বিনা মূল্যের বই বিতরণ টাকা নিয়ে!

সোমবার, ০৫ জানুয়ারি ২০১৫

বিনা মূল্যের বই বিতরণ টাকা নিয়ে!

 

শনিবার রিপোটঃ প্রাথমিকের মতো মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের বিনা মূল্যে পাঠ্য বই বিতরণের নির্দেশ দেওয়া হলেও সরকারের নিয়মনীতিকে তোয়াক্কা না করে বিভিন্ন স্থানে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বই বিতরণের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কোনো কোনো উচ্চ বিদ্যালয়ে মাসিক বেতন, ভর্তি ফি, সেশন চার্জসহ অন্যান্য ফির অজুহাত তুলে এ টাকা নেওয়া হচ্ছে বলে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা অভিযোগ করেছেন। যারা এ টাকা দিতে পারছে না তাদের হাতে বই তুলে দেওয়া হচ্ছে না।


কুড়িগ্রামের রৌমারীতে বেশ কয়েকটি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা নানা অজুহাতে শিক্ষার্থীদের কাছে টাকা আদায় করে বই দিচ্ছেন। গাজীপুরের শ্রীপুর, শেরপুরের নকলা, কুমিল্লার নাঙ্গলকোট ও মনোহরগঞ্জ উপজেলা ও কয়েকটি উচ্চ বিদ্যালয় ও মাদ্রাসায় একই ঘটনার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় অভিভাবকরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তকের (এনসিটিবি) চেয়ারম্যান আবুল কাশেম মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বইগুলো আমরা বিন্যা মূল্যে বিতরণের জন্য দিয়েছি। এর সঙ্গে বিদ্যালয়ের মাসিক বেতন, ভর্তি ফি, সেশন ফির কোনো সম্পর্ক নেই। যদি নেওয়া হয় তাহলে তা হবে নিয়মবহির্ভূত।’ তিনি আরো বলেন, ‘বিষয়টি বিদ্যালয়ের ম্যানেজিং কমিটি, শিক্ষা প্রশাসনের দেখা উচিত। যাতে কেউ সরকারের সৎ-সুন্দর উদ্দেশ্যেকে নস্যাৎ করতে না পারে।’ বিভিন্ন স্থান থেকে আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

রৌমারী (কুড়িগ্রাম) : রৌমারী উপজেলার দাঁতভাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রৌমারী সিজি জামান হাই স্কুলে প্রধান শিক্ষকরা নানা অজুহাতে এক হাতে ৫০০ থেকে ৯০০ টাকা নিচ্ছেন, অন্য হাতে বিনা মূল্যের পাঠ্য বই বিতরণ করছেন। দাঁতভাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজের সপ্তম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ এক শিক্ষার্থী জানায়, ‘সেশন ফি ৩০০ টাকা, ভর্তি ফি ২০০ টাকা, তিন মাসের বেতন ২৪০ টাকা এবং অন্যান্য ফি ৪০ মোট ৭৮০ টাকা দিতে হচ্ছে। ওই টাকা পরিশোধ করে তার রিসিভ জমা দিলে বিনা মূল্যের পাঠ্য বই পাওয়া যাচ্ছে। এভাবেই রৌমারী সিজি জামান হাই স্কুল, কোমরভঙ্গি উচ্চ বিদ্যালয়, বকবান্দা বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, শৌলমারী এম আর উচ্চ বিদ্যালয়, টাপুরচর উচ্চ বিদ্যালয়, পাখিউড়া উচ্চ বিদ্যালয়, যাদুরচর উচ্চ বিদ্যালয় ও চরশৌলমারী উচ্চ বিদ্যালয়েও পাঠ্য বই বিতরণের সময় অর্থ আদায় করা হচ্ছে।

তবে দাঁতভাঙ্গা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ বদিউজ্জামান বলেন, ‘ম্যানেজিং কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ওই ফি নির্ধারণ করা হয়েছে। আমি সেটাই আদায় করছি।’

নাঙ্গলকোট ও মনোহরগঞ্জ : কুমিল্লার নাঙ্গলকোট ও মনোহরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিনা মূল্যের সরকারি পাঠ্য বই বিতরণের সময় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করা হচ্ছে। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।

নাঙ্গলকোট উপজেলার পানকরা হাফেজা উচ্চ বিদ্যালয়ে গতকাল সকালে এক শিক্ষার্থী বিদ্যালয়ে এসেছিলেন নতুন বছরের পাঠ্য বই নিতে। কিন্তু তাকে বাড়িতে ফিরতে হয়েছে বই না নিয়ে। কারণ বই পেতে হলে দিতে হয় ২৫০ টাকা। এভাবেই ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদেরও টাকা দিয়ে বই নিতে হয়েছে।

