বাঙালি সংস্কৃতিকে জনপ্রিয় করতে আমেরিকান স্টাইলে রবীন্দ্র সঙ্গীত

শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর ২০১৫

বাঙালি সংস্কৃতিকে জনপ্রিয় করতে আমেরিকান স্টাইলে  রবীন্দ্র সঙ্গীত

নিউইয়র্ক থেকে এনআরবি নিউজ: ‘বিশ্বায়নের এ সময়ে বিশ্বকবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্য-সংস্কৃতি এই পাশ্চাত্যেও বিকাশ ঘটাতে হবে। কারণ, রবি ঠাকুরের কর্মের মধ্যেই নিহিত রয়েছে বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য’-এমন সংকল্প নিয়ে যাত্রা শুরু করেছেন সঙ্গীত শিল্পী এবং শিক্ষাবিদ ড. মওসুমী ব্যানার্জি। তার সাথী হয়েছেন ড. রাজিব চক্রবর্তি। উভয়েই কলকাতার সন্তান হলেও ড. মওসুমী বাস করছেন যুক্তরাষ্ট্রে। উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের পর মিশিগানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়ো স্ট্যাটিসটিক্স ডিপার্টমেন্টে শিক্ষকতা করছেন। মওসুমী এবং রাজিব-দুজনে একটি প্রকল্প নিয়ে এগুচ্ছেন। এর নাম ‘ঠাকুর : সীমানারও বাইরে’। তারা আমেরিকার ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে যাচ্ছেন, রবীন্দ্র সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে তাদেরকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন। এজন্যে তারা এগুচ্ছেন অত্যন্ত ধীর গতিতে এবং সুদূর প্রসারি পরিকল্পনার মধ্যদিয়ে। আর এ পরিকল্পনায় নিরন্তর সহযোগী হিসেবে কাছে পেয়েছেন বাংলাদেশের বাঙালিদের। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে অধ্যয়নরত বাংলাদেশী প্রজন্ম রবীন্দ্রসঙ্গীত তথা বাঙালি সংস্কৃতিকে লালন ও বিকাশে যথেষ্ঠ আগ্রহী বলে ড. ব্যানার্জি অকপটে স্বীকার করলেন। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের বাঙালিরাই হাজার বছরের ঐতিহ্যমন্ডি বাংলা সংস্কৃতিকে বিশ্ব দরবারে জাগ্রত রাখার ক্ষেত্রে অপূর্ব ভ’মিকায় অবতীর্ণ রয়েছে বলে উল্লেখ করেন অধ্যাপিকা মওসুমী ব্যানার্জি।
অক্টোবরের শেষ সপ্তাহে এমনি একটি অনুষ্ঠান হলো বিশ্বখ্যাত ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার বার্কলে ক্যাম্পাসে ‘দ্য সুবীর এ্যান্ড মালিনী চৌধুরী সেন্টার ফর বাংলাদেশ স্টাডিজ’-এ। পড়ন্ত বিকেলে বিপুলসংখ্যক দর্শক-শ্রোতার এ অনুষ্ঠানের সঞ্চালন করেন টিনা জাবিন। পাশ্চাত্যে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি লালন ও বিকাশে সোচ্চার বাংলাদেশের তরুণী টিনা জাবিন এ অঞ্চলে প্রায়ই এ ধরনের অনুষ্ঠানে হোস্ট করেন। ড. ব্যানার্জির এ অনুষ্ঠানের শিরোনাম ছিল ‘ওসেন অব স্টোরিজ : টেলিং স্টোরিজ থ্রো ট্যাগোর্স মিউজিক এ্যান্ড পয়েট্রি’। প্রথম পর্বে ছিল মওসুমী ব্যানার্জির সাথে রবীন্দ্রনাথ ঘিরে কথোপকথন। স্থান পায় শুধুই রবীন্দ্র সাহিত্য। এর আগে এই সেন্টারের পরিচালক ড. সঞ্চিতা সাক্সেনা স্বাগত বক্তব্য দেন। ড. সঞ্চিতাও বাংলাদেশেরই ইমিগ্র্যান্ট।
