বিদ্বান পরিত্যাজ্য

শনিবার, ২৩ মে ২০১৫

বিদ্বান পরিত্যাজ্য

 

মুহ শরীফ উল ইসলাম


 

 

Litearture 01রাজু মিয়া কিছুদিন হল বিছানায় পড়ে গেছে। কেহ পিঠে হাত দিয়ে উঠায় না দিলে নিজে বসতেও পারে না। সারাক্ষণ তার বিছানার পাশে থাকে এক মাত্র মেয়ে সাহানা। বহুদিন হল বউ মারা গিয়েছে, দ্বিতীয় বিয়ে-শাদী  আর করে নাই। এই মেয়েটি ছিল বলে তার রক্ষা। অনেক দিন পর্যন্ত মেয়েটির বিয়ে হচ্ছিল না। মুখরা ঝগড়াটে বলে গ্রামে তার নাম আছে।অনেক বয়সে তার বিয়ে হয়েছিল, বর দুরের অচেনা এক গ্রামের। বিয়ে করে সে ঘরজামাই হয়েছিল। বাচ্চাও হয়েছিল দুইটা। ১০/১২ বছর সংসার করার পর বরটি একদিন উধাও। গাঁয়ের লোকে বলে বউয়ের অত্যাচারে বেটা বাচ্চা কাচ্চা রেখে পালিয়ে বেঁচেছে। এ নিয়ে সাহানার কোন মাথা ব্যথা নেই। সে বাপের সংসারে সর্বময় কর্তা।

সাহানা বাপের পাশে বসে পান চিবাতে চিবাতে বলল, বুঝলে বাবা বিদ্বান সর্বদা পরিত্যাজ্য ।

নারে মা না, হবে দুর্জন বিদ্বান হলেও পরিত্যাজ্য ।

বাবা কথাটি ঠিক না। বিদ্বান সে সুজন বা দুর্জন হোক তা পরিত্যাজ্য। আর বাবা তুমি জান না , বিদ্বান কখনও সুজন হতে পারে না, সে সর্বদাই দুর্জন। এই দেখ তোমার চারটা বেটা।সবাইকে বড় বিদ্বান । তারা কি দুর্জন নয় ? তারা কোথায়?  তোমাকে এক নজরও দেখতে আসে না। এক মাত্র পঙ্গু অসুস্থ বাবাকে দেখতে আসা কি উচিৎ নয় ?  আর আমি এই পাড়াগাঁয়ের এক মূর্খ মেয়ে আমাকে লেখাপড়া শিখাও নাই। কোনদিন স্কুলে পাঠাও নাই। মেয়ে পড়ান পাপ। মেয়েকে লেখাপড়া শিখাইয়ে লাভ কি?  তাদের লেখা-পড়ার পিছনে  অর্থ খরচ মানে টাকা দিয়ে দোজখ কেনা। তুমি বিছানায় পড়ে আছ, তোমাকে দেখাশুনার লোকের দরকার। তোমার বিদ্বান ছেলেরা কি খোঁজ খবর নিচ্ছে?  নিচ্ছে না। এই মূর্খ মেয়েই তোমার কাজে লাগছে।  বাবা আমার ভবিষ্যৎ কি ? আমি দুইটা বাচ্চা নিয়ে স্বামী পরিত্যক্তা। তোমার যে অবস্থা তাতে আজ আছ তো কাল নেই। তখন আমি বাচ্চাদের নিয়ে কোথায় গিয়ে দাঁড়াব ?  তুমি এক কাজ কর বাবা, তোমার যে জমি জমা বাস্ত-ভিটা আছে , আমার নামে লিখে দাও। তাতে তোমার সম্পদ রক্ষা হবে। তুমি মারা গেলে তোমার  বিদ্বান ছেলেরা সব বিক্রি  শহরে নিয়ে যাবে। আমাকে বাচ্চাসহ ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিবে।

 তোর কি মাথা খারাপ হয়ে গেল, তোর ভাইয়েরা তোকে পথে বের করে দিবে? তারা তোকে কত আদর করে। তুইহলি তাদের এক মাত্র বোন। তাছাড়া আমার সব ছেলেরা বড় বিদ্বান।শিক্ষিত মানুষেরা অন্যায় করতে পারে না। তাদের বিবেক বলে একটা কথা আছে। আর আমার ছেলেদের কি কিছুতে কি কম আছেরে। তাদের প্রত্যেকের ঢাকায় ৫ তলা বাড়ি। তারা আমার এই তুচ্ছ জনি জমা নিয়ে ভাবে না। এই বাড়ি ঘর তোর আছে তোরই থাকবে।

