প্রাণের পণ্যে ইঁদুরের বিষ্ঠা পেয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেছে ইতালি

বুধবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৪

প্রাণের পণ্যে ইঁদুরের বিষ্ঠা পেয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেছে ইতালি

 

pran logoশনিবার রিপোর্টঃ বাংলাদেশি কোম্পানি প্রাণের পণ্যে ইঁদুরের বিষ্ঠা পেয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেছে ইতালির সীমান্ত কর্তৃপক্ষ। ফলে কোম্পানিটির পণ্যের ব্যাপারে বাংলাদেশকে সতর্ক বার্তা দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। এর আগেও দেশে ও বিদেশে কোম্পানিটির খাদ্যপণ্যে ভেজাল ও ক্ষতিকর ভাইরাস পাওয়া যায়। কোম্পানিটির রফতানি পণ্যে ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিজ ভাইরাস (খুরারোগ) ও পোকামাকড়ের উপস্থিতি থাকায় গত বছরের শেষের দিকে কানাডা থেকে খাদ্যপণ্য ফেরত আসে। বিষয়টি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রকাশের পর প্রাণের পণ্যের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে দি ইন্টারন্যাশনাল ফুড সেফটি অথরিটিস নেটওয়ার্ক (আইএনএফওএসএএন)। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রাণের যেসব কোমল পানীয় ও জুস বাজারে বিক্রি হয়, এর কোনোটিরই গুণগত মান ঠিক নেই। জনস্বাস্থ্যের জন্যও নিরাপদ নয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রাণের কারণে বিশ্বে বাংলাদেশী পণ্য প্রশ্নবিদ্ধ। কিন্তু প্রচার আর প্রসারে শীর্ষে রয়েছে কাদিয়ানিদের এ প্রতিষ্ঠান।


সূত্র জানায়, ইঁদুরের বিষ্ঠা ধরা পড়ার পর এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ওই চালানের সব পণ্য জব্দ করে তা অনুমোদনহীন আমদানি বলে ঘোষণা করা হয়। এরপর চলতি বছরের ২৩ মে ‘ব্যাপিড অ্যালার্ট সিস্টেম ফর ফুড অ্যান্ড ফিড’ শীর্ষক এক সতর্কবার্তা জারি করে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। বাংলাদেশ থেকে ইতালিতে স্বাস্থ্যঝুঁকির উপাদানসহ মানহীন পণ্য রফতানি নিয়ে ওই সতর্কবার্তায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ইইউর হেলথ অ্যান্ড কনজিউমারস ডিরেক্টরেট জেনারেলের কার্যালয়। সূত্র জানায়, ইতালিতে রফতানি হওয়া পণ্য যাচাই-বাছাই করে দেশটির সীমান্ত কর্তৃপক্ষ। প্রাণ এগ্রো ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানির রফতানিকৃত খাদ্যপণ্যের চালানে রোডেন্ট এক্সট্রেমেন্টের (ইঁদুরের বিষ্ঠা) উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়ার পর তা জব্দ করা হয়। চালানটি অনুমোদনহীন আমদানি ঘোষণা করে বর্ডার রিজেকশন নটিফিকেশন। ২০১৪ এভিই বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এসব তথ্য সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়।

একই সঙ্গে এ সংক্রান্ত চিঠি দেয়া হয় বাংলাদেশের বাণিজ্য ও কৃষি মন্ত্রণালয়, রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি), বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর), ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এফবিসিসিআই), মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ (এমসিসিআই), বাংলাদেশ ফ্রুটস ভেজিটেবল অ্যান্ড অ্যালাইড প্রডাক্টস এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএফভিএপিইএ) ও প্রাণ এগ্রিকালচারাল মার্কেটিং কোম্পানি। ইইউর সতর্কবার্তার তথ্যানুসারে, ইতালির বাজারে প্রবেশাধিকার না পাওয়া ও জব্দকৃত প্রাণের ওই চালানে ছিল মিশ্র খাদ্যপণ্য। চালানটির ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করা হয় ‘রোডেন্ট এক্সট্রেমেন্ট’।

এ প্রসঙ্গে বিসিএসআইআর চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমাদ ইসমাইল মুস্তফা বলেন, রোডেন্ট হল ইঁদুর বা চিকাজাতীয় প্রাণী। আর এক্সট্রেমেন্ট হল মলমূত্র। বিজ্ঞপ্তির বিষয়বস্তু অনুযায়ী রফতানিকৃত খাদ্যপণ্যে ইঁদুরের বিষ্ঠা রয়েছে, তা বলা যায়।

এর আগেও প্রাণ পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ইস্যুতে বিভিন্ন সময় যাচাই-বাছাইয়ের প্রয়োজন হয়েছে উল্লেখ করে ইপিবির ভাইস চেয়ারম্যান শুভাশীষ বসু বলেন, বর্তমান সময়ে কঠিন বাস্তবতা হল মান নিয়ন্ত্রণ। এর ওপর নির্ভর করছে দেশের রফতানি বহুমুখীকরণ ইস্যু। তবে এক্ষেত্রে রফতানি পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ সনদ কৃষি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে দেয়া হয়। কাজেই এ বিষয়ে তারাই যথাযথ ব্যাখ্যা দিতে পারবেন।

