বিজয় উল্লাসের অপেক্ষায় বাংলাদেশ

বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ ২০১৫

বিজয় উল্লাসের অপেক্ষায় বাংলাদেশ

দীপন নন্দী,ঢাকা: পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মাঠে খেলা। সামনে ক্রিকেট মোড়ল ভারত। তাদের অহঙ্কারকে পদচূর্ণ করতে প্রস্তুত অকুতোভয় ১১ টাইগার। আর তাদের সঙ্গে প্রস্তুত ছাপান্ন হাজার বর্গমাইলের ষোলো কোটি মানুষ। বিজয়ের আগেই তৈরি হয়ে গেছে বিজয় মঞ্চ। এখন অপেক্ষা শুধু ভারতকে হারানোর। আর তার জন্য পুরো দেশ এখন প্রার্থনারত। করজোড়ে ঈশ্বরের কাছে কায়মনে প্রার্থনা- সেমিফাইনালে উঠুক প্রিয় দেশ।

বিশ্বকাপ ক্রিকেটর কোয়ার্টার ফাইনালকে সামনে রেখে ক্রিকেটপাগল বাংলাদেশিদের উচ্ছ্বাসের একটি চিত্র দেখা গেলো বুধবার বিকেলে। বাংলাদেশ ক্রিকেট ফ্যানস ইউনিটি নামে একটি ফেসবুক ভিত্তিক সংগঠন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বোপার্জিত স্বাধীনতার পাদদেশে আয়োজন করে পতাকা শোভাযাত্রার। দেশের গানে আর উদ্দীপনামূলক নানা স্লোগানে তারা মাতিয়ে রাখে পুরো বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা।


শোভাযাত্রার নির্ধারিত সময় ছিল বিকেল ৪টা। তার এক ঘন্টা আগে থেকেই সবাই জড়ো হতে শুরু করে সেখানে। কিন্তু বেরসিক বৃষ্টি বাধ সাধে তাদের আয়োজনে। তবে যে আয়োজনে যুক্ত আছে বাংলাদেশের নাম, সে আয়োজনকে রুখে এমন সাধ্যি কার! আর সেজন্যই শোভাযাত্রার আগেই মেঘ সরে হেসে উঠলো সূর্যি মামা। সঙ্গে সঙ্গে উপস্থিত হাজারো কণ্ঠ এক হয়ে গর্জে উঠলো ‘বাংলাদেশ…বাংলাদেশ’।

শুরুতেই কনসার্ট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যান্ডদল চিত্রের শিল্পীদের কণ্ঠে উচ্চারিত হলো আজম খানের গান- ‘রেললাইনের ওই বস্তিতে জন্মেছিল একটি ছেলে…বাংলাদেশ…বাংলাদেশ’। সবাই মিলে উপভোগ করলেও স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বরের একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা আসিফ আর মুনিরা জানালেন প্রতিবাদ। নিজেদের মধ্যেই আলোচনা- বাংলাদেশ এখন আর বস্তির দেশ নয়, পৃথিবীর সেরা ক্রিকেট দলগুলো একটি। যেখানে রয়েছেন মাশরাফির মতো একজন বীর সেনাপতি, রয়েছেন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান আর ইতিহাস গড়া মাহমুদল্লাহর মতো ব্যাটসম্যান। আর রুবেলের মতো শেষ মুহূর্তে জ্বলে ওঠা নায়ক তো রয়েছেনই!

এতো গেলো কথার মালা। সাজসজ্বাতেও ছিল মাঠের আবহ। নিজের মুখকে লাল-সবুজ বানিয়ে এসেছেন বিএফ শাহীন কলেজের ছাত্র সীমান্ত। কাছে গিয়ে কথা বলতেই জানালো, তিনি নাকি মুখে লাল-সবুজ রঙ লাগালে বাংলাদেশ জেতে, বৃহস্পতিবারের ম্যাচের আগে তাই আগাম প্রস্তুতি। কোয়ার্টার ফাইনালে বাংলাদেশ- কেমন লাগছে জানতে চাইলেই বললেন, ‘কেমন লাগছে, এ কথা ভাষায় প্রকাশ করার ক্ষমতা আল্লাহ আমাকে দেন নাই।’ বৃহস্পতিবারের ম্যাচের প্রত্যাশা জানতে চাইলে বলেন, ‘বাংলাদেশ দলকে অনেক অনেক শুভকামনা। আমরা মেলবোর্নে গিয়ে খেলা দেখতে পারবো না, কিন্তু এখন থেকে চিৎকার করে বাংলাদেশ দলকে সমর্থন জানাতে চাই। আশা করছি, ভারতকে হারিয়ে আমরা সেমিফাইনালে উঠবো, তার পর ফাইনাল। আর এরপর মাশরাফির হাতে উঠবে বিশ্বকাপের ট্রফিটি।’

একই প্রসঙ্গে কথা হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্রী সুমাইয়ার সঙ্গে। বললেন, ‘ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের জয় কামনা করার সঙ্গে সঙ্গে চাইছি অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে সেমিফাইনালে উঠুক পাকিস্তান। এরপর ২৬ মার্চ, আমাদের স্বাধীনতা দিবসের দিনে পাকিস্তানকে হারিয়ে আমরা ফাইনালে উঠতে চাই।’

দেশের গান আর কথামালার মাঝে শুরু হলো শোভাযাত্রা। সবাইকে শোভাযাত্রায় অংশ নেয়ার আহ্বান জানিয়ে অন্যতম সংগঠক বাশার বললেন, ‘আমরা আর কোনো দলকে সমর্থন করি না, শুধু বাংলাদেশকে সমর্থন করি। আর কোনো দেশকে আমরা সমর্থন করবো না।’

