৮৮০ নাগাদ। এবং এতে আশ্রিত উনিশ শতকের কলেরা এবং ম্যালেরিয়ার জনপদবিধ্বংসী একাধিক মহামারির সামাজিক স্মৃতি।

স্মৃতি ব্যাপারটিকে আমরা প্রায়শই শুধু নিছকই ব্যক্তিগত বিষয় বলে ধরে নিই। বিশেষজ্ঞরা কিন্তু এ বিষয়ে অন্য মত পোষণ করেন। ফরাসি দার্শনিক মরিস হালবোয়াক্স প্রথম স্মৃতির এই গোষ্ঠীগত রূপের দিকে মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বলেন যে, স্মৃতি সব সময়ই গোষ্ঠীগত, এবং তা নির্ভর করে একটি নির্দিষ্ট সামাজিক পরিকাঠামোর উপর। এই ‘গণস্মৃতি’-ই আমাদের শিখিয়ে দেয় কী মনে রাখব এবং কেমন করে মনে রাখব। দৈনন্দিন জীবনের নানা ছোট-বড় ঘটনার অবিশেষ ধারাকে বিশেষায়িত করে ব্যক্তিগত স্মৃতি তৈরি হয় আসলে গণস্মৃতির উপর জোর দিয়েই।

হালবোয়াক্স-এর পরবর্তী কালের গবেষকরা এই গণস্মৃতির হদিস দিতে গিয়েই প্রায়ই খুঁজে পেয়েছেন নানা রকম ভূতের গল্প। বহু দেশের গবেষকরা দেখেছেন কেমন করে ভূতের গল্পের মধ্যে দিয়ে সমাজ গণস্মৃতি গঠন এবং চর্চা করে। তারই মধ্যে অন্তর্নিহিত থাকে সেই সমাজটির আত্মসত্তা। প্রতিটি নতুন প্রজন্ম বিগত প্রজন্মের সামাজিক সত্তার সঙ্গে নিজেদের গোষ্ঠীগত সত্তাকে জুড়তে শেখে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া কিছু গণস্মৃতির মাধ্যমে। এবং শুনলে হয়তো অনেকে অবাক হবেন, এই উত্তরাধিকারের একটি বড় অংশই হল ভূতের গল্প।

ত?? বে এ কথাও মনে রাখতে হবে যে, এ সব গল্পের মধ্যে দিয়ে যে ঠিক কিসের স্মৃতি ধারাবাহিত করা হচ্ছে, সেটা কিন্তু সব সময় ঠিক পরিষ্কার নয়। ভূতের গল্প গণস্মৃতির ধারক মানে যে, তা কেবল আমাদের ব্রহ্মদত্যি বা শাঁকচুন্নি চিনতে শেখাচ্ছে, তা কখনও নয়। বাংলা, কিংবা সংস্কৃতে, ‘ভূত’ শব্দটিরই তো দুটো পৃথক অর্থ। এক দিকে তার মানে নিছক প্রেত বা বিদেহী আত্মা। কিন্তু অর্থান্তরে ভূত মানে সমগ্র অতীত। তাই ভূতের গল্প কখনওই কেবল প্রেতযোনির আখ্যায়িকা নয়, তা ধারাবাহিত করে সেই সব মূল্যবোধকেও, যারা অতীতের সামাজিক সত্তার কেন্দ্রবিন্দু গঠন করে।

