ভোটের শাড়ি

শনিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

ভোটের শাড়ি

ভোটের শাড়ি
শাওন পরিচয়

 


Litearture 01সুবলা অন্তঃস্বত্বা। এখন তার আট মাস। বাজারের কিছু চিংড়িমাছ কিছু পাকা সব্জির উপর তেল মসলা ঢেলে কোন রকম একটা চচ্চড়ি করে বারান্দায় বসে জল ভাতের সাথে জিভে তুলেছিল। সকালের সুর্য তাদের বারান্দার ভুমিতলের সাথে ষাট ডিগ্রি কোন করে আকাশে খোলাখুলি কিরন দিচ্ছে। তার ফাঁকে সে স্বামিকে জিজ্ঞেস করল ‘ও বটুর বাপ এবার ভোটে কাপড় দেবে?’ অশিক্ষিতা সুবলা শাড়িকে সাধারন অর্থে কাপড় বলে। শ্রীমন্ত রান্না ঘরের কোনটাতে লেবু গাছটার তদারকি করছিল। এবার অনেক বেশি ফুল ধরেছে। সুবলার কথার কোন উত্তর না দিয়ে সে নিজের কাজে ব্যস্ত ছিল।

সুবলা আবার কিছু বলে বসে, ‘এবার ভোটে দুটো কাপড় চাইবে। ও বটুর বাপ ভোট কবে গো?’

শ্রীমন্ত সুবলার কথার উত্তর দেয় এবার, ‘ভোটের এখন দেরি আছে।’

শ্রীমন্ত আর কিছু বলে না দেখে সে কথাটা বাড়াতে থাকে ‘এবার যারা দুট কাপড় দেবে তাদের ভোট দোবো, তুমি কি বলো? সুবলা কথাটা বিশেষ ভঙ্গিতে বলে ফেলে।

শ্রীমন্ত একটু রেগে যায়। সুবলার উপর হটাৎ চোখ উঁচিয়ে বলে ‘মেয়ে মানুষের এত ভোট ক্যান বলত। ভোটের এখন দুমাস দেরি।’

সুবলা নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, ‘এমনি বলছিলুম বাড়ির পেছন থেকে লোকে ভোটের কথা বলে যাচ্ছিল তাই।’

শ্রীমন্ত নিচু গলায় গাছটির একটা ডাল তেনে বাঁধতে বাঁধতে বলে ‘ সে যা হয় হবে পাশে লোকে শুনলে কোটনাম করবে সবতো শয়তানের দল।’ সুবলার ততক্ষনে খাওয়া শেষ হয়েছে সে সকড়ি তুলতে তুলতে নিজের মতো অভিযোগ করে ‘লোকে কত কত পাচ্ছে। শুধু আমাদের হয়না। ভোট আসুক বোঝাবো।’

শ্রীমন্ত সুবলার কথার অধিক গুরুত্ব না দিয়ে জিঞ্জেস করে, ‘আমাদের বটু কোথায়?’ সুবলা উত্তর দেয় ‘ইস্কুলে খেলা হচ্ছে ও দিকে আছে কোথাও।’

!! দুই !!

সকাল থেকে সাংসারিক কাজের চাপ। সুবলা বাইরে বেরিয়ে কোন প্রতিবেশি গৃহিনীর কাছে ভোট সম্বন্ধীয় কোন খবর যে জানবে সে অবসর তার হয়নি। সুবলাদের বাড়ির পিছন থেকে কাল সন্ধ্যায় কারা যেন আলোচনা করে যাচ্ছিল। তাই আজ স্বামীর কাছে তার ভোটের বৃত্তান্ত এত প্রশ্ন।

খাওয়া শেষে অল্পক্ষনের মধ্যে সুবলার একটা খেয়াল হল। নিজের মত বাড়ির বাইরে এসে রাস্তার ও দিকটা রায়দের পুরানো বাড়ির পিছনটা ভালো করে দেখে নিল। ভোটের আগে লোকেরা এখানে লাল নীল সবুজ নানা রং দিয়ে ভোটের কথা লিখে দিয়ে যায়। লেখা ভর্ত্তি বড় ছোট কাগজ সেটে দেয়। এগুলো থাকলে সুবলা জানতে পারে ভোট আসছে।

এখন ফাল্গুনের প্রথম সপ্তাহ শীত তল্পিতল্পা গুটিয়ে বিদায় হয়েছে। বসন্ত নিজেকে মেলে ধরেছে নিজের মত। মানুষ পরিবেশে গা রেখে সেটা বুঝতে পারছে। ভোট বসন্তের মত সুবলা ও অনেকে ভোটের হাওয়া বোঝে।

কয়েক সপ্তাহ যাবার পর একদিন বেলা করে শ্রীমন্ত বাঁশের কাজ করছিল। তার ঘরটা বাৎসরিক মেরামতের প্রয়োজন। খড়-বাঁশের ঘর। সুবলা তখন রান্না ঘরে ব্যাস্ত, বাইরে থেকে একজন জিঞ্জেস করল, শ্রীমন্ত বাড়ি আছিস ?’

