বাগেরহাটের ঐতিহাসিক ষাটগম্বুজ মসজিদ

শনিবার, ০১ আগস্ট ২০১৫

বাগেরহাটের ঐতিহাসিক ষাটগম্বুজ মসজিদ

 

মুহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান
বাংলাদেশের প্রাচীন মসজিদগুলোর মধ্যে বৃহত্তম এবং সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম স্থাপত্যের অন্যতম চিত্তাকর্ষক নিদর্শন ষাটগম্বুজ মসজিদ।


খান আল-আজম উলুগ খান জাহান, যিনি দক্ষিণ বাংলার এক বৃহৎ অংশ জয় করে তৎকালীন সুলতান নাসিরউদ্দীন মাহমুদ শাহের (১৪৩৫-৫৯) সম্মানে বিজিত অঞ্চলের নামকরণ করেন খলিফাতাবাদ। তিনিই সম্ভবত ষাটগম্বুজ মসজিদের নির্মাতা। ১৪৫৯ সালে তার মৃত্যু পর্যন্ত খান জাহান হাভেলি-খলিফাতাবাদ থেকে ওই অঞ্চল শাসন করেন। তার শাসনকৃত অঞ্চলটিকে বর্তমান বাগেরহাটের সাথে অভিন্ন হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।

 সময়ের ব্যবধানে এরূপ অসাধারণ একটি ভবন ধ্বংস হওয়ার উপক্রম হয়েছিল। ব্রিটিশ সরকার এর সংস্কার ও মেরামতের উদ্যোগ নেয়। পরে পাকিস্তান ও বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ধারাবাহিকভাবে এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করে। বিশ শতকের আশির দশকের শুরুতে ইউনেসকোর উদ্যোগে এই ঐতিহাসিক পুরাকীর্তিটির রক্ষণাবেক্ষণে কার্যকরী ও দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রহণ করা হয়।

Sixty-Dome-Mosque 03প্রাচীরবেষ্টিত মসজিদটি বর্তমান বাগেরহাট শহর থেকে তিন মাইল পশ্চিমে ঘোড়াদিঘির পূর্ব পাড়ে অবস্থিত। মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশের জন্য দুটি প্রবেশপথ ছিল। একটি পূর্বদিকে এবং অন্যটি উত্তর দিকে। পূর্ব দিকের প্রবেশপথটি বর্তমানে পুনঃনির্মাণ করা হলেও উত্তর দিকেরটি বর্তমানে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। পূর্ব দিকের প্রবেশপথটি নিজেই একটি স্বতন্ত্র ভবনের দাবিদার। এটি মসজিদের কেন্দ্রীয় খিলানপথ বরাবর স্থাপিত। খিলান সম্বলিত প্রবেশপথটি সাত দশমিক ৯২ মিটার দীর্ঘ ও দুই দশমিক ৪৪ মিটার চওড়া। এটি দুই দশমিক ৪৪ মিটার পুরু এবং এর উপরিভাগ সুদৃশ্যভাবে বাঁকানো।

 বিশাল আয়তাকার মসজিদ ভবনটি মূলত ইট নির্মিত। বাইরের দিক থেকে এর পরিমাপ চার কোণে অবস্থিত দ্বিতল টাওয়ারসহ উত্তর-দক্ষিণে ৪৮ দশমিত ৭৭ মিটার এবং পূর্ব-পশ্চিমে ৩২ দশমিক ৯২ মিটার। মসজিদের ভেতরে প্রবেশের জন্য রয়েছে খিলানপথ। পূর্ব প্রাচীরে ১১টি, উত্তর এবং দক্ষিণ প্রাচীরে সাতটি করে খিলানপথ। রয়েছে। পশ্চিম প্রাচীরে একটি খিলানপথ রয়েছে। মসজিদের ভেতরের পরিমাপ ৪৩ দশমিক ৮৯ মিটার বাই ২৬ দশমিক ৮২ মিটার। মসজিদ অভ্যন্তরে ছয় সারি স্তম্ভ¢ সহকারে উত্তর-দক্ষিণে সাতটি আইল এবং পূর্ব-পশ্চিমে এগারোটি ‘বে’তে বিভক্ত।

