বিষয়ে কবিতা গাণিতিক, অনুভবে মনোজাগতিক : কামাল চৌধুরী

শনিবার, ৩০ জানুয়ারি ২০১৬

বিষয়ে কবিতা গাণিতিক, অনুভবে মনোজাগতিক : কামাল চৌধুরী

সত্তরের মাঝামাঝি তারুণ্যদীপ্ত ও দ্রোহী কবিতা নিয়ে কাব্যজগতে প্রবেশ করেন কবি কামাল চৌধুরী। জীবনযাপনের কোলাহলের ভেতরেও কবিতাই তাঁর সাধনা। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু গদ্য লিখেছেন, সেটাও কবিতাবিষয়ক। কবিতার বাইরে উৎসাহী সমাজ-সংস্কৃতি অধ্যয়ন ও গবেষণায়। শক্তিমান এ কবির লেখালেখির হাতেখড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায়। নিয়মিত লিখছেন সত্তর দশক থেকে। ১৯৭৪ সালে দৈনিক পত্রিকার সাহিত্য পাতায় কবিতা প্রকাশের মাধ্যমে সমকালীন কাব্যজগতে প্রবেশ তাঁর। ব্যস্ততম সরকারি চাকুরে হলেও কবিতার জন্য ঠিকই সময় বের করে নেন তিনি। তা সেটা যানজটে আটকা পড়া গাড়িতে বসেই হোক কিংবা বিদেশ ভ্রমণের উদ্দেশ্যে আকাশযানে। কবিতার স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা। সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কাজের পাশাপাশি ইউনেস্কো নির্বাহী বোর্ডে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করছেন তিনি। ব্যস্ততম এ অগ্রজ কবির সঙ্গে একান্ত আলাপনে উঠে আসে তাঁর শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য, যুবাকালে থেকে হাল আমলের জীবনের নানা জানা-অজানা কথা।

সাক্ষাৎকারটি গত ২৮ জানুয়ারি এনটিভি অনলাইন পত্রিকায় প্রকাশিত হয় । শনিবারের চিঠির পাঠকদের সৌজন্যে সাক্ষাৎকারটি নিন্মে হুবহু পত্রস্ত হলোঃ


অঞ্জন আচার্য : শুরুতেই আপনার বেড়ে ওঠার গল্পটি শুনতে চাই?

কামাল চৌধুরী : ১৯৫৭ সালের ২৮ জানুয়ারি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামের বিজয়করা গ্রামে আমার জন্ম। খুব ছোটবেলায় (প্রথম শ্রেণিতে) আমি ঢাকায় পড়েছি মতিঝিল প্রাইমারি স্কুলে। আমার আব্বা আহমদ হোসেন চৌধুরী তখন ঢাকাতেই থাকতেন। আব্বাসহ আম্মা বেগম তাহেরা হোসেন ও ছয় ভাই নিয়ে আমাদের সংসার। (ছয় ভাইয়ের মধ্যে কবির অবস্থান দ্বিতীয়। ভাইয়েরা হলেন : ড. আবদুল্লাহ আল মামুন চৌধুরী, ড. কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী, আবদুল্লাহ আল মোহনীন চৌধুরী, আবদুল্লাহ আল মাসুদ চৌধুরী, ড. সাইফুল মাহমুদ চৌধুরী, ড. মেহেদী মাহমুদ চৌধুরী)।

এর পরে আবার আমরা চলে যাই গ্রামে। আমি চলে আসি ফেনীর পরশুরামে আমার নানাবাড়িতে। সেখানে এক বছর লেখাপড়া করি। গ্রামের আমার লেখাপড়া চলতে থাকে। আমার গ্রামজীবনের অভিজ্ঞতা সত্যিকার অর্থে সে সময়ই গড়ে ওঠে। সেই গ্রামজীবনের একটি অভিজ্ঞতার কথা মনে পড়ছে। আমাদের গ্রামে ‘পল্লী কল্যাণ সমিতি’ বলে একটি সমিতি ছিল। আমরা মাঝেমধ্যে সমিতি থেকে বই সংগ্রহ করে পড়তাম। বেশির ভাগ বইই ছিল রহস্য কাহিনীর—দস্যু মোহন, স্বপনকুমার সিরিজ ইত্যাদি। পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথ, তারাশঙ্কর, সুকান্তের বইও ছিল। ফাঁকে ফাঁকে সেসবও পড়া হতো।

