প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, আমাদের আরেকটি সুন্দরবন নেই

মঙ্গলবার, ০২ আগস্ট ২০১৬

প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, আমাদের আরেকটি সুন্দরবন নেই

 

প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, আমাদের আরেকটি সুন্দরবন নেই 
ফজলুল বারী


 

লেখক ফজলুল বারী

লেখক ফজলুল বারী

অদ্ভুত স্ববিরোধিতা যেন বাংলাদেশের নানাকিছুতে! বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো যে বিপদের ঝুঁকির সম্মুখীন সে বিষয়টি নিয়ে বিশ্বের পরিবেশবাদীরা আন্তর্জাতিক নানা ফোরামে সোচ্চার। বাংলাদেশ এসব সহানুভূতিকে কাজে লাগিয়ে নানান আন্তর্জাতিক ফোরামে গিয়ে নানান প্রকল্প সহায়তা চাইছে, পাচ্ছেও। প্রধানমন্ত্রীকে ডেকে নিয়ে দেওয়া হচ্ছে পরিবেশ বিষয়ক আর্থ পুরস্কার। পরিবেশ বিপর্যয়, দখল এসবকে কেন্দ্র করে মরে যাচ্ছে ঢাকার প্রাণ বুড়িগঙ্গা নদী। বুড়িগঙ্গা বাঁচাতে সরকার লাগোয়া ট্যানারি শিল্পটি সরিয়ে নিচ্ছে। জরিমানার আদেশ হচ্ছে ট্যানারি মালিকদের বিরুদ্ধে।

আড়িয়াল বিলে বিমানবন্দর হলে ধ্বংস হবে অনেক ফসলি জমি, এলাকার জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হবে এমন অভিযোগকে কেন্দ্র করে এর বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। আড়িয়াল বিলে বিমানবন্দরটি হওয়ার কথা ছিল জাতির পিতার নামে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ নিয়ে কোনও জেদাজেদিতে যাননি। মানুষ চাইছে না, ব্যাস! কিন্তু সে সরকারই রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রটিকে কেন্দ্র করে এক ধরনের জেদাজেদিতে চলে গেছে! যা এই সরকারের চরিত্রের সঙ্গে মেলে না।
কারণ বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত যত সরকার এসেছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারগুলোই তুলনামূলক পরিবেশবান্ধব কাজকর্ম করেছে এবং করছে। জলাধার রক্ষা আইনসহ অনেক পরিবেশবান্ধব আইন করেছে এই সরকার। সরকারের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত মন্ত্রী হওয়ার অনেক আগে থেকে পরিবেশবাদীদের সংগঠন বেলা’র সঙ্গে সক্রিয় জড়িত। সেই মুহিত যখন বলেন- রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে সুন্দরবনের কিছু ক্ষতি হলেও এটি নড়বে না বা বাতিল হবে না তখন তাজ্জব বনে যাই! এ কেমন কথা সরকারের একজন দায়িত্বশীল মন্ত্রীর? আপনি কবুল করছেন ক্ষতি হবে, এরপরও বলেছেন সেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্তের নড়চড় হবে না! বিদ্যুৎতো সরকারের মন্ত্রীরা যার যার বাড়ির জন্য করেন না। করবেন না। করবেন দেশের জন্যে। তা দেশের সেরা এবং একক এক সম্পদ সুন্দরবনের বিনিময়ে? অথচ এ বন কত কিছু দিয়েছে এদেশকে! কত ঝড় জলোচ্ছ্বাস সামাল দিয়ে কত জীবন সম্পদ রক্ষা করেছে আমাদের এই গৌরবের সুন্দরবন।

সুন ২বিদ্যুতের জন্য এই সরকার অনেক যুগান্তকারী কাজ করেছে। এর আগে বাংলাদেশের আর কোনও সরকার এত বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থা করেনি। এর আগে খাম্বা বসিয়ে টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। বিদ্যুতের ব্যবস্থা হয়নি। এ সরকারের আমলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় বেশি না কম হয়েছে দাম কম না বেশি তা ভিন্ন প্রসঙ্গ। কিন্তু সত্য হচ্ছে শহরাঞ্চলের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু জনসংখ্যা আর চাহিদার এত বিশাল যে সরকার সারাক্ষণ নতুন বিদ্যুৎ উৎসের সন্ধানে পেরেশানির মধ্যে থাকে। রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্প তেমন একটি পেরেশানির প্রডাক্ট।