কেন্দ্রীয় বে-এর ঠিক উত্তর পাশেরটি ব্যতীত সব কয়টি ‘বে’ কিবলা প্রাচীরে অর্ধ গোলাকার মিহরাব কুলুঙ্গিতে শেষ হয়েছে। ফলে মসজিদটিতে রয়েছে মোট ১০টি মিহরাব। কেন্দ্রীয় নেভ বরাবর অবস্থিত কেন্দ্রীয় মিহরাবটি পার্শ্ববর্তী মিহরাবগুলো অপেক্ষা বড় এবং ছাদ পর্যন্ত উঁচু একটি আয়তাকার কাঠামোর মধ্যে ন্যস্ত।

 মসজিদের প্রবেশপথের খিলানগুলো দ্বিকেন্দ্রিক ধরনের এবং প্রাচীরের মাঝামাঝি থেকে উত্থিত। পূর্ব ফাসাদের সব কয়টি খিলানপথ এবং উত্তর ও দক্ষিণের কেন্দ্রীয় এবং পশ্চিমের একমাত্র খিলানপথ সামান্য কুলুঙ্গিত আয়তাকার কাঠামোর মধ্যে ন্যস্ত। বাকি খিলানপথগুলো পরপর দুটি খিলান সমন্বয়ে তৈরি, যার মধ্যে অভ্যন্তরীণ খিলানটি বাইরেরটির তুলনায় সামান্য বড়। পূর্ব দিকের দেয়াল ছাড়া পুরো ভবনের বাইরের দেয়াল জুড়ে অনুভূমিক অভিক্ষেপ ও দ্বৈত কুলুঙ্গি নকশার অলঙ্করণ রয়েছে। ভবনের কার্নিস বাঁকানো। তবে স্বাভাবিক বাঁকানো রেখা দ্বারা বেষ্টিত না হয়ে পূর্ব ফাসাদের কেন্দ্রীয় খিলানপথের উপরের কার্নিসে একটি বিচিত্র ত্রিভুজাকার পেডিমেন্ট স্থাপিত। এ ধরনের বৈশিষ্ট্যের পুনরাবৃত্তি দেখা যায় কিশোরগঞ্জের এগারোসিন্ধুর-এর সাদী মসজিদ-এ (১৬৫২)।

