বাবা দিবসের বিশেষ গল্পঃ

পিতৃদেব

রবিবার, ২১ জুন ২০২০

পিতৃদেব
পিতা স্বর্গ, পিতা ধর্ম, পিতাহি পরমং তপ।

Litearture 01

কাকিমা আর ক’টা  দিন অপেক্ষা করুন । অতিমারির পরিস্থিতি উন্নত হলে বাবা আবার কাজ করতে পারবেন । তখন আমরা আপনাদের বাড়ি ভাড়া পরিশোধ করে দিব।
না বাপু আর ক’টা দিন অপেক্ষা করতে পারব না । তুমি কি মনে করছ মেয়ে ? এই অতিমারি  শিগগির যাবে ?
অতিমারি কি চিরদিন থাকে ? একদিন সবই ঠিক হয়ে যাবে । আমাদের একটু দয়া করুন, কাকি ?
না দয়া-টয়া বুঝিনা । গত দু’ মাসের ভাড়া বাকি । এ মাসেও বলছ পরিস্থিতি  উন্নত  হলে দিয়ে দিবে। পরিস্থিতির কি কোন গ্রারান্টি আছে ? তা ছাড়া তোমার বাবার পায়ে ব্যথা । তখন বলবে বাবা কাজ করতে পারছেন না । আরো কিছুদিন অপেক্ষা করুন । ঐ সব ভিজা কথায় চিড়া ভিজবে না।  এক সঙ্গে দু’মাসের ভাড়া দাও নইলে ঘর খালি করে অন্যত্র চলে যাও, বাপু ।
এই লকডাউনের মধ্যে আমরা কোথায় যাব ?
কোথায় যাবে, না কি করবে ? তা তোমাদের বাপ-বেটির ব্যাপার। থাকতে হলে  ভাড়া পরিশোধ করতে হবে। একদম সাফ সাফ কথা।
তাগেদার এক ফাঁকে কাকি জিজ্ঞেস করলেন, তোমার বাবাকে দেখছি না । তিনি কোথায় ?
যে মালিকের রিকশা নিয়ে চালান  বাবা তার ওখানেই  গিয়েছেন । এক্ষুনি  ফিরবেন।
বিহারের এক গরিব রিকশা চালকের মেয়ে শ্রীমতি । জীবন আর জীবিকার তাগিদে বাবা রাকেশ শর্মা রিকশা চালান হরিয়ানার গুরুগ্রাম শহরে। কিছুদিন আগে রিকশা চালাতে গিয়ে এক দুর্ঘটনায় পড়েন বাবা । দুর্ঘটনায় ডান  পায়ে  প্রচন্ড আঘাত পান তিনি। বাবার দূর্ঘটনার সংবাদ পেয়ে পিতৃটানে বিহারের অজপাড়াগাঁ দ্বারভাঙ্গা থেকে ছুটে আসে হরিয়ানার গুরুগ্রাম পনের বছরের বালিকা শ্রীমতি শর্মা। আসার কিছুদিন পরেই ভারতসহ বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে মহামারি নভেল করোনাভাইরাস।  নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে হরিয়ানাসহ গোটা ভারতে লকডাউন ঘোষণা করা হয় । অনেক শ্রমজীবীর মতো হরিয়ানায় আটকে যায় বিহার রাজ্যের দারভাঙ্গার রিকশা চালক রাকেশ শর্মা ও তার মেয়ে শ্রীমতি শর্মা।


নভেল করোনাভাইরাসে লকডাউন হয়ে যাওয়ায় কাজকর্মের অভাবে আয় রোজগারের অবনতি ঘটায় বাড়ি ভাড়া দিতে না পারার বাবার পক্ষে এমনিই হররোজ বাড়িওয়ালার বউয়ের মুখে ভাড়া পরিশোধের তাগেদার মুখোমুখি হয় কিশোরি শ্রীমতি শর্মা।

