ভ্যাকসিন রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করে দিচ্ছে ভারত

মঙ্গলবার, ২০ এপ্রিল ২০২১

ভ্যাকসিন রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করে দিচ্ছে ভারত
প্রতিকী ছবি

করোনাভাইরাসের ভয়াল থাবা থেকে রেহাই পেতে ভারত এবার ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে মানুষকে করোনার টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এতে দেশটি আর টিকা রপ্তানি করতে পারবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ তিন মাস আগেই ৪৫ বছরের ঊর্ধ্বের সবাইকে ভ্যাকসিন দিতে গিয়ে চাপের মুখে পড়েছিল। ভ্যাকসিন সংকটে বহু টিকা সেন্টার বন্ধ করে দিয়েছিল। এবার ১৮ বছরের ঊর্ধ্বের সবাইকে ভ্যাকসিন দেওয়া শুরু হলে বিদেশে ভ্যাকসিন রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাবে।

একাধিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতে প্রাপ্ত বয়স্কদের করোনা টিকা দেওয়া শুরু করলে আন্তর্জাতিক মার্কেটে টিকা রপ্তানির বন্ধ হবে। এতে বাংলাদেশ-সহ যেসব দেশ শুধু ভারতে তৈরি টিকার অপেক্ষায় আছে, যথারীতি এই সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়বে সেসব দেশেও।


র্তমানে ভারতে ৪৫ বছরের ঊর্ধ্বের সকল মানুষকে করোনার টিকা দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আগামী মে মাস থেকে সকল প্রাপ্তবয়স্কদের টিকা দেওয়া শুরু হবে। এতে দেশটির প্রায় ৯০ কোটি টিকার প্রয়োজন হবে। এতো সংখ্যক টিকা উৎপাদনে ভারত অন্যদেশে ভ্যাকসিন রপ্তানি করতে পারবে না।

এখন যে দুটি ভ্যাকসিন ভারতে ব্যবহার করছে তা হল- অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকার উদ্ভাবিত ও পুনের সিরাম ইনস্টিটিউটে তৈরি কোভিশিল্ড এবং ভারত বায়োটেকের তৈরি কোভ্যাক্সিন, তা দিয়ে এই বিপুল চাহিদা মেটানো কার্যত অসম্ভব। সে কারণেই এখন ভারত রাশিয়ার উদ্ভাবিত স্পুটনিক ভি কিংবা আরও নানা বিদেশি ভ্যাকনের ছাড়পত্র দিচ্ছে।

রয়্যাল সোসাইটির ফেলো ও ভারতের শীর্ষস্থানীয় বিজ্ঞানী গগনদীপ কাং বিবিসি বাংলাকে বলেন, ভারতে এপ্রিল মাসের মাঝমাঝি সময়ে দেশের মাত্র সাত শতাংশ মানুষকে এক ডোজ ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে। আর দুই ডোজ পেয়েছে মাত্র এক শতাংশ মানুষ। এখনও টিকা দেওয়ার অনেক কাজ বাকি রয়েছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে প্রতিদিন ৩০ লাখ বা তার কিছু বেশি ডোজ ভ্যাকসিন দিচ্ছি। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে গেলে এটা দু-তিনগুণ বাড়ানো দরকার, প্রতিদিন অন্তত এক কোটি ডোজ দিতে পারলে খুব ভালো হয়। এই লক্ষ্যের কাছাকাছি পৌঁছতে গেলেও ভারতকে বিদেশে টিকা রপ্তানি পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে হবে।

গগনদীপ কাং আরও বলেন, গত মাস থেকে ভারত বিদেশে ভ্যাকসিন পাঠানো বন্ধ রেখেছে, তবে সরকার সেই সঙ্গেই দাবি করেছে ওই পদক্ষেপ ‘সাময়িক’।

জহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের বিশেষজ্ঞ বিশ্বজিৎ ধর বলেন, ভবিষ্যতে ভারত আর ভ্যাকসিন রপ্তানি করবে না। রপ্তানি আর সম্ভব নয় সেটা কিন্তু স্পষ্ট। এই মুহূর্তে ভারতে যে চাহিদা সেটাই সামাল দেওয়া যাচ্ছে না, এর ওপর এলিজিবিলিটি ক্রাইটেরিয়া আরও শিথিল করা হলে টিকার ঘাটতি অনেকটাই বেড়ে যাবে। ফলে যে ভ্যাকসিন কূটনীতিটা ভারত শুরু করেছিল, তা আর এখন চালিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।

বিশ্বজিৎ ধর আরও বলেন, করোনাভাইরাসের ভ্যাকসিন ভারত শুরুর দিকে বিদেশে পাঠিয়ে, কিংবা উপহার দিয়ে যে গুডউইল বা ভাবমূর্তিটা ভারত তখন অর্জন করেছিল, সেটাও কিন্তু এখন হুমকির মুখে।

জানুয়ারিতে ভারত ঢাকঢোল পিটিয়ে ভ্যাকসিন মৈত্রী অভিযান শুরু করেছিল, তা এতো দ্রুত এভাবে থমকে যাওয়ার পেছনে কারণ কী?

অধ্যাপক ধরের মতে, বিশ্বের বৃহত্তম টিকা উৎপাদক সিরাম ইনস্টিটিউটের সামর্থ্য ঠিক কতটা, তা নিয়ে হিসেবে অবশ্যই ভুলচুক হয়েছিল। সিরাম ইনস্টিটিউট গোড়াতে বলেছিল তারা প্রতি মাসে দশ কোটি ডোজ উৎপাদন করতে পারবে। কিন্তু এখন তারা বুঝতে পারছে সেটা সম্ভব হচ্ছে না।

“তারা অবশ্য সেই সঙ্গেই বলছে যে মার্কিন প্রশাসন ডিফেন্স প্রোডাকশন অ্যাক্ট প্রয়োগ করে ভ্যাকসিন কালচার বা নানা কাঁচামালের রপ্তানি আটকে দিয়েছে এবং টিকার সব উপাদান যথেষ্ট পরিমাণে আসছে না।” কারণগুলো যাই হোক, সিরামের উৎপাদন সামর্থ্য যে অনেক অনেক বাড়িয়ে হিসেব করা হয়েছিল সেটা কিন্তু বোঝাই যাচ্ছে।”

“সোজা কথায়, মাসে তাদের দশ কোটি ডোজ উৎপাদনের ক্ষমতা নেই। এখন ওরা বলছে ক্যাপাসিটি বাড়ানোর পরে হয়তো ওই পরিমাণ উৎপাদন করা সম্ভব- কিন্তু সেটা জুলাইয়ের আগে নয়!”

ফলে সিরাম ইনস্টিটিউট যে সব দেশের সঙ্গে টিকা সরবরাহের সমঝোতা করেছে, তাদের অপেক্ষা যে আরও দীর্ঘায়িত হতে যাচ্ছে তা বলাই বাহুল্য।

ভারতে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, আগস্ট বা সেপ্টেম্বরের আগে ভারত বিদেশে এক ডোজ টিকাও রপ্তানি করতে পারবে না।

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৭:০৮ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২০ এপ্রিল ২০২১

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com