জানা গেছে, তিন দশকের বেশি সময় ধরে দেশে ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য বাজারজাত করছে প্রাণ। তবে গত কয়েক মাসে দেশের অভ্যন্তরে ও বিদেশে কোম্পানিটির খাদ্যপণ্যে ভেজাল ও ক্ষতিকর ভাইরাস পাওয়া যায়। প্রাণ গ্রুপের রফতানি পণ্যে ফুট অ্যান্ড মাউথ ডিজিজ (খুরারোগ) ভাইরাস ও পোকামাকড়ের উপস্থিতি থাকায় গত বছরের শেষের দিকে কানাডা থেকে খাদ্যপণ্য ফেরত আসে। তাতে ছিল প্রাণ টোস্ট বিস্কুট, ট্রি ব্রেক, চানাচুর, ম্যাংগোবার, চাল, ঝালমুড়ি, চিড়াভাজা, চিড়ালাড্ডু, পটেটো ক্র্যাকার্স ও মাস্টাড অয়েল। আবার গত জুন মাসের শেষদিকে দূষণের দায়ে পরিবেশ অধিদফতরের জরিমানার ফাঁদে পড়ে প্রতিষ্ঠানটি।

গুঁড়োদুধ বাজারজাতকরণে আইন না মানায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে নজরদারিতেও পড়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এ সংক্রান্ত বিষয়গুলো জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রাণের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে দি ইন্টারন্যাশনাল ফুড সেফটি অথরিটিস নেটওয়ার্ক (আইএনএফওএসএএন)। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সহযোগী হিসেবে আইএনএফওএসএএন সারা বিশ্বে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করে। এছাড়া প্রাণের বাজারজাতকৃত খাদ্যপণ্যের মান যাচাই-বাছাই করার জন্য বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন জনস্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটকে (আইপিএইচ) চিঠিও দেয় সংস্থাটি।

এছাড়া রফতানি করা প্রাণের গুঁড়া হলুদে উচ্চমাত্রার সিসা উপস্থিতির প্রমাণ পায় যুক্তরাষ্টে র ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ)। এরপর দেশটির বাজার থেকে প্রাণের গুঁড়া হলুদ প্রত্যাহার করে নিতে চারটি পরিবেশক সংস্থাকে নির্দেশ দেয় সংস্থাটি। পরবর্তীকালে বাংলাদেশেও প্রাণের হলুদ পরীক্ষা করলে তাতে উচ্চমাত্রার সিসা থাকায় কোম্পানির সার্টিফিকেশন মার্কস (সিএম) সনদ বাতিল করে বিএসটিআই।

এ ব্যাপারে জানতে প্রাণের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) আমজাদ খান চৌধুরীর সঙ্গে সোমবার মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি কোম্পানির মার্কেটিং ডিরেক্টর কামরুজ্জামান কামালের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। তিনি এ ব্যাপারে ভালো বলতে পারবেন বলে জানান। পরে কামরুজ্জামান কামালের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি যুগান্তরকে বলেন, এটি ৫ থেকে ৬ মাস আগের ইস্যু। তিনি বলেন, তাদের পণ্য কোম্পানি থেকে বের হওয়ার পর রফতানির আগে কয়েকদিন বন্দরে থাকে। এ সময়ে ইঁদুর ঢুকতে পারে। তিনি জানান, ইতালিতে পণ্য যাওয়ার পর কনটেইনার খোলা হলে কার্টুন কাটা পাওয়া যায়। এরপর তারা বলেন, ওই পণ্য ফেরত নিতে হবে, না হয় ধ্বংস করতে হবে। এরপর তাদের ওয়েবসাইটে একটি সতর্কবার্তা দেয়া হয়। এটি তাদের নিয়মিত কাজ। তবে তিনি বলেন, কোম্পানি ইঁদুর প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে বিএসটিআই থেকে তাদের কিছু জানানো হয়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রফতানির ক্ষেত্রে মানহীনতার বিষয়ে প্রাণের ক্ষেত্রেই একাধিকবার অভিযোগ এসেছে। আর রোডেন্ট এক্সট্রেমেন্ট পাওয়ার ঘটনা দেশের রফতানি ইতিহাসে প্রথম। দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি প্রাণের এ ধরনের কার্যকলাপে বাংলাদেশের সুনাম নষ্ট হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে বিএফভিএপিইএ সভাপতি এসএম জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, খাদ্যপণ্যে এ ধরনের ত্রুটি অবশ্যই আমাদের জন্য উদ্বেগের বিষয়। এ ব্যাপারে শক্ত কোনো ব্যবস্থা নেয়া উচিত। ইউরোপের বাজারে কঠোর নজরদারির কারণে খাদ্যপণ্যে নানা ত্রুটি ধরা পড়লেও দেশের বাজারে তা দেদারসে বিক্রি হয় উল্লেখ করেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি ও হাইজিন বিভাগের অধ্যাপক বাহানুর রহমান। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ত্রুটিযুক্ত খাদ্য আমাদের দেশসহ বিশ্বেও যে কোনো প্রান্তের মানুষের জন্যই ক্ষতিকর। সরাসরি ভোক্তার শরীরে প্রবেশ করে, এমন পণ্য ত্রুটিমুক্ত নিশ্চিত না করা গর্হিত অপরাধ।

১৯৮১ সালে যাত্রা শুরু করে প্রাণ। বর্তমানে ১০টি ক্যাটাগরিতে ২০০টির বেশি খাদ্যপণ্য প্রস্তুত ও রফতানি করছে প্রাণ। এর মধ্যে রয়েছে জুস, ড্রিংকস, মিনারেল ওয়াটার, বেকারি পণ্য, কার্বোনেটেড বেভারেজ, স্ন্যাকস, কনফেকশনারি, মসলা, বিস্কুট ও ডেইরি প্রোডাক্টস। ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে রফতানি হওয়া কৃষিজাত খাদ্যপণ্যের মধ্যে রয়েছে সরিষার তেল, চানাচুর, বিস্কুট, জুস, মুগডাল ভাজা, বাদাম ও মটরভাজা। সুত্রঃ যুগান্তর

 

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১০:৪০ পূর্বাহ্ণ | বুধবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৪

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com