ছোট গল্পঃ

বেড়ালের কোয়ারেন্টাইন

শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২০

বেড়ালের কোয়ারেন্টাইন
বেড়ালের কোয়ারেন্টাইনঃ মোস্তফা অভি

গত কয়েকদিন যাবত শহরে অন্যরকম একটি খবর ভেসে বেড়াচ্ছে-পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় অকারণে বেড়াল মারা পড়ছে। ঘটনার সত্যতা মানুষের কাছে আরো বেশি স্পট হয়ে ওঠল যখন তারা দেখল, শহরের অলি-গলির ড্রেনের ঢাকনার কাছে কয়েকটা মৃত বেড়াল পড়ে আছে। সম্ভবত বেড়ালগুলো মৃত্যুর আগে পানি পান করার চেষ্টারত অবস্থায় মারা পড়েছে। পৌর মেয়র পড়াশোনা জানা মানুষ। পোষা প্রাণির আকস্মিক মৃত্যুর বিষয়টা হয়ত ভাবিয়েছে তাকে। হয়ত তার জানা আছে বিগত শতাব্দীর মহামারিগুলোর ইতিহাস। আর এ কারণেই তিনি একদিন পৌর কর্মচারীদের নিয়ে মৃত বেড়াল দেখার জন্য পথে বেরিয়ে পড়েন। তিনি লোক মুখে শুনতে পান কয়েকটি বেড়াল মরার গল্প। সেই গল্পগুলো কিছুটা অতিরঞ্জিত; মনে হয় গল্পগুলোতে রঙের প্রলেপ পরিয়ে ভয় আর কল্পনা মিলিয়ে বর্ধিত করেছে গল্পকারেরা। কিন্তু বেড়ালগুলোর মৃত্যুর ব্যাপারে পৌরবাসীর আর কোনো সন্দেহ থাকেনা। মেয়র মহোদয় প্রথমে পরিদর্শনে যান শহরের গুলবাগ, আরামবাগ এলাকায়। কেননা শহরের অন্যান্য এলাকার তুলনায় এখানে বেড়ালের মৃত্যুর হার বেশি। তিনি একটা ড্রেনের ঢাকনার কাছে চিৎ হয়ে মরে পড়ে থাকা বেড়ালটার কাছাকাছি গিয়ে দাঁড়ালেন। পকেট থেকে মাস্ক বের করে নাক মুখ আড়াল করলেন। তারপর খুব গভীর মনযোগে বেড়ালটার হা করে থাকা শক্ত চোয়ালের ভেতরের দিকে তাকিয়ে দেখলেন, লাল থকথকে ঘায়ের মত ফোস্কাওঠা টাকরাটা দেখা যায়। মেয়র মহোদয়ের বহু বছর আগে পত্রিকায় পড়া সেই ঘটনাটির কথা তখন মনে পড়ল।
একবার পশ্চিমের কোনো এক শহরে এভাবে বেড়াল মরতে দেখা গিয়েছিল। সেখানকার লোকজন ছিল পাড় মাতাল, অশিক্ষিত আর গিদর। যে কোনো অস্বাভাবিকতার বিষয়ে তাদের জ্ঞান ছিল খুবই সাধারণ। তারা বিষয়টিকে খুব একটা পাত্তা দিলনা। শুরু হল বেড়াল মৃত্যুর তাণ্ডব। শহরের অলি-গলিতে অসংখ্য বেড়াল মরে পড়ে থাকতে শুরু করল। বাতাসে ছড়িয়ে পড়ল মরা বেড়ালের রক্ত আর পুঁজের গন্ধ। লোকজন অবস্থা বেগতিক দেখে বিচলিত হয়ে পড়ল আর তারা শহর ছেড়ে যেতে লাগল গ্রামের দিকে। এই ঘটনার পর শহরের উপকণ্ঠে আরেকটি আশ্চর্য ঘটনা ঘটল। প্রথমে একেকটা বাসা থেকে দুএকজন করে মেয়েলোক নাচতে শুরু করল। তারপর তাদের নাচ দেখে দলে ভিড়ে গেল আরো কিছু সংখ্যক মেয়েমানুষ। অদ্ভুত আর দুর্দমনীয় সেই নাচ আর কিছুতেই থামে না। তারা নাচতে নাচতে বিভোর হয়ে পড়ে। আর নাচের তালে তালে তারা বিচিত্র হাসি হাসে। মহিলারা হাসতে হাসতে নাচতে নাচতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে লাগল। ছোট্ট সেই শহরটিতে যখন কয়েকশ লোক মারা যায় তখন সেখানকার নদী বন্দরে একটা জাহাজ ভেড়ে। আর সেই জাহাজ থেকে কালো আলখেল্লা পরিহিত কয়েকজন অপরিচিত লোক এসে দুর্গন্ধযুক্ত লাশের নমুনা সংগ্রহ করে। তারপর তারা নিজেদের শরীর মুড়িয়ে ফেলে একটা বিশেষ সুরক্ষা পোশাকে। তারা কয়েকদিন শহরের এখানে ওখানে ঢুঁ মেরে একদিন রাতে জাহাজ নিয়ে লাপাত্তা হয়ে যায়। এই ঘটনার বেশ কিছুদিন পর সেই শহরের মানুষ নৃত্যরতদের মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে জানতে পারল -বেড়ালের উচ্ছিষ্ট থেকে মেয়েলোকের ভেতর সংক্রমিত হয়েছিল বিশেষ একটি ভাইরাস। আর সেই ভাইরাস সংক্রমনের প্রথমাবস্থায় সংক্রমিত মহিলার সঙ্গে যৌন সংসর্গে সংক্রমিত হয়েছে পুরুষ লোকটি। তারপর শহরের সংক্রমিত বহু পুরুষের গলা ও অণ্ডকোষ ফুলে ঢোল হয়ে যায় আর সেই অণ্ডকোষ ফেটে বের হয় মরছা রক্ত আর দুর্গন্ধযুক্ত পুঁজ। নৃত্যরত মহিলাদের পুরুষসঙ্গীরা এভাবেই একদিন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।


