প্রকৃতিতে শরৎ এলো আনন্দের বারতা নিয়ে

শনিবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২১

প্রকৃতিতে শরৎ এলো আনন্দের বারতা নিয়ে
প্রচ্ছদঃ সংগৃহীত

বর্ষাকন্যা অশ্রুসজল চোখে বিদায় নিতে না নিতে বৃষ্টি– ধোয়া আকাশ হয়ে উঠেছে শরতে নির্মল । গাঢ় নীল আকাশ থেকে খানিক পরেই ঝরে পড়ছে সোনা সোনা রোদ। মেঘ মুক্ত আকাশে যেন জ্যোৎস্নার ফুল ঝরছে । ঝলমলে এই ঋতুতে শিমুল তুলার মত ভেসে বেড়াচ্ছে সাদা সাদা মেঘ ।শিশিরের মৃদু ছোঁয়ায় স্নিগ্ধ এখন ভোরের ঘাস। শস্যে – শিশিরে গোপন কি যেন কানাকানি । ব্যাকুলতার সুর বেজে চলছে আকুল মানবহৃদয়ে ।
প্রেম পূজারী শরৎভালোবাসার ঋতু ।শরৎকালে কখনো কখনো বৃষ্টি হয়, তবে বর্ষার মতো তেমন নয়। বরং শরতের বৃষ্টি মনে আনন্দের বার্তা বয়ে আনে। শরতের সৌন্দর্য বাংলার প্রকৃতিকে করে তোলে মায়াবী। সোনার বরন রূপ নিয়ে জেগে ওঠে সূর্য ।শরতের আকাশের সুন্দর্য যেমন ফুটে উঠে তেমন অন্য কোন ঋতুতে দেখা যায় না।
শ্রাবণ মাসের শেষে বর্ষাকালের বিদায় হলেও বৃষ্টি এখনো আনুষ্ঠানিক বিদায় নেয়নি। মাঝেমধ্যে ঘন কালো মেঘের সমাহার লক্ষ করা যাচ্ছে আকাশে। কোথাও অঝোরে বৃষ্টিও ঝরছে। তবে বেশিরভাগ সময় আকাশে ছেঁড়া ছেঁড়া, পেঁজা তুলার মতো শাদা মেঘ ভাসমান। শরৎ যেমন বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতিতে প্রভাব বিস্তার করেছে তেমনি সাহিত্যকর্মেও শরতের উজ্জ্বল উপস্থিতি লক্ষণীয়। যুগে যুগে কবি-সাহিত্যিকরা প্রকৃতি বর্ণনায় শরৎকালকে ব্যবহার করেছেন ।শরৎ নিয়ে কবি –সাহিত্যিকদেরও আগ্রহ –আকুলতার কমতি নেই আজও । বাংলার মহীরুহ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শরৎ নিয়ে রচনা করেছেন প্রচুর কবিতা-গান ।
লিখেছেন তিনি –
শরৎ তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি
ছড়িয়ে গেল ছাপিয়ে মোহন অঙ্গুলি।
শরৎ তোমার শিশির-ধোওয়া কুন্তলে,
বনের-পথে লুটিয়ে-পড়া অঞ্চল
আজ প্রভাতের হৃদয় ওঠে চঞ্চলি।
অনুপম রূপ সৌন্দর্যমণ্ডিত শরৎ ঋতু শারদ লক্ষী নামেও পরিচিত। শরৎকালের মধ্যেই যেন বাংলাদেশের হৃদয়ের স্পর্শ মেলে। তাই শরতের প্রকৃতি দরশনে অন্তরে প্রিয় মানুষের সান্নিধ্য লাভের বাসনা জাগাও অমূলক নয়। রবীন্দ্রনাথের এই রচনাটিই যার উৎকৃষ্ট প্রমাণ- ‘আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায়/লুকোচুরির খেলা।/নীল আকাশে কে ভাসালে/সাদা মেঘের ভেলা।’
শরৎ বন্দনায় কবি কাজী নজরুল ইসলামের অবদানও কম নয়। তিনি অসংখ্য গান ও কবিতায় শরতে বাংলার প্রকৃতির নিখুঁত আল্পনা এঁকেছেন। তার ‘শিউলি ফুলের মালা দোলে শারদ রাতের বুকে ঐ’, ‘এসো শারদ প্রাতের পথিক’সহ অনেক গানই শরৎ-প্রকৃতির লাবণ্যময় রূপের অপরূপ বর্ননা দিয়েছেন। কবি লিখেছেন –
