বাবার লুঙ্গি

মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৪

বাবার লুঙ্গি
বাবার লুঙ্গিঃ কনুজ শিকদার

কনুজ শিকদারঃ

Lungiপর সমাচার এই যে, ছেলে-মেয়ের বার্ষিক পরীক্ষার পর…’
উপরের লাইনটি পড়ে কারো বুঝতে বাকি থাকার কথা নয় যে, এটি একটি চিঠির কথা। আর এমন একটি চিঠি প্রতিবছরের শেষ সময়ে বাবার নামে আমার ছোট মামা পাঠিয়ে থাকেন। ঐ চিঠি আসা মানে আমাদের ভাই-বোনদের বাধভাঙ্গা আনন্দ।
৪ + ২ + ২ = ৮ – ২ = ৬ + ২ = ৮।
লিখতে লিখতে হঠাৎ একটা অংক চলে এলো। এই অংক সেই অংক নয়। এটা আমাদের ভাই-বোনদের সংখ্যার একটি অংক। একটু ব্যাখ্যা করি, আমরা চার ভাই দুই বোন। অবশ্য আমার জন্মের আগে ফরহাদ এবং অনুজ নামে বড় দুই ভাই ছোটবেলায় মারা গেছেন। আর বাবা-মা।
মামার ঐ চিঠি মানে পরীক্ষার পর মামাবাড়ি বেড়াতে যাওয়া। গতবছর মামাবাড়িতে একটা ঘটনা ঘটল যেটা মনে পড়লে আজও আমার হাসি পায়। ঘটনাটা এ রকম-
আমার মামাতো বোন আকলিমা বললো চল্‌ দোকানে যাই, গুড় কিনে আনি।
মামাবাড়ির দোকানে যাওয়াও যেন একটা অন্য রকম আনন্দ। আমি লাফ দিয়ে বললাম, চল্‌।
আকলিমা একটা কাসার বাটি নিয়ে রওয়ানা হলো আমাকে নিয়ে। কাসার বাটি মানে ঝোলা গুড় কেনা হবে। ঝোলা গুড় দিয়ে রুটি খেতে খুব মজা।
দোকানে পৌঁছে আকলিমা দোকানিকে বললো, কাকু এক পোয়া গুড় দাও।
দোকানি কাকু অনেক ব্যস্ত। ব্যস্ত মানে কাস্টমারের ভিড়। এরই মধ্যে কাকু বললো, দে রে আকলিমা বাটি দে।
সে দাড়িপালার একপাশে এক পোয়ার বাটখারা দিল অন্যপাশে কাসার বাটি দিয়ে ঝোলা গুড় কলস থেকে ঢালতে শুরু করল। গুড় ঢালা শেষে মাপতে লাগল। বাটিতে পরিমাণে অনেক উঠে গেছে। তাই একটু কমায় আবার পালাটা সোজা করে ধরে দেখে। এবারও বেশি হয়েছে। আবার কমায়। আবার মাপে। আবার কমায় আবার মাপে। এভাবে কমাতে কমাতে এবং মাপতে মাপতে বাটি প্রায় খালি হয়ে গেল।
এবার আকলিমা বললো, ও কাকু তুমিতো বাটির গুড় সবই প্রায় নামিয়ে ফেললে। আমার একপোয়া গুড় কই?
সে খুব চিন্তিত ভঙ্গিমায় বললো, আরে বেটি দাড়া। তুই তোর বাটি ফেরত পাবি কি-না সেটাই ভাবছি।
আকলিমা কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, একপোয়া গুড় কিনতে এসে বাটি হারাবো নাকি?
হঠাৎ একটা ব্যাপার লক্ষ্য করে আমি বললাম, ও মামা তুমি তো তোমার পাল্লায় বাটির ‘ফ্যার’ (বাটির ওজনের সমপরিমাণ বাটখারা) দাও নি।
যাই হোক, মামার চিঠি পাওয়ার পর আমাদের পড়াশোনার গতি বেড়ে গেল। বলে রাখি, আমরা ছয় ভাই-বোনই স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রী।
তখন আমরা লালমনিরহাট থাকি। বাবা রেলওয়েতে চাকরি করেন। বিশাল একটা বাংলোতে থাকি আমরা। বাংলোগুলি ব্রিটিশদের তৈরি।