কাজের জন্য ঘর ছেড়ে ভিনরাজ্য হরিয়ানায় থাকেন রাকেশ শর্মা। আর বিহারের বাড়িতে থাকেন তাঁর স্ত্রী কন্যা ও অন্যান্য সন্তানেরা। হরিয়ানায় রিকশা চালিয়ে যা উপার্জন করতেন তা থেকে  সেখানে নিজের চলার জন্য যতটুকুন প্রয়োজন তা রেখে বাকীটা পাঠিয়ে দিতেন বিহারে স্ত্রী-কন্যাদের কাছে। তা দিয়েই  কোনওরকমে পরিবার চালাত রাকেশের স্ত্রী প্রমিলা দেবী। কিন্তু মাস কয়েক আগে এক দুর্ঘটনায় পড়ে রোজগার বন্ধ হয়ে যায়। তারপর কিছু জমা টাকার উপর নির্ভর করে দিন চলছিল। কিন্তু করোনা সংক্রমণ এড়াতে লকডাউন যেন নাকের উপর বিষ ফোঁড়া হয়ে দাঁড়াল বাবা-মেয়ের কাছে । দরকারি ওষুধ কেনার টাকা দূরে থাক, দু’বেলা খাবার জোগাড় করতেই হিমশিম খেতে শুরু হয়ে বাবা-মেয়ের সংসারে। এদিকে কয়েক মাসের বাড়ি ভাড়া বাকি থাকায় বাড়িওয়ালার স্ত্রী তাগেদা দিতেন কিশোরি শ্রীমতিকে । যা তার কাছে ছিল অত্যন্ত লজ্জাজনক ও বিরক্তকর । এই অবস্থায় শ্রীমতি সিদ্ধান্ত নেয় আপাতত বাড়ি ফিরে যাবে বাবাকে নিয়ে।
সন্ধ্যার কিছু আগে বাবা ফিরে এলেন রিকশা গ্যারেজ মালিকের বাড়ি থেকে। এসে হতাশার এক নিশ্বাঃস  ছেড়ে বারান্দার কোনে চৌকির পাশের চেয়ারটায় বসে একটি সিগারেটের অর্ধেকটা খুব সাবধানে বের করলেন পকেট থেকে । যেটি দুপুরের দিকে অর্ধেকটা খেয়ে  অবশিষ্টাংশ পকেটে রেখে দিয়েছিলে। পকেটে আবারও হাত ঢুকিয়ে ম্যাচ লাইটার খুঁজতে গিয়ে দেখেন পকেটে  লাইটার নাই। তিনি সেখানে বসেই মেয়েকে ডাক দিলেন শ্রীমতি ?
ঘরের ভিতর থেকে সাঁড়া দিল শ্রীমতি,আজ্ঞে .পরক্ষনে আবার জিজ্ঞেসও করল তুমি কখন এলে বাবা ?
এই তো ! একটু সিগারেট জ্বালতে গিয়েছিলাম। দেখি পকেটে ম্যাচ লাইট নাই। তুই কি একটু আগুনের ব্যবস্থা করতে পারিস, বেটি?
তুমি বসো, আমি আসছি, বাবা।
শ্রীমতি একটি ম্যাচ লাইট এনে বাবাকে দিল।
বাবাকে  মিষ্টি করে ডাক দিয়ে জিজ্ঞেস করল, গ্যারেজ মালিকের  কাছে কেন গিয়েছিলে?  বাবা !
গিয়েছিলাম এই কারণে যে, লকডাউনে রিকশা চালাতে পারছিনা।  তাছাড়া পায়ের ব্যথাটাও কমছে না। আয় উপার্জন তো একদম নেই। এ পরিস্থিতে রিকশার মাসিক ভাড়া  কেমনে দেই ?
তো তিনি কি বললেন?
বললেন,  ঘাবড়াও মাৎ। পরিস্থিতি অনুকূলে না এলে ভাড়া দিতে হবে না।
তিনি খুব ভাল মানুষ, তাই না বাবা !
হ্যাঁ, খুব ভাল মানুষ। আমি আজ দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে ওনার গ্যারেজের রিকশাচালাই।
তোমার ওই বাড়িওয়ালা মানে বাড়িওয়ালার বউ কিন্তু বদের হাড্ডি।
কেন কি হয়েছে ? আবার এসেছিল নাকি?
হ্যাঁ, এসেছিলো।  মহিলার কি চ্যাটাং চ্যাটাং কথা। আমার একদম ভাল লাগেনা।