আমাদের পরিবারটি ছিল মধ্যবিত্ত শিক্ষিত পরিবার। আমার আব্বা ইতিহাসের বিষয়ে ছিলেন খুবই অনুরাগী। কবিতা না লিখলেও, কবিতার ব্যাপারে খুব উৎসাহী ছিলেন। আব্বা আমাকে বিভিন্ন বই এনে পড়তে দিতেন। আমার পরিবারে কেউ লেখক ছিলেন, ব্যাপারটা সে রকম না। তবে আমার নানা কাজী আবদুল ওদুদ কবিতা লিখতেন। একসময় টি-এস্টেটের ম্যানেজার ছিলেন তিনি। এই রকম একটি পারিবারিক পরিমণ্ডলে থেকে একসময় আমি আস্তে আস্তে লেখালেখি শুরু করেছি। আমার লেখালেখির শুরু গদ্য দিয়ে। খুব ছোটবেলায় একটা দস্যুকাহিনী লেখা শুরু করেছিলাম। সময়টা যতদূর মনে পড়ে, তখন আমি ক্লাস থ্রিতে পড়ি। সেখান থেকেই লেখালেখির উৎসাহের বীজটা বপন হয় বলা যায়।

এরপর আব্বার পাটকলের চাকরিসূত্রে আমরা চলে এলাম নারায়ণগঞ্জের আদমজী নগরে। আমরা থাকতাম জুনিয়রস অফিসার্স (জিও) কোয়ার্টারে। ওই সময় আমার স্কুল ছিল গোদনাইল হাই স্কুল। স্কুলটা ছিল প্রায় দুই মাইল দূরে। বাড়ি থেকেই আসা-যাওয়া করতাম। ক্লাস এইটে পড়ার সময়ই শুরু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধের আগের উত্তাল দিনের স্মৃতিগুলো আজও মনে পড়ে। মনে আছে, ৭ মার্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন, তা দেখাতে আব্বা আমাকে ও আমার বড় ভাইকে নিয়ে এসেছিলেন রেসকোর্স ময়দানে। আদমজী থেকে হেঁটে বড় ভাই ও আমি আব্বার সঙ্গে সেখানে এসে পৌঁছি। তখন আজকের এই রাস্তা ছিল না। অনেকটা পথ ঘুরে আসতে হতো। এটা আমার জীবনে একটি ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা। ওই সময়ে টুকটাক লেখালেখি করি। তবে বই পড়ার আগ্রহটা ছিল প্রবল।

অঞ্জন আচার্য : যুদ্ধের সময়ের দিনগুলো কীভাবে কাটিয়েছেন?

কামাল চৌধুরী : মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের উদ্বাস্তু জীবন। আব্বার আর চাকরিতে ফিরতে পারেননি। বিহারি অধ্যুষিত ওই অঞ্চলে বাঙালিরা তখন সেখানে নিরাপদ ছিল না। আদমজী থেকে আমরা চলে চাই মুন্সীগঞ্জের হাজারদি নামে একটি গ্রামে। সেখান থেকে ঢাকার মতিঝিলে আমার চাচার বাসায় উঠি। আমার চাচা ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা। সে সময় খুব দুর্বিষহ একটা সময় পার করতে হয়েছে আমাদের সবাইকে।

আব্বা সময়ই ছিলেন বাঙালির চেতনায় সোচ্চার। এ ক্ষেত্রে একটা দৃষ্টান্ত দিতে পারি। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার পরে বঙ্গবন্ধু দেশে এলে আওয়ামী লীগ একটি সমাবেশ ডাকে। ওই সময় আব্বা আমাকে নিয়ে মঞ্চে উঠে যায়। আওয়ামী লীগের প্রতি এই অকৃত্রিম সমর্থনের কারণে মুক্তিযুদ্ধের সময় আব্বাকে প্রাণরক্ষার্থে একরকম আত্মগোপনে থাকতে হয়েছিল। যাই হোক, মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা যেখানে থাকতাম, তার পাশের একটি বাড়িতে একটি লোক পয়সা দিয়ে বই পড়তে দিতেন। চার আনা দিয়ে একটি বই পড়া যেত। সে সময় আমি ফাঁকে ফাঁকে বেশ কিছু বই পড়েছি। অর্থাৎ পড়াটা আমার সব সময়ই চলমান ছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে আগেই আমার ভেতরে এক ধরনের পরিবর্তন ঘটে। মুক্তিযুদ্ধের সেইসব ঘটনা আমাকে আন্দোলিত করে। যুদ্ধে বিধ্বস্ত দেশের চিত্র দেখে দেখে আমার ভেতরে একরকম কবিতা লেখার ঝোঁক কাজ করে। লেখাতে মুক্তিযুদ্ধ, আন্দোলন, সংগ্রাম, হত্যা-নির্যাতন ইত্যাদি সুস্পষ্ট প্রতিফলিত হয়। মনে আছে, ওই সময় আমি একটি বই লিখলাম, যা উৎসর্গ করেছিলাম বঙ্গবন্ধুকে। অষ্টম শ্রেণিতে পড়াশোনাকালে সেই লেখা ছিল বেশ কাঁচা হাতের। পাণ্ডুলিপিটি এখনো আমার কাছে আছে, তবে তা ছাপার যোগ্য নয়। এখন আর সেগুলো আমার কাছে কবিতা মনে হয় না; ছিল কিশোর আবেগের উচ্চ বহিঃপ্রকাশ মাত্র।

