বাগেরহাটে মাছের ঘেরে মড়কঃ চাষীরা বিপাকে

বুধবার, ১০ জুন ২০১৫

বাগেরহাটে মাছের ঘেরে মড়কঃ চাষীরা বিপাকে

 

Bagerhatবাগেরহাট প্রতিনিধিঃ প্রচন্ড তাপদাহে ও লবণাক্ততায় বাগেরহাটে মাছের ঘেরে সাদাসোনা খ্যাত বাগদা চিংড়ি ও সাদা মাছে মড়ক দেখা দিয়েছে। প্রতিদিনই ঘেরে মাছ মরছে আর চাষী তা ঘের থেকে তুলে ফেলছে। আবার কোন কোন ঘের মালিক তার ঘেরে মরে যাওয়া মাছ তুলতে তুলতে অপারগ হয়ে ভেসে থাকা মরা মাছ তোলা বাদ দিয়েছেন। গত প্রায় দুই মাস ধরে এই অবস্থা চলছে। মৌসুমের শুরুতেই জেলার শতকরা আশি ভাগ মাছের ঘেরে এই মড়ক দেখা দিয়েছে বলে চাষী ও জেলা চিংড়ি চাষী সমিতি দাবী করেছে।


প্রচন্ড তাপদাহ ও লবণাক্ততার কারণে মাছের ঘেরে মাছ মরে যাচ্ছে বলে জানিয়েছে জেলা মৎস্য বিভাগ।

ঘেরের বাগদা চিংড়ি ও সাদা মাছে মড়ক দেখা দেয়ায় এই জেলার হাজার হাজার চাষী ব্যাপকভাবে আর্থিক ক্ষতিরমুখে পড়তে যাচ্ছেন। মাছের ঘেরে ব্যাপকহারে মড়ক শুরু হওয়ায় এজেলার চাষীরা হতাশ হয়ে পড়েছেন। এই বিপর্যয় কাটাতে চাষীদের মাছ চাষে রাখতে সরকারকে স্বল্প সুদে ঝণ দেয়ার দাবী করেছে সংগঠনটি।

 সরজমিনে বাগেরহাট সদর উপজেলার কাড়াপাড়া ও ষাটগম্বুজ ইউনিয়নের খোন্তাকাটা ও শশীখালীর বিলে যতদূর চোখ যায় শুধু ঘের আর ঘের। সেখানে গিয়ে দেখা গেছে মাছের ঘেরগুলোতে অসংখ্য মাছ মরে ভেসে আছে। ঘের থেকে দুর্গন্ধ ছাড়াচ্ছে। মরে যাওয়া মাছের মধ্যে রয়েছে বাগদা চিংড়ি, রুই ও কাতলা মাছ। চাষী তার ঘেরে মরে যাওয়া মাছ তুলে ওপরে ফেলে দিচ্ছেন। জেলার অধিকাংশ উপজেলায় মাছের ঘেরে একই অবস্থা।

বাগেরহাট সদর উপজেলার ষাটগম্বুজ ইউনিয়নের কাড়াপাড়া গ্রামের সত্যরঞ্জন মন্ডল  এ প্রতিনিধিকে জানান, ২৫ বিঘা জমিতে বাগদা চিংড়ির সাথে সাদা মাছ রুই ও কাতলা চাষ করেছি এতে আমার প্রায় তিন লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। প্রচন্ড তাপদাহে ও লবনাক্ততার কারণে বাগদা চিংড়ি ও সাদা মরে যাচ্ছে । গত দুই মাস ধরে এই মাছ মরছে। আমার ঘেরে মড়ক দেখা দেয়ায় আমি একেবারে সর্বশান্ত হয়ে পড়েছি।

পীযুষ মন্ডল বলেন, গত ১৫ বছর ধরে মাছের চাষ করছি। এবারের মতো তাপদাহ (খরা) আগে কখনো দেখিনি। এবছর নদীর পানিতেও মাত্রাতিরিক্ত লবণ। পানিতে অতিরিক্ত লবণাক্ততা এবং প্রচন্ড তাপদাহে ঘেরের মাছ সব মরে যাচ্ছে। বাগদা চিংড়ি ও সাদা মরে ভেসে রয়েছে। প্রতিদিনই ঘেরে এসে মরা মাছ তুলছি। মৌসুমের তিন মাস পার হলেও এখনো এক টাকারও মাছ বাজারে বিক্রি করতে পারিনি।

