বাগেরহাটে খানজাহানের (রাঃ) ধলা পাহাড় মারা গেছে

শুক্রবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

বাগেরহাটে খানজাহানের (রাঃ) ধলা পাহাড় মারা গেছে

 

BGHTবাগেরহাটঃ বাগেরহাটের হযরত খানজাহান (রহ:) এর দিঘির কুমির ‘ধলাপাহাড়’ মারা গেছে। বৃহস্পতিবার ভোরে এলাকাবাসী মৃত কুমিরটিকে দিঘির উত্তর-পশ্চিম দিকে পাড়ের কাছে ভাসতে দেখে। জেলা প্রশাসন ও বন বিভাগ কুমিরটি সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে। স্থানীয় খাদেমদের মতে কুমিরটির বয়স হয়েছিলো প্রায় এক শত বছর।


‘ধলা পাহাড়’ এর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে হযরত খানজাহান (রহ:) এর মাজারের দিঘিতে প্রায় ছয় শত বছর ধরে প্রাকৃতিক পরিবেশে টিকে থাকা মিঠা পানির কুমির যুগল ‘কালাপাহাড়’ ও ‘ধলাপাহাড়’ এর ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটলো।

এই দিঘিতে এখন ভারতের মাদ্রাজ ক্রোকোডাইল ব্যাঙ্ক থেকে ২০০৫ সালে আনা এই প্রজাতির দু’টি কুমির রয়েছে।

এলাকাবাসী ও মাজারের খাদেমদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার ভোরে দিঘিতে পানি নিতে আসা লোকেরা মৃত কুমিরটিকে ভেসে থাকতে দেখেন। খাদেমরা খবর জানার পর স্থানীয় ষাটগম্বুজ ইউপি চেয়ারম্যান ও বাগেরহাট সদর থানা পুলিশে খবর দেয়া হয়। বেলা ১২টার দিকে পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে কুমিরটিকে টেনে পাড়ে তোলা হয়।

তাৎক্ষনিকভাবে ধলা পাহাড়ের মৃত্যুর কারণ জানা যায়নি।

বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মো: জাহাঙ্গীর আলম বলেন, আগামী প্রজন্মের কাছে হযরত খানজাহানের (রহ.) আমলে ঠাকুরদীঘিতে ছাড়া কুমির দু’টিকে (কালাপাহাড় ও ধলাপাহাড়কে) পরিচয় করিয়ে দিতে চামড়া দু’টি স্থানীয় ষাটগম্বুজ জাদুঘরে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

বাগেরহাট জেলা প্রাণীসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সুখেন্দু শেখর গাইন মৃত কুমিরটি পর্যবেক্ষণ করে বলেন, জেলা প্রশাসন কুমিরটির মৃতদেহ ময়না তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছে। ময়না তদন্ত শেষে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ বলা সম্ভব হবে। তবে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে অতিরিক্ত খাদ্য গ্রহণের কারণে শরীরে চর্বি জমে প্যান স্ট্যাটিস রোগে আক্রান্ত হয়ে অথবা খাদ্যে বিষক্রিয়ায় কুমিরটির মৃত্যু হতে পারে।

সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আমির হোসাইন চৌধুরী জানান, হযরত খানজাহানের (রহ:) দিঘির এই কুমির দেশে বিদেশে মানুষের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত। এটি বিরল প্রজাতির মিঠা পানির কুমির। আমাদের দেশে উন্মুক্ত পরিবেশে সম্ভবত এটিই ছিলো এই প্রজাতির সর্বশেষ কুমির। তাই আমরা কুমিরটির চামড়া প্রক্রিয়াকরণ করে সংরক্ষণের জন্য ষাটগম্বুজ যাদুঘরে হস্তান্তরের উদ্যোগ নিয়েছি।

বিশ্ব ঐতিহ্য ষাটগম্বুজ মসজিদ ও যাদুঘরের কিউরেটর মো: গোলাম ফেরদৌস বলেন, খ্রীষ্টিয় ১৪০১ সালে এই অঞ্চলে হযরত খান জাহান (র:) এর আগমন, খলিফতাবাদ নগর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও খান জাহান পরবর্তি ইতিহাস ও সংস্কৃতির সাথে মাজারের দিঘির কুমিরযুগল ‘কালা পাহাড়’ ও ‘ধলা পাহাড়’ এবং তাদের পরবর্তি বংশানুক্রমের ইতিহাস অবিচ্ছেদ্যবাবে জড়িত। এই কুমির এখন বাগেরহাটের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অংশ। তাই জেলা প্রশাসন ও সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের সহযোগিতায় আমরা কুমিরের এই চামড়াটি প্রক্রিয়াকরণের পর স্টাফড করে আমাদের যাদুঘরে দর্শনার্থীদের জন্য সংরক্ষণ করার উদ্যোগ নিয়েছি। সেই সাথে আমরা এর কংকালটিও প্রক্রিয়াকরণের জন্য চেষ্টা করছি।

খানজাহান আলীর (রাঃ) মাজার

ইতিহাস অনুযায়ী, হযরত খান জাহান (র:) সুলতানী শাসন আমলে খ্রীষ্টিয় ১৪ শতকের প্রথম দিকে বাগেরহাটে খলিফতাবাদ নগর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। এসময় তিনি ঠাকুর দিঘি নামে পরিচিত এই দিঘিটি সংস্কার করেন। তিনি এই দিঘিতে ‘কালা পাহাড়’ ও ‘ধলা পাহাড়’ নামে মিঠা পানির প্রজাতির এক জোড়া কুমির পোষেন। তিনি তাদের নিয়মিত খাবার দিতেন, কুমির দু’টি তাঁর হাত থেকে খাবার খেতো। তাঁর মৃত্যুর পরও মাজারের খাদেম ও ভক্তরা এই কুমির দু’টিকে নিয়মিত খাবার দিতেন। ক্রমে এই কুমির যুগল বংশ বিস্তার করে এবং গত সাতশ’ বছর ধরে বংশানুক্রমে তারা এই দিঘিতে উন্মুক্ত পরিবেশে বসবাস করে আসছিলো। এক সময়ে এই কুমির হযরত খান জাহানের ভক্ত অনুরাগীদের বিশ্বাস ও অনুভুতির প্রতীকে পরিণত হয়। এরা হয়ে ওঠে এই মাজার সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংগ। মাজারের এই কুমির নিয়ে এলাকার মানুষের মুখে অনেক কিংবদন্তি ও লোককাহিনী শোনা যায়।

মন্তব্য লিখুন

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৯:৫৩ পূর্বাহ্ণ | শুক্রবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com