মংলায় পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মৌখিক নির্দেশে ১৬৭কোটি টাকার প্রকল্প বন্ধ

রবিবার, ০৪ জানুয়ারি ২০১৫

মংলায় পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মৌখিক  নির্দেশে ১৬৭কোটি টাকার প্রকল্প বন্ধ

monglaবাগেরহাটঃ বাগেরহাটের চার উপজেলার বাস্তবায়নাধীন ৩৪/২ সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্পের কাজ পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মৌখিক নির্দেশে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ভারত আন্তর্জাতিক মংলা-ঘষিয়াখালী নৌ-পথটি ভরাট হয়ে যাওয়ার পেছনে এই প্রকল্প দায়ী বলে স্থানীয় সংসদ সদস্য তালুকদার আব্দুল খালেকসহ স্থানীয় কিছু মানুষ অভিযোগ করায় পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় এক মৌখিক নির্দেশে গত ২২ ডিসেম্বর এই প্রকল্পের কাজ বন্ধ করে দেয়। এ অবস্থায় ১৬৭ কোটি ২৬ লাখ টাকা মূল্যের এই প্রকল্পটি অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নের অনিশ্চয়তা দেখা দেয়ায় রোববার সকালে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ প্রকল্প এলাকা পরিদর্শনে আসছেন। তবে প্রকল্পটির বাস্তবায়নকারী সরকারী প্রতিষ্ঠান ‘পানি উন্নয়ন বোর্ড’ ওই সংসদ সদস্যের করা অভিযোগ বাস্তব সম্মত নয় বলে মন্তব্য করেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্টরা বলছেন ৩৪/২ পোল্ডার প্রকল্প মংলা-ঘষিয়াখালী নৌ-পথ ভরাট হবার জন্য কোন ভাবেই দায়ী না বরং ২৮ বছর ধরে নিয়মিত খনন না করায় নৌ-পথটি ভরাট হয়েছে। তারা আরও বলেছেন, এই বাঁধ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মংলা-ঘষিয়াখালী নৌ-পথের পলি ব্যবস্থাপনা সহজতর হবে।


গত ২২ ডিসেম্বর পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে মৌখিকভাবে এই পোল্ডার প্রকল্পের চলা কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয় বলে নিশ্চিত করেছেন এই প্রকল্পের প্রকল্প কর্মকর্তা (পিডি) প্রকৌশলী জুলফিকার আলী হাওলাদার।

এদিকে ৩৪/২ পোল্ডারের কার্যক্রম বন্ধ রাখায় প্রকল্প এলাকার সুবিধাভোগী বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তারা মংলা-ঘষিয়াখালী নৌ-পথ খননের পাশাপাশি রামপালের মরে যাওয়া দাউদখালী নদী পুণঃখননসহ ৩৪/২ পোল্ডার প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজ দ্রুত চালু করার দাবি জানান।

৩৪/২ পোল্ডার প্রকল্পের পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব যাচাইকারী প্রতিষ্ঠান ‘সিইজিআইএস’ এর প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে বাগেরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রামপাল, মংলা, বাগেরহাট সদর ও ফকিরহাট উপজেলা এলাকায় সমীক্ষা চালিয়ে সরকার এই প্রকল্পটি হাতে নেয়। বিষয়টি নিয়ে এই এলাকার মানুষের সঙ্গে একাধিক সভা করা হয়েছে। তারা সবাই বাঁধ ও নদী পূণঃখননের দাবী জানিয়েছেন।

তারা আও বলেন, সমীক্ষা পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ‘সিইজিআইএস’ এর ঐ প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে পোল্ডার ব্যবস্থা বাস্তবায়ন না হলেও প্রাকৃতিক কারণেই নৌ-পথটি ভরাট হবে। ৩৪/২ বাঁধ প্রকল্প বাংলাদেশের আঞ্চলিক পানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি পরিবেশবান্ধব ও ইতিবাচক সমাধান।

বাগেরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বাগেরহাট সদর উপজেলার অন্তর্গত যৌখালী উপ-প্রকল্প, ফকিরহাট উপজেলার মাসকাটা উপ-প্রকল্প এবং খুলনা জেলার বটিয়াঘাটা উপজেলার আমিরপুর-ভান্ডারকোট উপ-প্রকল্পকে একত্রিত করে ৩৪/২ প্রকল্প তৈরী করা হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় ৫০ কি.মি. বাঁধ নির্মাণ ও ১১০ কি.মি. নদী-খাল পুণঃখননের কথা। বাগেরহাট সদর ও রামপাল উপজেলার একটি বড় অংশ এবং মংলা ও ফকিরহাট উপজেলার কিছু এলাকা প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত। তিন বছর মেয়াদী প্রকল্পটির কাজ শুরু হয় ২০১২-১৩ অর্থ-বছরে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের শতকরা প্রায় এগারো ভাগ কাজ শেষ করতে ব্যয় হয়েছে প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি টাকা।

বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের সুফল সম্পর্কে বাগেরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাইন উদ্দীন বলেন, রূপসা ও পশুর নদীর পূর্ব পাড়, মংলা ও কুমারখালী নদীর উত্তর পাড় এবং বিষ্ণু নদীর পশ্চিম পাড়ে খুলনা ও বাগেরহাট জেলার পাঁচটি উপজেলা এই প্রকল্পের আওতাভুক্ত। প্রকল্প এলাকার আওতায় মরা পশুর, দাউদখালী, মইদাড়া ও ইছামতি নদীসহ ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ খাল পুণঃখনন করা হবে। যার অধিকাংশই মংলা-ঘষিয়াখালী নৌ-পথের সাথে সংযুক্ত। এ সব নদী ও খাল খনন করে নিয়ন্ত্রক গেটগুলো কার্যকর করা গেলে এই নৌ-পথের নাব্যতা স্থিতিশীল থাকবে।

