মন্ত্রী যখন শ্রমিকের ভাই

শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

মন্ত্রী যখন শ্রমিকের ভাই
মন্ত্রী যখন শ্রমিকের ভাই

প্রাকৃতিক গ্যাস সার কারখানা বা এনজিএফএফ ফেঞ্চুগঞ্জ! সাবেক বিআইডিসির একটি প্রতিষ্ঠান! প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সাহেবের শাসনামল! কারখানা পরিদর্শনে এসেছেন মাননীয় শিল্পমন্ত্রী জামালুদ্দীন! কারখানার জেনারেল ম্যানেজারসহ সবাই তটস্থ! মন্ত্রীর সফরসঙ্গী হয়ে ঢাকা থেকে এসেছেন এই কারখানারই এক শ্রমিক (শ্রমিকনেতা) ইস্কান্দার আলী, যিনি সারা জীবন বিনা কাজে বেতন নিয়েছেন। কারণ তিনি শ্রমিক ইউনিয়নের কাজে (কারখানার কাজে নয়) বেশির ভাগ সময়ই নানা তদবির-টদবির নিয়ে ঢাকায়ই পড়ে থাকেন! রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে যোগ দেন! কারখানার মহাব্যবস্থাপকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যখন মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়কে স্যার স্যার করছেন, তখন এই কারখানারই একজন নগণ্য শ্রমিক মন্ত্রীকে ‘জামাল ভাই জামাল ভাই’ বলে সম্বোধন করছেন! মন্ত্রীর সাথে তাকেও ভিআইপি মর্যাদা দিতে হচ্ছে! গেস্টহাউসে মন্ত্রীর সাথে এই বিশেষ অতিথিকেও যথাযোগ্য মর্যাদা প্রদর্শনপূর্বক আপ্যায়ন করতে হচ্ছে তারই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের! মন্ত্রী যেখানে শ্রমিকের ভাই, সেখানে জিএম অসহায়! কতটা অসহায় তা পাঠকের অনুমান করা কঠিন হবে না নিশ্চয়!

সুহৃদ পাঠক, আমাদের আজকের বিষয় সার কারখানা জিম বা ইস্কান্দার আলী ভাই নয়, আজকের আলোচনার বিষয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী, ডিজি ও সাহেদ! যেহেতু সাহেদ ক্ষমতাসীন দলের কোনো একটা উপকমিটিতে নাম লিখে ফেলেছিল, তাই মন্ত্রী তার ভাই হওয়াটাই স্বাভাবিক! যেহেতু সরকার ও রাষ্ট্রের উচ্চ লেভেলে তার অবাধ বিচরণ, সেহেতু প্রজাতন্ত্রের বেতনভোগী নগণ্য কর্মচারী ডিজি তার সামনে কিছুই নয়! চাইলে সে ঘণ্টার মধ্যে ডিজিকে বদলি করে দিতে পারার ক্ষমতা রাখে!
ডিজি আদেশ পালনে বাধ্য! এমনকি মন্ত্রীর মৌখিক আদেশ পালনেও বাধ্য আর যদি মাননীয় মন্ত্রী বাহাদুর সশরীরে হাজির থেকে তদারকি করেন, তাহলে ডিজির চুক্তিপত্রে সাইন না করে কি কোনো উপায় আছে বলুন?


কন্টাক্ট সাইন করার সময় মন্ত্রীর উপস্থিত থাকা জরুরি ছিল না! তিনি ‘মেক শিওর’ করার জন্য নিজেই হাজির থাকেন, যাতে করে ডিজি কোনো অজুহাতে কালক্ষেপণ না করতে পারেন বা সাইন করতে বাধ্য হন! অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি স্বাক্ষরে হয়তো ডিজির অনাগ্রহ ছিল, তাই মন্ত্রী নিজেই অতি উৎসাহী হয়ে সামনে হাজির থেকে অপকর্মটা সম্পাদন করিয়েছেন ডিজিকে দিয়ে! এ ক্ষেত্রে ডিজি হয়তো মারাত্মক রাজনৈতিক চাপের মুখে ছিলেন! লক্ষণীয় যে পেছনে কতজন খাড়া! যেন দুই দেশের মধ্যে কোনো গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য চুক্তি সম্পাদিত হচ্ছে! খাড়াদের মধ্যে একজন মনে হচ্ছে তিনি, যিনি মধ্যপ্রাচ্যের আতর-গোলাপজল বিক্রি করে নব্য ধনকুবের! এত লোক পেছনে খাড়া থাকায় সন্দেহ হওয়া স্বাভাবিক যে ডিজি চাপের মুখে ছিলেন! অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সাহেদ বহু কাঠখড় পুড়িয়ে আটঘাট বেঁধেই এই কাজে নেমেছিলেন! সাইন না করলে নিশ্চয় ঝুঁকির মধ্যে ছিলেন ডিজি (গাড়িচাপা ইত্যাদি)! সাহেদের গাড়িচাপা দেওয়ারও ইতিহাস আছে, আমরা দেখতে পাচ্ছি! বিচিত্র নয় যে সাহেদ ডিজির সামনে মন্ত্রীকে ভাইজান বা এ রকম কিছু বলে সম্বোধন করে আকারে-ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিয়েছে তার দৌড়!

এ ছাড়া স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে একজন সচিব আছেন! সাহেদের রেজিস্ট্রেশনবিহীন হাসপাতালের বিষয় এবং গুরুত্বপূর্ণ এই চুক্তির বিষয় মন্ত্রণালয়ের সচিবের অবগত না থাকার কথা নয়! সচিব কী করে এর দায় এড়াবেন! আর যেহেতু মন্ত্রী স্বয়ং সামনে উপস্থিত থেকে স্বাক্ষরপর্ব সমাধা করেছেন এবং মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন, তাই দায়ও তার নিজের! দায়িত্ব নেবেন আর দায় নেবেন না, এটা হতে পারে না! অতীত অভিজ্ঞতা থেকে দেখা গেছে যে প্রকল্পের ঠিকাদার যদি সরকারদলীয় নেতা হয়, তাহলে তার সামনে প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তারা অসহায়! এ ক্ষেত্রেও বিষয়টা সে রকম হতে পারে! পরিশেষে বলতে চাই, ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে ডিজি ও সচিবকে সাময়িক বরখাস্ত ও মন্ত্রীর পদত্যাগ একান্তভাবেই জরুরি! ওনাদের দায়িত্বে রেখে তদন্ত অবান্তর! তদন্তে নামার আগে নিদেনপক্ষে মন্ত্রীকে ‘মিনিস্টার উইদাউট পোর্টফোলিও’ এবং সচিব ও ডিজিকে ওএসডি করা হোক! আর তা না হলে তদন্ত প্রহসনে পরিণত হতে বাধ্য ।

শনিবারের চিঠি / আটলান্টা/ সেপ্টেম্বর ০৪, ২০২০

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১:৫৯ অপরাহ্ণ | শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২০

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com