রম্য রচনা

বল্টুর ভাস্কর্য দেখা

বুধবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২০

বল্টুর ভাস্কর্য দেখা
রম্য রচনাঃ বল্টুর ভাস্কর্য দেখা

গ্রামের  একটি  সরকারি প্রাইমারি স্কুল ।  উপজেলা সদর থেকে খবর এসেছে আগামি রবিবার স্কুল ইন্সপেক্টর  স্কুল পরিদর্শনে আসবেন ।
স্কুল ইন্সপেক্টর আসার খবর পাওয়ার পর স্কুলের হেড মাষ্টারসহ সব টিচারই ব্যস্ত সময় কাটাতে লাগলেন স্কুলের ক্লাশরুম, বারান্দা, পায়খানা, প্রস্রাবখানা সব ঝকঝকে পরিষ্কারের কাজে। গাছ থেকে একটি ঝরা পাতা উড়ে এসে বারান্দায় পড়লে হেড মাষ্টার কাউকে কিছু না বলে নিজেই ঝট করে পাতাটা তুলে ফেলছেন। দুই সপ্তাহ আগেই ছাত্র-ছাত্রীদের বলে দেওয়া হয়েছে, সেদিন যেন সবাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন মার্জিত পোশাক পরে স্কুলে হাজির হয়। কারণ ওই দিন স্কুল ইন্সপেক্টর আসবেন স্কুল পরিদর্শনে ।
সব চেয়ে বেশি সতর্ক হলেন , গতমাসে ইন্সপেক্টর  যখন এসেছিলেন ছাত্রদের জিজ্ঞেস করেছিলেন ‘ দেশের রাষ্ট্রপতির নাম । জবাবে সকলেই রাষ্ট্রপতির নাম না বলে দিয়েছিল প্রধান মন্ত্রীর নাম । আর বলবেই না কেন ? অবশ্য এটা ছাত্র-ছাত্রীদেরই বা ভুল কোথায় ? আজকাল রেডিও, টিভি সংবাদপত্রে সবখানেই প্রধানমন্ত্রী । কোমলমতি এই শিক্ষার্থিরা কি খেয়াল রাখতে পারে কে রাষ্ট্রপতি আর কে প্রধানমন্ত্রী ?  সে ইন্সপেক্টর বদলী হয়ে অন্যত্র চলে গেছেন । নতুন ইন্সপেক্টরের এই প্রথম পরিদর্শন । এবারেও ছাত্র-ছাত্রীরা যদি একই ভুল করে তাই রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকার প্রধানের গুরত্বপূর্ণ সকলেরই নাম ক্লাশের ছাত্র-ছাত্রীদের ঠোঁটস্থ করানো  হয়েছে । যাতে জিজ্ঞেস করার আগেই সঠিক জবাব দিতে পারে ।
রবিবার যথারীতি  ইন্সপেক্টর স্কুলে এসে পৌঁছিলেন ।
হেড মাষ্টার থেকে শুরু করে সব টিচারের মধ্যেই একটা নিরব আতঙ্ক । নতুন ইন্সপেক্টর কাকে কি জিজ্ঞেস করেন । যদি সঠিক জাবাব দিতে না পারে ?
স্কুলের টিচারদের সাথে নিয়ে তিনি পদচারী করতে করতে ক্লাশ ফাইভের রুমে গিয়ে ঢুকলেন । ছাত্রছাত্রীরা সমস্বরে মেহমান স্কুল ইন্সপেক্টরকে অভিবাদন জানিয়ে সকলে দাঁড়িয়ে পড়ল । তিনি হাত নেড়ে অভিবাদন গ্রহণ করে সকলকে বসতে বললেন ।
নিজের পরিচয় দিয়ে নাতিদীর্ঘ শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখলেন ইন্সপেক্টর। ছাত্র-ছাত্রীরা গভীর মনযোগ সহকারে সে বক্তব্য শুনল । এর পরে তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের পর্যায়ক্রমে এক এক জনের পরিচয় নিলেন।
পরিচয় পর্ব শেষে তিনি জিজ্ঞেস করলেন , একই বস্তু স্থান কাল ভেদে বিভিন্ন নাম ধারণ করে এমন একটি বস্তুর উদাহরণ দিতে পার ?
ক্লাশের ফাস্ট বয়  রাকিব উঠে জবাব দিল হ্যাঁ  আমি পারব, স্যার । পানি ।
