ভাষাহীন সৈনিক

শনিবার, ২০ ডিসেম্বর ২০১৪

ভাষাহীন সৈনিক

 

 ফারজানা আহমেদ


 

Litearture 01তিন বান্ধবী আসমা, সোমা আর প্রতিমা। বয়স তখন ওদের এগারো থেকে বারো । তিন আত্না এক দেহ বলতে যা বোঝায় ওরা ছিল অনেকটা সে রকম। অনেকে অনেক খেতাবে ভূষিত করেছে ওদের ইতিমধ্যে ।অদ্ভূত রকমের মিল ছিল তিনজনের। চরিত্রের মিলও ছিল খুব। তিনজনই চলতো ঝোঁকের মাথায়। তাই আসমার মাথায় যখন এল কুকুর পালবে, বাকী দুজনও দিলো ঢোলে বাড়ি।কোমর বেধে লেগে গেল কোথায় পাওয়া যায় কুকুর ? জোগাড়ও হয়ে গেল । পাড়ার ছেলে মন্টুই খবরটা দিলো । ওর মেঝ খালার বাসায় ধানমন্ডিতে ওদের এলসেসিয়ান কুকুরটা পাঁচটা বাচ্চা দিয়েছে। খালা নাকি তার থেকে দুটো রাখবেন আর উপযুক্ত মানুষ পেলে তিনটা  বিলিয়ে দেবেন। ছুটে গেল তিন বান্ধবী খবর পেয়ে। নাচতে নাচতে নিয়ে এল তুল তুলে তিনটি কুকুর ছানা। প্রতিবাদ এলো বাসা  থেকে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। হাল ছেড়ে দিলো অভিভাবককূল । অতএব  রয়ে গেল বহাল তবিয়তে তিনজনই।নিজেদের নামের অদ্যাক্ষরের সঙ্গে মিলিয়ে যার যার কুকুরের নাম রাখলো আদর, সোহাগ আর প্রেমা। সবাই বললো ‘সুন্দর নাম ,কিন্ত কুকুরের নাম না রেখে ওদের ভবিষ্যৎ  বাচ্চাদের জন্য নামগুলো সেইভ করলেই কি আরো ভালো হতো না? সব-সময় কি সুন্দর নাম মাথায় আসে?

   এক বছরের মধ্যেই এলসেসিয়ানত্রয়  পুরো পাড়ার মধ্যে হয়ে গেল তিন বাঘের বাচ্চা । সবার প্রিয়, সবার পরিচিত, সর্বত্র যাতায়াত ওদের । তখন ঢাকা শহরে এত বড় বড় গেইট ছিল না । তাই যখন-তখন যেখানে- সেখানে চলে যেতে পারতো তারা । ছোট ছোট স্থানীয় হোটেল-রেস্টুরেন্টের মালিকরা পালা করে নাস্তা, দুপুরের খাবার, আর রাতের খাবার খাওয়াতো ওদের । ওরা বুঝে নিতো কোথায় কখন ওদের খাবার বরাদ্দ । বিনিময়ে পুরোটা পাড়ার নিরাপত্তার ভার নিয়েছিল ওরা ।মানুষের সঙ্গে মিশতে মিশতে মানুষের সমস্ত কথাই বুঝতে পারতো কুকুরগুলো । তাই “আব্দুল রেস্টুরেন্টের” মালিক যখন তিন দিনের জন্য দেশে যাবার সময় বলে গেল “তোমরা আমার দোকানটা খেয়াল রাইখো।”  তখন কথা রেখেছিল তারা ।সেই তিনদিন আব্দুল রেস্টুরেন্টের আশে-পাশেই বেশি সময় থাকলো তারা।

    পাঁচ বছর পরের ঘটনা । ১৯৭১ সাল । মুক্তিযুদ্ধের বছর । চারপাশে আতঙ্ক । পাড়াটা খালি হয়ে যাচ্ছে ।হুরহুর করে চলে যাচ্ছে সবাই শহর ছেরে গ্রামের বাড়িতে। আসমাদের কোনও গ্রামের বাড়ি নেই বলে ওরা যাচ্ছে সোমাদের সঙ্গে বিক্রমপুর।সমস্ত বাধা-ছাদা শেষ । পর দিন খুব সকালে অন্ধকার কাটবার আগেই রওয়ানা দেবার প্ল্যান সবার ।তাই প্রতিমা আর সোমা এসেছে আসমাদের বাসায় গল্প করতে । তখন দুপুর তিনটা হবে । হঠাৎ  করেই হানাদার বাহিনী হানা দিলো আসমাদের বাসায় । তছনছ করতে  করতে ঢুকলো হাতের কাছে যা কিছু পেলো তাই । এত দ্রুত ঘটে গেল ঘটনাটা যে কেউ লুকোবারও সময় পর্যন্ত পেলো না। আবিস্কার করে ফেললো একসঙ্গে তিন ষোড়শীকে। ঝাঁপিয়ে পড়লো যেন তিনটি নেকড়ে। চিলের মতো ছো মেরে নিয়ে গেল তিন বান্ধবীকে উঠিয়ে । ঘরের কারোরই কোনও ক্ষতি করলো না। যেন এর জন্যই এসেছিল তারা। আসমার কুকুর আদর ছিল উঠানের আর এক কোণায় । টের পেয়ে দৌড়ে এলো এলসেশিয়ান । ঝাঁপিয়ে পড়লো একাই তিনটি হায়েনার উপর।কিন্ত পেরে উঠলো না। মানুষের সঙ্গে চলতে চলতে ওদের বুদ্ধি আর শক্তি সম্বন্ধে মোটামুটি ধারণা ছিল তাদের। বুঝে গিয়েছিল একা পারবে না ওদের সঙ্গে আর তাছাড়া ভাবলো, মাথা ঠান্ডা রেখে কাজ করতে হবে। এখন যদি উল্টা কিছু করে শুধু শুধু জানটাই খোয়াবে আদর । তাই অল্প হলেও সময় নিল।চিনে রাখলো গন্ধটা।

