বইমেলাকে বাঁচাতে ‘বাংলা উৎসব‘র যোগ

রবিবার, ৩১ মে ২০১৫

বইমেলাকে বাঁচাতে ‘বাংলা উৎসব‘র যোগ

 

মাহফুজুর রহমান


 

 

Openionনিউইয়র্কে বইমেলার দুইযুগ অর্থাৎ ২৪ বছর পূর্তি হলো এবার। এক সময়ে একুশের বইমেলা তার নাম থেকে ‘একুশে’ শব্দ ছেটে ফেলে ‘বাংলা বইমেলা‘ নামধারন করেছে, সাথে যোগ হয়েছে ‘আর্ন্তজাতিক বাংলা উৎসব’। মূলমঞ্চের ব্যানার দেখে কেউ স্পষ্টভাবে বুঝতে পারেননি আসলে কি হচ্ছে? তাই প্রশ্ন উঠে একুশের বইমেলা যেটি হতো এতোদিন- এটি কি তার অপভ্রংশ নাকি অধিক বাণিজ্যের জন্য ‘একুশে’ নাম বিসর্জন দিয়ে বহুনামের ভেল্কিবাজীর বাণিজ্য কৌশল অবলম্বন? যাই হউক এবারের মেলায় বোধহয় ‘মেলার দুই নামের’ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশী মানুষের উপস্থিতি ঘটেছিলো। অবশ্য এর কতটা বইয়ের মেলার ভীড় ছিল, আর কতটা বিনে পয়সায় দুই খ্যাতিমান শিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদি ও সামিনা চৌধুরীর গান শোনার জন্য ছিল তা সহজে অনুমেয়।

নিউইর্য়কের বই ও সিডি বিক্রয়ের প্রতিষ্ঠান মুক্তধারা এক সময়ে মেলা আয়োজন করতো এখন খোলস পাল্টে তা ‘মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের’ নামে হচ্ছে। ২২,২৩ ও ২৪ মে তিনদিনব্যাপী এই আয়োজনে বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, কানাডা এবং নিউইয়র্কসহ অন্যান্য স্টেটের কবি, সাহিত্যিক, লেখক, এবং প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান যোগ দিয়েছিলো। মেমোরিয়াল ডে লং উইক এন্ডে অনুষ্ঠিত মেলা ও সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ করতে নিউইয়র্কসহ আশেপাশের শহর থেকে অনেকেই ভীড় জমিয়েছিলেন।

২২মে শুক্রবার বিকেলে জ্যাকসন হাইটসরে ডাইভার্সিটি প্লাজা সেভেনন্টি থ্রি স্ট্রীট ঘুরে ৩৭ এভিন্যু হয়ে এক উদ্বোধনী বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়।. এতে অংশ নেন বাংলাদেশ ও প্রবাসের লেখক, কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মীসহ সাধ্রান প্রবাসীরা। জ্যাকসন হাইটসের একটি স্কুলে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী বাংলা উৎসব ও বইমেলার উদ্বোধন করেন অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ। উদ্বোধনী পর্বে শুভেচ্ছা বক্তব্য করেন বাংলাদেশ থেকে আসা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, বাংলাদেশ সরকারের পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের সচিব নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা ও নিউইয়র্কের কনসাল জেনারেল শামীম আহসান।

এরপর স্কুল অডিটোরিয়াম ভাষা সৈনিক আব্দুল মতিন মঞ্চে শুরু হয় অনুষ্ঠানের মূল কার্যক্রম। বই মেলার আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক রোকেয়া হায়দারের শুভেচ্ছা বক্তব্যের পর সমবেত কন্ঠে ধ্বনিত হয় ‘আগুনের পরশমনি ছোয়াও প্রাণে, এ জীবন পূর্ণ করো’। কাবেরি দাসের নির্দেশনায় সঙ্গীত পরিষদ নিউইয়র্ক এর শিল্পী শিরিন রহমান, ডানা ইসলাম, ফারজানা মম, কৃস্টিনা রোজারিও লিপি, প্রার্থনা নাথ, সানজার আহমেদ, ধীমান শাহেদ,অনামিকা, চৈতী বিশ্বাস সানাই, নার্গিস বেগম, শারমিন আশরাফ, শাহীন খান, কৃষ্ণা দে, শ্রুতিকনা দাস, সাবেরা কাকন, অধরা, তাহরিন পারভীন প্রীতি উদ্বোধনী সঙ্গীত পরিবেশন করেন। পরে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এর নেতৃত্বে ২৪ জন আমন্ত্রিত অতিথি মঙ্গল প্রদীপ প্রজ্জলন করে আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন উৎসব ও মেলার।

