প্রাণীদের প্রতি অন্যরকম ভালোবাসা

শনিবার, ২৮ আগস্ট ২০২১

প্রাণীদের প্রতি অন্যরকম ভালোবাসা
রাতের বেলা কুকুরদের খাবার দিচ্ছে অধ্যাপক আলী আজম [ ছবিঃ সংগৃহীত ]

করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে দেশের অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো প্রায় দেড় বছর ধরে বন্ধ রয়েছে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। আবাসিক হল ও দোকানপাট সব কিছুই বন্ধ থাকায় ক্যাম্পাসে এখন পিনপতন নীরবতা। আর তাই ফাঁকা এই ক্যাম্পাসে সম্ভবত সবচেয়ে বেশি অসহায় হয়ে পড়েছে এখানে অবস্থান করা বিভিন্ন প্রাণী।

আবাসিক হলের চারপাশের উচ্ছিষ্ট কিংবা শিক্ষার্থীদের দেওয়া খাবার অথবা বিভিন্ন হোটেল রেস্তোঁরার ফেলে দেওয়া খাবারই ছিল তাদের ভরসা। বিশেষ করে কুকুর ও বিড়ালগুলোর চরম খাবার সংকট দেখা দিয়েছে। শুধু কুকুর-বিড়াল নয়, ক্ষুধার কারণে আশপাশের জঙ্গল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়কে বেরিয়ে আসছে শিয়াল, গুইসাপ, বেজিসহ বিভিন্ন প্রাণী।


এই অভুক্ত প্রাণীগুলোর পাশে অনেকটা দেবদূতের মতো দাঁড়িয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক আলী আজম। ক্যাম্পাসে বিচরণ করা এসব ক্ষুধার্ত প্রাণীকে প্রতিদিন নিয়ম করে খাবার দিচ্ছেন তিনি।

প্রথমে নিজের বাসায় বিশ্ববিদ্যালয়ের কুকুরগুলোর জন্য খাবার রান্না শুরু করেন অধ্যাপক আলী আজম। পরে গভীর রাত পর্যন্ত সেই খাবার পৌঁছে দেন ক্যাম্পাসের প্রায় চার কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিচরণ করা কুকুরগুলোর কাছে। কুকুরদের খাবার দিতে গিয়ে তার নজরে আসে অভুক্ত শিয়ালদের বিষয়টিও। কুকুরদের দেয়া খাবারের ঘ্রাণে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করতে থাকে শিয়ালগুলো।

এরপর থেকে তিনি শিয়ালদের জন্যও বাড়তি খাবারের ব্যবস্থা করেন। কুকুরের সঙ্গে শিয়ালদেরও খাবার দিতে থাকেন তিনি। এখন এই শিয়াল-কুকুরগুলো রাতে খাবার নিয়ে আসা গাড়িটি দেখলেই ছুটে আসে। জড়ো হয়ে দাঁড়ায় আলী আজমের পাশে।

প্রতিদিন রাত হলেই নির্দিষ্ট একটি গাড়ি দেখলেই ছুটে আস কুকুরগুলো। পেছনে এসেই থামে তাদের যাত্রা। আর তখনই গাড়ি থেকে পাতিল হাতে বের হন আলী আজমের ড্রাইভার সুজন। বড় একটি হাঁড়িতে ৩-৪ কেজি চালের রান্না করা ভাত, তরকারি (ভাতের সাথে মুরগির গিলা, কলিজা, পা) রান্না করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থানরত কুকুর, শিয়াল, বিড়ালদের জন্য। রান্না করা খাবার বের করে দেন সামনে। কুকুরগুলোও কোনো দিকে আর খেয়াল না করে এক মনে খেতে শুরু করে।

প্রায় দেড় বছর ধরে এদের খাবার বহন করা ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম সুজন।