ব্যস্‌। পরীক্ষা শেষ। এবার লালমনিরহাট টু মামাবাড়ি মোল্লাহাট। ট্রেনযোগে মোল্লাহাট মানে মামাবাড়ি।
মামারবাড়ি পৌঁছলাম। আমরা মোট আটজন। বাড়ির উঠোনে পৌঁছানোমাত্র গ্রামের আশেপাশের লোকজন জড়ো হয়ে গেল আমাদের দেখতে। কেউ কেউ বলছেন বিদেশ থেকে মানুষ এসেছে। কেউ কেউ আবার আমাদের ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছাপোষণ করছে। এরই মধ্যে মামী শরবত নিয়ে এলেন। সবাই শরবত খেলাম। কিছুক্ষণ পর মামা ডাব নিয়ে এলেন। সবাই ডাব খেলাম। হঠাৎ খেয়াল করলাম আশেপাশে মা নেই। কী ব্যাপার মা কোথায়?
মা গেছে তার অন্যান্য বোন-বান্ধবীদের সঙ্গে দেখা করতে। এরই মধ্যে বাব আমাদের উদ্দেশে বলে উঠলেন, অ্যাই তোমরা কাপড় বদলে নাও। তারপর গোসল করো।
এই কথা শুনে আমি মামাকে বললাম, মামা আমি পুকুরে গোসল করবো।
বাবা তাঁর স্বভাবসুলভ আচরণে বললেন, পুকুরে গোসল করা চলবে না। জ্বর হবে। গরম পানি দিয়ে গোসল করো।
আমি মামার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছি মানে গোপন মিনতি পুকুরে গোসলের জন্য।
বাবার কথা শুনে মামা বললেন, মাস্টার করুক না। এক দুইদিন পুকুরে গোসল করলে কিছু হবে না।
মামাসহ এ এলাকার সবাই বাবাকে মাস্টার বলে সম্বোধন করে। কারণ রেলওয়ের চাকরির আগে আব্বা এই গ্রামেই স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। সেই তখন থেকেই বাবা এই এলাকায় লতিফ মাস্টার হিসাবে পরিচিত।
রহমান তুমি ছেলে-মেয়েদের বেশি আস্কারা দাও। এটা ঠিক না।
মামা বলল, তুমি তোমার মাস্টারি থামাবে?
রহমান তাহলে তুমি একটা কাজ করো।
কী কাজ?
তুমি একটু অপেক্ষা করো। আমিও তোমাদের সঙ্গে পুকুরে গোসল করতে যাবো।
বাবার এই কথায় আমরা ভাই-বোনরা সবাই চিৎকার করে উঠলাম আনন্দে। সবাই পুকুরে গোসল করবো। কী আনন্দ কী আনন্দ!
কই গো কই গেলে। নাহ এই মানুষটাকে নিয়ে আর পারি না। সেই যে কখন এসেছি। কাপড়-চোপড় যে চেঞ্জ করতে হবে সেদিকে তার খেয়ালই নেই।
মাকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলি বলে বাবা নিজেই ব্যাগের ভিতরে তার লুঙ্গি খুঁজতে শুরু করলেন। এ ব্যাগ সে ব্যাগ খুঁজতে খুঁজতে রাগে গজ গজ করতে করতে বললেন, কী ব্যাপার লুঙ্গি আনা হয় নি নাকি।
এরই মধ্যে মা এলেন। মা কে দেখেই বাবা দ্বিগুন গজ গজ করে বললেন, আমার লুঙ্গি আনা হয় নি নাকি?
মাও ঠিক মনে করতে পারছেন না। ব্যাগ খোঁজা শুরু করলেন। নাহ কোথাও লুঙ্গি নেই।
এখানে আসার আগে একটা নতুন লুঙ্গি কিনলাম পরবো বলে। তোমরা যে কী করো। তোমাদের নিয়ে কীভাবে যে সংসার করছি আল্লাহই ভাল জানেন।
বাবা রেগে গেলে সংসার সম্পর্কিত কথাবার্তা বেশি বলেন। আমরা অবশ্য জানি আব্বা মাকে যতখানি বকাঝকা করেন তার চেয়ে বহুগুন বেশি ভালবাসেন।