জামাইয়ের লেবু চাওয়ার গল্পটাই ধরা যাক। এর মধ্যে ছোট বড় নানা মূল্যবোধ ও সামাজিকতার হদিস লুকিয়ে আছে। জামাইয়ের শ্বশুরকুলের প্রতি কর্তব্য কী হওয়া উচিত, শ্বশুর-শাশুড়ির জামাইয়ের প্রতি কেমন আচরণ করা উচিত, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত, এই সবই তো আমরা শিখেছি ছোট বেলায় এই সব গল্পের মাধ্যমে। তার সঙ্গে এটাও শিখে গেছি যে, এই সমস্ত সম্পর্ক এবং আনুষঙ্গিক কর্তব্যের উপর অভাবনীয় চাপ সৃষ্টি করেছিল উনিশ শতকে একের পর এক আসা মহামারি। কলেরা বস্তুটি যে ঠিক কী, খায় না গায় মাখে, তা জানার আগেই বাঙালি খোকা-খুকুরা ভূতের গল্পের মাধ্যমে জেনে যেত যে, তাতে আমাদের অনেক পূর্বপুরুষের প্রাণ গেছে। তবে তারা এও শিখেছিল যে, মড়কের চাপে আমাদের সমাজ ধ্বংস হয়ে যায়নি। মৃত্যুর পরেও আমাদের পূর্বপ্রজন্ম তাঁদের সামাজিক কর্তব্য পালন করেছেন। এই পাঠ গ্রহণের মধ্য দিয়েই তো আমরা আমাদের অতীত ঠিক কী ছিল, আমাদের সামাজিক কর্তব্যগুলো কী রকম এ সব শিখি। তারই সঙ্গে এও শিখি যে, যারা ওই সব মহামারির মুখোমুখি হয়েছিল, তাদের আমরা ব্যক্তিগত ভাবে না চিনলেও তারা আমাদেরই সমাজের অন্তর্ভুক্ত। ফলে নির্মাণ হয় অতীত এবং বর্তমানকে বেণীবদ্ধ করে আমাদের আত্মসত্তা।

ত?? বে গণস্মৃতি কোনও দিনই স্থবির নয়। যখনই সমাজের অবয়ব ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয়, তার সঙ্গে স্মৃতির রংগুলোও বদলায় ক্রমশ। ১৮৮০-৯০ সালে কৃষ্ণনগর অঞ্চলে জামাইয়ের গল্প শোনেন কৃষ্ণনগরের মহারাজার বিখ্যাত দেওয়ান, কার্তিকেয়চন্দ্র রায়। তবে সেই গল্পের সঙ্গে আমার ছেলেবেলার গল্পের বেশ কিছুটা ফারাক রয়েছে। দেওয়ান সাহেবের শোনা গল্পে ভূতের দেখা মিলেছে শ্বশুরবাড়ি পৌঁছনোর অনেক আগেই। শ্বশুরবাড়িগামী জামাইবাবাজি পথে সন্ধে হয়ে যাওয়ায় একটি অচেনা গ্রামে আশ্রয়ের খোঁজ করেছেন। বহু হাঁকডাকের পর, শেষে গ্রামের একটি প্রাচীন অট্টালিকাতে এক অসুস্থ বৃদ্ধ তাকে আশ্রয় দেন। পরে যথারীতি লম্বায়িত হাত দেখে জামাই বোঝেন, বৃদ্ধ হলেন কলেরা বা ম্যালেরিয়াতে মৃত প্রেত। বৃদ্ধ তখন বুঝিয়ে বলেছেন যে, ভয়ের কারণ নেই। প্রেত হলেও বৃদ্ধ কখনও ব্রাহ্মণসন্তানের অনিষ্ট করবেন না। কিন্তু জামাই যখন তাঁর কেউ নয়, তা হলে কেনই বা বৃদ্ধ এত যত্ন করে তাকে আশ্রয় দিলেন বা তার খাওয়াদাওয়ার জন্য এত ব্যস্ত হলেন?

আবারও উঠে আসে জামাইটির বর্ণের সংসর্গ। বৃদ্ধ জানান যে, ব্রাহ্মণ অতিথিকে দোর থেকে ফেরাতে নেই এবং ব্রাহ্মণ অতিথিকে উপবাসী রাখা তো মহাপাপ। তার সঙ্গে অবশ্য বৃদ্ধের একটি অনুরোধও ছিল। তিনি এবং তাঁর পরিবারের সকলেই মহামারিতে মৃত। তাই শ্রাদ্ধশান্তি কিছুই হয়নি। পারলৌকিক ক্রিয়াকর্ম অসম্পূর্ণ থাকায় বৃদ্ধের পরিবারের সকলেই প্রেতাবস্থা প্রাপ্ত হয়েছেন। তাই তাঁর অনুরোধ, হয় অন্যত্র তাঁর আত্মীয়দের খবর দিয়ে বা নিজেই শ্রাদ্ধাদি করে তাঁদের মুক্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