শ্রীমন্ত প্রতিবেশিদের গলা বোঝে। গলাটা চারু মাস্টারের বুঝতে পেরে শ্রীমন্ত সাড়া দিল ‘হ্যাঁ মাস্টারকাকা ভিতরে আসুন।’

চারু মাস্টার বেড়া পেরিয়ে শ্রীমন্তর কাছে এসে জিঞ্জেস করল কিরে, ‘শ্রীমন্ত কেমন আছিস ?’

‘এই চলে যাচ্ছে মাস্টারকাকা ।’

শ্রীমন্ত চারুমাস্টারকে বসার জায়গা দিতে বলল। সুবলা সচরাচর চলা ফেরার অধিক গতিতে ঘর থেকে বাঁশের মোড়াটা বের করে চারুকে বলল ‘বসুন মাস্টারকাকা ।’

চারু এক সময় এ গ্রামে প্রাথমিক শিক্ষক ছিল। সে এ পঞ্চায়েতের মানুষ। অনেকদিন থেকে রাজনিতির সাথে যুক্ত। কয়েকবার ভোটে দাঁড়িয়ে কখন হেরেছে কখন জিতেছে কিন্তু দলটা একই আছে।

চারু মাস্টার মোড়াটা নিয়ে শ্রীমন্তর কাছাকাছি বসল। শ্রীমন্ত কাজ বন্ধ করে তার সাথে কথোপকথনে লিপ্ত হল।

চারু যে ভোটের ব্যাপারে এসেছে সুবলা শ’ভাগ নিশ্চিত। সে মাঝে মাঝে রান্না ঘর থেকে উঁকি দিয়ে দেওয়ালে কান রেখে শোনে ঠিক কি কথা হচ্ছে। শ্রীমন্ত একবার জোরে বলে উঠল ‘ভোট আমরা আপনারই কথায় দেব।’

তাতে মাস্টারকাকা কি বলে সেটা শোনার জন্য অধীর আগ্রহে সুবলা বাইরে মুখ বাড়িয়ে থাকে। চারুও ততোধিক জোরে শ্রীমন্তকে জানিয়ে দিল ‘ভয়নি আগের থেকে এবার অনেক বেশি পাবি।’

চারুর আশ্বাসে শ্রীমন্ত কতটা খুশি বলা শক্ত। তবে সুবলা যে পরম তৃপ্তি পেয়েছে এ বিষয়ে কারো সন্দেহ না থাকাই ভালো।

চারু মাস্টার ফিরে গেলে সুবলা দ্রুত পায়ে শ্রীমন্তর কাছে এসে জিঞ্জেস করল ‘কিগো ভোটের কথা হলতো! কি দেবে বলে গেল ?।’

শ্রীমন্ত বাম দিক থেকে বাঁশ একটা টেনে নিয়ে গাঁট ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে উত্তর করল ‘এবারে টাকা কাপড় দুরকম দেবে বলেছে।’

তাতে সুবলা আরো ব্যাকুল হয়ে জিঞ্জেস করল ‘এবার দুটো কাপড়ের কথা বলনি ?’

‘ বলেছি বলেছি’, শ্রীমন্ত অল্প বিরক্তির সাথে বলল, ‘ও নিয়ে পাঁচ কান করিসনি।’

সুবলা কেমন একটা আত্নবিশ্বাসের সঙ্গে বলল, ‘এতে পাঁচ কানের কি আছে সবাইতো পাবে।’

যাই হক দুপুরের স্নান খাওয়ার পর শ্রীমন্ত যখন বিছানায় এপাশ ওপাশ দিচ্ছে সুবলা একছুটে বাড়ির বাইরে গিয়ে দেখে নেয় রায় বাড়ির পিছনটাতে কোন লেখা উঠেছে কিনা। এখন থেকে ভোটের কাপড় আসা পর্যন্ত এটা তার দৈনন্দিন কাজের মধ্যে পড়ে।

!! তিন !!

দেখতে দেখতে ভোটের বাজনা বেজে উঠ ল। আর কয়েক দিন পর সুবলাদের পঞ্চায়েত ভোট, চারদিকে ভোটমুখি মানুষের মধ্যে হৈ হৈ রৈ রৈ। ভোট-টা ঠিক কি এবং কেন এখনো যারা বুঝে উঠতে পারেনি ভোট নিয়ে তাদেরও কৌতুহল আর মজার শেষ নেই। ভোটের শুধু আধিকার প্রয়োগ এখানে কারো দাঙ্গা হাঙ্গামা, কারো পকেটচুরি, নতুন কাপড় এবং আরো অনেক কিছু। তবু এখানে সবাই চাইছে ভোট আসুক ভোট যাক।

সুবলা সময় মত দেখতে পেল রায়বাড়ির দেওয়ালে নানা রঙের লেখা উঠেছে। সে ছেলেকে পাঠিয়ে দেওয়ালের লিখন ভাল করে জেনে আসতে বলে। বটু তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র, পড়তে শিখেছে।

