ফের বেপরোয়া ছাত্র লীগ

মঙ্গলবার, ২৫ নভেম্বর ২০১৪

ফের বেপরোয়া ছাত্র লীগ

 

image_9_1748শনিবার ডেস্কঃ অস্ত্রের রাজনীতির ধারাবাহিকতায় রোববার আবারো স্বরূপে দেখা যায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) শাখা ছাত্রলীগকে। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি মিজানুর রহমান রানার নেতৃত্বে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর তারা অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি করে। এ সময় অন্তত ৩০ শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হন। বর্ধিত ফি বাতিল ও সান্ধ্য কোর্স বন্ধের দাবিতে ছাত্রসমাবেশে গত রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে বিনা উসকানিতে হামলা চালায় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ। রাবি ছাত্রলীগের সভাপতি মিজানুর রহমান রানা নিজেই শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। এ ছাড়াও গুলি ছুড়তে দেখা যায় ছাত্রলীগের সহসভাপতি রানা চৌধুরী, আমির আলী হল সভাপতি ও বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শামসুজ্জামান ইমন, সাংগঠনিক সম্পাদক নাসিম আহমেদ সেতু, আরেক সাংগঠনিক সম্পাদক ফয়সাল আহম্মেদ রুনু, ছাত্রলীগ ক্যাডার সুদিপ্ত সালাম, মোস্তাকিম বিল্লাহ, উপ-আপ্যায়ন বিষয়ক সম্পাদক আল গালিব, ছাত্রলীগ ক্যাডার ও ইসলামের ইতিহাস বিভাগের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী পলাশ।


এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে গত বৃহস্পতিবার ছাত্রলীগ ঘটায় আরেক তুঘলকি কান্ড। ক্যাম্পাসের নিয়ন্ত্রণ ও হল দখলকে কেন্দ্র করে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (শাবি) ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে এক বহিরাগত ছাত্রলীগ নেতা নিহত ও পুলিশসহ ১৫ জন আহত হয়েছেন। আহতদের মধ্যে শাবি প্রক্টর প্রফেসর ড. হিমাদ্রি শেখর রায়সহ পাঁচজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। শাবি কর্তৃপক্ষ অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছে। বৃহস্পতিবার বিকেল ৪টার মধ্যে ছেলেদের ও আজ শুক্রবার সকাল ৯টার মধ্যে মেয়েদের হল ছাড়তে বলা হয়েছে। ক্যাম্পাসে এখন থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ। তবে দফায় দফায় সংঘর্ষ চলাকালে পুলিশ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে। আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ছাত্রলীগ ক্যাডাররা সংঘর্ষে লিপ্ত হলেও পুলিশ কাউকেই গ্রেফতার করেনি। এ ছাড়া গতকাল সশস্ত্র তাণ্ডব চালানোর পর খুনিরা দীর্ঘসময় ক্যাম্পাসে অবস্থান করে। পরে তারা প্রশাসনের সহযোগিতায় নির্বিঘ্নে ক্যাম্পাস ছেড়ে যায়। নিহত বহিরাগত ছাত্রলীগ নেতা সুমন দাস সিলেট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির এলএলবি অনার্স চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। পাগলা সুমন হিসেবে পরিচিত এই ছাত্রলীগ নেতা দলের সিলেটের কাশ্মীর গ্রুপের সাথে দীর্ঘ দিন ধরে জড়িত। এক বছর আগেও তিনি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ছাত্রলীগের সহসভাপতি ছিলেন বলে একটি সূত্রে জানা গেছে। তার গ্রামের বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই উপজেলার শ্যামারচরে। তার বাবা ভূমি সার্ভেয়ার। ক্যাম্পাস সূত্র জানায়, শাবি ছাত্রলীগ সভাপতি সঞ্জীবন চক্রবর্তী পার্থ ও সহসভাপতি অঞ্জন রায় গ্রুপের মধ্যে ক্যাম্পাসে আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে বিরোধ চলছিল। এর জের ধরে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে দুই পক্ষ সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। খবর পেয়ে পুলিশ এসে ফাঁকা গুলি ছুড়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এতে সাধারণ শিার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে উভয় গ্রুপের মধ্যে ব্যাপক গুলিবর্ষণ শুরু হয়। সংঘর্ষে শাবি প্রক্টর প্রফেসর ড. হিমাদ্রি শেখর রায়সহ পাঁচজন গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। তাদের মধ্যে সুমন দাস হাসপাতালে মারা যান। তিনি অঞ্জন গ্রুপের কর্মী ছিলেন। এ ছাড়া খলিল নামে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের প্রথম সেমিস্টারের এক ছাত্রের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।