উদ্বোধনী পর্বে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের সচিব নব বিক্রম ত্রিপুরা , এনডিসি, লেখক ও বিশ্বভারতীর পরিচালক রামকুমার মুখোপ্যাধায়, মাওলা ব্রাদারের কর্নধার মাহমুদুল হক, ও কানাডা প্রবাসী জিয়াউল হক জিয়া। শুভেচ্ছা বক্তব্যের পর নৃত্য পরিবেশন করেন পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে আগত নৃত্যশিল্পী এলি ও স থিউ পুরে। এরপর ১৯৭১ এ মহান মুক্তিযুদ্ধের সহযোদ্ধা লেয়ার লেভিনকে সম্মাননা দেয়া হয়। হাসান ফেরদৌসের সঞ্চালনায় এ অনুষ্ঠানে তাকে উত্তরীয় পরিয়ে দেন কনসাল জেনারেল শামীম আহসান। কনসার্ট ফর বাংলাদেশ পর্বে সঙ্গীত পরিবেশন করেন দ্বিতীয়া ফেরদৌস, দীপাঞ্জলী ভৌমিক, বাসমা ও স্মৃতিকনা দাস। ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড’ কবিতা আবৃত্তি করেন সৌরভ সরকার। সবশেষে পার্থ সারথী দাস এবং মেহরুন আহমেদের সঙ্গীত পরিবেশনার মধ্য দিয়ে প্রথম দিনের অনুষ্ঠানের সমাপ্তি হয়।

বই মেলার দ্বিতীয় দিন সকালে ছিল বাংলা লিখন, চিত্রাংকন, আবৃত্তি, চিত্র প্রদর্শনী এবং নৃত্য-গীতি ও হারানো দিনের গান । এই দিন বিভিন্ন পর্বে বিভিন্ন আলোচনা অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহন করেন অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, সৈয়দ আব্দুল হাদি,শারমিন আহমেদ, রামকুমার মুখোপ্যাধায়, ড. অনুুপম সেন, লুৎফর রহমান রিটন,বীরুপাক্ষ পাল, আহমাদ মাযহার, রোকেয়া হায়দার ,নিনি ওয়াহেদ, ড. নুরন নবী, দর্পন কবীর, আদনান সৈয়দ, আবীর আলমগীর, গোপন সাহা, ইভান চৌধুরী, জি এইচ আরজু, দুলাল ভৌমিক, তাজুল ইসলাম, মিস এলি, স থিউ পুরে, অনামিকা ত্রিপুরা, মনজুর কাদের, আলম সিদ্দিকী প্রমূখ।

উৎসব ও মেলার শেষ দিনে ছিল আমন্ত্রিত অতিথিতের আড্ডা, শিশু-কিশোর প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণ, লেখক-প্রকাশ-পাঠক ত্রিমুখী আলাপচারিতা, ছড়া ও স্বরচিত কবিতা পাঠের আসর, আমন্ত্রিত শিল্পীদের সঙ্গীত পরিবেশন, পাবর্ত্য চট্টগ্রামের শিল্পীদের আঞ্চলিক পরিবেশনা, নাটক নিয়ে আলোচনা ও অভিনয়, মূলধারায় বাঙালি লেখকদের আলোচনা, সংস্কৃতিকর্মী সেমন্তী ওয়াহেদের নৃত্য, ব্যান্ড সঙ্গীত ইত্যাদি। মুমু আনসারীর সঞ্চালনায় ছড়া পাঠ পর্বে অংশ নেন কবি ও সাংবাদিক দর্পণ কবীর, ফকির সেলিম, প্রকাশক হুমায়ূন কবীর ঢালী, মিজানুর রহমান জোয়ার্দার প্রমুখ। সবশেষে জনপ্রিয় সঙ্গীত শিল্পী সামিনা চৌধুরীর একক সঙ্গীতানুষ্ঠান উপভোগ করেন দর্শক-শ্রোতারা।

এদিকে তার ফেইস বুকে একটি স্ট্যাটাসে এবারের চব্বিশতম আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসব ও বইমেলাকে ‘বিশৃঙ্খল, বাণিজ্যপ্রবণ, অস্বচ্ছ ও অগোছালো’ বলে মন্তব্য করেছেন উৎসবের সহ-আয়োজক রুমা চৌধুরী। এছাড়াও বিভিন্ন মহল থেকে নানান অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলে দাবি করেছেন,আয়োজন প্রতিষ্ঠান মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের কর্ণধার বিশ্বজিৎ সাহা। সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠানস্থল অডিটোরিয়ামে শীতাতপ ব্যবস্থা না থাকায় প্রচন্ড গরমে দর্শক-শ্রোতারা ঘেমে নেয়ে উঠেন এবং বিরক্তি প্রকাশ করে। শেষ দিন সামিনা চৌধুরীর গানের সময়ে অতিরিক্ত গরমে অতীষ্ঠ সামিনাকে বিরক্তি প্রকাশ করতে দেখা যায়। দর্শকদের ধারনা গরমের কারনেই সামিনা বেশী গান না গেয়ে মঞ্চ ছেড়ে বিদায় নেন। গরমে বিশেষ করে শিশুরা উপভোগ করতে পারেনি সাংষ্কৃতিক অনুষ্ঠান। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে আয়োজক বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, অডিটোরিয়াম ছাড়া পুরো অনুষ্ঠানস্থলে শীতাতপ নিযন্ত্রন ব্যবস্থা ছিলো। অডিটোরিয়ামে কোন শীতাতপ নিয়ন্ত্রন ব্যবস্থা না থাকায় তার পক্ষে কিছুই করার ছিল না।

