বাংলায় প্রথম ছায়াছবি ‘মুখ ও মুখোশ’

বুধবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৪

বাংলায় প্রথম ছায়াছবি ‘মুখ ও মুখোশ’

একরামুল হক শামীম

১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে দিনটি স্মরণীয় হয়ে আছে। বাংলাদেশের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ এ দিনটিতে মুক্তি পায়। এ অঞ্চলের প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে আলোড়ন তৈরি করে মুখ ও মুখোশ। আবদুুল জব্বার খান চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেন। আজ থেকে ৫৭ বছর আগের এই দিনটিতে বর্তমান আজাদ প্রেক্ষাগৃহে (তৎকালীন মুকুল প্রেক্ষাগৃহ) ছবিটির প্রথম প্রদর্শনী হয়। প্রথম প্রদর্শনীতে প্রধান অতিথি ছিলেন শেরেবাংলা একে ফজলুল হক। ছবিটি ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও খুলনায় একযোগে মুক্তি পেয়েছিল।


Mukh o Mukhoshমুখ ও মুখোশ বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের ইতিহাসের সঙ্গে নানা কারণে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত। এই চলচ্চিত্রটি নির্মাণের প্রেক্ষাপট মনে করলেই তা স্পষ্ট হবে। তখন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) কোনো চলচ্চিত্র শিল্প গড়ে ওঠেনি। স্থানীয় সিনেমা হলগুলোতে দেখানো হতো কলকাতা কিংবা লাহোরের চলচ্চিত্র। এ অঞ্চলের চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রযোজনা নিয়ে মারাত্মক নেতিবাচক মন্তব্য করেন পাকিস্তানের চলচ্চিত্র প্রযোজক এফ দোসানি। সেই মন্তব্য স্থানীয় অনেককেই ক্ষুব্ধ করে। কিন্তু এটিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে গ্রহণ করেন আবদুুল জব্বার খান। তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণে উদ্যোগী হন। ১৯৫৩ সালে তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণের কাজ শুরু করেন। চলচ্চিত্রের কাহিনী নেওয়া হয় ‘ডাকাত’ নাটক থেকে। শুরুতে চলচ্চিত্রের নাম দেওয়া হয় ডাকাত। পরবর্তী সময়ে ফজল শাহাবুদ্দীনের পরামর্শে নাম পাল্টে রাখা হয় ‘মুখ ও মুখোশ’। ১৯৫৪ সালের ৬ আগস্ট ছবিটির মহরত অনুষ্ঠিত হয়। তারপর দুই বছর সময় নিয়ে মুখ ও মুখোশের পেছনে কাজ করেন আবদুুল জব্বার খান। স্বপ্ন হয় সত্যি। নির্মিত হয় এ অঞ্চলের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। মুখ ও মুখোশের ডিভিডি কভারের ওপর লেখা ‘বাংলাদেশের প্রথম বাংলা ছবি’।

১৯৫৬ সালের পর বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্প ক্রমশ বিকশিত হতে থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় বেশ কয়েকজন প্রতিভাবান চলচ্চিত্র নির্মাতার আবির্ভাব ঘটে। বাংলা চলচ্চিত্রের স্বর্ণযুগ তাদের হাত ধরেই আসে। ১৯৫৬ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত মোট ২২৪টি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে ঢাকায়। এর মধ্যে ১৬৫টি চলচ্চিত্রই বাংলা ভাষায় নির্মিত। বাংলা চলচ্চিত্রের এই বিকাশের পেছনে নিঃসন্দেহে মুখ ও মুখোশের ভূমিকা রয়েছে। সাহসী উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে আবদুুল জব্বার খান এগিয়ে এসেছেন বলেই বাংলা চলচ্চিত্রের জাগরণ তৈরি হয়েছিল। শুরুর সময়টিতে বেশ কিছু কালজয়ী বাংলা চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। দেশের সিনেমা হলগুলোতে বাংলা চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী প্রাধান্য পায়।

বাংলা চলচ্চিত্র নিয়ে আশাবাদের পাশাপাশি হতাশার একটি দিকও রয়েছে বলে কেউ কেউ মনে করেন। বলা হয়ে থাকে, বাংলা চলচ্চিত্রের যে সম্ভাবনার জায়গায় যাওয়ার সুযোগ ছিল, তা পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি। এর পেছনে নানা কারণ দায়ী। তবে এটি সত্য যে, চলচ্চিত্র নির্মাণের মানের দিক থেকে আশপাশের দেশের চলচ্চিত্র শিল্প অনেক এগিয়ে গেছে। এ দেশের অনেক সিনেমা হল এরই মধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে। এর পেছনে ঢাকাইয়া চলচ্চিত্রের মান কমে যাওয়াকে দায়ী করছেন অনেকেই। একটা সময়ে অশ্লীল চলচ্চিত্রের দৌরাত্ম্য দেখা গিয়েছিল।

সেটিই চলচ্চিত্র শিল্পকে অনেকটা পিছিয়ে দেয়। আশার কথা, সেই প্রতিকূল সময় পার হয়ে এসেছে বাংলা চলচ্চিত্র শিল্প। আগের বছরগুলোর তুলনায় ছবির সংখ্যা কমে গেলেও মানসম্মত এবং দর্শকমনে আলোড়ন সৃষ্টিকারী বেশ কিছু ছবি নির্মিত হয়েছে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে। অনেকেই আশা করছেন, বাংলা চলচ্চিত্রের সোনালি দিন ফিরে আসছে। মুখ ও মুখোশের জন্মদিনে এমন আশার কথা পুনর্ব্যক্ত করা যেতে পারে।

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১০:০৭ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৪

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com