শেখ শহীদুল ইসলাম বলেন, পঞ্চাশ বিঘা জমিতে বাগদা চিংড়ি ও সাদা মাছের চাষ করেছি। গত এক মাস ধরে ঘেরে মাছ মরছে। প্রতিদিন মরা তুলতে তুলতে অপারগ হয়ে এখন ঘের থেকে মাছ তোলা বন্ধ করে দিয়েছি। এবছর যা অবস্থা তাতে দেনাগ্রস্থ হয়ে পড়া ছাড়া কোন উপায় দেখছিনা।

বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার বহরবুনিয়া গ্রামের ঘের মালিক সরদার নাসির উদ্দিন জানান, প্রায় আড়াইশ বিঘা জমিতে পনের লাখ টাকা ব্যয় করে বাগদা চিংড়ি ছেড়েছি। গত অমাবশ্যার তিথিতে এই ঘের থেকে অল্প কিছু বাগদা চিংড়ি ধরি। কিন্তু সম্প্রতি চলে যাওয়া পূর্ণিমা তিথিতে এতো বড় ঘেরে মাত্র আটশ গ্রাম চিংড়ি পেয়েছি। এবছর নদী থেকে যখন ঘেরে পানি তুলি তখন পানিতে মাত্রাতিরিক্ত লবণ ছিল। যা বাগদা ও সাদা মাছের জন্য অসহিষ্ণু। মাত্রাতিরিক্ত লবণাক্ততা এবং প্রচন্ড তাপদাহে ঘেরের পানি গরম হয়ে মাছ সব মরে গেছে। এবছর যে অবস্থা তাতে মূলধন ঘরে তোলা অসম্ভব হবে।

বাগেরহাট জেলা চিংড়ি চাষী সমিতির আহ্বায়ক ফকির মহিতুল ইসলাম সুমন বলেন, বাগেরহাট জেলায় ৭১ হাজার মাছের ঘের রয়েছে। প্রচন্ড তাপদাহে ও নদীর পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় বাগেরহাটের আশি শতাংশ ঘেরে বাগদা চিংড়ি ও সাদা মরে যাচ্ছে। এতে প্রত্যেক চাষী আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন।

মৌসুমের শুরুতে চাষীরা মাছের ঘেরে যে বাগদা চিংড়ি ও সাদা মাছ ছেড়েছেন তা গত দুই মাস ধরে মরছে। নতুন করে তারা আবার মাছ ছাড়বেন সেই টাকা তাদের কাছে নেই। মাছ মরে যাওয়ার কারনে তারা দেনাগ্রস্থ হয়ে পড়বেন বলে আশংকা করছেন তিনি। তাই এই বিপর্যয় কাটাতে চাষীদের মাছ চাষে রাখতে সরকারকে স্বল্প সুদে ঝণ দেয়ার দাবী জানান তিনি।

বাগেরহাট মৎস্য বিভাগের বিভাগীয় মৎস্য কর্মকর্তা (ডিএফও) নারয়ণ চন্দ্র মন্ডল বলেন, মৌসুমের শুরুতে এই এলাকায় বৃষ্টিপাত না হওয়া এবং মাছের ঘেরে তোলা পানিতে হঠাৎ করে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় বাগদা চিংড়ি ও সাদা মড়ক দেখা দিয়েছে। এবছর মাছের ঘেরে তোলা নদীর পানিতে অন্য বছরের তুলনায় লবণাক্ততার পরিমান অনেক বেশি। অনাবৃষ্টির কারণে অস্বাভাবিকহারে তাপমাত্রা বেড়ে গেছে। ফলে মাছ মরে যাচ্ছে। এ বছর জেলার নয়টি উপজেলায় ৭১ হাজার ঘেরে মাছ চাষ করা হয়েছে।

শনিবারের চিঠি / আটলান্টা / ১০ জুন ২০১৫

 

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৫:৩৮ অপরাহ্ণ | বুধবার, ১০ জুন ২০১৫

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com