এদিকে মেলায় কি পরিমান অর্থের বই বিক্রি হয়েছে জানতে চাইলে বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, এর কোন হিসাব নেই তার কাছে। কিন্তু মেলায় যোগ দেয়া একজন লেখক এই প্রতিবেদককে বলেন স্টলগুলোতে ভীড় থাকলেও বই কেনা বেচা হয়েছে খুবই কম। এমন স্টল খুুঁজে পাওয়া যাবে না যারা হাজার ডলার বিক্রি করেছে। আর সেই হিসাবে এতো আয়োজন ও বাগাড়ম্বের বই মেলায় ১০ হাজার ডলারেরও বই বিক্রি হয়নি বলে ধারনা করা হচ্ছে।

বই মেলায় বই বিক্রির এই অবস্থা দেখে নিউইয়র্কের একজন লেখক-সাংবাদিক বললেন, নিউইয়র্কে ২৪ বছর ধরে বই মেলা হচ্ছে কিন্তু এর ফলে এখানে বইয়ের ক্রেতা তৈরী হয়নি। আসলে নিউইয়র্কার বাঙ্গালীরা বই বিমূখ। বই কিনে পড়ার অভ্যাস রপ্ত করতে পারেননি তারা। আর তাই বই মেলাকে বাঁিচয়ে রাখতে ‘কোরামিন’ হিসাবে যোগ করতে হয়েছে ‘আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসব’। তাতেও রক্ষা হচ্ছে না।

মেলায় পাবর্ত্য চট্টগ্রামের চারুশিল্পী নিউইয়র্কে বসবাসরত: কে সি মংয়ের চিত্র প্রদশর্নীটি ছিল ব্যতিক্রমী। মেলার ভীড়ে তার প্রদর্শনী অনেকেরই দৃষ্টি কেড়েছে।

ব্যক্তিগত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মুক্তধারা এক সময়ে বাঙ্গালীর চেতনা মঞ্চকে সাথে নিয়ে জাতিসংঘের সামনে একুশের প্রথম প্রহরের অনুষ্ঠান আয়োজনের পাশাপাশি তাদের নিয়েই একুশের বই মেলা আয়োজন করতো। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে ফাউন্ডেশনের অধীনে মেলা আয়োজন কেন করছে তা বোঝা গেল এবার। ফাউন্ডেশনকে ব্যবহার করে বাংলাদেশ সরকার থেকে অনুদান পেতে এবং দেশের বিভিন্ন কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান থেকে মোটা অংকের অর্থের স্পন্সর যোগাড় করাই এর মূল লক্ষ্য তা স্পষ্ট হয়েছে মূল মঞ্চের বিশাল ব্যানারে ‘বাংলা বই মেলা’ আন্তর্জাতিক বাংলাদশ উৎসব’ ও ‘প্রাণ বাংলাদেশ মেলা’ ইত্যাদি গোঁজামিল নামের ব্যবহার দেখে। বাংলাদেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো, বেসরকারী প্রাইম ব্যাংক, এবি ব্যাংক, গ্রীনডেল্টা ইন্স্যুরেন্সসহ বেশকিছু প্রতিষ্ঠান এবারের ২৪তম আন্তর্জাতিক বাংলা উৎসব ও বইমেলাকে বিপুল অর্থ সহায়তা দিয়েছে জানা গেছে। এ ব্যাপারে জানতে চাইলে বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, বাংলাদেশের সৃজনশীল প্রকাশনা সমিতির বিরোধিতার কারনে প্রাইম ব্যাংকের স্পন্সরশীপ থেকে কোন অর্থই পাননি তিনি। আর রফতানী উন্নয়ন ব্যুরো থেকে এখনও কোন অনুদানের টাকা তার হাতে এসে পৌঁছায়নি। ভারতের শিল্পী-সাহিত্যিকদের আনা হয় মেলায়, সেক্ষেত্রে ভারতীয় কোন প্রতিষ্ঠান থেকে কেনো স্পন্সরশীপ পান কিনা জানতে চাইলে বিশ্বজিৎ বলেন তাদের কাছে চাই কিন্তু পাই না।

লেখকঃ সম্পাদক, সাপ্তাহিক বর্ণমালা, নিউইয়র্ক ।

শনিবারের চিঠি / আটলান্টা / ৩১ মে ২০১৫

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৪:৫৪ অপরাহ্ণ | রবিবার, ৩১ মে ২০১৫

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com