 মসজিদের চার বহিঃস্থ কোণে স্থাপিত গোলাকার টাওয়ার বিশালাকৃতির এবং উপরের দিকে ক্রমশ সরু হয়ে গেছে। প্রতিটি টাওয়ারই ছাদ ছাড়িয়ে উপরে উঠে গেছে। এগুলো খোলা খিলান চেম্বার বিশিষ্ট ও ছোট গম্বুজ দ্বারা আচ্ছাদিত। সামনের ভাগের টাওয়ার দুটির উপরের চেম্বার চার দিকে স্থাপিত চারটি খিলান জানালা বিশিষ্ট। আর পেছনের টাওয়ার দুটিতে রয়েছে একজোড়া খিলান জানালা, একটি উত্তর দিকে অন্যটি দক্ষিণ দিকে। পিছনের দিকের টাওয়ার দুটির জানালাগুলো ঠিক একই অক্ষরেখায় অবস্থিত নয়। সামনের ভাগের টাওয়ার দুটিতে ভেতরের দিক দিয়ে ২৬ ধাপের প্যাঁচানো সিড়ি রয়েছে। এই সিড়ির মাধ্যমে উপরের চেম্বারে উঠা যায়। সিড়ির প্রবেশপথ রয়েছে মসজিদের ভেতরের দিকে। সম্প্রতি এই প্রবেশপথগুলো ইটের প্রাচীর দিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। পেছনের টাওয়ার দুটি সামনের টাওয়ার দুটির মতো নয়। পেছনের টাওয়ার দুটি নিচ্ছিদ্র এবং এগুলোর চেম্বারে শুধু উপরের ছাদ দিয়েই প্রবেশ করা যায়।
Sixty-Dome-Mosque 02পূর্ব থেকে পশ্চিম দৈর্ঘ্য বরাবর প্রসারিত বিশাল কেন্দ্রীয় নেভ মসজিদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ। চার দশমিক ৮৮ মিটার বাই তিন দশমিক ৯৬ মিটার আয়তাকার স্বতন্ত্র সাতটি ‘বে’ সম্বলিত এই নেভ মসজিদের ভেতরকে সমান দুটি অংশে বিভক্ত করেছে। উত্তর ও দক্ষিণ দিকের খিলানপথ দিয়ে এই অংশগুলোতে প্রবেশ করা যায়। এই অংশ দুটি আবার সর্বমোট ৭০টি বর্গাকার ‘বে’ দ্বারা বিভক্ত। এই বর্গাকার ‘বে’গুলো তিন দশমিক ৯৬ মিটার বাহু বিশিষ্ট এবং উপরে পেয়ালাকৃতির গম্বুজ দ্বারা আচ্ছাদিত। অন্যদিকে কেন্দ্রীয় নেভের আয়তাকার ‘বে’গুলো চৌচালা ভল্ট দ্বারা আচ্ছাদিত। এই ভল্ট ও পেয়ালাকৃতির গম্বুজসমূহ পরষ্পর ছেদী খিলানের উপর স্থাপিত। খিলানগুলো মসজিদের ভেতরের স্তম্ভ থেকে উত্থিত। আর খিলানের কোণগুলো ভরাট করা হয়েছে বাংলা পেন্ডেন্টিভ দ্বারা। ফলে মসজিদটি সর্বমোট ৮১টি গম্বুজ সমৃদ্ধ- চারটি কর্নার টাওয়ারের উপর, ৭০টি পাশের দুই অংশের উপর এবং সাতটি চৌচালা ভল্ট কেন্দ্রীয় নেভের উপর স্থাপিত। অসংখ্য গম্বুজ সমৃদ্ধ মসজিদের বিশাল ছাদটির ভারবহন করছে মসজিদের ভেতরের স্তম্ভসারি। মসজিদে উত্তর-দক্ষিণে প্রসারিত ছয়টি স্তম্ভসারি বিদ্যমান। প্রতিটি সারিতে রয়েছে ১০টি করে স্তম্ভ। সুতরাং মসজিদটিতে সর্বমোট ৬০টি স্তম্ভ রয়েছে যার বেশিরভাগই সরু পাথর নির্মিত। তবে এর মধ্যে ছয়টি বিশালাকার। স্তম্ভগুলো হয় ইট, নতুবা পাথরের ব্লক দ্বারা বেষ্টিত। দেখে মনে হয় প্রথম থেকেই এগুলো এরকম। সবগুলো প্রস্তর স্তম্ভই দুই অথবা তিনটি পাথরের ব্লক একটির উপর আরেকটি স্থাপন করে প্লাগ হোল পদ্ধতিতে এবং লোহার দ- প্রবিষ্ট করে নির্মিত। সরু প্রস্তর স্তম্ভগুলোর স্তম্ভ শীর্ষ ও ভিত্তি বর্গাকার এবং এদের মধ্যবর্তী অংশ অষ্টভুজাকার। সম্প্রতি ইটের একটি বাড়তি স্তর তৈরি করে এগুলোকে পুরনো রূপে সংস্কার করা হয়েছে।
মসজিদটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পোড়ামাটির ফলক ও ইট দিয়ে অলঙ্কৃত করা হয়েছে। তবে হালকা রিলিফের খোদাইকৃত বিরল প্রস্তর অলঙ্করণও এতে রয়েছে। কালপরিক্রমায় এই অলঙ্করণের বহু অংশই হারিয়ে গেছে। অবশ্য খিলানপথ, মিহরাব, গম্বুজের নিচে খিলানগুলোর সংযোগস্থল, চৌচালা ভল্টের ভেতরেরভাগ, কর্নার টাওয়ারের উত্থিত বন্ধনী, মসজিদ প্রাঙ্গণে প্রবেশপথের কার্নিস ও মসজিদের কার্নিসে এসবের বেশ কিছু এখনও অক্ষত অবস্থায় বিদ্যমান। ধূসর বেলেপাথরে নির্মিত কেন্দ্রীয় মিহরাবটি মুসলিম রীতির অগভীর ও নিচু রিলিফের খোদাইকর্মে অলঙ্কৃত, যা পার্শ্ববর্তী মিহরাব ও খান জাহানের সময়ে নির্মিত অন্যান্য ভবনের খোদাইকর্ম থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বেশিরভাগ অলঙ্কৃত মোটিফই নষ্ট হয়ে গেছে। এখনও কিছু টিকে আছে, তবে বেশ ক্ষতিগ্রস্থ অবস্থায়। সম্পূর্ণ ইট নির্মিত বাকি নয়টি মিহরাবের সামনেরভাগ খাঁজকাটা। যদিও তাদের বেশিরভাগ অলঙ্করণ বর্তমানে বিলীন, তবু এখনও যা কিছু টিকে আছে তাতে এটি প্রতীয়মান যে, এগুলো চমৎকারভাবে পোড়ামাটি দ্বারা অলঙ্কৃত ছিল। তবে এই অলঙ্করণ কেন্দ্রীয় মিহরাবের মতো ছিল না। মোটিফ ও নকশা প্রাথমিকভাবে একই রকম হলেও মিহরাব থেকে মিহরাবে পার্থক্য সূচিত হয়েছে এদের ব্যবহারের অবস্থানগত দিক থেকে।
মসজিদটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো কেন্দ্রীয় মিহরাবের পাশে নির্মিত ক্ষুদ্র প্রবেশপথ। এটি উত্তর ভারতের কিছু মসজিদে দেখা যায়, তবে বাংলায় অপ্রচলিত। এই রীতিটি সম্ভবত আদি মুসলিম স্থাপত্য রীতিতে নির্মিত মসজিদ থেকে ধার করা হয়েছে। আদি মুসলিম স্থাপত্যে মসজিদ পশ্চাতের এই প্রবেশপথটি ব্যবহূত হতো খলিফা, গভর্নর বা ইমাম কর্তৃক। তাই এটি খুব অপ্রাসঙ্গিক নয় যে, এই পথটি ব্যবহৃত হতো খলিফাতাবাদের শাসক খান জাহান কর্তৃক, যার বাসস্থান মসজিদের উত্তর দিকে সামান্য দূরত্বেই অবস্থিত ছিল।