    যা করবার তাড়াতাড়ি করতে হবে ।ছুটে  গেল পাড়ার যে কয়জন এখনও বাকী ছিল ওদের কাছে। কিন্ত মানুষের ভাষা ওরা বুঝলে কি হবে, মানুষ তো আর কুকুরের ভাষা বোঝে না। তাই অন্য  পথ ধরলো।ছুটে গেল অন্য দুজনের বাসায়। ভাষার আদান – প্রদান হলো তিনজনের মধ্যে। যা  করবার দ্রুত করতে হবে। রক্ষা করতে হবে ওদের মনিবদের।যদি এর জন্য মরতে হয় পরোয়া করে না এলসেসিয়ানের বাচ্চারা। শুধুই আদরের জানা    ছিল গন্ধটা। তাছারা ওরা জন্ম থেকে পরিচিত মনিবের গন্ধের সঙ্গে। গন্ধ শুকে শুকে এগিয়ে গেল তিনজন। এমন কোন কষ্ট হলো না আস্তানাটি খুঁজে পেতে।কুকুর বলে কোথাও বাধা পেলো না। ক্যাম্পে না নিয়ে ওদেরকে উঠিয়েছে একটা ছোট্ট খালি বাসায়। তালা বন্ধ করে গিয়েছে রাতের খাবার খেতে রাক্ষসগুলো। ভেবেছে খেয়ে দেয়ে স্ন্যাক হিসাবে ভোগ করবে তিন ষোড়শীকে ।ক্লোরোফর্ম দিয়ে তিনজনকেই বেহুশ করে রেখে এসেছে।কয়েক ঘন্টার জন্য নিশ্চিন্ত। কিন্তু  পরিচিত শব্দে সাড়া দিলো ষষ্ঠ ঈন্দ্রিয়। ভেঙ্গে গেল ওদের ঘুম। টের পেলো এখন আর ওরা একা না। ঠিক করে রেখেছিল নিজেদেরকে বাঁচাতে না পারলে আত্নহত্যা করবে একসঙ্গে তিনজনই।গা ঝাড়া দিয়ে  উঠে দাঁড়ালো। জানালা খুলে দেখলো ওদের তিন বন্ধুকে। সমস্ত ভয় দূর হয়ে গেল। অনুভব করলো তিনজনের বিরুদ্ধে ওরা এখন ছয়জন। খুব মায়া হলো। আহারে! মুখগুলো কেমন শুকনো।অনেকটা রাস্তা হেটে আসতে হয়েছে। হয়তো তাই। কিন্ত চোখগুলো জ্বলছে ভাটার মত। যুদ্ধের জন্য তৈরি ওরা। সামনে ড্রেন থেকে পানি খেয়ে শক্তি সঞ্চয় করে নিল। তিন জননীর সঙ্গে চোখে চোখে ভাষার বিনিময় হলো। আশ্বাস দিলো

   – কোন ভয় নেই আর তোমাদের এখন মা! আমরা চলে এসেছি!!

    -আমরা তা জানি সোনা মানিক!!!

     ঘন্টা খানেকের মধ্যেই  জিপটা এসে থামলো। নেমে এলো তিন সেনা। বড়ই খোশ মেজাজ তাদের । ঘর থেকে তিনটা লাঠি জোগার করে চাদরের নিচে লুকিয়ে রেখে মরার মত পড়ে ছিল তিনজন বিছানায়।দরজা লাগাবারও তর সয়নি জানোয়ারগুলোর। নিজ়েদেরকে প্রায় উলঙ্গ করে এগোলো বিছানায় টলতে টলতে। আর এ সুযোগেই ঢুকে গেল তিন যমদূত। নেশা করে আসাতে শক্তির অভাব ছিল ওদের । তাছাড়া একেবারেই তৈরি ছিল না এ পরিস্থিতির জন্য। তাই দুদিক থেকেই যখন আক্রমন হলো ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেল তিন মিলিটারি। তবু জাত সেনা দ্রুত সামলে নিয়ে চেষ্টা করলো অস্ত্র বের করতে। কিন্ত সে সুযোগ আর দিলো না আদর , সোহাগ আর প্রেমা। মোক্ষম জায়গায় কামড়ে ধরলো তিন শয়তানের। খুবলে নিলো মাংস্পিন্ড। অতি সহজে ধরাশায়ী হলো তারা।

     তারপর? তারপর আর কি? প্রতিশোধের আগুনে যেন পাগল হয়ে গিয়েছিল তিন নিঃশব্দ সৈনিক। টু শব্দটি করবার সুযোগ না দিয়ে আঁচড়ে কামড়ে  ছিন্ন- ভিন্ন রক্তাক্ত করে দিলো খান সেনার দেহ। সেই রক্তে মুখ রক্তিম করে ঘরে ফিরেছিল তিন মুক্তি কুকুর ওদের প্রেয়সী মাতাকে সঙ্গে  নিয়ে। জানাজানির সুযোগ না দিয়ে সে রাতেই অন্ধকারে পালিয়ে গিয়েছিল ওরা গ্রামের বাড়িতে।

 নিউ ইয়র্কঃ

 

 

 

 

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৭:৩৮ অপরাহ্ণ | শনিবার, ২০ ডিসেম্বর ২০১৪

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com