‘এসো শারদ প্রাতের পথিক এসো শিউলি বিছানো পথে
এসো ধুইয়া চরণ শিশিরে এসো অরুণ-কিরণ রথে।
দলি শাপলা শালুক শতদল এসো রাঙায়ে তোমার পদতল
নীল লাল ঝরায়ে ঢল ঢল এসো অরণ্য পর্বতে।’
সীমানার প্রান্ত ছুঁয়ে উড়ে চলে গাঙচিলের স্থির নৃত্য,বাঁশঝাড়ে – কচুরিপানা থেকে ভেসে আসে ডাহুকের ডাক। বাতাসের সাথে সন্ধি করে কলকল ধ্বনি তোলা নদীতে চলে পাল তোলা নাও। শরতের নিজস্বতা মিশে রয়েছে কাশফুলের সঙ্গে। শরৎ মানে নদীর দুধারে প্রিয়ার গন্ধমাখা বাতাসে দোল খাওয়া সাদা সাদা কাশফুল কিংবা নীল আকাশে শুভ্র বকের সাড়ি।
কবি নির্মলেন্দু গুন লিখেছেন-
সবে তো এই বর্ষা গেল শরত এলো মাত্র,
এরই মধ্যে শুভ্র কাশে ভরলো তোমার গাত্র।
ক্ষেতের আলে নদীর কুলে পুকুরের ওই
পাড়টায়,
হঠাৎ দেখি কাশ ফুটেছে বাঁশ বনের ওই
ধারটায়।
আকাশ থাকে মুখ নামিয়ে মাটির দিকে নুয়ে,
দেখি ভোরের বাতাসে কাশ দুলছে মাটি
ছুঁয়ে।
কিন্তু কখন ফুটেছে তা কেউ পারে না বলতে,
সবাই শুধু থমকে দাঁড়ায় গাঁয়ের পথে চলতে।
ভাদ্র-আশ্বিন মাস জুড়ে বাংলাদেশে শরৎকালের রাজত্ব। প্রকৃতির বুকে এক অনাবিল আনন্দের ঝর্ণাধারা ছড়িয়ে দেয় এই ঋতু। এ সময় গাছে গাছে ফুটতে শুরু করে ছাতিম, বরই, দোলনচাঁপা, বেলি, শিউলি, শাপলা, জারুল, রঙ্গন, টগর, রাধাচূড়া, মধুমঞ্জুরি, শ্বেতকাঞ্চন, মল্লিকা, মাধবী, কামিনী, নয়নতারা, ধুতরা, কল্কে, স্থল পদ্ম, সন্ধ্যামণি, জিঙে, জয়ন্তীসহ নাম না জানা আরো নানা জাতের ফুল।
শরতের স্নিগ্ধ শোভাকে মোহনীয় করে শরতের বাহারি ফুলেরা। ঘরের আঙিনায় ফোটে শিউলি- শেফালি, খাল-বিল-পুকুর ডোবায় অসংখ্য জলজ ফুল। শেষ রাতের মৃদু কুয়াশায় ঢেকে থাকা মায়াবী শাপলা ফুলেরা রূপ বিলায় গ্রামের হাওর-বাওর,খাল-বিল জুড়ে ।
শরতের সৌন্দর্য বাংলার প্রকৃতিকে করে রূপময়। গাছপালার পত্রপল্লবে গুচ্ছ গুচ্ছ অন্ধকার ফিকে হয়ে আসতেই পাখপাখালির দল মহাকলরবে ডানা মেলে উড়ে যায় নীল আকাশে।আকাশের উজ্জ্বল নীলিমার প্রান্ত ছুঁয়ে মালার মত উড়ে যায় পাখির ঝাঁক। চারদিকে সজীব গাছপালার ওপর বয়ে যায় শেফালিফুলের মদির গন্ধভরা ফূরফুরে মিষ্টি হাওয়া।হালকা শিশিরে ভেজা দূর্বাঘাসের ওপর চাদরের মত বিছিয়ে থাকে সাদা আর জাফরন রং মেশানো রাশি রাশি শিউলিফুল।শরতের ভোরের এই সুরভিত বাতাস মনে জাগায় আনন্দের বন্যা।