তিনি বলেন, “মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের আলী আজম স্যার এই খাবারের ব্যবস্থা করেন। আমি জানি, শহীদ মিনার পার হলেই এই শেয়ালগুলো জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসবে গাড়ি দেখে। প্রতিদিন এদের জন্য রান্না করে, এদেরকে নিজের হাতে খেতে দিয়ে আমি তৃপ্তি পাই। আমার মনে খুবই শান্তি শান্তি লাগে। এটা আমার কাজ না, তবুও এদের খাবার নিয়ে না আসতে পারলে আমার ভালো লাগে না; আমি নিজেও খেতে পারি না ঠিকমতো। মনে হয়, এরা আমার পথ চেয়ে বসে আছে। আমি খাবার নিয়ে আসার পর আনন্দে ওদের ছোটাছুটি দেখলেই আমার মন ভরে যাই।”

অধ্যাপক ড. আলী আজম বলেন, “জাপানে আমি দীর্ঘ ১৪ বছর থেকেছি। সেখান থেকেই আমার ভেতর চেঞ্জটা আসে। জাপানে যেটা দেখেছি, তারা প্রত্যেকটা জীবজন্তুকে ভিতর থেকে দেখে। সেই ধারণা থেকে আমি প্রাণিদের জন্য অতীতেও কিছু করেছি। আর এই করোনাকালীন সময়ে যখন ২০২০ সালের মার্চে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। আমি যে হলের প্রভোস্ট তখন ওইখানে বেশ কিছু কুকুর নরমালি আসতো। তাদের চোখের দিকে যখন আমি তাকাইলাম। তখন মনে হলো তারা খুব ক্ষুধার্থ। ওই দিন থেকেই স্থির করেছিলাম যতটুকু পারি আমার সাধ্যমত তাদের কিছু রান্না করে খাওয়াবো। এখান থেকেই শুরু। সেই থেকে আস্তে আস্তে কুকুর, বিড়াল ও শিয়ালের সংখ্যা বেড়ে গেছে।”

তিনি বলেন, “আমি যেহেতু একা মানুষ, আমার পক্ষে তো সব এরিয়া কাভার করা সম্ভব না। তাই আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াজেদ মিয়া বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র থেকে উপাচার্জের বাসভবন হয়ে জয়বাংলা গেট পর্যন্ত একটা জোন করেছি। এই এলাকায় যত জীবজন্তু আছে, প্রতিদিন রাতে আমি এদের খাবার দেই।”

অধ্যাপক আলী আজমকে দেখে এখন অনেক শিক্ষক ও কর্মচারীরাও এগিয়ে এসেছেন অভুক্ত প্রাণীগুলোকে খাবার দিতে।

পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মোহাম্মদ ওবায়দুর রহমানের কোয়ার্টারের সামনে খাবারের জন্য জড়ো হয় বিড়াল ও গুইসাপ। প্রতিদিন বাজার থেকে পাঙ্গাশ ও তেলাপিয়া মাছ কিনে এনে এদের খেতে দেন এই শিক্ষক। এ ছাড়া বিভিন্ন আবাসিক হলের নিরাপত্তাকর্মীরা তাদের খাবারের কিছুটা অংশ এসব অবলা প্রাণীদের বিলিয়ে দেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ হোসেন হলের নিরাপত্তাকর্মী জাকির হোসেন বলেন, “আমাদের হলে অনেক বিড়াল ও কুকুর থাকত। করোনার সময় হল বন্ধ হওয়ায় কুকুর-বিড়ালগুলা খাবারের অভাবে ছোটাছুটি করে। তখন আমাগো হলের প্রভোস্ট স্যার নিজে বিড়াল আর গুইসাপগুলারে তার কোয়ার্টারের সামনে খাওয়ান। আমরাও আমাগো আনা খাবার মইধ্যে মইধ্যে ওগো দেই।”

পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক ও মীর মশাররফ হোসেন হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক মোহাম্মদ ওবায়দুর রহমান বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের শুরু থেকে বিড়ালগুলো আমার বাসার সামনে জড়ো হয়ে ডাকতে থাকত। একটা গুইসাপও মাঝে মাঝে রাস্তায় উঠে শুয়ে থাকত। তখন বিষয়টা আমার নজরে আসে। এরপর থেকেই ওদের জন্য বাজার থেকে পাঙ্গাশ ও তেলাপিয়া মাছ কিনে আনি, তারপর ওদের খাওয়াই।”

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১:০৯ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ২৮ আগস্ট ২০২১

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com