নগরপিতা পৌর মিলনায়তনে জরুরী বৈঠকে বসেন। সিদ্ধান্ত মত শহরের অলি-গলি, ঘিঞ্জি-ঘুপচিতে যেখানে বেড়াল পাওয়া যায় সেগুলি ধরে এনে শহর থেকে অনেক দূরে নিয়ে যাওয়া হয়। নির্জন এক বিলের ভেতর বড় আকারের খাঁচা বানিয়ে বেড়ালগুলো সেখানে বন্দি করে রাখা হল। আর ওগুলো সার্বক্ষণিক দেখভাল করার জন্য রাখা হল দুজন তদারককারী। একজন সনাতনী-সুখলাল আর আরেকজন তার বন্ধু মৌলভী বংশের ছেলে হাকিম। ওরা একেকটা মৃত বেড়াল দাহ করতে করতে এই অদ্ভুত ঘটনার কারণ অনুসন্ধানের চেষ্টা করে। বিষয়টি ওদের সাধারণ মাথায় কুলোয় না। খাঁচায় বন্দি বেড়ালগুলো যখন মরতে মরতে প্রায় শূন্যের কোঠায় নামে মেয়রের কাছে তখনও প্রকৃত সংবাদ পৌঁছে না। কারণ ইতোঃমধ্যেই শহরে আরেকটা ভয়াবহ খবর ছড়িয়ে পড়েছে। চীনের উহান প্রদেশ থেকে পুরো বিশ্বজুড়ে নতুন এক ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছে। দেশে সাধারণ ফ্লুর উপসর্গ নিয়ে মারা যাচ্ছে বহুসংখ্যক মানুষ। জ্ঞান-বিজ্ঞানেরে এই যুগেও আধুনিক চিকিৎসা খুব একটা কাজে আসছেনা নতুন ভাইরাসটির কাছে। দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে দেশের আনাচে-কানাচে। পৌর হলরুমে দ্বিতীয়বারের মত জরুরী বৈঠক ডাকলেন মেয়র মহোদয়। নিরাপদ দূরত্বে বসতে দেয়া হল সিভিল সার্জন, প্রশাসনের প্রতিনিধি, পুলিশের লোক এবং বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের প্রধানকে। মেয়র মহোদয় সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা করলেন সেখানে। মহামারির প্রাদুর্ভাব থেকে শহরের লোকদের নিরাপদ রাখতে কয়েকটি পদক্ষেপের কথা শোনালের উপস্থিত সবাইকে। সেদিন সন্ধ্যা থেকে একে একে বন্ধ হতে লাগল দোকানপাঠ, বিপণিবিতান, জনসমাগমস্থল, স্কুলকলেজ এবং উপসনালয়। শহরের মাঝ বরাবর বহু বছরের লম্বালম্বি অন্ধ গলির প্রবেশমুখে পেরেক মেরে সেটে দেয়া হল টিনের বেড়া। বৈঠকে বসা একদল কাকের কর্কশধ্বনির মত বেড়ার ভেতর চিৎকার করতে লাগল গতর ব্যবসায়ী মেয়েগুলো। শহরের প্রবেশপথের সড়কে পুলিশের বেড়িকেট। পূর্বদিকের নদী বন্দরে ভিড়তে দেয়া হলনা কোনো দূর পাল্লার লঞ্চ। পশ্চিমপ্রান্তের ডোঙার মত ছোট পণ্টুনেও পুলিশের কড়াকড়ি। অভ্যন্তরীন একতলা লঞ্চ সহ ভিড়তে পারলনা মালবাহী ট্রলার। প্রধান প্রধান সড়ক, বিপণি বিতান আর গলির মুখের চায়ের দোকানগুলিতে সুনসান নীরাবতা। পুরানবাজার মাছ এবং সবজির আড়তের দিকে তাকালে মনে হয় এটা একটা ভুতের রাজ্য। যেন অচেনা এক গাম্ভীর্যে ধরা দিয়েছে চিরচেনা এই শহর।