তাহলে এখন আমি কী পরবো?
মা চুপ।
এরই মধ্যে মামা বললেন, মাস্টার এটা নিয়ে এতো ভাবার কী আছে। এই নাও তোমার জন্য আগেই আমি লুঙ্গি কিনে রেখেছি। এটা পরো।
বাবা লুঙ্গি নিলেন। মাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, শোন সংসার চালাতে গেলে সবদিকে খেয়াল রাখতে হয়। মনে রেখো তোমার ছয় ছয়টি সন্তান। কার কখন কী দরকার কে কী খাবে এইসব মনে রাখতে হবে।
যদিও মা এ বিষয়ে অনেক সচেতন। তবুও বাবার কিছু একটা বলতে হবে তাই বলা। বাবা মামার দেওয়া লুঙ্গি নিয়ে প্যান্ট বদলাচ্ছেন আর এ সব বলছেন। কাপড় বদলাতে গিয়ে বাবা থ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। মামা ব্যাপারটা লক্ষ্য করে বললেন, কী হয়েছে মাস্টার। কোন সমস্যা।
বাবার মুখে কোন কথা নেই।
মামা কাছে এসে আবার বললেন, কোন সমস্যা?
বাবা ঝট করে মামার দেওয়া লুঙ্গি ফেরত দিয়ে বললেন, ধরো তোমার লুঙ্গির দরকার নেই।
মামা বললেন, কেন?
মামার মুখটা শুকনো হয়ে গেল। জামাই হঠাৎ রাগ হলো কেন!
তোমাকে কী আরেকটা লুঙ্গি এনে দেব?
না থাক, দরকার নেই।
তাহলে।
শোন রহমান, আমি তোমাদের এখন একটা খেলা দেখাব।
মামার মুখটা আরো শুকিয়ে গেল।
সবাই তোমরা সামনে আসো।
আমরা সবাই সামনে এলাম। যারা আমাদের দেখতে এসেছিল তারাও অনেক আগ্রহ নিয়ে সামনে এলো।
বাবা খেলা দেখানো শুরু করলেন। প্রথমে জামা খুলে ফেললেন। এরপর গেঞ্জি।
মামা চিন্তিত গলায় বললেন, মাস্টার কী করছো তুমি?
বাবা মার দিকে তাকিয়ে বললেন, কী করছি মানে। আমি এখন তোমাদের খেলা দেখাব।
এই বলে জামার পর গেঞ্জি তারপর প্যান্টের বোতাম খোলা শুরু করলেন।
এবার মামি ছুটে এলেন, ভাইজান কী শুরু করলেন আপনি?
তুমি এতক্ষণ কোথায় ছিলে অ্যা? তুমি আমার সামনে দাঁড়াও। তোমার সামনেই খেলাটা দেখাই। এই বলে বাবা এক ঝটকা মেরে প্যান্ট খুলে ফেললেন।
মামিতো হাত দিয়ে মুখ ঢাকলেন। অন্যরাতো অতি আগ্রহে ব্যাপারটা উপভোগ করছে। বিশেষ করে আগত দর্শণার্থীরা।
বাবা মামিকে বললেন, মুখ ঢেকে আছ কেন? আমার দিকে তাকাও।
এক রকম জোর করেই বাবা মামির হাত মুখ থেকে সরিয়ে দিলেন। দর্শণার্থী সবাই হো হো করে হেসে উঠলো। এবার মামি চোখ খুলে হেসেই খুন।
কী খেলাটা কেমন হলো?
বাবা মার সামনে দাঁড়িয়ে বললেন, লুঙ্গিটা নেংটি করে এর ওপরেই প্যান্ট পরেছি বিষয়টা আমি বেমালুম ভুলেই গিয়েছিলাম।
মামা বাবার কাছে এসে বললেন, তোমার ছেলেমি আর গেল না।
আরে শ্বশুরবাড়িতে জামাই কখনো বুড়ো হয় না। চলো গোসল করে আসি।
সবাই গোসল করতে পুকুরে দিলাম লা……..ফ।


Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৫:২৭ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৪

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com