Rally-2এরপরই শুরু হলো শোভাযাত্রা। টিএসসি চত্বরের রাজু ভাস্কর্যের সামনে সবাই দাঁড়িয়ে পড়লেন। সবগুলো কণ্ঠ এক হয়ে গেয়ে উঠলো ‘আমার সোনার বাংলা/ আমি তোমায় ভালোবাসি’। উপস্থিতির মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাৎ মনে হচ্ছিল, সবাই যেন মেলবোর্নে দাঁড়িয়ে গাইছেন জাতীয় সঙ্গীত। এরপর সজোড়ে স্লোগান- ‘জয় বাংলা’। শুরু হলো শোভাযাত্রার। সর্বাগ্রে ব্যান্ড পার্টি। যেখান থেকে জাতীয় সঙ্গীত আর রণসঙ্গীত ‘চল্ চল্’-এর সুর বেজে উঠছে। এরপরই ব্যানার হাতে মেয়েরা। তারপর বিশালাকৃতির জাতীয় পতাকা। আর অন্যদের হাতেও জাতীয় পতাকা, পরনে বাংলাদেশের জার্সি। রাজু ভাস্কর্য থেকে শোভাযাত্রা এগিয়ে যায় দোয়েল চত্বরের দিকে। সেখানে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার হয়ে আবারো স্বোপার্জিত স্বাধীনতা চত্বরে এসে শেষ হয় শোভাযাত্রাটি। পথিমধ্যে রাস্তায় ঘরে ফেরা মানুষেরা গাড়িতে বসে, রিকশায় চড়ে অভিবাদন জানিয়েছেন বাংলাদেশকে। এদিকে বাংলাদেশ ক্রিকেট ফ্যানস ইউনিটির এ আয়োজনের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে চট্টগ্রাম, রাজশাহী ও খুলনাতেও বের করা হয় পতাকা শোভাযাত্রা।

এ আয়োজন সম্পর্কে বাংলাদেশ ক্রিকেট ফ্যানস ইউনিটির ফেসবুকে শেখ ইরফান হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীবন এস চক্রবর্তী লিখেছেন, ‘বাঘের গর্জনে কাঁপছে বিশ্ব, বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছে গেছে টিম বাংলাদেশ। ১৯ মার্চ মেলবোর্নে প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনাল খেলতে নামবে আমার দেশ।’

এরপর বিশ্বকাপ ফুটবলের উদাহারণ টেনে তারা লিখেছেন- ‘ব্রাজিল-আর্জেন্টিনাকে সমর্থনের জন্য রেকর্ড ভাঙা সব পতাকা বানাই আমরা। পতাকায় ছেয়ে যায় সারাদেশ, শুভকামনা জানিয়ে হয় র‌্যালি, শোভাযাত্রা। কিন্তু আজ টাইগাররা যখন ক্রিকেট বিশ্বকাপে সারা বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে বাঘের গর্জনে, আমাদের দেশপ্রেম তখন বন্দী ফেসবুক স্ট্যাটাসে, শোভাযাত্রা দূরে থাক, ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের দামে কেনা পতাকাটা উড়াতেও আমাদের যেনো লজ্জা লাগে। অথচ ভারত, পাকিস্তান, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনার পতাকা উড়াতে আমাদের লজ্জা নেই! এই লজ্জার শেষ নেই। অনেক হয়েছে ভিনদেশপ্রীতি, আর নয়। সময় এসেছে দেখিয়ে দেবার।… মাঠে তোমরা এগারোজন, কিন্তু সাথে আছি আমরা ষোল কোটি। যে লাল সবুজ পতাকার জন্য তোমরা খেলো, সে লাল সবুজের পতাকা হাতে আমরা আছি রাজপথে, তোমাদের সাহস যোগাতে, শুভকামনা জানাতে। গৌরব আর অহঙ্কারের মাস মার্চ। এই মার্চেই লেখা হোক টাইগারদের নতুন বিজয়গাথা। টাইগারদের গর্জনে কাঁপুক সারা বিশ্ব, লাল সবুজের উৎসবে মাতুক সারাদেশ।’

এতো গেলো একটি স্বতন্ত্র সংগঠনের আয়োজন। কিন্তু বৃহস্পতিবারের কোয়ার্টার ফাইনালকে সামনে রেখে রীতিমতো উৎসবের আমেজ সৃষ্টি হয়েছে পুরো বাংলাদেশ জুড়ে। ইতোমধ্যেই বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত করে দেয়া হয়েছে। সবাই এখন ব্যস্ত বৃহস্পতিবারের ম্যাচ দেখা নিয়ে। সবার অপেক্ষা কখন বাজবে সকাল সাড়ে ৯টা; যখন মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে বেজে উঠবে যুদ্ধের দামামা। ধোনি-কোহলিদের হারিয়ে মেলবোর্নের এক লাখ দর্শকের সামনে ভিক্টরি ল্যাপ করবেন মাশরাফি-সাকিবরা।

প্রস্তুত মাঠের এগারো টাইগার। তাদের গর্জনে কাঁপবে ক্রিকেট বিশ্ব; ষোলো কোটির বাঙালির গর্জনে কাঁপবে সমগ্র বিশ্ব!

 

শনিবারের চিঠি / আটলান্টা / ১৮ মার্চ ২০১৫

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৯:৩০ পূর্বাহ্ণ | বৃহস্পতিবার, ১৯ মার্চ ২০১৫

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com