কয়েকদিন পার হতেই মানুষের মধ্যে নেমে আসে গভীর শঙ্কা। দুধের বাচ্চাগুলো দুধ না পেয়ে ট্যাট্যা করতে শুরু করল। মাছ আর সবজির আকালে ফুরিয়ে যেতে লাগল মানুষের খাদ্যের সংস্থান। শহরের অলিতে গলিতে মাইকে ঘোষণা করা হল মেয়র মহোদয়ের নতুন বার্তা- রুদ্ধ করা হয়েছে শহরের প্রবেশ এবং বের হওয়ার পথ। মানুষের অবাধ যাতায়াতের ওপর দেয়া হয়েছে কঠোর নিষেধাজ্ঞা। সমস্ত প্রতিষ্ঠানে ঘোষণা করা হয়েছে সাধারণ ছুটি। শহরে যে তিনজন প্রবাসী এসেছিল তাদের দুজন লাপাত্তা। হয়ত পাব্লিকের রোশানলে পড়ার ভয়ে রাতের অন্ধকারে পালিয়েছে কোনো অপরিচিত জায়গার সন্ধানে। প্রবাসী পরিবারের চারজন এখন হাসপাতালে। সেই চারজনের ভেতর দুজন রোগীর মৃত্যুর সংবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল শহরের অলিতে গলিতে। হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকের মত কেঁপে উঠল শহরবাসীর বুক। তারা রাতের দ্বি-প্রহরে শহরের পেছন দিকের বদ্ধ খালের ওপর কাঠের পুল পেরিয়ে দলে দলে যেতে লাগল গ্রামের দিকে। তারা অন্ধকারে গ্রামের সরুপথ ধরে হাতড়াতে থাকে সঠিক পথের দিশা পাওয়ার জন্য। কিন্তু পথে পথে তারা বাঁধাপ্রাপ্ত হয় পুলিশের জটলার কাছে। কেউ জেরার মুখে পড়ে আবার ফিরে আসে নিজ বাসায়। আবার কেউ সুকৌশলে কনেস্টবলের মুঠের ভেতর নোট গুঁজে দিয়ে স্বপরিবারে অদৃশ্য হয়ে যায় অন্ধকারে। এভাবেই শহর থেকে ধীরে ধীরে কমতে থাকে মানুষের বহর। শহরের রাস্তাঘাট,বাসা-বাড়ি ইত্যাদি বরবাদ হতে থাকে আর তাতে সামগ্রিকভাবে বদলে যেতে থাকে পরিচিত চেহারা। কর্মহীন, অলস বসে থাকা মানুষগুলো শুয়ে বসে থেকে শরীরটা অবস করে তোলে। যে পুরুষলোকটি স্ত্রীকে সময় দিতে পারেনা বলে বরাবর কর্পোরেট অফিসের সিস্টেমকে বলাৎকার করেছে, এই দীর্ঘ ছুটিতে সে একবারও ছুঁয়ে দেখেনা স্ত্রীর শরীর। অথচ তারা রাতভর গল্প করে, সিনেমা দেখতে দেখতে ভোরের পাখির কলকাকলি শোনে। মাঝে মধ্যে টিভিতে দেখা মৃত্যুর খবরে যে ভীতি সঞ্চার হয় তাতে স্ত্রী সঙ্গমে প্রস্তুত পুরুষ লোকটিরও শিশ্ন শিথিল হয়ে আসে। এই মৃত্যুর অদৃশ্য বিওগলের মুহূর্তেও একদল মানুষ চুপিচুপি গলির মুখে জটলা পাকায়। তারা গলায় বাক্স ঝোলানো ফেরিওয়ালার থেকে চড়া দামের সিগারেট কিনে আকাশের দিকে ধোঁয়া ছুড়তে থাকে। ধীরেধীরে মানুষের প্রতি মানুষের জাগে গভীর অবিশ্বাস। এই বুঝি গুপ্ত ঘাতক বহন করে চলছে লোকটা। পুরো শহরজুড়ে দেখা দেয় প্রলয়ের পূর্বক্ষণের পূর্বাভাস। প্রতি সন্ধ্যায় একেকটা গলির ভেতর থেকে বের হয়ে আসে এ্যাম্বুলেন্স গাড়ির ঘরঘর আওয়াজ। কোনো জরুরী হুইসেলের শব্দ নেই। যেন নীরবেই যমের বাড়ি নিজেকে শপে দিতে যাচ্ছে অসুস্থ মানুষগুলো। আজ যে লোকটি পরিবারের সঙ্গে টেবিলে চিন্তিতমুখে নাস্তা খায়, পরের সপ্তাহে তার মৃত্যু সংবাদ আসে। শবের মুখদর্শন, গোসল কিংবা জানাজা কিছুই দেয়া হয় না। একেকটা মৃত্যুতে যেন কালো মেঘে ঢেকে যায় আত্মীয়দের মুখ। শুধু কল্পনায় বারবার ফিরে আসে মৃত লোকটিকে নিয়ে অসংখ্য স্মৃতিবহ ঘটনা।