পানি স্থান কাল ভেদে বিভিন্ন নাম ধারণ করে , যেমন সাধারণত এটি যখন নদী খালে বিলে থাকে তখন একে আমরা পানিই বলি । এই পানি যখন ফ্রিজে রাখা হয় তখন জমে আইস বা বরফ হয়। যখন ফুটিয়ে রান্নার কাজে ব্যবহার হয় পানি তখন ফুটে উপরের দিকে উড়ে যায় তখন এর নাম হয় বাস্প । সেই বাস্প যখন আকাশ থেকে কিউব আকারে নিচে পড়ে তখন আমরা তাকে বলি শিলা ।ছাত্রের জবাবে ইন্সপেক্টর খুশি হয়ে বললেন ধন্যবাদ । তিনি আবারও জিজ্ঞেস করলেন আর কেউ ?
এবারের ক্লাশের দুষ্ট ছেলেটা উঠে দাঁড়ালো আমি ?  যার নাম বল্টু।
দুষ্টটা উঠে দাঁড়াতেই ইন্সপেক্টরের সাথে থাকা হেড মাষ্টার তো কাঁপুনি শুরু হয়েছে এই দুষ্ট আবার কি বলে ?  ছোড়াটা বাঁকা ছাড়া সোজা কথা কখনও বলে না।
ইন্সপেক্টর অনুমতি দিলেন।
এবার বল্টু উঠে দাঁড়িয়েই তার নিজ মাথায় হাত বুলিয়ে বলতে শুরু করল, এই যে আমি স্পর্শ করছি এটা চুল । মাথায় গজালে এটার নাম চুল। চোখের উপর গজালে ভ্রু, ঠোটের উপর গজালে গোফ, নিচ ঠোটের নিচে গজালে দাঁড়ী । বুকে গজালে লোম । এবার হেড মাষ্টার চিৎকার দিয়ে তাকে থামিয়ে বললেন, আর নিচে নামিস না রে পাগলা, নিচে নামিস না।
ইন্সপেক্টর তার দুষ্টে ভরা জবাবে বেজাড় না হয়ে বরং খুশি হয়েই দু’হাতে তালি দিয়ে বললেন দুষ্ট হলে চমৎকার জবাব ।
তিনি এবার জিজ্ঞেস করলেন , কি নাম তোমার ?
বল্টু ।
বল্টু না নাট ?
না, স্যার বল্টু ।
আমার মূল নাম বদিউজ্জামান । দাদু আদর করে ডাকতেন বল্টু । দাদুর দেওয়া নামটি পাড়া প্রতিবেশী সবার কাছেই পছন্দ হয়ে গেল । তাই সকলেই এখন বল্টু নামে ডাকে ।
আচ্ছা, আচ্ছা।
ইদানিং বাংলাদেশে একটি বিষয় নিয়ে বেশ বিতর্ক চলছে , মূর্তি বনাম ভাস্কর্য । এক শ্রেণির মানুষ বলছে মুর্তি আর ভাস্কর্য এক আর কিছু শ্রেণীর মানুষ বলছে এক নয় । এ ব্যাপারে তোমার মতামত কী, বল্টু ?
স্যার, যে লাউ সেই কদু ।
এ সময় হেড মাষ্টার ধমকের সাথে বললেন , বল্টু ।
বল্টু বিনয়ের সাথে বলল, সরি স্যার ।
জ্বী, স্যার মূর্তি এবং ভাস্কর্য একই জিনিস। পার্থক্য এতটুকুই মূর্তিকে পূজা করা হয় ভাস্কর্যকে পূজা করা হয় না। তাও আজকাল করা হয় । মূর্তি তৈরি করা হয় মাটি দিয়ে । কোন নিদিষ্ট সময় তৈরি করে তাকে পূজা করা হয় এবং পূজা শেষে জলাঞ্জলি দেওয়া হয় বা জলে ফেলে দেওয়া হয় । স্থায়ীও অনেক মূর্তি আছে যেমন লক্ষ্মী, কালী স্বরসতি প্রভৃতি । এদেরকে সকাল সন্ধ্যা ফুল দিয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা পূজা করে । বিশ্বাস না হ্য় আমাদের ক্লাশের দীপালিকে জিজ্ঞেস করেন । তাদের বাড়িতে সকাল সন্ধ্যা লক্ষ্মী পূজা করা হয় বলে সে ক্লাশে বসা দীপালির নজর কাড়ল ।