অঞ্জন আচার্য : আপনার শিক্ষাজীবনের পথচলা সম্পর্কে জানতে চাই।

কামাল চৌধুরী : স্বাধীনতার পর আমরা আবার ফিরে আছি আদমজীতে। আবার সেই গোদনাইল হাই স্কুল। স্কুল ম্যাগাজিনে লিখলাম। একসময় দেখলাম যে আমি প্রচুর লিখছি। পাঠ্যপুস্তক ফেলে সারা দিন শুধু কবিতাই লিখছি। আমার এসএসসি পরীক্ষার খাতা ভরে উঠতে লাগল কবিতায়। কবিতা পথিক যেমন হওয়ার, তেমনটা হয়ে গেলাম। আব্বা খুব চিন্তিত ছিলেন পরীক্ষার ফল খারাপ হবে ভেবে। যদিও পরীক্ষায় আমার ফল খারাপ ছিল না, বরং ভালোই ছিল। পরীক্ষা পাসের পর থেকে কিছু কিছু লেখা পাঠাতে শুরু করলাম বিভিন্ন জায়গায়। এরপর ঢাকা কলেজে ভর্তি হলাম আমি। সেখানে ভর্তি হয়ে আমি কবিতার একটি বিশাল জগৎ পেলাম। ঢাকা কলেজে আমার দুই প্রিয় বন্ধু পেলাম। একজন কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ, আরেকজন কবি জাফর ওয়াজেদ। এই দুই কবি বন্ধুর সঙ্গে আমার সারা দিন আড্ডা চলত। দুই বন্ধুর ছিল দুই রকম প্রতিভা। জাফর ছিল চলন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া আর রুদ্র ছিল উদ্দাম-উত্তাল। রুদ্রের সঙ্গে যখন আমার প্রথম পরিচয় হয়, তখন সে বলেছিল, “আমি একটা পত্রিকা সম্পাদনা করি ‘অনামিকার অন্য চোখ’ নামে। সেটা দিল আমাকে। ক্যান্টিনে সারাক্ষণ আড্ডা চলত, পড়ালেখা তখন উচ্ছন্নে গেছে। সে সময়, বিশেষ করে ঢাকা কলেজের সময়ে, অর্থাৎ ’৭৪-’৭৫ সালে আমরা একই সঙ্গে সৃষ্টিশীলতা এবং অপচয়ের কাল হিসেবে কাটিয়েছি। অপচয় বলব এ কারণে যে, যে সময়টা আমরা আরো ভালো কাজে লাগতে পারতাম, তা আমরা আড্ডা দিয়ে নষ্ট করেছি। তবে শিল্প-সাহিত্য নিয়ে লেখাপড়া আমাদের চলেছে সমানতালে।

অন্যদিকে, একাডেমিক লেখাপড়া থেকে আমরা দূরে সরে গিয়েছিলাম। ফলে প্রত্যেকের ফলাফলই ছিল খারাপ। কথাসাহিত্যিক মঈনুল আহসান সাবেরও আমাদের সঙ্গে ঢাকা কলেজে পড়ত। লেখক আলী রীয়াজ আমাদের আড্ডায় এসে যোগ দিত।