আপত্তি উঠেছে প্রস্তাবিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের স্থান নির্বাচন নিয়ে। পরিবেশ আন্দোলনকারীরা বলছেন- এতে বিপর্যয়ের মুখে পড়বে বাংলাদেশের মানুষের প্রাণের সুন্দরবন। বনের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হবে। এ নিয়ে প্রতিবাদের সূচনাতে পরিবেশ মন্ত্রণালয় বলেছিল- তারা এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিবেশ ছাড়পত্র দেয়নি। কিন্তু এরপর শুরু হয় লুকোচুরি। ছাড়পত্র দেওয়া হয় জনগণকে অন্ধকারে রেখে! প্রকল্পটা জনগণের জন্যে। ছাড়পত্র দেওয়া নিয়ে জনগণের সঙ্গে লুকোচুরির মানে কী? অর্থমন্ত্রী বলে দিয়েছেন সুন্দরবনের ক্ষতি হলেও এই বিদ্যুৎকেন্দ্র হবে।

বিদ্যুৎকেন্দ্র করতেতো কেউ নিষেধ করেনি। কিন্তু ওই জায়গাতেই করতে হবে সে জেদাজেদি কেন? খোঁজ নিলে দেখবেন এর পেছনে গুরুত্ব পাচ্ছে ভারতীয় স্বার্থ! তারা এই প্রকল্পে কয়লা বিক্রি করতে পারবে। কয়লার দামও তারা ঠিক করেছে। আর বর্তমান স্থানে করলে তাদের পরিবহন খরচ কম পড়বে। ভারততো তার স্বার্থ দেখবেই। সেতো এখানে ব্যবসা করতে এসেছে। রামকৃষ্ণ মিশনের সেবা কর্মসূচিতে দানখয়রাত করতে আসেনি। কিন্তু আমরা আমাদের স্বার্থ দেখবো না? এ কেমন কথা। এভাবে নিজের নাক কেটে পরের স্বার্থ উদ্ধারের এমন খুব বেশি নজির দেখা যায় কি?

সুন্দরবনের কাছে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের কারণ এ বন নিয়ে মানুষের আবেগ-ভালোবাসা। বাংলাদেশে বিশেষ কী আছে তা দেশি-বিদেশে কেউ জিজ্ঞেস করলেই আমরা চটজলদি বলি, বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার আমাদের আছে। আমাদের কাছে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন। সর্বশেষ সেরা প্রাকৃতিক ঐতিহ্য বিস্ময় প্রতিযোগিতায় এ দুটি স্থানের পক্ষে ভোট সংগ্রহে কত না সামাজিক আন্দোলন হয়েছে বাংলাদেশে! এমনকি প্রশাসনিক উদ্যোগে মাইকিং করে এগুলোর পক্ষে ভোট চাওয়া হয়। সে সুন্দরবনের পক্ষে মানুষ দাঁড়ালে তাকে আপনি সম্মান করবেন না? এটিইতো একটি গণতান্ত্রিক সরকারের কাজ তাই না?

সুন্দরবন নিয়ে আমার ব্যক্তিগত আবেগটা একটু ভিন্ন মাত্রার। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সেরা প্রাকৃতিক স্পটগুলোর বেশ কয়েকটা ঘুরে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। সে সব দেশের পর্যটন কর্তৃপক্ষ দাওয়াত করে নেওয়াতে তাদের সেরাগুলোই আমাকে দেখিয়েছে। কিন্তু আমার বরাবর মনে হয়েছে আমাদের সুন্দরবনই সেরা। প্রথমবার সুন্দরবন ঘুরে এসে আমার বন্ধুকে বলেছিলাম রাতের সুন্দরবনের নিরবতা যে কী সুন্দর তা অনুভব করা সম্ভব একমাত্র সুন্দরবনে বসেই। পরেরবার আমি আমার বন্ধুকে সেখানে সঙ্গে নিয়ে যাই। বনের ভেতর আমি এত ঘুরেছি যে সেখানে আসলে কী আছে না আছে এর কিছুটা হলেও জানি। নদী থেকে বনের যে অংশ দেখা যায় এর সঙ্গে ভেতরের বনের কোনও মিল নেই! ভেতরের দিকের বেশিরভাগ গাছপালার বনের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা লুটপাটে সাবাড় করে দিয়েছেন!

সুন ৩রয়েল বেঙ্গল টাইগারের জন্যে বিখ্যাত ছিল সুন্দরবন। বাংলাদেশের জাতীয় পশু এই রয়েল বেঙ্গল টাইগার। বাংলাদেশের ক্রিকেট দলের সদস্যদের বলা হয় টাইগারস। কিন্তু সেই বাঘ কি এখন আর আছে? একবার বাঘ শুমারিতে সেভাবে বাঘ পাওয়া গেল না। পরিবেশ মন্ত্রী বললেন- বাঘের সুন্দরবনের ভারতীয় অংশে বেড়াতে গেছে! ঠিক একই সময়ে পশ্চিমবঙ্গে বিধান সভায় বলা হয় তাদের শুমারিকারীরা সুন্দরবনের তাদের অংশে কোনও বাঘের দেখা পাননি। আমার অভিজ্ঞতা সুন্দরবন ভ্রমণ শুরু হয় বাঘের গল্প দিয়ে। ভ্রমণের সারা সময় সবাই বাঘের আতঙ্কে থাকে। এভাবে সুন্দরবন ভ্রমণ শেষ হয়ে যায়, কিন্তু বাঘের দেখা পাওয়া যায় না। কিন্তু আপনিতো সে পরিবেশ বহাল রাখবেন যাতে সেখানে বাঘ আসতে থাকতে পারে।