এ সময় দীপালী উঠে দাঁড়িয়ে বলল, জ্বী, স্যার আমাদের বাড়িতে সকাল সন্ধ্যা লক্ষ্মী পূজা করা হয়  আগে করতেন ঠাকুরমা । তিনি মারা যাওয়া এখন করেন আমার মা ।
ভাস্কর্য কাঠ, পাথর বা সিমেন্ট দিয়ে তৈরি করে রাখা হয় রাস্তার মোড়ে মোড়ে । ভাস্কর্যে ফুল দিয়ে সব সম্প্রদায়ের মানুষই পূজা করে । ভাস্কর্যগুলো যেহেতু রাস্তার মোড়ে মোড়ে রাখা হয় কিছুদিন পরে দেখা যায় সেখানে কাক পক্ষী এসে বিশ্রাম করে এবং মলও ত্যাগ করে । আমার নানা বাড়ি যেতে পথে একটি বন্ধভূমি পড়ে ।
এ সময় হেড মাষ্টার বললেন , বন্ধভূমি নয় বধ্যভূমি ।
জ্বী স্যার , বধ্যভূমি । দেশ স্বাধীনের যুদ্ধের সময় ঐ স্থানে  পাকসেনা আর রাজাকেরা মিলে হিন্দু মুসলমান অনেক মানুষ হত্যা করে। সেই স্থানে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেক ভাস্কর্য কে বা কারা যেন তৈরি করেছিল । সে সব ভাস্কর্যের এখন কেউ যত্ন নেয় না। পাখির মলে সেসব ভাস্কর্যের চেহারাই আর চেনা যায় না।
আচ্ছা বল্টু ভাস্কর্য সব সম্প্রদায়ের মানুষ পূজা করে কিভাবে ? জিজ্ঞেস করলেন ইন্সপেক্টর ।
আমার মামা খুলনা শহরে থাকেন । সেখানে কোর্টে ওকালতি করেন পাশাপাশি সে একজন সাংবাদিকও। গত মার্চে খুলনায় মামার বাসায় বেড়াতে গিয়েছে মামা বলল, ভাগ্নে আমার সাথে প্রেস ক্লাবে যাবি ? আজ আমাদের প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির  জন্মদিন উপলক্ষে একটি অনুষ্ঠান আছে বেশ মজা হবে সেখানে ।
অনুষ্ঠানে হিন্দু মুসলমান সকলে একত্রিত হয়ে প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতির ভাস্কর্যে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানাল । এই ভাস্কর্যে ফুল দেওয়া আর লক্ষ্মীর পায়ে ফুল দেওয়ার তফাৎ কি স্যার ? লক্ষ্মীর পায়ে ফুল দিয়ে পূজা করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষেরা আর ভাস্কর্যে ফুল দিয়ে পূজা করল সব সম্প্রদায়ের মানুষেরা । তা হলে ব্যপারটা কি দাঁড়াল মূর্তি পূজা করে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ আর ভাস্কর্য পূজা করে সব সম্প্রদায়ের মানুষ ।
বল্টুর কথা শুনে ইন্সপেক্টর সাহেব তাজ্জব বনে গেলেন ।
তিনি ইশারায় বল্টুকে কাছে নিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে আশির্বাদ করলেন, বেঁচে থাকরে বাপ, বেঁচে থাক।

আটলান্টা।


শনিবারের চিঠি/ আটলান্টা/ ডিসেম্বর ০, ২০২০

বিদ্রঃ এই  রচনাটি শুধু মাত্র বিনোদনের জন্য । এটির সাথে জাতি, ধর্ম বা কোন ব্যক্তির মিল নেই । যদি কোন মিল পাওয়া যায় তা সম্পূর্ণভাবে কাকতালীয় ।

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৫:৫১ অপরাহ্ণ | বুধবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২০

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com