অঞ্জন আচার্য : সাহিত্য জগতে প্রবেশ ও রাজনীতিকাল সম্পর্কে কিছু বলুন…

কামাল চৌধুরী : অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যার প্রকাশ করতেন ‘কণ্ঠস্বর’ নামে একটি পত্রিকা। তখন সায়ীদ স্যার ছিলেন ঢাকা কলেজের শিক্ষক। কণ্ঠস্বররে শেষ সংখ্যায় আমার ও রুদ্রের কবিতা ছাপা হলো। এর আগে দুই-একটি পত্রিকায় আমার লেখা প্রকাশিত হয়েছিল। তখন বেশ কিছু সাপ্তাহিক পত্রিকা বের হতো, সেগুলোতে কবিতা প্রকাশ পায় আমার। তখন ‘আজাদ’ পত্রিকাটি ছিল বেশ জনপ্রিয়। আজাদ পত্রিকায় আমি একটা লেখা পাঠালাম। রুদ্র বলল, আজাদে তারও একটি লেখা ছাপা হয়েছে। রুদ্র বলল, ‘আমি ওই পত্রিকার সম্পাদককে চিনি, চলো যাই।’ রুদ্রের সঙ্গে গেলাম, কবিতাটি পরে ছাপা হয়। এর পরে আমি ইত্তেফাকে লেখা দিলাম। রুদ্রও কবিতা দিয়েছিল। আমারটা ছাপা হলো, রুদ্রের কবিতা ছাপা হয়নি। রুদ্র খুব কষ্ট পেয়েছিল। এরপর কবি আহসান হাবীবের হাত দিয়ে আমার কবিতা ছাপা হলো দৈনিক বাংলায়। এভাবেই আমার সাহিত্য জগতে প্রবেশ। আমার পিতৃদত্ত নাম কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী হলেও শুরু থেকেই আমি কামাল চৌধুরী নামে লিখে আসছি।

ঢাকা কলেজের পাঠ শেষে ’৭৬-এ আমি ভর্তি হলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। থাকতাম ফজলুল হক হলে। প্রথমে ১৩ নম্বর, এর পর ৩০৯ নম্বর রুমে। দুই বন্ধু রুদ্র ও জাফর ভর্তি হলো বাংলা বিভাগে। আমি ও সাবের ভর্তি হলাম সমাজবিজ্ঞানে। আমিও বাংলায় ভর্তি হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পরে ভেবে দেখলাম, বাংলা তো আমি এমনিতেই পড়ব। এ মনে করে অন্য বিভাগে ভর্তি হলাম। ওই সময়ে আমাদের আড্ডাটি ছিল খুব গুরুত্বপূর্ণ। আমরা আড্ডা দিতাম বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় গফুর মিঞার রেস্টুরেন্টে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের পাশে ছিল শরীফ মিঞার দোকান। তার পাশে ছিল গফুর মিঞার রেস্তোরাঁ।

ষাটের কবি-লেখকরা আড্ডা দিতেন শরীফ মিঞার দোকানে। আর আমরা যাঁরা সত্তরের দশকের লেখক, তাঁরা আড্ডা দিতাম গফুর মিঞার দোকানে। রুদ্র, জাফর, জ্যোতি, আলমগীর রেজা চৌধুরী, আলী রীয়াজ, আবিদ রহমান, মোহন রায়হান, অনুজ লেখক তুষার দাশসহ আরো অনেকে আড্ডা দিতাম সেখানে। সপরিবারে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর পরের সময়, আমরা যাঁরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী, তাঁরা ভাবতাম, কী করা যায়? এভাবে প্রতিবাদহীন হয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকা যায় না। প্রতিকূল পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও আমরা মনে মনে ফুঁসে উঠতাম। সে সময় একদিন আমি গফুর মিঞার দোকানে বসে একটি স্লোগান লিখলাম, ‘মুজিব লোকান্তরে, মুজিব বাংলার ঘরে ঘরে’। সে সময় হায়দার আলী নামের এক ছাত্রনেতা ছিলেন। হায়দার ভাই ছিলেন আমাদের এক বছরের সিনিয়র। তাঁকে আমি স্লোগানটা দিলাম। তিনি ছিলেন দেয়ালে চিকা মারায় ওস্তাদ মানুষ। এক রাতের মধ্যে সারা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে আমার এই স্লোগান দেয়ালে দেয়ালে সাঁটিয়ে দিলেন তিনি। ওই সময় সেটা ছিল খুবই দুঃসাহসিক কাজ। আতঙ্কের ভেতর দিন কাটাতে হতো সবাইকে। যাই হোক, পরে আমার সেই স্লোগানটি ‘‘এক মুজিব লোকান্তরে, লক্ষ মুজিব ঘরে ঘরে’- এই হিসেবে ছন্দোবদ্ধ করা হয়।