বাঘ নিয়ে যত অনিশ্চয়তা থাক হরিণ, বানর সহ নানাজাতের পশুপাখি, জলে কুমিরসহ আরও যতকিছু সুন্দরবনে আছে তা বাংলাদেশের আর কোথাও নেই। বনকে ভালোবেসে বনের ভেতরের নদীগুলোর নানা অংশে আপনি অভয়ারণ্য বানিয়ে রেখেছেন। সে এলাকাগুলোতে কাউকে মাছ ধরতে পর্যন্ত দেওয়া হয় না। সে বনের কুড়ি কিলোমিটারের মধ্যে আন্তর্জাতিক পরিবেশ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আপনি একটি কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের অনুমোদন দেন কী করে? বলা হচ্ছে এতে বনের কোনও ক্ষতি হবে না! এ কথাটি আপনাদের কে বলেছে? দেশের কোন পরিবেশবিদ অথবা বিজ্ঞানী?

আমাকে একজন লিখেছেন- সেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র হলে সুন্দরবনের পরিবেশের কী পরিমাণ ক্ষতি হতে পারে? আমি কোনও পরিবেশবিদ বা বিজ্ঞানী না। কিন্তু এ বিষয়ে রিপোর্টিংয়ের সূত্রে যতোটা পড়াশুনা করেছি তাতে বলতে পারি এ ক্ষতির বিষয়টি বাটখারা দিয়ে মেপে বা দিনক্ষণ ঠিক করে বলার বিষয় না। আজ রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র ওই জায়গাটায় হয়ে গেলে কাল সুন্দরবন নাই হয়ে যাবে এমন না। কিন্তু এই ক্ষতিটি হবে ক্রমশ। আপনারা দেশের জন্যে এতকিছু করেছেন এবং এখনও করছেন। আপনাদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। আপনারা কাউকে এমন সুযোগ কেন দেবেন যে একদিন বলা হবে আপনারা বাংলাদেশের অন্যতম সেরা একটি গৌরব সুন্দরবনের ক্ষতির কারণ অথবা ধ্বংসকারী? এবং সব শেষে আমি এই বন রক্ষায় সাহায্য চাইছি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছেই। আমার বিশ্বাস আপনি কোনও ভুল করবেন না। আপনাকে যতটা দেখেছি বুঝেছি আপনি যদি আজ ক্ষমতায় না থাকতেন তাহলে রামপালের প্রস্তাবিত স্থানে আপনি সুন্দরবনের জন্য ক্ষতিকর বিদ্যুৎকেন্দ্র হতে করতে দিতেন না। এ আন্দোলনে তখন আপনিই নেতৃত্ব দিতেন। প্লিজ কোনও জেদাজেদিতে আমল দেবেন না। বিদ্যুৎ নিয়ে আপনার সরকারের অনেক অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ হতে দেবেন না। যারা সেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিরোধিতা করছেন তারাও দেশ প্রেমিক। তারা কোন ঠিকাদার বা চাঁদাবাজ না। বাংলাদেশের সেরা সব পরিবেশ বিজ্ঞানীদের অনেকে আছেন যারা আপনার দল করেন অথবা সরকারকে সমর্থন করেন। তাদেরকে নিয়ে বসুন। তাদের জিজ্ঞেস করুন এ ব্যাপারে তাদের মতামত কী? দেশের সব মানুষকে আস্থায় নিন। কারণ বিদ্যুৎতো আপনি করতে চান দেশের মানুষের জন্য।

প্লিজ, প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, নতুন প্রজন্মের কথা শুনুন। এমনতো না যে ওই বিদ্যুৎকেন্দ্র ওখানে না হলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি ঘটবে বা ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ লেগে যাবে। তারা তাদের স্বার্থ দেখেছে আমরা আমাদেরটা দেখি। আমাদের যে আরেকটা সুন্দরবন নেই প্রিয় প্রধানমন্ত্রী।

লেখক: অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী সাংবাদিক

শনিবারের চিঠি/ আটলান্টা / আগস্ট ০২, ২০১৬

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১১:৩১ পূর্বাহ্ণ | মঙ্গলবার, ০২ আগস্ট ২০১৬

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com