আহরে আমার কপাল, আমি বলি কি আর উনি বলে কি?  শিক্ষিত মানুষেরা অন্যায় করতে পারে না, তাদের বিবেক আছে। বাবা আমি তোমাকে বলেছি না, বিদ্বান মাত্রই পরিত্যজ্য। তোমার ছেলেরা সব বড় বিদ্বান বড় বড় চাকুরে । একজন্ তো বড় সাংবাদিক , অন্যের সংবাদ ছাপায়। সে কি তার নিজ বাপের সংবাদ রাখে? বলতো তুমি কতদিন তোমার ছেলেদেরএক নজর দেখ না। তুমি কি জান ঢাকায় একটা ৫ তলা বাড়ি করতে কত টাকা লাগে। ঢাকায় বাড়ি করতে তুমি কি তাদের টাকা দিয়েছে ? দেও নাই। তারা কত টাকা বেতন পায়।তাহলে তারা টাকা পেল কোথায়। নিশ্চয়ই ঘুষ খেয়েছে। শোন নাই, হুজুররা বলে ঘুষ খোর দোজখের আগুনে জ্বলবে। জ্বলুক আর না জ্বলুক তুমিত ঘুষখোরের বাবা।বাবা তুমি হিসাব করে দেখ , তাদের পড়াতে তোমার কত টাকা খরচ হয়েছে, আমার পিছনে এক কানা কড়িও ব্যয় কর নাই। সে হিসাবে তোমার সব সম্পদ আমাকে দিলেও আমার প্রাপ্য শোধ হয় না। হিসেব কর ছেলেদের পড়াতে যে ব্যয় করেছে তা দিয়ে যদি এতিম খানা মাদ্রাসা মক্তব বানাতে তাহলে আজ অনাসয়ে বেহেস্তে যেতে।আর এখন ঘুষখোর বিদ্বান বানিয়ে দোজখের সার্টিফিকেট কিনেছ। তোমার ছেলেদের অনেক আছে আরও করতে পারবে। আমি নিঃস্ব , দোমনা না করে আমাকে তোমার জমি জমা লিখে দাও।আমি তোমার এই গা ছুঁয়ে বলছি , তোমার  মরার পর মাসে মাসে কোরআন খতম দিয়ে দিব। বছরে বছরে এতিম মিসকিনদের ভরে খাইয়ে দিব। আমি একজন মুহুরি এনেছি, তিনি দলিলপত্র ঠিক করেছেন তুমি শুধু সই করে দাও।

না না আমি কারুর হক নষ্ট করব না। আমার মরার পর যে যার প্রাপ্য বুঝে নিও।

  ও বুঝেছি , আমি মেয়ে আমার কোন মূল্য তোমার কাছে নাই।

অন্য ঘরে মুহুরি বসা ছিল সাহানা তার কাছে গিয়ে বলল, চাচা বাবাতো কোন মতেই রাজী হচ্ছে না, কি করি বলেন তো ?

শোন সোজা আঙ্গুলে ঘি ওঠে না। আমাকে ১ লাখ টাকা দাও আর আমার পরামর্শ মত কাজ কর, রাতে খাবারে বিষ মিশাইয়া দাও। আমি কাল এসে মরা হাতের ছাপ নিয়ে তোমার নামে সব জমি জমা দলিল করে দিব। ভাত ছিটালে কাকের অভাব হয় না । সাক্ষী সবদ পেতে তোমার কোন বেগ পেতে হবে না। আর শোন তোমার বাপের মরার খবর ভাইদের জানাইও না।যত তাড়াতাড়ি পার কবর দিয়ে দিও। ওরা যখন বাপ মরার খবর পেয়ে আসবে তখন কান্না কাটি করে বলবে , আমি মূর্খ মেয়ে মানুষ তোমাদের কত খবর দেওয়ার চেষ্টা করলাম পারলাম না,সবাই বলল লাশ বেশি সময় ঘরে রাখতে নাই, যত তাড়াতাড়ি কবর দেওয়া যায় ততই আত্মার মঙ্গল।

বাবা মৃত্যুর পর অনেক জমি জমার মালিক হওয়ায় গ্রামে সাহানার প্রতিপত্তি বেড়ে যায়। গাঁয়ের ঝগড়াঝাটি বিবাদ মীমাংসায় সাহানার মতের গুরুত্ব অনেক। যার ফলে সে প্রথমে গ্রামের  মহিলা মেম্বার পরে উপজেলা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়। আগামি উপজেলা নির্বাচনে সাহানা নিজেই উপজেলা চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী। গতকাল স্থানীয় হাইস্কুল মাঠে ছিল সাহানার নির্বাচনী জনসভা। মাঠ ছিল  মানুষে কানায় কানায় পরিপূর্ণ। সাহানা তার বজ্রকন্ঠে বলল , ভাইবোনেরা আমার দেশ আজ দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে। অফিস আদালত ঘুষ দুর্নীতির আখড়া।এখানে আগত ভাইবোনেরা, আপনাদের কাছে আমার প্রশ্ন , অফিস আদালতে কারা চাকরি করে ? বিদ্বান লোকেরাই ওখানে চাকরি করে । তা হলে দুর্নীতি করে কারা। অফিস আদালতের বিদ্বান ব্যক্তিরাই দুর্নীতির হোতা।

‘ দেশ  আজ দূর্নীতিতে ভরে গেছে ।  ‘খুন গুম দূর্নীতি সব অপকর্মের হোতা আজ সব বড় বড় ডিগ্রীধারীরাই । অশিক্ষিত- অর্ধশিক্ষিতরা এ সব দূর্নীতির ধারে কাছেও নাই ।

তাই আপনাদের কাছে আমার দাবী , বিদ্বান পরিত্যাজ্য। আমার প্রতিদ্বন্দিরাও সব বড় বড় শিক্ষিত বড় বড় বিদ্বান। আমার একটই শ্লোগান  বিদ্বান পরিত্যাজ্য। সভাস্থল থেকে মুরব্বী গোছের একজন বলে উঠল পাগলী খ্যেপেছেরে, পাগলী খ্যেপেছে !! চল ওঠা যাক।

পরের দিন সব পত্রিকায় শিরোনাম  এলো, ‘ বিদ্বান পরিত্যাজ্য – সাহানা খাতুন ‘

 

আটলান্টা, জর্জিয়া

মে ২১, ২০১৫

 

শনিবারের চিঠি/ আটলান্টা/ মে ২৩ ২০১৫

 

আমাদের ওয়েবে  আরো গল্প পড়তে নিন্মের লিঙ্কে দেখুনঃ

শনিবার সাহিত্য

 

 

 

 

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৫:১২ অপরাহ্ণ | শনিবার, ২৩ মে ২০১৫

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com