বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় একটি রেষ্টুরেন্ট্রে সন্ত্রাসী হামলা

শনিবার, ০২ জুলাই ২০১৬

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় একটি রেষ্টুরেন্ট্রে সন্ত্রাসী হামলা

সমীর দে, ঢাকাঃ এবার জঙ্গি হামলা বাংলাদেশে। রাজধানী ঢাকার অভিজাত এলাকা গুলশন, যেখানে সবকটি বিদেশি দূতাবাস এবং মূলত বিদেশিদের বসবাস, শুক্রবার রাত পৌনে ৯টা নাগাদ সেখানে একটি স্প্যানিশ রেস্তোরাঁ, আর তার লাগোয়া বেকারিতে অস্ত্রসহ ঢুকে পড়ে আই এস জঙ্গি গোষ্ঠীর বাংলাদেশ শাখা আনসার উল বাংলার অন্তত ৮/১০ জন জঙ্গি। ভেতরে ঢুকেই তারা এলোপাথারি গুলি চালায়, বোমা বিস্ফোরণ ঘটায়। মুহুর্তের মধ্যে পুরো রেস্তোরাঁর দখল নেয় তারা। পণবন্দি করে অন্তত ২০ জনকে, যাঁরা সবাই বিদেশি নাগরিক বলে জানা গেছে। এদের মধ্যে ইউরোপীয়, মার্কিনি এবং কয়েকজন জাপানিও আছেন।

ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রক যদিও নিশ্চিত করেছে যে ঢাকার ভারতীয় দূতাবাসের কোনও কর্মী ঘটনাস্থলে নেই, তাঁরা সবাই নিরাপদে আছেন। কিন্তু অন্য একটি সূত্রের খবর, এক ভারতীয় বালক ওই স্প্যানিশ রেস্তোরাঁয় আটকে পড়েছে। অন্যদিকে দু’‌জন ইতালীয় নাগরিকসহ পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। তবে পুলিস গোটা এলাকাটি ঘিরে নেওয়ার পরই উপস্থিত সংবাদমাধ্যমকে, বিশেষত টিভি চ্যানেলগুলিকে অনুরোধ করে চারপাশের ছবি সম্প্রচার না করার জন্য। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই এই অনুরোধ করা হয়।


ঢাকার গুলশন যেহেতু কূটনৈতিক এলাকা হিসেবে হাই সিকিওরিটি জোনের মধ্যে পড়ে, প্রতিদিনই প্রচুরসংখ্যক পুলিস সেখানে পাহারায় থাকেন। হামলার খবর পেয়েই তাঁরা দৌড়ে গিয়ে ওই বেকারিতে ঢোকার চেষ্টা করলে জঙ্গিরা গ্রেনেড ছোঁড়ে। এতে রেস্টুরেন্টের দরজার কাছেই অন্তত ২৫ জন পুলিশকর্মী আহত হন। এদের মধ্যে স্থানীয় বনানী থানার ওসি সালাহউদ্দিন আহমেদ–সহ তিন ‌জন পুলিশ কর্মীর মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় ইউনাইটেড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ঘটনার শুরুতে পর পর কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দের পরেই বেশ কিছুক্ষণ গোলাগুলির শব্দ পাওয়া যায়। এর পরই সব থেমে যায়। পুলিস সূত্রে জানা যায়, দখলদার জঙ্গিদের সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা চলছে। সব থেকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে পণবন্দীদের নিরাপত্তাকে। এর ঠিক পর পরই জানা যায়, ইসলামিক স্টেট জঙ্গি গোষ্ঠীর বাংলাদেশ শাখা আনসার উল বাংলা এই হামলার কৃতিত্ব দাবি করেছে। মুক্তমনা ব্লগার অভিজিৎ রায়ের হত্যা থেকে শুরু করে সম্প্রতি বাংলাদেশে একের পর এক নাস্তিক, বিজ্ঞানমনস্ক লেখক, প্রকাশক, ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং বিদেশিদের হত্যার জন্যে এই আনসার উল বাংলা গোষ্ঠী যেমন দায়ী, তেমন তারা সেদেশে একাত্তরের যুদ্ধ অপরাধীদের বিচারেরও কট্টর বিরোধী। ফলে এরকম একটা ধারণা ছড়ায় যে সম্ভবত নির্দিষ্ট কোনও দাবি নিয়েই এই হামলা চালিয়েছে জঙ্গিরা, যে কারণে তাদের সঙ্গে আলোচনার চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিস। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই ফের ব্যাপক গুলি বিনিময়ের আওয়াজ পাওয়া যায়। স্থানীয় সময় রাত একটা পর্যন্ত এই অবরোধ চলে, যার কোনও নিষ্পত্তির সম্ভাবনা তখনও পর্যন্ত নজরে পড়েনি। বরং খবর আসে পুলিসের গোয়েন্দা শাখার সহকারী কমিশনার রবিউল আলমও সঙ্ঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছেন। আরও জানা যায়, হামলাকারীরা জঙ্গিরা তখনও পর্যন্ত নির্দিষ্ট কোনও দাবি পেশ করেনি, যার ভিত্তিতে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া যায়। ফলে স্রেফ আতঙ্ক ছড়ানোর জন্যই এই হামলা কিনা, সে প্রশ্নও উঠে আসে।