বাড়িওয়ালার বউয়ের সাথে কথোপকথনের সবিস্তারে বাবার কাছে উপস্থাপন করল। শ্রীমতি তখন তার বাবাকে বলল, বাবা,তোমার এখন কোন আয়-ইনকাম নেই। বসে বসে বাসা ভাড়া, রিকশা ভাড়া না গুনে চলো আমরা আপাতত বাড়ি ফিরে যাই। তাছাড়া তোমার চিকিৎসা খরচ তো আছেই। আমি আসার সময় মা বলেই দিয়েছেন, আমি যেন তোমাকে নিয়ে বাড়ি ফিরি।
ফিরি বললেই তো আর ফেরা যাবে না। গণপরিহণ বন্ধ। কীভাবে এতটা পথ পেরিয়ে বাড়ি ফিরবি, বেটি?
অনেকে তো হেঁটে যাচ্ছে ।
মেয়ের কথা শুনে হেসে ফেললেন রাকেশ । তুই কী জানিস এখান থেকে আমাদের বাড়ি কতটা দূর ?
কত দূর বাবা ?
হাজার ১,২০০ কিলোমিটার তো হবেই । তাছাড়া আমার পায়ে ব্যথা । আমি কি অতটা   পথ পায়ে হেঁটে যেতে পারব ?
তা হলে তুমি একটা কাজ করো, বাবা ।
কি কাজ ?
আমাকে একটা সাইকেল কিনে দাও ।
তোমাকে সাইকেলের পিছনে বসিয়ে দুই বাপ-বেটি চলে যাব হরিয়ানা থেকে বিহার ।
সাইকেলে চড়ার কথা শুনে আবারও হাসলেন বাবা । বললেন এটা ৩০-৪০ কিলোমিটার রাস্তা নয়, ১,২০০ কিলোমিটার, দূর্গম পথ । এতটা রাস্তা কী সাইকেল চড়ে যাওয়া যায় রে পাগলি ?
আমি ঠিকই পারব । তোমার মনে নেই আমি স্কুলের সাইকেল দৌঁড় প্রতিযোগীতায় ফাস্ট হয়েছিলাম।
সেটা ছিল ১০০ মিটার । আর এটা ১,২০০ কিলোমিটার ।
তবুও আমাকে পারতেই হবে । আমার বাবার অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে কেউ তাঁকে তিরস্কার করবে তা তুমি সহ্য করলেও আমি সহ্য করতে পারব না। বিশেষ করে ঐ নিরামিশ মহিলার চ্যাটাং চ্যাটাং কথা ।
স্কুলের ধর্ম সাস্ত্রে পড়েছি,
পিতা স্বর্গ, পিতা ধর্ম, পিতাহি পরমং তপ।
পিতোরি প্রিতিমা পন্নে প্রিয়ন্তে সর্ব দেবতাঃ।।
স্বর্গ,ধর্ম,তপস্যা সবই পিতার সন্তুষ্টিতে। পিতাকে সন্তুষ্ট করলে দেবতারাও সন্তুষ্ট হন।
ঠিক আছে ,বেটি। পিতাকে সন্তষ্ট করে যদি তুই দেবতাকে সন্তষ্ট করতে চাস আমি তাতে বাঁধ সাধব না । বাবার প্রতি মেয়ের অগাধ ভালবাসা আর লড়াকু মানসিকতা দেখে বাবা রাকেশ শর্মা একটি সাইকেল কিনতে রাজী হলেন ।
এমন সময় দূরের  মন্দির থেকে সন্ধ্যা পূজোর ঘন্টার ধ্বনি ভেসে এলো । পাশের বাড়ির বৌ-ঝিরাও উলু উলু স্বরে সন্ধ্যার বার্তা জানাতে লাগল ।
বাবার কথায় আশ্বস্ত হয়ে শ্রীমতি উঠে দাঁড়িয়ে  বলল, তুমি  বসে সিগারেট টান আমি সন্ধ্যে পূজোটা সেরে আসি, বাবা ।
পরের দিন রাকেশ এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে একটি সেকেন্ড হ্যান্ড বাই-সাইকেল কিনে ফেললেন। সাইকেল দেখে খুব খুশি হলো শ্রীমতি। বাবাকে বলল , আর দেরি নয় । বাড়িওয়ালার সব ঝামেলা চুকিয়ে দিয়ে আগামিকালই হবে আমাদের বাপ-বেটির সাইকেল যাত্রা । হরিয়ানা টু বিহার । বিশ্বে স্মরণীয় হয়ে থাকবে বাপ-বেটির সাইকেল যাত্রার এই ইতিহাস ।
তুই পারবি তো ?
ভগবানের কৃপা আর তোমার আশির্বাদে অবশ্যই পারব। আর ভারতবর্ষকে জানিয়ে দিব রাকেশ শর্মার মেয়ে শ্রীমতি শর্মা অবলা বালিকা নয়।  এক টুকরো ইস্পাত।