আভিধানিকভাবে ‘ষাটগম্বুজ’ অর্থ হলো ষাটটি গম্বুজ সম্বলিত। তবে সাধারণভাবে মসজিদটিতে ৮১টি গম্বুজ রয়েছে। এগুলোর মধ্যে মসজিদের ছাদে ৭৭টি এবং বাকি চারটি চার কোণের কর্নার টাওয়ারের উপর। এ ব্যাপারে দুটি ব্যাখ্যা দেয়া যেতে পারে। কেন্দ্রীয় নেভের উপর স্থাপিত সাতটি চৌচালা ভল্ট মসজিদটিকে ‘সাতগম্বুজ’ মসজিদ হিসেবে পরিচিত করে, কিন্তু সময় পরিক্রমায় এই ‘সাতগম্বুজ’ই ‘ষাটগম্বুজ’ হিসেবে রূপান্তরিত হয়ে যায়।

দ্বিতীয় ব্যাখ্যানুসারে, মসজিদের বিশাল গম্বুজ-ছাদের ভারবহনকারী মসজিদ অভ্যন্তরের ষাটটি স্তম্ভ সম্ভবত একে ‘ষাট খামবাজ’ (খামবাজ অর্থ স্তম্ভ¢) হিসেবে জনপ্রিয় করে তোলে। এটি অসম্ভব নয় যে, এই ‘খামবাজ’ শব্দটিই পরবর্তীকালে বিকৃতরূপে ‘গম্বুজ’-এ পরিণত হয়ে মসজিদটিকে ষাটগম্বুজ হিসেবে জনপ্রিয় করে তুলেছে। শেষোক্ত ব্যাখ্যাটি সম্ভবত বেশি গ্রহণযোগ্য।

শনিবারের চিঠি / আটলান্টা / ০১ আগষ্ট ২০১৫

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৪:৫৩ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০১ আগস্ট ২০১৫

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com