’৭৭ সালের জানুয়ারি মাসে ছাত্র ইউনিয়নের ‘জয়ধ্বনি’ পত্রিকায় আমার একটি লেখা ছাপা হলো। ‘জাতীয়তাময় জন্ম-মৃত্যু’ শিরোনামের কবিতাটি ছিল এমন—‘রক্ত দেখে পালিয়ে গেলে/ বক্ষপুরে ভয়/ ভাবলে না কার রক্ত এটা/ স্মৃতিগন্ধময়/ দেখলে না কার জন্ম-মৃত্যু জাতীয়তাময়।’ কবিতাটি প্রকাশের পরদিন দেখি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে দেয়ালে আর দেয়াল পত্রিকায় ছেয়ে গেছে। ছাত্ররাজনীতি তখন উত্তাল হয়ে উঠল। ছাত্রলীগ, জাসদ ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে লাগল। তবে আমরা যাঁরা সাহিত্যকর্মী, তাঁরা ‘রাখাল’ নামে একটি সাংস্কৃতিক মুভমেন্ট শুরু করলাম।

সমাজ বদলের প্রয়োজনে রাজনীতি ও সাহিত্যকে একীভূত করাই ছিল আমাদের কাজ। এমনকি মধুর ক্যান্টিনেও আমরা কবিতা পাঠের আসর করেছি। এর মধ্যে একটি বিষয় শেয়ার করতে চাই। ওই সময় ডাকসু’র নির্বাচন প্রক্রিয়া শুরু হলো। আমরা তিন বন্ধু (রুদ্র, জাফর ও আমি) সদস্যপদের জন্য ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগ ও জাসদ ছাত্রলীগ প্যানেলের হয়ে দাঁড়ালাম। ছাত্ররাজনীতিতে ওই সময় আমি ফুল টাইমার হয়ে গেলাম। বন্ধুরা মিলে এখানে-ওখানে যাই, পাশাপাশি লেখালেখি চলে। এ সময় সত্তরের কবিদের একত্র করার লক্ষ্যে ‘নক্ষত্রবীথি’ নামে একটি পত্রিকা করলাম আমরা। বন্ধু রেজা সেলিম, আলী রীয়াজদের বাড়ি ছিল আমাদের আরো দুটি আড্ডার জায়গা। তো, নক্ষত্রবীথি পত্রিকা নিয়ে আমরা গেলাম বাংলা একাডেমিতে অগ্রজ কবি রফিক আজাদ, আসাদ চৌধুরী, মুহাম্মদ নূরুল হুদাসহ আরো কয়েকজনকে দিতে। একসময় ষাটের অগ্রজ কবিদের সঙ্গে আমাদের গড়ে ওঠে হৃদ্যতা।

অঞ্জন আচার্য : এমন কোনো স্মৃতি আছে কি, যা বলা হয়নি তেমন করে?

কামাল চৌধুরী : আমার জীবনের একটি ঘটনা এখানে বলতে চাই আমি। ’৭৭ সালের ২৬ মার্চ। আদমজী জুট মিল। আমার আব্বা তখন সেখানকার চিফ লেবার ওয়েলফেয়ার অফিসার (প্রধান শ্রমকল্যাণ কর্মকর্তা)। ওখানে স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে আমাকে ডাকা হয় কবিতা পড়তে। আমি মঞ্চে উঠে প্রথমেই বললাম, ‘বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ ছাড়া এভাবে ২৬ মার্চের অনুষ্ঠান হতে পারে না।’ আমার এ কথা শুনে সবাই খুব সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল। আমি যথারীতি বঙ্গবন্ধুকে উৎসর্গ করে কবিতা পড়লাম। এটা আমার জন্য অনেকটা সাহসী পদক্ষেপ ছিল। যিনি অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করছিলেন, তিনি আমাকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘ও তো আমাদের ভাতিজা, কবি। সে তার নিজ দায়িত্বেই এটা পড়েছে।’ আমিও দৃঢ়তার সঙ্গে বলি, হ্যাঁ, আমি নিজ দায়িত্বেই তা বলছি।’ তবে এর জন্য পরবর্তী সময়ে আমার আব্বাকে অনেক মাশুল গুনতে হয়েছিল, হয়রানির শিকার হতে হয়েছিল।