গুলশান ২ এলাকায় ইতালিয়ান দূতাবাসের পাশের একটি আড়াইতলা বাড়ির নিচের তলায় ‘হলি আর্টিজান’ বেকারি ও দোতলায় ‘ও ক্রিচেন’ নামে একটি স্প্যানিশ রেস্টুরেন্ট। সাড়ে ৯টার দিকে দুর্বৃত্তরা ভেতরে ঢুকে গুলি করা শুরু করলে হলি আর্টিজানের সুপারভাইজার সুমন রেজা কৌশলে উপরের ছাদ থেকে লাফিয়ে পালিয়ে আসেন। বেরিয়ে এসে তিনি বলেন, রাত পৌনে নয়টার দিকে আট থেকে ১০ জন যুবক অতর্কিতে আর্টিজানে ঢুকে পড়ে। তাদের একজনের হাতে ছিল তলোয়ার, বাকিদের কাছে আগ্নেয়াস্ত্র। ঢুকেই তারা কয়েকটি ফাঁকা গুলি করে এবং ‘‌আল্লা হো আকবর’‌ বলে চিৎকার করে। তখন ভেতরে ২০ জনের মতো বিদেশি নাগরিক ছিলেন।
সুমন নিজে ও আর্টিজানের আরেকজন কর্মী (ইতালির নাগরিক) দোতলার ছাদ থেকে লাফিয়ে বাইরে আসতে সক্ষম হন। সুমন বলেন, ‘আমি ছাদে ছিলাম। ওরা যখন বোমা মারতে ছিল, তখন বিল্ডিং কাঁপতে ছিল। ওরা ১০-১২টা বোমা মারছে। মারতেই আছে, মারতেই আছে। ওরা সামনের দিকে স্টেপ নিচ্ছিল মনে হয়। তখন ছাদ থেকে লাফ দেই।’ সুমন রেজা বলেন, ‘ভেতরে থাকা আমাদের কর্মীরা ফোন ধরতেছে না। আমাদের স্টাফদের মধ্যেও দুজন বিদেশি। এক আর্জেন্টিনীয় কর্মীর কোনো খোঁজ নেই।’ সংবাদ সংস্থার খবর, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ঘটনার খবর জানানো হয়েছে। ঢাকা শহরে জারি করা হয়েছে উচ্চ সতর্কতা। ‌

শনিবারের চিঠি/আটলান্টা/ জুলাই ০২, ২০১৬

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১২:০৮ অপরাহ্ণ | শনিবার, ০২ জুলাই ২০১৬

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com