বাবার কাছে জুতা-সুয়েটার নেয়া হলোনা তানিয়ার

মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি ২০১৫

বাবার কাছে জুতা-সুয়েটার নেয়া হলোনা তানিয়ার

 

নাজমুল ইসলাম ,নাটোর: বাবার কাছে এবার শীতে কাপড়ের জুতা আর সুয়েটারের আবদার ছিল তানিয়ার। মেয়ের আবদারের কথা ঘটনার দিন ৯ জানুয়ারি ফোনে বলেছিল গৃহবধূ আছমা বেগম (২৫)।


সেদিন সন্ধ্যায় বাবা আসার খুশিতে না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ে ছোট্ট শিশু তানিয়া। কিন্তু ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস বাড়ি ফেরা হলো না কাভার্ডভ্যান চালক রাজু আহম্মেদের (৩৫)। পূরণ হলো না তানিয়ার ছোট্ট আবদারটুকুও। স্বামীর শোকে পাগলপ্রায় গৃহবধূ আছমা। পরিবারের কান্নায় ভারি হয়ে উঠেছে পুরো জুমাইনগর।

নাটোরের গুরুদাসপুরের জুমাইনগর গ্রামের মৃত মানু মণ্ডলের ছোট ছেলে রাজু। ৮ জানুয়ারি আলুভর্তি কাভার্ডভ্যান নিয়ে ৯ জানুয়ারি ভোর ৩টার দিকে রংপুর থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়। বগুড়ার লাহেরী ইউনিয়ন এলাকায় আসলে ২০ দলের ডাকা অবরোধে অবস্থান নেয়া পিকেটিংকারীরা কাভার্ডভ্যান লক্ষ্য করে ইট, পাটকেল ছুঁড়লে তাতে চালক রাজুর মাথায় লাগে। নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছের সঙ্গে আটকে থাকে তার কাভার্ডভ্যান। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসাপাতালে ভর্তি করে। কিন্তু অবস্থার উন্নতি না হলে চিকিৎসকরা রাজুকে সেদিনই ঢাকা মেডিকেল কলেজে হাসপাতালে ভর্তি রেফার্ড করে। সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিকেলে তার মৃত্যু হয়।

১১ জানুয়ারি বিকেল ৪টার দিকে গ্রামের বাড়িতে রাজুর লাশ আনা পর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।

নিহত রাজুর স্ত্রী আসমা, স্বামীর মৃত্যুতে পাগলপ্রায়। কান্নার শব্দে বাড়িতে শোকের মাতাম, শোকাহত আসমা জানান, দীর্ঘদিন ধরে তার স্বামী কাভার্ডভ্যান চালায়। জীবিকার তাগিদে ছুটে বেড়ায় দেশের বিভিন্ন জেলা। দুর্ঘটনার দিন রাতে স্বামী রাজুর সঙ্গে তার শেষ কথা হয়। নতুন বছরের একদিনও বাড়িতে আসেনি রাজু। কথা ছিল আলুর খেপ নামিয়ে মেয়ের জন্য শীতে কাপড়ের জুতা, সুয়েটার নিয়ে বাড়ি ফিরবে। কিন্তু বাড়ি ফিরতে দিলনা অবরোধকারীরা।

তিনি আক্ষেপ করে আরও জানান, তার স্বামী নিহত হওয়ার পর থেকে কাভার্ডভ্যানের মালিক ও ইউনিয়ন পরিষদ চেয়াম্যান মেম্বাররা কেউই কোনো খোঁজ-খবর নেয়নি। এখন তার অবুঝ মেয়ে তানিয়ার পড়াশুনা আর তাদের ভরণপোষনের দায়িত্ব কে নিবে?

নিহতের পরিবারকে সাহায্য সহযোগিতার ব্যাপারে জানতে চাইলে নাজিরপুর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আয়ুব আলী জানান, ব্যক্তিগতভাবে নিহতের পরিবারকে ও তার মেয়ের পড়াশুনার জন্য সাহায্য করবেন। এছাড়াও ইউনিয়ন পরিষদ থেকেও সহযোগিতা করবেন বলে আশ্বাস দেন।

নিহতের পরিবার জানায়, চেয়ারম্যান খোঁজ-খবর নিলেও একবারের জন্যেও কোনো খোঁজ খবর নেননি ঢাকার আমিন বাজারের গ্যারেজ ম্যালিক জহির উদ্দিন। নিহত রাজু তার গ্যারেজে ১৫ বছর ধরে কাজ করছেন।

নিহত রাজুর বৃদ্ধ মা কাঞ্চন বেওয়া (৬২) ছেলে শোকে পাগলের মতো ঘরের বারান্দায় বসে আছে। প্রতিবেশীরা তাকে ঘিরে বসে শান্তনা দিচ্ছেন। ছেলের হারানোর শোকে পাথর হয়ে বসে আছে। দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতায় তার ছেলের প্রাণ গেলেও কারো কিছু যায় আসবে না। ছেলের স্মৃতি বুকে নিয়ে থাকতে হবে সারাটা জীবন।

 

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৮:১৫ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ১৩ জানুয়ারি ২০১৫

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com