আরেকটা স্মৃতি মনে পড়ছে। অনার্স শেষ হলো। মাস্টার্সের শেষ পর্ব। আমার জানা নেই, কবিতা পড়ে কেউ ডিপার্টমেন্টের ভাইভা বোর্ড থেকে পাস করেছে কি না। আমার সেই সৌভাগ্য হয়েছে। ক্লাস করিনি। শিক্ষকরাও কেউ আমাকে তেমন চেনেন না। ভাইভা বোর্ডে আমাকে দেখে তাঁরা সবাই রীতিমতো অবাক। আমি আবার কে? এর মধ্যে এক শিক্ষক আমাকে চিনতে পেরে বলেন, ‘ও তো কবি, ক্লাস-টাস করে না। তবে ভালো ছাত্র।’ একসময় শিক্ষকদের অনুরোধে স্বরচিত কবিতা পাঠ করে আমি ভাইভা বোর্ড পার করি। ১৯৮১ সালে প্রকাশিত হয় আমার প্রথম বই। বইটির নাম ‘‘মিছিলের সমান বয়সী’’। দ্রাবিড় প্রকাশনী নাম দিয়ে আমরা নিজেরাই সেটা বের করি। মুহাম্মদ নূরুল হুদা ভাই, রুদ্র ও আমি মিলে এই প্রকাশনার যাত্রা শুরু করলাম।

অঞ্জন আচার্য : প্রথম কাব্যগ্রন্থটি সমকালে যেমন আলোচিত ও সমাদৃত হয়েছে, তেমনি আপনার খ্যাতি ও পরিচিতির বিপুল বিস্তার ঘটিয়েছে। এ গ্রন্থভুক্ত কবিতাগুলো ছাড়া ওই সময়ের বাংলাদেশের কবিতার পূর্ণাঙ্গ আলোচনা সম্ভব নয় বলেই মনে করি।

কামাল চৌধুরী : ‘মিছিলের সমান বয়সী’ কবিতাগ্রন্থের কবিতাগুলোর রচনাকাল (১৯৭৬-১৯৮০) দেখে আজকের পাঠক সহজেই অনুধাবন করতে পারবেন যে, যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে জাতিসত্তার বিপর্যয় ও অনিশ্চয়তার অস্থির চিত্রের প্রকাশ ঘটেছে এ গ্রন্থের অধিংশ কবিতায়। এক অস্থির ও প্রতিকূল সময়ের কথা বলতে চেয়েছি আমি। জাতীয় জীবনের সামগ্রিক সংকট ও অনিকেত বাস্তবতার ক্রান্তিকালে আমার রক্তাক্ত পঙ্‌ক্তিমালা তারুণ্যের দ্রোহকে জাগিয়ে তোলে সাহসী ও স্পর্ধিত ভাষায়। নতুন বিন্যাসে পৃথিবীকে গড়তে চেয়েছি; কথা বলেছি হত্যার বিরুদ্ধে; খুলে দিয়েছি প্রতিক্রিয়াশীলদের মুখোশ; স্বপ্ন দেখেছি বৈষম্যহীন এক সমাজের—অপ্রেমিক মানুষের ভ্রূƒকুটি তুচ্ছ করে জয়গান গেয়েছি মুক্তিযুদ্ধ, আবহমান বাংলা, বাঙালি ও শাশ্বত প্রেমের।

অঞ্জন আচার্য : এবার কর্মজীবন সম্পর্কে আসা যাক।

কামাল চৌধুরী : একাডেমিক পড়াশোনা শেষে ভাবলাম কিছু তো একটা করতে হবে। ভেবেছিলাম, সাংবাদিকতা পেশায় যাবো। কিন্তু তেমন সুবিধাজনক কিছু পেলাম না। তাই অনেকটা স্বল্পকালের জন্য (প্রায় তিন মাস) যোগ দিলাম ন্যাশনাল ব্যাংকে। এর পর বিসিএস পরীক্ষা দিলাম। পাস করলাম। তৎকালীন শাহবাগে সিভিল অফিসার্স ট্রেনিং একাডেমি (বর্তমান বিসিএস ভবন) প্রশাসনে ট্রেনিং নিলাম। এর মধ্যেই প্রণয়সূত্রে বিয়ে করি নিজেরাই। আমার স্ত্রী ইফফাত আরা কামাল তখন ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের ছাত্রী (বর্তমানে যুগ্ম সচিব, স্থানীয় সরকার বিভাগ)। এই ফাঁকে আমার পারিবারিক অবস্থানটি বলে নিই। আমার দুই সন্তান। ছেলে অমিয় সদনম চৌধুরী লেখক ও ইউল্যাবের ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক। তার দুটি প্রকাশিত উপন্যাস হলো : মহাকাল (বাংলা), উইংস (ইংরেজি)। পুত্রবধূ : ফারিহা ফাইরুজ চৌধুরী কর্মরত বিশ্বব্যাংকে। আর মেয়ে প্রতীতি রাসনাজা কামাল এ-লেভেল পাস করে এখন উচ্চতর শিক্ষায় ভর্তির অপেক্ষায় আছে।