তাই যেন হয় মা, তাই যেন হয়। বলে রাকেশ শর্মা মেয়ের জন্য প্রাণখুলে আর্শিবাদ করলেন।
পরের দিন বাড়িওয়ালার সব দেনাপাওনা চুকিয়ে  দিয়ে বাবাকে সাইকেলের কেরিয়ারে বসিয়ে সাইকেলের প্যাডেলে পা রাখল পনের বছরের কন্যা শ্রীমতি শর্মা।
কয়েক কিলোমিটার যাবার পর বাবা একটি বটগাছ দেখিয়ে বললেন , ঐ যে বড় গাছটা দেখা যাচ্ছে ওখানে একটু দাঁড়াস তো বেটি,বড্ড চেষ্টা পেয়েছে । খানিকটা জল খেয়ে নেই ।
গাছের নীচে এসে সাইকেলে ঝুলিয়ে রাখা ব্যাগ থেকে এক বোতল জল ও কয়েকটা বিস্কুট নিজে খেল এবং মেয়েকেও খাওয়াল। খানিক বিশ্রাম নিয়ে আবার প্যাডেলে পা রাখল  শ্রীমতি।
সারাদিন সাইকেল চালিয়ে ক্লান্ত হয়ে এলো শ্রীমতি।  সূর্যও পশ্চিম দিগন্তে ঢলে গিয়েছে। আর কিছুক্ষণের মধ্যে ডুবে যাবে। রাতে কোথায় বিশ্রাম নিবে?  ভাবতে ভাবতে হাইওয়ের পাশে সাইকেলটা দাঁড় করালো।  এ সময়ে বাবাও সাইকেল থেকে নেমে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে খানিকটা দূরে গিয়ে বসল।
এমন সময় হাইওয়ে দিয়ে একটা লরি যাচ্ছিল। এই অবেলায় রাস্তায় পাশে সাইকেলে একাকি একটি মেয়ে দেখে লরিটা থামল।
কাছে এসেই কন্ডাকটর লরিতে বসেই  জানালা নামিয়ে জিজ্ঞেস করল, এই খুকি এই অবেলায় এখানে কি করো?
আমরা বিহার যাব।
আমরা মানে?  তোমার সাথে আর কে কে আছে?
আমার বাবা। শ্রীমতি আঙুল নির্দেশ করে দেখাল ঐ যে তিনি পেশাব করতে বসেছেন।
আমাদের লরিও বিহার যাবে। আমাদের সাথে যেতে পার ?
কন্ডাকটরের কথা শুনে  শ্রীমতি উচ্চস্বরে ডাক দিল বাবাকে,বাবা তাড়াতাড়ি এসো।
কেন ?
এই লরিটা বিহার যাবে।
তাই নাকি? ভগবান বোধহয় আমাদের কৃপা করেছেন।
রাকেশ  দ্রুত পা ফেলে  এসে লরির কন্ডাকটরকে জিজ্ঞেস করল, সত্যি  আপনারা ঐ দিকেই যাবেন দাদা ? হরিয়ানা থেকে এসেছি। আমার পায়ে খুব চোট । ছোট্ট মেয়েটি সাইকেল চালিয়ে নিয়ে এসেছে। খুব কষ্ট হয়েছে তার।  আমাদের  আপনাদের সাথে নিলে খুব উপকৃত হতেম।
এমন সময় ড্রাইভার চিৎকার দিয়ে জিজ্ঞেস করল, কিরে গণেশ প্যাচাল পারস ক্যা?
গুরু তারা নাকি বিহার যাবে ?
তা কত ভাড়া দিবে?
এবার গণেশ রাকেশ শর্মার দিকে  লক্ষ্য  করে জিজ্ঞেস করল, এই মশাই কত ভাড়া দিবেন ?
আমাদের কাছে তো ভাড়া দেয়ার মত অর্থ নেই দাদা ? মাত্র ছ’’শ রুপি আছে ।
গুরু তারা ছ’শ রুপি ভাড়া দিতে চায় । গণেশ তার ড্রাইভারকে ডেকে বলল ।
৬ হাজার রুপির ভাড়া ছ’ শ রুপি ?
সেকি আমার আর জনমে ঠাকুরদা’ ছিল নাকি ? যে  ছয় হাজার রুপির ভাড়া ছ’ শ’ রুপিতে নিতে হবে?  লরিতে নয় সাইকেল চেপেই যেতে বল । কথা না বাড়িয়ে চলরে গণেশ ।
লরিটা ভোঁ ভোঁ করে কালো ধোঁয়া ছেড়ে স্থান ত্যাগ করল ।