মনোহরগঞ্জ উপজেলার শাহপুর ফাজিল মাদ্রাসার সপ্তম শ্রেণির ছাত্র তহিদুর রহমান। গতকাল সকালে মাদ্রাসায় এসেছিল সরকারের দেওয়া বিনা মূল্যের পাঠ্য বই নিতে। কিন্তু ওই মাদ্রাসার আইনুযায়ী তাকে বই নিতে দিতে হয়েছে ১০০ টাকা।

এ বিষয়ে নাঙ্গলকোট উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এ বি এম আবদুল হান্নান ও মনোহরগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সৈয়দ মো. তৈয়ব হোসেন জানান, বই বিতরণের সময় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার কোনো ক্ষমতা শিক্ষক বা ম্যানেজিং কমিটির নেই। কেউ বই বিতরণে টাকা আদায় করলে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শেরপুর : শেরপুরের নকলায় উপজেলার ৭ নম্বর টালকি ইউনিয়নের ইসলাম নগর সাইলামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুস সাত্তারের বিরুদ্ধে প্রতি সেট বইয়ের জন্য ছাত্রপ্রতি ২০০ টাকা করে নগদ ফি আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগে বলা হয়েছে। বই উৎসবের দিনে বিদ্যালয়ের প্রায় ৮০০ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ওই টাকা আদায় করা হয়।

চরকামানিরপাড় গ্রামের নূরজাহান নামের এক অভিভাবক বলেন, ‘বই উৎসবের দিন বিদ্যালয়ে গিয়ে নাতনির জন্য বই চাইলে প্রধান শিক্ষক তার কাছে ২০০ টাকা দাবি করে বলেন, টাকা না দিলে বই পাওয়া যাবে না। ১৫০ টাকা দেওয়া হলে তিনি তা ফিরিয়ে দেন। আরেক অভিভাবক জানান, প্রধান শিক্ষক বই কম এসেছে, আর নাও আসতে পারে- এমন ভয় দেখিয়ে অনেকের কাছ থেকে ৫০০-৬০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে।

গাজীপুরের শ্রীপুর : গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার গাজীপুর ইউনিয়নের ধনুয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র শাহ জালাল। এবার সে ষষ্ঠ থেকে সপ্তম শ্রেণিতে উঠেছে। বছরের প্রথম দিনে নতুন জামাকাপড় পরে হেসে-খেলে বিদ্যালয়ের বই উৎসবে যোগ দিয়েছিল জালাল। নতুন বই পাওয়ার আশা নিয়ে দুই ঘণ্টা অতিথিদের বক্তব্য শোনার পর শিক্ষকরা জানালেন, নতুন বইয়ের জন্য প্রত্যেক শিক্ষার্থীর ৬৫০ টাকা দিতে হবে।’ টাকা দিতে না পেরে কেঁদে খালি হাতে ঘরে ফিরে সে। শুধু শাহ জালাল ও তার সহপাঠী রমজান আলী নয়, এমন অভিযোগ বিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীর। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, নগদ টাকা দিতে না পেরে বিদ্যালয়ের প্রায় ৪০০ দরিদ্র শিক্ষার্থী এখনো নতুন বই হাতে পায়নি।

অভিভাবকরা আরো জানান, প্রধান শিক্ষকের ওই ঘোষণার পর শিক্ষার্থীরা কেঁদে-কেটে খালি হাতে ঘরে ফেরে। তবে বিদ্যালয়ের আশপাশের ৩৫ থেকে ৪০ জন সচ্ছল শিক্ষার্থী নগদ টাকা দিয়ে নতুন বই হাতে পায়।

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ‘শ্রীপুরের বেশির ভাগ বিদ্যালয় ও মাদ্রাসায় একইভাবে টাকা আদায় করা হচ্ছে। ওই তুলনায় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে আমরা বরং আরো কম টাকা আদায় করছি।’

অভিযোগ প্রসঙ্গে শ্রীপুর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আতিকুর রহমান খান বলেন, ‘বিনা মূল্যে বিতরণের জন্য বইয়ের মূল্য আদায় করা হচ্ছে বলে কোনো খবর আমার জানা নেই। অভিযোগ পেলে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’সুত্রঃ কালের কন্ঠ

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৩:৩৬ পূর্বাহ্ণ | সোমবার, ০৫ জানুয়ারি ২০১৫

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com