মেয়র মহোদয়ের লোকদের হাত থেকে বেঁচে যাওয়া দুএকটা বেড়াল গলির ভেতর থেকে হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে আসে। রাস্তার এপার থেকে ওপার তেরছাভাবে ছুটে চলা বেড়ালগুলোর খবর মেয়র মহোদয়ের কাছে পৌঁছে যায়। আর তখন মেয়র মহোদয়ের মনে পড়ে কোয়ারেন্টাইনে থাকা সেই বেড়ালগুলোর কথা। তিনি ভাবতে থাকেন, তদারকির অভাবে বেড়ালগুলো হয়ত এখন আর বেঁচে নেই। মেয়র মহোদয় সেই বিচ্ছিন্ন বিলের সংবাদ চেয়ে তার সচিবকে ফোন করতে বলেন। সেখান থেকে খবর আসে- শেষ পর্যন্ত যে কয়টা বেড়াল ধুকে ধুকে বেঁচে ছিল, ওরাও মারা পড়েছে কয়েকদিনের অনাহারে। খাঁচার ভেতর থেকে দূরে ইঁদুরের কিঁচকিঁচ শুনতে শুনতে রোমান্টিক মৃত্যু কল্পনায় বেড়ালগুলো নিথর হয়ে পড়ে। তারপর ওদের চোয়ালদুটো শক্ত হয়ে যায়। অথচ মেয়র মহোদয় এই বেড়ালগুলোর জন্য রুটি, মাছ আর ঝোল মাখানো ভাতের উপকরণ পাঠিয়েছিলেন দফায় দফায়। যা পথে পথেই সাবার করে ফেলেছে প্রাণিদের প্রতি নির্দয় আর লোভী মানুষগুলো। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষেতিতে মেয়র মহোদয় তার পৌর কলিগদের অশততায় বিরক্ত হয়ে ওঠেন। কয়েকজন অসৎ লোক চিহ্নিত করে কড়া করে সতর্ক করে দেন।