রাতে বাপ-বেটি সাইকেল চেপে নিগোহী শহরে হাইওয়ের পাশে একটি ফুয়েল পাম্প স্টেশনে রাত কাটাল। পাশের এক রেস্তোরার সকালের নাস্তা সেরে আবারও বিহারের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিবে ঠিক তখনই একটি লরি এসে ঢুকলো সেখানে । এবার রাকেশ নয় শ্রীমতি নিজেই এগিয়ে গেল লরির ড্রাইভারের দিকে । জিজ্ঞেস করল, কাকা আপনাদের লরি কোথায় যাবে ?
শ্রীমতি যখন ড্রাইভারের সাথে কথা বলতে ছিল তখন তার বাবা পুর্বের ড্রাইভারদের আচরন স্মরণ করে তার সাথে কথা বলতে বারণ করল । না জানি আবার কোন তিরস্কারের মুখে পড়ে ? শ্রীমতি তখন বাবাকে বলল, পৃথিবীর সব মানুষ কী এক রকম,বাবা ?
শ্রীমতির কথা শুনে ড্রাইভার নিজেই তাকে  জিজ্ঞেস করলেন, কেন বলতো সোনা ? ড্রাইভারের কোমল কন্ঠে জবাব।
ড্রাইভারের নমনীয় জবাব শুনে শ্রীমতি একটু ভরসা পেল । তাদের দূরাবস্থার কথা আগাগোড়া বিস্তারিত তাকে জানালো ।
তখন ড্রাইভার বললেন,  আমাদের লরি তো বিহার যাবে না। যাবে জৈনপুর । তাহলে তোমরা এক কাজ করো , আমাদের সাথে লখনৌ পর্যন্ত চলো । সেখান থেকে ফায়াজবাদ হয়ে সোজা বিহার পৌঁছতে পারবে ।
ভাড়া দেয়ার মত সামর্থ্য কিন্তু আমাদের নেই, দাদা। ড্রাইভারকে লক্ষ্য করে  বললেন রাকেশ ।
আরে মশাই, ভাড়া নিয়ে চিন্তা করতে  হবে না, চলুন আমার সাথে। হাসিমুখে  জবাব দিলেন ড্রাইভার।
রাকেশ তখন উপরের দিকে দু’হাত তুলে ভগবানের কাছে কৃতজ্ঞা প্রকাশ করে বললেন।
ভগবান, তুমি সত্যিই দয়াময় । যার কেউ নেই তার তো তুঁমিই আছো ।
শ্রীমতি ও তার বাবা লরিতে উঠে পড়ল । সঙ্গে সাইকেলটাও তুলে নিল। বাপ বেটিকে লখনৌ নামিয়ে দিয়ে লরি ছুটলো জৈনপুর অভিমুখে ।
আবার সেই দুই চাকাই ভরসা। তাঁর দৃঢ় সংকল্প, বাবাকে নিয়ে বাড়ি ফিরবেই। সত্যি সত্যিই সে বাবাকে সাইকেলের কেরিয়ারে বসিয়ে এক সময় পৌঁছে গেল নিজ বাড়ি দ্বারভাঙ্গা গ্রামে। যা কিনা কোনও অ্যাথলিকের পক্ষেও ছিল  যথেষ্ট চ্যালেঞ্জের ব্যাপার । বাবার জন্য সেই কঠিন কাজটিই কিনা হাসিমুখে সেরে ফেলল পনের বছরের  কন্যা শ্রীমতি শর্মা।
বাবাকে নিয়ে যখন বীরঙ্গণার বেশে বাড়িতে  পৌঁছিল তখন সে কি নির্লিপ্ত আনন্দ শ্রীমতির চোখে মুখে ! পাড়া-প্রতিবেশীরা এসে ভিড় করলো তাদের বাড়ি ।
এ সময় পাশের বাড়ির এক জেঠি জিজ্ঞেস করলেন,হরিয়ানা থেকে কবে যাত্রা করেছিলিরে শ্রীমতি ?
হরিয়ানা থেকে বিহারের উদ্দেশে কবে যাত্রা করেছিল তা ভুলে গিয়েছে  শ্রীমতি । শুধু বিড়বিড় করে জানায়, দিন আষ্টেক তো হবেই।

( একটি সত্য ঘটনা অবলম্বণে )

আটলান্টাঃ

শনিবারের চিঠি / আটলান্টা/ জুন ২১, ২০২০

লেখকের অন্যান্য বই অনলাইনে কিনতে এখানে ক্লিক করুনঃ রকমারি ডট কম

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ৩:৩৩ পূর্বাহ্ণ | রবিবার, ২১ জুন ২০২০

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com