এর পর হামলায় অঞ্জন রায়ও গুরুতর জখম হয়েছেন। তাকে উদ্ধার করতে গিয়ে পুলিশও হামলার শিকার হয়েছে। এর আগে সকালে ছাত্রাবাসে ব্যাপক ভাঙচুর করে ছাত্রলীগের একাংশ। হামলাকারীরা শাহপরাণ হলে অন্তত ৪০টি ক ভাঙচুর করে। একই সময়ে তারা দ্বিতীয় ছাত্র হলেও ভাঙচুর করে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের একাধিক সূত্রে এ তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে। দেশের ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের একশ্রেণির নেতা-কর্মীর উচ্ছৃঙ্খলতা যেন থামছেই না। কিছু নেতা-কর্মীর কর্মকাণ্ডে দেশের বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অস্থির। দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিপক্ষের ওপর হামলা, অন্তর্দ্বন্দ্ব, সংঘর্ষ, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, দখল-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ারও অভিযোগ উঠেছে অনেক নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে। বর্তমান সরকারের মেয়াদকালে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা চার শতাধিকবার সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েছে। যার বেশিরভাগই ঘটেছে নিজেদের মধ্যে। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, অনেক জায়গায় এ সংগঠনের কমিটি বিলুপ্ত করে দেয়া হয়েছে। ছাত্রলীগের সংঘর্ষের কারণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অচল হয়ে যাওয়ায় আওয়ামী লীগের অনেক সিনিয়র নেতাও বিরক্ত। গত শনিবার বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) ছাত্রলীগের সভাপতি শামছুদ্দিন আল আজাদ ও সাধারণ সম্পাদক রফিকুজ্জামান ইমন গ্রুপের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে শিশু রাব্বি (১২) নিহত হবার পর ছাত্রলীগ আবারো আলোচনায় এসেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাকৃবি ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে। অনির্দিষ্টকালের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদালয় এবং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে ছাত্রলীগ। একের পর এক অস্ত্রবাজি আর অপকর্ম করেই যাচ্ছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের এই ছাত্র সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর আরো বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে তারা। ছাত্রলীগের কর্মকান্ড নিয়ে আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী এরই মধ্যে প্রকাশ্যেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

শিক্ষামন্ত্রী দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার প্রতিশ্রুতি গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে ব্যক্ত করেছেন। এর আগেও একটি ঘটনার বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানালেও তা দৃশ্যমান হয়নি। নেতাকর্মীরা এভাবে ধারাবাহিক অপকর্ম করে চললেও ছাত্রলীগের হাইকমান্ড থেকে কার্যকর স্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। বহিষ্কার কিংবা সতর্ক করে দিয়ে দায় সারছেন তারা। নামপ্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগের একজন সিনিয়র নেতা বলেন, ছাত্রলীগের এ পরিস্থিতি একদিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে এ অবস্থা চলতে থাকলেও তা নিয়ে কেন্দ্র মাথা ঘামায়নি। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের দাবি-দাওয়ার দিকে নজর না দিয়ে তারা সকাল-বিকাল গণভবনে গিয়ে বসে থাকছেন। এটি বিভিন্ন জায়গায় ভুল বার্তা পাঠাচ্ছে। এ অবস্থায় ছাত্রলীগে শৃংখলা আনা কষ্টসাধ্য হবে বলেও মনে করেন তিনি। দলের অপর একজন নেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বললেন, গৌরবোজ্জ্বল ছাত্র রাজনীতি বর্তমান ছাত্র রাজনীতির কারণে ম্লান হয়ে যাচ্ছে। ছাত্রলীগের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস বর্তমান ছাত্রনেতারা পড়েন না বলেই তারা এ ধরনের সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছেন।

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৯:৩৮ অপরাহ্ণ | মঙ্গলবার, ২৫ নভেম্বর ২০১৪

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com