এপ্রিলের এক মঙ্গলবার বিকেলে শহরের সদর হাসপাতালে ষাটোর্ধ এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়। বুক আর গলা ব্যাথার সাথে তার শ্বাসকষ্ট হয়েছিল খুব। লোকটা পিঠের তলাটা মাটির উপর তুলে বুকটা প্রশারিত করে দম নিতে নিতে প্রাণ হারায়। হাসপাতালের ওয়ার্ডবয় আর কয়েকজন কর্মচারী মিলে বৃদ্ধের শবদেহটি কাপড়ে মুড়িয়ে হাসপাতালের পতিত এক কোনে রেখে দেয়। দুপুরের বৃদ্ধের মৃত্যু সংবাদটি হাসপাতালের চত্ত্বর থেকে বেরিয়ে গলির মুখের প্রধান সড়কে ওঠে। তারপর ছড়িয়ে যায় শহরের অলিতে-গলিতে। একটি মৃত্যুর আকস্মিকতা শেষ হতে না হতেই সন্ধ্যায় মেয়র মহোদয়ের কাছে আরেকটি মৃত্যুর খবর আসে- যা অত্যন্ত হৃদয় বিদারক এবং করুণ। কোয়ারেন্টাইনে থাকা একটা বেড়াল কয়েকদিন ধরে ঘুরঘুর করেছিল খাঁচার গা ঘেষে। খুব বিলাপ করে ভাঙা গলায় মিউ মিউ করত বেড়ালটা। চুপচাপ লেজ গুটিয়ে বসে থাকত বেষ্টনির পাশে মেঝের ওপর। চার-পাঁচ দিন মুখে কোনো খাবার তোলেনি আর ওটার চোখদুটোতে ছিল বেদনার ছায়া। শেষে রুগ্ন কান্নায় শ্বাস টানতে টানতে মৃত্যুর কাছে হেরে যায় বোবা প্রাণিটি। তদারককারী সুখলাল লোহার সাড়াশি দিয়ে টেনে বেড়ালটিকে নিয়ে উঁচু ভিটার সীমানার কাছে রাখে। ওটাকে দাহ করার জন্য উসকে দেয় শুকনো কাঠের আগুন। আর বেড়ালটি ভষ্ম হতে না হতে-ই শহরের বাতাসে শোনা যায় আজরাইলের সহচরদের করুণ বাঁশির সুর। অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে শহরের পথে-প্রান্তরে।

শহরের পূব দিকের নদী ভাঙা পাইলিং রাস্তার শেষ প্রান্তে লেজুর শহর। নদী লাগোয়া সড়কের পাশে বহু বছরের পুরনো পীর সাহেবের খানকা। প্রতি বছর মার্চ এপ্রিলে যখন জোয়ারের জলে নদী ফুলেফেঁপে ওঠে তখন মাওলানা বয়তুল্লাহ ইছাপুরি রাহেমেহুল্লাহ (দাঃ বঃ) সাহেব সেখানে ওয়াজ নসিহত করতে আসেন। এবছরও তিনি এসেছেন তবে বেশ আড়ম্বরহীন, চুপেচাপে। তিনি করোনা ভাইরাসকে আল্লাহর সৈনিক বলে বিশেষ ভাষন প্রদান করেন। আর ভাইরাসের বিষয়ে মুমিন মুসলমানের বিচলিত হবার বিশেষ কারণ নাই বলে উচ্চাকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করে সন্ধ্যায় শহর ত্যাগ করেন। মেয়র মহোদয়ের কাছে খবরটি পৌঁছানোর পর তিনি সন্ধ্যায় এসে তাল গাছের মত থির দাঁড়িয়ে থাকেন খানকার মসজিদের প্রবেশমুখে। তিনি মুছল্লিদের ধরে ধরে কৈফিয়ত চান আর সঙ্গ নিরোধের উপদেশ দিয়ে শহরে ফেরেন। লেজুর শহরের ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ বলতে থাকেন- মসজিদ-মাদ্রাসা, ওয়াজ নসিহত বন্ধ করা কেয়ামতের আলামত। তারা ধারণা করে কয়েকদিন আগে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের এক নেতাকে জেলে থেকে মুক্তি দেয়া হয়েছে। সেই কারণে করোনা নামে এক গুজব রটিয়েছে শাসকদল। যাতে বিরোধীরা লোক সমাগম করে কোনো আন্দোলন করতে না পারে। অথচ এইসব সাধারণ মানুষ পুরো বিশ্ববাসীর দুর্বিসহ পরিস্থিতির কথা অনেকেই জানে না। তারা প্রতিদিন কাজের সন্ধানে যেতে চায়। সাহায্য পাওয়ার জন্য হাপিত্যেস করে। পুকুর কেটে, জমির আইল বেঁধে সময় পার করে। কয়েকদিন যেতেই লেজুর শহর থেকে শুরু হয় মহামারির দ্বিতীয় অধ্যায়।