ব্রাহ্মণ অতিথির এই গল্প একা দেওয়ান সাহেব শোনেননি। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের পিতামহ সুরেন্দ্রমোহন ভট্টাচার্য, যাঁর লেখা ‘পুরোহিত দর্পণ’ আজও অনেক কুলকর্মে অপরিহার্য, তিনিও এই একই রকম একটি কাহিনি লিপিবদ্ধ করেছেন। ওই একই সময়। সুরেন্দ্রমোহন আরও জানিয়েছেন যে, এই গল্পটি লোকমুখে পরিচিত ‘গদখালীর হাত’ নামে। বলাই বাহুল্য যে, জনশ্রুতি বা ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সাধারণত কোনও বিশেষ নাম হয় না। কিন্তু এই গল্পটির হয়েছিল। বিশের দশকে লোকসংস্কৃতি গবেষক বীরেন বন্দ্যোপাধ্যায়ও ‘গদখালীর হাত’ নামেই এই গল্পটির সঙ্গে পরিচিত হন। তিনি এও জানান যে, বাংলার ঘরে ঘরে এই কাহিনিটি সুপরিচিত এবং সবাই এটাকে খুলনা জেলার গদখালী গ্রামের সত্য ঘটনা বলেই জানেন। আরও পরে, বিখ্যাত ভাষাবিদ সুকুমার সেনও এই গল্পের ‘গদখালীর হাত’ নামে বহুল প্রচারের উল্লেখ করেছেন। সত্তরের দশকেও গজেন মিত্র বা মনোজ বসুর লেখা গল্পের মধ্যে পাই ‘গদখালীর হাত’ নামের এই একই গল্পের উল্লেখ।

তবে তত দিনে গল্পের অভ্যন্তরীণ ছকের অনেক পরিবর্তন ঘটেছে। এবং তাতেই ইঙ্গিত রয়েছে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পাল্টে যাওয়া সামাজিক মূল্যবোধের। ব্রাহ্মণ অতিথি ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছেন বাড়ির জামাই। হাত লম্বা করা প্রেতটি, অজ্ঞাত কোনও বৃদ্ধ না হয়ে হয়ে উঠেছেন প্রথমে শাশুড়ি, এবং আরও পরে, জামাইয়ের স্ত্রী স্বয়ং। যেখানে উনিশ শতকের গল্পে অপরিচিত ব্রাহ্মণকে আপ্যায়ন করতে মৃত গৃহস্বামীকে তাঁর হাত লম্বায়িত করতে হয়েছিল, সেখানে বিংশ শতকের গল্পগুলিতে গৃহস্বামীর দেখাই পাওয়া ভার! জামাইকে অভ্যর্থনা করেন শাশুড়ি, বা আর একটু পরের গল্পে, তাঁর সহধর্মিণী। শ্বশুরমশাই এ সব গল্পে একেবারেই প্রান্তিক চরিত্র। লম্বায়িত হাতখানা, তা সে শাশুড়িরই হোক আর স্ত্রীরই, মেয়েলি হাত। পুরুষালি নয়।

বর্ণাশ্রিত অতিথিসেবা এবং তার উজ্জ্বল ব্রাহ্মণ্যবাদ চাপা পড়ে গেছে প্রথমে গ্রাম্যসমাজের জামাই আদরের স্নেহাচ্ছাদনে এবং পরবর্তী সময়ে নিছক দাম্পত্যপ্রেমের সিক্ত বসনে। ধীরে ধীরে এমন গল্পও চালু হয় যেখানে শ্বশুরবাড়ির বাকি ভূতেরা জামাইয়ের অনিষ্ট করতে উদ্যত, কিন্তু স্ত্রী সেখানে তাঁর স্বামীর রক্ষক। ১৯০২ সালে স্যর উইলিয়াম ক্রুক সাহেবের সংগ্রহ করা এ রকম একটি গল্পে আবার স্ত্রী এ-ও বলে দেন যে, তিনি পরের বছর তাঁরই কাকার বংশে জন্মগ্রহণ করবেন, এবং তাঁর স্বামী যেন সেই মেয়েটিকেই আবার বিয়ে করেন। এতে জন্ম-জন্মান্তরের যোগ তো বজায় থাকবেই, সঙ্গে কাকারা শ্বশুরবাড়ির সম্পত্তিও জামাইবাবাজিকে দিয়ে দিতে রাজি হয়ে যাবেন। এমনই সব খুঁটিনাটি মামুলি বৈষয়িক আলাপচারিতার মধ্যেই তো ধরা পড়ে যৌথ পরিবারের পরিকাঠামোর মধ্যে থেকে ধীরে ধীরে আধুনিকতার দিকে এগিয়ে চলা স্বামী-স্ত্রীর দাম্পত্য সম্পর্কের ইতিহাস।