গাঢ় আঁধারে উড়ে বেড়ানো জোনাকীর বোবা নৃত্য,হাসনাহেনা,গন্ধরাজ, দোলনচাঁপা, বেলী, শিউলী, কামিনী , বরই, শাপলা, জারুল, রঙ্গন, টগর, রাধাচূড়া, মধুমঞ্জুরি, শ্বেতকাঞ্চন, ধুতরা মল্লিকা, মাধবী, কামিনী, নয়নতারা, কল্কে, স্থলপদ্ম, কচুরী, সন্ধ্যামণি, জিঙে, জয়ন্তীসহ নাম না জানা শত ফুলের মৌ মৌ মুগ্ধকরা বাতাস, চারিপাশে পাতা নিঙরানো বৃষ্টির ফোঁটা, শেষে আবারো, দিগন্তজুড়ে সাতরঙে ফুঁটে উঠা সূর্যের আলো । এমন মনমাতানো দৃশ্য শুধু এক ঋতুতেই চোখে পড়ে। সে হল ঋতুর রাণী শরৎ।
শরতের মন মাতানো প্রকৃতিতে কী যে খুঁজে ফেরে মন, তা বোঝা বড়ই মুশকিল! প্রকৃতির মতো রোদ-বৃষ্টির দোদুল্যমানতায় মনের মধ্যেও যেন অভিমানের মেঘ জমে। কবি জসীমউদ্দীন শরতকে দেখেছেন ‘বিরহী নারী’ মননে।
কবি ‘নক্সী কাঁথার মাঠ’ কাব্যগ্রন্থে রূপাই আর সাজুর বিচ্ছেদ বেদনা এভাবে অঙ্কন করেছেন।
‘গণিতে গণিতে শ্রাবণ কাটিল, আসিল ভাদ্র মাস,
বিরহী নারীর নয়নের জলে ভিজিল বুকের বাস।
আজকে আসিবে কালকে আসিবে, হায় নিদারুণ আশা,
ভোরের পাখির মতন শুধুই ভোরে ছেয়ে যায় বাসা।
বাংলা সাহিত্যের শুদ্ধতম কবি জীবনান্দ দাশ ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যের ‘এখানে আকাশ নীল’ কবিতায় বলেন-
‘এখানে আকাশ নীল-নীলাভ আকাশ জুড়ে সজিনার ফুল
ফুটে থাকে হিম শাদা-রং তার আশ্বিনের আলোর মতন;
আকন্দফুলের কালো ভীমরুল এইখানে করে গুঞ্জরণ
রৌদ্রের দুপুর ভরে;- বারবার রোদ তার সুচিক্বণ চুল
কাঁঠাল জামের বুকে নিঙড়ায়ে;- দহে বিলে চঞ্চল আঙুল
বুলায়ে বুলায়ে ফেরে এইখানে জাম লিচু কাঁঠালের বন,
ধনপতি, শ্রীমন্তের, বেহুলার, লহনার ছুঁয়েছে চরণ;
মেঠো পথে মিশে আছে কাক আর কোকিলের শরীরের ধূল,’
শরৎ যেমন প্রকৃতিকে অপরূপ রূপে সাজিয়ে যায় তেমনি সংস্কৃতিতেও ব্যাপক পরিবর্তনের সূচনা করে মানুষের ক্লান্তি মোচনের ক্ষেত্র তৈরি করে। শরৎ অবসাদগ্রস্ত মনে নতুন প্রেরণার সঞ্চার করে। শরতের কাশবন আর জ্যোৎস্নায় প্রিয়জন সান্নিধ্যে হারিয়ে যাওয়ার বাসনা প্রবল হয়, শত কষ্ট গোপন করেও।
ঋতুবৈচিত্র্যের এ বাংলাদেশের প্রকৃতিতে কাঁপন তুলে আসে শরৎ। এক আশ্চর্য রূপমাধুরী নিয়ে ফেরে সে দ্বারে দ্বারে। এ যেন এক নিপুণ কারিগর। স্বর্ণরেণু দিয়ে গড়ে দেয় প্রকৃতি। তার পরশে প্রকৃতি হয়ে ওঠে ঢলঢল লাবণ্যময়। ধরণী হয়ে ওঠে শ্যামলে সুধাময়।
শরৎকাল শারদীয় আরাধনায় হিন্দু সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষকে যেমন উৎসবমুখর করে, তেমনি বিজয়ার বেদনায়ও করে তোলে ব্যথিত। শরৎ বাংলার প্রকৃতিতে আসে শুভেচ্ছা স্মারক হিসেবে, বহুমাত্রিক আনন্দের বারতা নিয়ে।

Facebook Comments Box


বাংলাদেশ সময়: ৬:১২ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২১

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com