লেজুর শহরের কয়েকজন ভাইরাসের লক্ষণ প্রকাশের পর সেখানকার সাধারণ মানুষের মাঝে নতুন চাঞ্চল্য তৈরি হয়। তারা মনে করে, আক্রান্ত লোকটি নিশ্চয়ই আল্লাহর অভিশপ্ত কেউ। তখন শারীরিক যন্ত্রণার আড়ালেও লোকটি সমাজের চোখে অপমানিত বোধ করে। জ্বর আর শরীরব্যাথায় কষ্ট পাওয়া লোকজন পিসিআর পরীক্ষার জন্য বিভাগীয় শহরে নমুনা পাঠায়। তখন গ্রামের ধুলোমাথা পথে রটে যায় পুরনো ডায়লোগ- হালার দ্যাশে বালা-মুছিবাত আইলে পীরের গায় ও লাগে। অতএত ইল্লাল্লাহ জেকেরের কোনো বিকল্প নাই। সন্ধ্যার পর লেজুর শহরের প্রায় প্রতিটি মসজিদ থেকে জেকেরের ধ্বনিতে বাতাস প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। রাত গভীর হতে হতে সেই শব্দ আকাশের দিকে মিলিয়ে যায়। রাত আরো গভীর হলে কতগুলি ঘরে একটা একটা করে বিজলির আলো জ্বলে। সেসব বাড়ির লোকেদের শরীরের উত্তাপ বেড়ে যায় আর তাদের সমস্ত শরীরজুড়ে শুরু হয় প্রচণ্ড ব্যাথা। যন্ত্রণাকাতর লোকেরা সারারাত অপেক্ষা করে একটি প্রশান্তির ভোরের জন্য।

সকালে সদর হাসপাতালের সামনে রোগীদের ভীড় বেড়ে যায়। তারা নিজেদের পরীক্ষা করার স্যাম্পল দেয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। আর শরীরের কষ্ট লাঘব করতে ক্লিনিকগুলোর সামনে জটলা পাকায়। মেয়র মহোদয় এই খবরে দ্রুত নেমে পড়েন দুর্দশাগ্রস্থ মানুষের বিষণ্ন মুখ দেখতে। তিনি সবাইকে আশ্বস্ত করে বলেন-একটা প্রাণও চিকিৎসাবিহীন মরতে দেয়া হবেনা। কিন্তু সুরক্ষা পোশাকের অভাবে ডাক্তারদের মধ্যেও সংক্রমনের প্রভাব প্রকাশ পেতে থাকে। শহরের প্রত্যেকটা গলির কিছু বাড়িতে জানালার আলোর ভেতর নীরবে চলতে থাকে আইসোলেশন।

পৌর শ্মশানঘাটের বিপরীতে লাশকাটা ঘরের পেছন হয়ে একটা সরুখাল চলে গেছে ফরাজি বাড়ির দিকে। পাইলিং করা খালটির দুধারের একপাড়ে সনাতনীদের বসবাস আর অন্যপাশে ফরাজি বাড়ি। ফরাজি বাড়ির লোকেরা হিন্দুপাড়া থেকে হু হু কান্নার আওয়াজ শুনতে পায়। তারা বিমর্ষ চিত্তে খালের ওপার জলের দিকে নুয়ে পড়া রক্তজবা ফুলের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারা অপেক্ষা করে উলুধ্বনি শোনার কিন্তু সন্ধ্যার পূর্বক্ষণে হিন্দুপাড়ায় টের পাওয়া যায় সুনসান নীরাবতার। মেয়র মহোদয় এসে দেখেন বৃদ্ধ কার্ত্তিক সাধুর লাশ পড়ে আছে পাইলিংয়ের ধারে। হোগলার ওপর চিৎ হয়ে থাকা লোকটির ঘোলাটে চোখদুটো নিষ্পলক তাকিয়ে আছে সন্ধ্যার বিষণ্ন আলোর দিকে। মেয়র মহোদয় হিন্দু পাড়াকে লাউড স্পিকারে স্পেশাল লক ডাউনের ঘোষনা দেন। তিনি পৌর স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে নদীর ধারে সন্ধ্যার পর দাহ করার ব্যবস্থা করেন কার্ত্তিক সাধুর মৃতদেহ। আমের চ্যালা কাঠ থেকে আগুনের লেলিহান শিখা আকাশমুখি উসকে ওঠে। কার্ত্তিক সাধুর দেহটা মড়মড় করে আর শরীর থেকে গড়িয়ে পড়ে রক্ত আর চর্বি গলানো রস। মেয়র মহোদয় প্রাকসন্ধ্যায় শ্মশানঘাটের কাছে নদীর প্রবাহমান জলের দিকে তাকিয়ে মনের অজান্তেই ডুকরে কেঁদে ওঠে।