তবে এ সবের উপরেই কিন্তু ছায়া পড়েছে মহামারির। সমস্ত আয়োজনই মহামারির ফলস্বরূপ। কিন্তু সেই ছায়ার তলায় মৃত্যুভয়ের থেকে বেশি যে ভাবটি দেখা গেছে, তা হল, পরিচিত সামাজিকতা এবং মূল্যবোধগুলিকে জিইয়ে রাখার তাগিদ। এই সব গল্পে মৃত্যুভয়ের প্রায় উল্লেখ নেই বললেই চলে। বরং প্রেতেদের অতি সাধারণ জীবনযাপন বা পুনর্জন্মের উল্লেখের দ্বারা মৃত্যুকে যেন বৃহত্তর জীবনলীলার একটি ছোট দৃশ্য রূপে অঙ্কিত করা হয়েছে। গল্পগুলি একটিও বিয়োগান্ত নয়। বরং গল্পের মধ্যে যে চিন্তাটি সর্বোপরি, তা সামাজিক কর্তব্য সংক্রান্ত। মহামারির মুখোমুখি বাঙালি যতটা না ভয় পেয়েছে ব্যক্তিগত মৃত্যুকে, তার থেকে সে যেন বেশি ভয় পেয়েছে সামাজিক মৃত্যুকে। তার সামাজিক সত্তা বাঁচিয়ে রাখতে সে এতটাই ধাবিত হয়েছে যে, তার গণস্মৃতিতে সমুজ্জ্বল হয়ে রয়েছে মৃত্যুর পরেও সামাজিকতা বজায় রাখার তাগিদ।

সত্তরের দশকে এই ‘গদখালীর হাত’ আবার দেখা দিয়েছে নতুন রূপে। তখন আর ঠিক স্বতন্ত্র জনশ্রুতি হিসেবে নয়। বরং আত্মসচেতন সাহিত্যিকের ইচ্ছাকৃত কৃষ্টির মধ্যে। গজেন্দ্রকুমার মিত্রের ‘বহু দূরের দেশ’ বা মনোজ বসুর ‘সীমান্ত’-র মতো সব ছোট গল্পে গদখালীর হাত হয়ে উঠেছে উপমা। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অত্যাচারের মুখে দঁড়িয়ে সেই উপমা মনে করিয়ে দিয়েছে বাঙালি জাতিসত্তার কথা। মনে করিয়ে দিয়েছে যে কী হিন্দু কী মুসলমান সকল বাঙালিই গদখালীর হাতের সঙ্গে পরিচিত। এবং এই এজমালি গণস্মৃতিই তাদের মিলিত সমাজের ঐকতান। দু’টি গল্পেই গদখালীর হাত মনে পড়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত গ্রামবাংলার মুখ দেখে। নায়ক-নায়িকা শিউরে উঠেছেন যুদ্ধের ভিতর মহামারির ভ ূত দেখে। কিন্তু তার থেকেই তাদের মনে পড়েছে সামাজিক কর্তব্য। আশ্রয় ও আহার দিয়ে পশে দাঁড়িয়েছেন যুদ্ধবিধ্বস্ত বাঙালির। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে।