যা-ই হোক, বিসিএস ট্রেনিং শেষে আমার প্রথম পোস্টিং হয় রাঙামাটিতে। এর ফলে লেখালেখির আড্ডা থেকে আমি একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। সেখানে আমার একটি মজার অভিজ্ঞতা আছে, যা বলা যেতে পারে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে যে পিলার বসানো হয়, তখন স্থানীয় ম্যাজিস্ট্রেটদের উপস্থিত থেকে সরকারের প্রতিনিধিত্ব করতে হয়। একবার রাঙামাটির এক দুর্গম এলাকায় এমন পিলার বসানো হবে। আমি তখন সেখানকার ম্যাজিস্ট্রেট। আধা ঘণ্টার নোটিশে আমাকে পাঠিয়ে দেওয়া হলো সেখানে। আমি গেলাম। কাপ্তাই থেকে হেলিকপ্টারে গিয়ে পৌঁছালাম তৎকালীন বিডিআর ক্যাম্পে। সেখান থেকে কখনো পাহাড়ের ওপর দিয়ে, কখনো গলাসমান পানি ভেঙে ওই জায়গায় গিয়ে পৌঁছাই। পিলার চেক করে বিডিআর ক্যাম্পে আসতে আসতে রাত প্রায় ১০টা বেজে যায়। পাহাড়ের ওপর বিশাল হেলিপ্যাড। তার ওপর শুয়ে পড়ি। চারদিকে তখন ধবধবে জ্যোৎস্নায় ভরে যায়। আর আমার গা পুড়ে যায় প্রচণ্ড জ্বরে। বেহুশ হয়ে পড়ে থাকি অনেকক্ষণ। তাঁবুতে থাকতে হয় রাতে। দুই দিন পর কিছুটা সুস্থ হলাম। তাঁবুতে বসেই আমি লিখলাম ‘অরণ্যে বিলীন’ নামে একটি কবিতা। সেটা আমি ঢাকা পাঠাই আমাদের খাবারবাহী হেলিকপ্টারে করে। পরের সপ্তাহে সেটা ছাপা হলো ইত্তেফাকে।
রাঙামাটিতে আমি প্রায় তিন বছর ছিলাম। রাঙামাটিকে আমি বলি, সরকারি চাকুরে জীবনের প্রথম প্রেম। ভয়ংকর নান্দনিক সৌন্দর্য আছে সেখানে। কোনো কোনো সৌন্দর্য আক্রান্ত করে। এর পর সেখান থেকে অনেক জায়গায় গেছি। কক্সবাজার আমার আরেক প্রিয় জায়গা। সমুদ্র আমার একটি প্রিয় অংশ। আমার একটি সনেট কবিতার বই আছে ‘ভ্রমণকাহিনী’ নামে। সেখানে ছোট ছোট পরিসরে উঠে এসেছে চা-বাগান, মাধবকুণ্ডের ঝর্ণা, রাবার বাগানসহ নানা প্রকৃতি ও নিসর্গের কথা। অনেকে ভাবতে পারেন, এটা হয়তো কোনো গদ্যের বই। আসলে ভ্রমণযাত্রাটা হচ্ছে আমার কাছে কবিতার যাত্রা।
অঞ্জন আচার্য : আপনার কবিতা ও সাহিত্য-বিষয়ক ভাবনাগুলো জানতে চাই?