টিনার সাথে কথোপকথনের সময় প্রাসঙ্গিক সঙ্গীত পরিবেশন করেন ড. মওসুমী। ‘বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা, বিপদে আমি না যেন করি ভয়’ গান দিয়ে শুরু বৈচিত্রমন্ডিত এ অনুষ্ঠানের। গান বাংলায় পরিবেশিত হলেও গানের প্রেক্ষাপট এবং অন্যান্য প্রসঙ্গ ইংরেজীতে উপস্থাপন করেন মওসুমী। এ সময় মওসুমী সকলকে অবহিত করেছেন, বাংলার মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান আমি। বেড়ে উঠেছি একই সমাজে। আর এ কারণেই আমার মনে হচ্ছে যে, পুরো বাঙালি সমাজেই রবীন্দ্রনাথের প্রভাব অনেক বেশী অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের গান, কবিতা, নাটক, গল্প-উপন্যাস-সবকিছুতেই মূলত: বাঙালির জীবনধারা সন্নিবেশিত। মওসুমী এ সময় অবলীলায় উল্লেখ করেন, আমার কাছে সেই ছোটবেলা থেকেই তাকে ঠাকুর (পরম পূজনীয়) বলে মনে হয়েছে। আমি মন্দিরে যাইনি কখনো। মন্দিরের সময়টুকু আমি ঘরে বসে একান্তে রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়েছি এবং এখনও তাই করি। তার গানই আমার কাছে ভগবানের প্রার্থনার মত। বিদেশে এসেও রবীন্দ্রনাথের প্রভাব মুক্ত হতে পারিনি। অর্থাৎ আমার জীবনের প্রতিটি পরতে রবীন্দ্রনাথ সমুজ্জ্বল-বলেন মওসুমী। তিনি উল্লেখ করেন, আমার সন্তানের মাঝেও রবীন্দ্রনাথে আদর্শ আর গুণাবলী প্রবাহিত করতে চাই। এ জন্যে ওরা ঘুমুতে যাবার আগে প্রতি রাতেই মোমবাতি জ্বালিয়ে ‘আগুনের পরশমনি ছোঁয়াও প্রাণে’ গানটি পরিবেশন করি।
এনআরবি নিউজকে ড. মওসুমী বলেন, তিনি (রবিঠাকুর) হচ্ছেন এ বিশ্বে ব্যতিক্রমী একজন মানুষ। সৃষ্টির অপার দান এ মানবজাতির জন্যে। সম্ভবত: একারণেই বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয় সঙ্গীত হয়েছে তার লেখা গান। আরেকটি বিষয় লক্ষণীয় যে, একটি ভাষা এই দুই দেশকে অপূর্ব ভাবে কাছে টেনেছে। ঠাকুরের গানে রয়েছে জীবনবোধের অপূর্ব সমাহার এবং কর্তব্য নিষ্ঠ হবার আলাদা একটি প্রেরণা।
‘আন্তরিকতার সাথে যারা রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবেশন করেন তারা হারিয়ে যান জীবনের এক ভিন্ন জগতে, হারিয়ে যান মানবতার কল্যাণে, তৈরী হয় জীবনবোধ’-বলেন মওসুমী।
মওসুমী ব্যানার্জি বলেন, পাশ্চাত্যে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে জনপ্রিয় করতে আমি ঠাকুরের নির্যাসটুকু অটুট রেখে পাশ্চাত্যের ঢঙে পরিবেশন করতে চাই। মূল রস অটুট থাকলে কোন সমস্যা হবে বলে মনে করি না। পাশ্চাত্যের হৃদয় জয় করার মধ্য দিয়ে বাঙালি সংস্কৃতির মাহাত্ম বিশ্বব্যাপী জাগ্রত করা সহজ হবে বলে মনে করছি।