হয়তো অনেকের মনে হবে যে, আধুনিক সাহিত্যে উপমারূপে ব্যবহৃত গল্পকে ঠিক লৌকিক গল্পের সমগোত্রীয় বলা চলে না। যুক্তিটি আপাতদৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য। তাই এও মনে রাখা উচিত যে, এই সব আধুনিক সাহিত্যের পাশাপাশি গদখালীর হাত কিন্তু বিংশ শতাব্দীর শেষ প্রান্তে এসেও বেঁচে ছিল জনবিশ্বাস এবং জনশ্রুতির মধ্যে। সম্প্রতি বিশিষ্ট সরোদবাদক, পণ্ডিত অনিন্দ্য বন্দ্যোপাধ্যায়, তাঁর একটি লেখায় উল্লেখ করেছেন যে, তিনি গদখালীর হাতের গল্প শোনেন কয়েক বছর আগে প্রখ্যাত সরোদবাদক বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের কাছে। বুদ্ধদেববাবু গল্পটি বলেছিলেন ওঁদের যশোরের সর্বজনবিদিত জনশ্রুতি হিসেবেই। তাই আবারও ফিরে যেতে হয় সুকুমার সেনের প্রাসঙ্গিক মন্তব্যে। তাঁর মতে বাংলা সাহিত্যে ভূতের গল্প যদিও নিতান্তই আধুনিক কালের সৃষ্টি, তার মালমশলা কিন্তু প্রায়শই সংগৃহীত হয়েছে লোকবিশ্বাস এবং জনশ্রুতির সুপ্ত ধারা থেকে। ফলে আধুনিক সাহিত্যিক ভূত আর লোকমুখে শোনা ভূতের গল্প সমগোত্রীয় না হলেও, তাদের একটা আত্মীয়তা রয়েছে।

ফলে আমরা দেখছি যে, যে বাঙালিয়ানা ১৮৮০ সালে জড়িয়ে ছিল বর্ণশ্রেষ্ঠ ব্রাহ্মণের সেবার অনুশাসনের মধ্যে, ১৯৭০-৭১ সালের যুদ্ধের আঘাতে তা হয়ে উঠেছে সার্বিক বাঙালি জাতির আত্মীয়তা বোধের ধারক। এ সবের মধ্যে দিয়েই সামাজিক কাঠামোটিকে টিকিয়ে রেখেছে বিশাল লম্বা ভৌতিক কয়েকটি হাত। এই হাত এক দিকে আশ্বাস দিয়েছে যে, অতীতেও আমরা সামাজিক ভাবে নানা ধরনের ফাঁড়ার সম্মুখীন হয়েছি। মহামারির গ্রাসে বিলীন হয়েছে লাখো মানুষ। কিন্তু সমাজ হিসেবে আমরা সে ফাঁড়া অতিক্রম করেছি। মানুষ মারা গেছে, কিন্তু বাঙালি সমাজ আজও বেঁচে আছে । অপর দিকে এই হাতই আবার নির্দেশ করেছে নতুন সামাজিকতার দিকে, পরিবর্তিত মূল্যবোধের দিকে। শুষ্ক, কর্তব্যপরায়ণ ব্রাহ্মণ্যবাদকে সরিয়ে উঠে এসেছে পারিবারিক আন্তরিকতা, আধুনিক দাম্পত্য এবং বাঙালি জাতিসত্তা।

আমি প্রথম যখন গদখালীর হাতের গল্পটি শুনি, গল্পটি আমায় পড়ে শুনিয়েছিলেন আমার ঠাকুমা। সঙ্গে এও বলে ছিলেন যে গল্পটি নাকি তাঁর দেশে সত্যি ঘটেছিল! ঠাকুমারা কৃষ্ণনগরের লোক ছিলেন। এক বার পুজোর ছুটিতে কৃষ্ণনগর গিয়ে তাঁদের বাড়ির পাশেই একটি নেবুগাছ দেখিয়ে বলেছিলেন, ওই গাছ থেকেই নাকি সেই বৌটি নেবু পেড়েছিল। তার পর থেকে ওই গাছের তলায় বেশ কিছু দিন ভয়ে আর দুপুরে খেলতে যাইনি! বহু পরে যখন দেওয়ান কার্তিকেয়চন্দ্রের লেখায় পড়লাম যে, ১৮৮০ সালেও ওই গল্প ওই কৃষ্ণনগর অঞ্চলেই বলা হত, তত দিনে ঠাকুমা আর জীবিত নেই। কিন্তু তবু গায়ে কাঁটা দিয়েছিল এই ভেবে যে, এক শতক পেরিয়ে-আসা একটি গণস্মৃতির ফল্গুধারা কী ভাবে বেমালুম আমার ব্যক্তিগত স্মৃতির জোয়ারে মিলেমিশে একাকার হয় গেছে! ভয়াবহ মহামারির মুখোমুখি হওয়ার ঐতিহাসিক স্মৃতি মিশে গেছে ছেলেবেলার পুজোর ছুটি আর দুপুরবেলায় পাশের মাঠে খেলতে যাওয়ার মেদুরতায়।

কলকাতা।

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৬:২৮ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ২৬ জুন ২০২১

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com