তিনি আরও বলেন, ৩৪/২ পোল্ডার বাস্তবায়ন হলে প্রায় ৪৮ হাজার হেক্টর জমি সমন্বিত বন্যা ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার আওতায় আসবে। লবণ পানি মুক্ত হবে প্রায় ত্রিশ হাজার হেক্টর জমি। অনাবাদী কৃষি জমি কমবে। সেচের আওতা বাড়বে শতকরা প্রায় ৬৮ ভাগ। প্রায় সাড়ে ১৯ হাজার হেক্টর নীচু জমি মাঝারি উঁচু ও উঁচু জমিতে পরিণত হবে। প্রকল্প এলাকা থেকে বছরে প্রায় দুই হাজার ৩০০ মে. টন মাছ উৎপাদন হবে।

মংলা-ঘষিয়াখালী চ্যনেল রক্ষা সংগ্রাম কমিটির সভাপতি অ্যাড. মহিউদ্দিন শেখ বলেন, ‘এলাকায় চিংড়ি ঘেরের সমর্থক শক্তিশালী একটি মহল ৩৪/২ পোল্ডার বাস্তবায়নে বাঁধা সৃষ্টি করে আসছেন। কিন্তু পোল্ডারটি রামপাল-মংলা এলাকার মানুষের জীবন জীবিকার জন্য একান্ত প্রয়োজন। মংলা-ঘষিয়াখালী নৌ-পথের সাথে এই পোল্ডার প্রকল্প সাংঘর্ষিক না, বরং সহায়ক।’ তিনি অবিলম্বে এই প্রকল্পের কাজ শুরুর দাবি জানান। সুন্দরবনের শেলা নদীতে তেলের ট্যাঙ্কার ডোবার পর ভরাট হয়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক মংলা-ঘষিয়াখালী নৌ-পথ পুনখনন ও চালু করার দাবীতে সকল মহল যখন সোচ্ছার হয়ে উঠেছে তখন স্থানীয় একটি প্রভাবশালী মহল মংলা-ঘষিয়াখালী নৌপথটি ভরাট হয়ে যাওয়ার পেছনে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাস্তবায়নাধীন ৩৪/২ সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্পকে দায়ী করছেন।

তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘মংলা-ঘষিয়াখালী নৌ-পথ যদি ওয়াপদার পোল্ডারের কারণে ভরাট হয় তবে ৩৫/১ পোল্ডারে বিছনা নদীর পূর্ব পাড়, মল্লিকের বেড় ও ডেমা এলাকায় এই নৌপথ সচল থাকছে কী ভাবে ?’ এই প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ও ওয়াপদা খুলনা জোনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী জুলফিকার আলী হাওলাদার বলেন, ‘শেলা নদীতে ট্যাঙ্কার ডুবির পর মংলা-ঘষিয়াখালী নৌ-চ্যানেল ভরাট হবার জন্য যারা ওয়াপদার ৩৪/২ প্রকল্পকে দায়ী করছেন তারা সঠিক বলছেন না। অব্যাহত খনন ছাড়া ঐ নৌপথ সচল রাখা কঠিন। পোল্ডার ব্যবস্থা বাস্তবায়নের সাথে নৌ-পথটি ভরাট হবার কোন সম্পর্ক নেই। ভরাট হওয়া এলাকায় ওয়াপদার কোন পোল্ডার নেই।’

তিনি বলেন, ‘মন্ত্রণালয় থেকে পরবর্তি নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত আমরা কাজ বন্ধ রাখবো। যদিও চলমান কাজ বন্ধ হলে প্রকল্পের সাথে সম্পৃক্ত উন্নয়ন অংশিদাররা বড় ধরণের ক্ষতির সম্মুখীন হবেন।’

এই পোল্ডার বাস্তবায়ন কাজ স্থগিত করা প্রসঙ্গে বাগেরহাট-৩ (রামপাল-মংলা) আসনের আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি তালুকদার আব্দুল খালেক বলেন, “বাংলাদেশ ভারতের আন্তর্জাতিক নৌপথ মংলা-ঘষিয়াখালী গত তিন বছর হলো একেবারের মরে গেছে। যা বর্তমানে পায়ে হেঁটে পার হওয়া যাচ্ছে। এই নদীর যদি নাব্যতা ফিরে না আসে তাহলে সরকারের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন ৩৪/২ সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প কোন কাজে আসবেনা। তাই পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়কে ওই প্রকল্প আপাতত বন্ধ রাখার অনুরোধ করা হলে মন্ত্রণালয় কাজ বন্ধ রেখেছে। তাছাড়া ৩৪/২ পোল্ডারের আওতায় দাউদখালী নদী, মরা পশুরসহ দুই শতাধিক রেকর্ডীয় খাল আছে। সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনার স্বার্থে এগুলো খনন করা প্রয়োজন। তবে নির্বিঘ্নে দ্রুত মংলা-ঘষিয়াখালী নৌ-পথ খনন করা এখন সব থেকে জরুরী।”

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৯:১৫ অপরাহ্ণ | রবিবার, ০৪ জানুয়ারি ২০১৫

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com