কামাল চৌধুরী : কবিতার কাজটি খুব সহজ নয়। একটি উদাহরণ টেনে বিষয়টি পরিষ্কার করা যাক। যেমন : শূন্য (০) সংখ্যাটি যদি ডিজিট হিসেবে ধরা হয়, তবে এর কোনো মূল্য নেই। তবে এটিকে যদি একটা নম্বর হিসেবে ধরি, তবে এর গুরুত্ব আছে। কারণ নম্বরটা যোগ হচ্ছে। ডিজিটটাও যোগ হচ্ছে, তবে সেটা নম্বর হিসেবে যোগ হচ্ছে। শূন্য সংখ্যাটি কোনো একটি পূর্ণ সংখ্যার ডানে বসালে মূল্য বেড়ে যায়, আর বামে বসালে কমে যায়। তার মানে হচ্ছে যে, সবকিছুর মধ্যে একটা ভ্যালু অ্যাড (মূল্য যোগ) করতে হবে। সে ক্ষেত্রে সাহিত্যের ভ্যালুটা কী? সাহিত্যের একটা লিটারেরি প্রপার্টি বা সাহিত্যমূল্য আছে। লেখাটি যখন শুধু লেখামাত্রই থাকে, তখন সেটার কোনো মূল্য নেই। এটা একটা বর্ণনা হতে পারে, অন্তর্গত বোধ হতে পারে। কিন্তু লেখার ভেতর যখন সাহিত্য মূল্যটা থাকবে, তখন এটাকে আমি বলব, এটা শিল্প হয়ে উঠেছে; কবিতা হয়েছে। এ জন্য কোনো কিছুর সঙ্গে আমরা যখন মূল্য যোগ করতে যাই, তখন কাজটা কঠিন।

বাংলার ইতিহাসে শত শত কবিতা রচিত হয়েছে। চারণ কবিরা যে কবিতা রচনা করে গেছেন, তার ওপরই কাজ করছি আমরা। ওটা ছিল আমাদের কবিতার ভিত্তি। কবিতার কাজটি বেশ কঠিন। কারণ, কবিতা অনেক জিনিসকে এক জায়গায় করে। আমার যে অভিজ্ঞতা তা আমি দেখছি, অনুভব করছি। উক্তি ও উপলব্ধিকে আমি একটা জায়গায় আনার চেষ্টা করছি। আমি দেখছি সেখানে ছন্দটা কাজ করে কি না, সেখানে মেটাফোর কাজ করে কি না, নন্দনতত্ত্ব কাজ করছে কি না। শব্দ-আঙ্গিক-বিন্যাস সবকিছু মিলে শেষে ভাষাটা কিন্তু আর ভাষা থাকছে না। একটা ভাষাকে আমি অনেক মাত্রায় দেখে তাকে অন্য একটি জায়গায় নেওয়ার চেষ্টা করি। কথন বার্তা, লেখনী বার্তা ও কাব্যিক বার্তা কিন্তু এক নয়। এই কাজ যখন করতে হয়, তখন একজন কবিকে আত্মস্থ করতে হয় বহু কিছু। তাঁকে তাঁর সময়কে, আত্মজীবনীকে আত্মস্থ করতে হয়।

কবি যা-ই লেখেন, তা তাঁর আত্মজীবনীর অংশ, সেটা তাঁর স্বপ্নের অংশ। কবি মেমোয়ার্স লেখেন, কিন্তু তা আরেকজনের মতো নয়। কবি মেমোয়ার্স লেখেন ছোট ছোট বিন্দু দিয়ে। সেই বিন্দু থেকে সিন্ধু হবে কিংবা আলাদা ব্যাখ্যা হবে, তা সময়ই বলে দেবে। আমরা আমাদের যাপিত জীবনের বহু অভিজ্ঞতাকে এক জায়গায় কম্পোজ করার চেষ্টা করি। ফলে কবিতাকে সময়ের থেকে বিচ্যুত করা যাবে না। কিন্তু এও মনে রাখতে হবে, শুধু আত্মজীবনী কবিতা না, শুধু স্বপ্ন কবিতা না, শুধু বাস্তবতা কবিতা না। তাহলে কোথায় কবিতা? আমি মনে করি, স্বপ্ন ও বাস্তবতার পরে যে জায়গাটি তৈরি হয় তাই কবিতা। যার সবটুকু ব্যাখ্যা করা যায় না। সে জন্য কবিতাকে বলা হয় রহস্যময়, কবিতাকে বলা হয় মনোজাগতিক। অবজেক্টটিভলি লিখলে কবিতা হবে না, কবিতার বিষয়টি গাণিতিক, কিন্তু তার অনুভব হচ্ছে মনোজাগতিক।

শনিবারের চিঠি/ আটলান্টা/ ৩০ জানুয়ারি ২০১৬

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১০:৫৯ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ৩০ জানুয়ারি ২০১৬

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com