এপ্রিলের জোছনা খেলানো রাতে অস্থির হয়ে ওঠে হিন্দু পাড়ার লোকেরা। ভয়ে তাদের কণ্ঠের তরল শুকিয়ে আসে। শতবার করে হাতের তালুটা কপালে চেপে ধরে উত্তাপ অনুমান করার চেষ্টা করে। আর বাইরের দিকে কান পেতে শোনে প্রতিবেশির কান্নার শব্দ। তারা একটি বাসার জানালার ফুটো দিয়ে ভেতরে তাকিয়ে দেখে, পুরুষ লোকটির বুকটা ফুলে ফুলে উঠছে। নিরাপদ দূরত্বে মুখে আঁচল চেপে বসে আছে লোকটির মধ্য বয়স্কা স্ত্রী। ধূসর, ভয়ার্ত চেহারা মহিলার। মনে হয় একটু পরেই নিঃসঙ্গ হয়ে যাবে সে। মহিলাটির স্মৃতিকাতরি মুখ সম্ভবত দ্রুতই মুছে যাচ্ছে তার সিঁথির সিঁদুর। । হিন্দুপাড়ার লোকজন শশব্যস্ত হয়ে পড়ে প্রত্যাশিত নির্মল ভোরের জন্য।

এপ্রিলের শেষ দিন পৌর সচিবকে সমাধিস্থ করার পর খুব ভেঙে পড়লেন মেয়র মহোদয়। বিকেলে শহরের উপকন্ঠে আরেকটি মৃত্যুর খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে দেখেন নিস্তব্ধ হয়ে আছে পৌরসভার সাথে গ্রামের সংযোগস্থল। দোকানপাঠগুলোর গায়ে ধুলোর আস্তরণ আর আশেপাশে কোথাও কেউ নেই। তার শরীরটা ক্রমশ নিস্তেজ হয়ে আসে আর বুকে-পিঠে জমা হয় বিন্দু বিন্দু ঘামের কণা। তখন তার কানে ভেসে আসে গায়ে কাঁটা দেওয়া কয়েকটি বেড়ালের মিউ মিউ শব্দ। ভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া বেড়ালগুলো শহর ছেড়ে গ্রামের দিকে চিরতরে চলে যাচ্ছে। তার চোখের সামনে ফুটে উঠল প্রাণহীন পরিত্যক্ত একটি পৌর শহর।

তখন শেষ বিকেলের ক্লান্ত আলো ধীরে ধীরে নেমে যাচ্ছে রহস্যময় নিঝুম রাতের দিকে। প্রকৃতির রং মিসকালো আর ধূসর। তিনি কার কাছে জানতে চাইবেন, এত এত মৃত্যুর শেষ কোথায়! যতক্ষণ খুশি তিনি প্রকৃতির কাছে প্রশ্ন করতে পারেন। অথচ তিনি ভালো করেই জানেন, বোবা প্রকৃতি তার সন্তানদের পরিণতি শুধু নির্বাক তাকিয়ে দেখে। প্রকৃতি কখনো-ই কোনো প্রশ্নের উত্তর দেয় না।

শনিবারের চিঠি/ আটলান্টা/ নভেম্বর ০৭, ২০২০

আমাদের সাইডে আরও গল্প পড়তেঃ  ক্লিক করুন

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১:৩৩ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২০

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com