মওসুমী উল্লেখ করেন, রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে জানার মধ্য দিয়ে প্রকারান্তরে বাঙালি সংস্কৃতির বর্ণাঢ্য রূপ পাশ্চাত্যের লোকজন জানবে। আর এ উদ্দেশ্য নিয়েই গত দু’বছরে আমি বেশ কটি অনুষ্ঠান করেছি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরা যত দ্রুত রবীন্দ্রসঙ্গীতে উৎসাহিত হবে, তত লাভবান হবে আমাদের এ প্রকল্প।
কথোপকথনের সর্বশেষ জিজ্ঞাসা ছিল, তথ্য-প্রযুক্তির এ যুগে রবীন্দ্রনাথের প্রয়োজন কোথায়? জবাবে মওসুমী যুক্তির অবতারণা করে বলেছেন, শিক্ষা, সমাজচিন্তা, সংস্কৃতি, ধর্ম এবং মত প্রকাশের স্বাধীনতা সবকিছুতেই রয়েছে রবীন্দ্রনাথের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি। অর্থাৎ আধুনিক বিশ্বের পরিপূরক একজন মানুষ গড়তে সকল দিক-নির্দেশনা পাওয়া যাচ্ছে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য কর্মে। এজন্যেই সকল যুগেই ঠাকুরের প্রয়োজন অপরিসীম। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, দেড় শত বছর আগে তিনি যা ভেবেছেন এখন আমরা তা দেখতে পাচ্ছি।
এ অনুষ্ঠানে ‘নিজের রবীন্দ্রনাথ’ সিডি থেকে বেশ কটি সঙ্গীত পরিবেশন করেন আমেরিকান স্টাইলে নতুন প্রজন্মকে আকৃষ্ট করার অভিপ্রায়ে।
মওসুমী ব্যানার্জি এ প্রসঙ্গে বলেন, আমি অত্যন্ত খুশী যে, অনুষ্ঠানে যারা এসেছিলেন তাদের প্রায় সকলেই ফিরে গেছেন অদম্য একটি বাসনা নিয়ে। কৌতুহল পরিলক্ষিত হয়েছে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ব্যাপারেও। মার্কিন তরুণ-তরুণীদের মধ্যে জানার এই আগ্রহ সৃষ্টির পরিস্থিতি তৈরী করার মধ্যে অনেক বড় আনন্দ।
ব্যানার্জির গাওয়া গানের মধ্যে ছিল বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা, আগুনে পরশমণি, দয়া দিয়ে হবে গো মোর জীবন, হৃদয় আমার প্রকাশ হলো, পুরানো সেই দিনের কথা, আজি ঝড়ের রাতে, দাঁড়াও আমার ইত্যাদি।
এনআরবি নিউজের আরেক প্রশ্নের জবাবে মওসুমী উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের অন্তত: দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজী নজরুলের সাহিত্য নিয়ে পড়ানো হলেও এখন পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক কোন কোর্স চালু হয়নি। অথচ এটি খুবই জরুরী। তিনি বলেন, ঠাকুর রিসার্চও নেই। আমি কথ বলেছি এই স্টাডিজ সেন্টারের পুরোধা ব্যক্তি সুবীর চৌধুরীর সাথে। এই সেন্টারেই রবীন্দ্র রিসার্চ সেন্টার স্থাপনের বিষয়ে তার মধ্যেও আগ্রহ দেখেছি। তবে, এ জন্যে প্রয়োজন অর্থের। সেটি কেউ দিলে খুব সহজ হবে রবীন্দ্র রিসার্চ সেন্টারের স্বপ্ন পূরণ করা।

শনিবারের চিঠি/ আটলান্টা/ ২৭ নভেম্বর ২০১৫


Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৯:৫৯ পূর্বাহ্ণ | শুক্রবার, ২৭ নভেম্বর ২০১৫

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com