ভোট যতটা এগিয়ে আসছে সুবলার দেহে ব্যাথাভাব মন্দভাব ততটা বেড়ে যাচ্ছে। সুবলার ভয় ভোটের সময় কিছু ঘটে যাবে না তো। শেষ পর্যন্ত কাপড় দুটো হাতে পাবে তো। ঠিক এ জাতীয় আলোচনা যখন শ্রীমন্ত আর সুবলার মধ্যে বারান্দায় বসে চলছে পাড়ার বড় রাস্তা দিয়ে একটা মিছিল সাংবিধানিক আওয়াজ তুলে ক্রমশ দুরে চলে গেল। সুবলা শ্রীমন্তকে জিঞ্জেস করল ‘ভোট এলে মানুষ নাচানাচি করে কেন?’

শ্রীমন্তের সহৃদয় উত্তর ‘ভোটে হীরে পান্না আছে-সেই আশায়’

সুবলা শ্রীমন্তের সব কথা না বুঝলেও অনুমান করে তার স্বামীর কথায় বিশেষ মূল্য আছে।

সে শ্রীমন্তকে বাড়তি প্রশ্ন না করে নিজে নিজে কিছু একটা চিন্তা করে। একটু পরে বলতে বলতে উঠে যায় ‘আমার হীরে পান্না দরকারনি দুট কাপড় হলেই চলবে।’

শ্রীমন্ত একটা মুচকি হাসি নিয়ে সুবলার দিকে তাকিয়ে থাকে।

সুবলার আর দশ মাস হতে সপ্তাখানেক বাকি। এর মধ্যে প্রসব কালটা আসবে কিনা এক প্রতিবেশি বৃদ্ধার কাছে এ ব্যাপারে নিশ্চিত হয়ে গেলে বৃদ্ধা স্নেহপূর্ণ শাসানিতে উত্তর দিল ‘এর মধ্যে ছাবাল বিয়োবি, কাপড় নিবিনি?’

ভোট না দিলে কাপড় হয় না-বিশ্বাসটা এদের অনেকের। বৃদ্ধার কথায় সুবলার মনটা মুচড়ে গেল আরো একটু।

জনগণের মনে জঠরে ভোট সুবলার জঠরে সন্তান কোনটা আগে এদেশের মাটিতে ভুমিষ্ট হবে সুবলার চিন্তা এখন সেটাই। সুবলা শ্রীমন্তকে কয়েক দিন পর জিঞ্জেস করে ‘ভোটের আর কদিন বাকি?’

শ্রীমন্তঃ ‘চার দিন, সামনে শুক্রবার।’

সুবলাঃ ‘কাপড় ওরা কবে দেবে?’

শ্রীমন্তঃ ‘বড়জোর একদিন আগে।’ সুবলা আর কিছু বলে না। বিষন্ন ভাবে বেড়াটার দিকে চেয়ে থাকে।

!! চার !!

ভোট হতে আর দু ‘দিন বাকি। ভোর বেলা দক্ষিণ বাতাসে বাড়ির লেবু গাছটার পাতায় ঝিরঝির করে শব্দ হচ্ছে। অন্ধকার তখনও বাইরে জাল পেতে আছে।

সুবলা ডেকে উঠল ‘কৈ গো বটুর বাপ তুমি কোথায়?’ শ্রীমন্ত অন্য একটা খাটিয়ায় ঘরের অন্য দিকে ঘুমিয়ে ছিল। সে সুবলার ডাক শুনতে পায়নি। দু-একবার ডাকাডাকির পর শ্রীমন্ত জেগে উঠে বলল ‘কি হয়েছে সুবলা?’

‘আমার খুব ব্যাথা হচ্ছে’ সুবলা আদো আদো কথায় বলল। সকাল হওয়ার আগে লোক যোগাড় করে শ্রীমন্ত তার স্ত্রীকে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করালো। ভোটের আগের দিন সে একটি কন্যার মুখ দেখল। তার কাঁচা ব্যাথা উপশম হবার আগে ভোটপর্ব চলে গেল।

শ্রীমন্ত সময়মত ভোট দিয়ে সুবলার কাছে এলে সুবলা জিঞ্জেস করল ‘ওরা কাপড় দেছে?’

শ্রীমন্তর সোজাসাপটা উত্তর ‘ভোট না দিলে কাপড় দেয়?’

সুবলা অদ্ভুত কিছু একটা ভাবতে ভাবতে সদ্যজাত কন্যার দিকে চেয়ে রইল, যেটা শ্রীমন্তেরও বোধগম্যের বাইরে।

এক সপ্তাহ বাদে সুবলা কন্যা শিশুটিকে নিয়ে ঘরে এলো। হাসপাতালের পোষাক ছেড়ে বাইরে এসে রায় বাড়ির দেওয়ালটা দেখতে দেখতে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। দেখল লেখাটা এখনও জ্বলজ্বল করছে।

শনিবারের চিঠি/ আটলান্টা/ ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৬

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১২:১০ অপরাহ্ণ | শনিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com