পায়রা বিবি

শনিবার, ১৮ জুন ২০১৬

পায়রা বিবি

ছোট গল্পঃ

 


পায়রা বিবি
যুথিকা বড়ুয়া

 

Litearture 01বছর তিনেক আগে এক জলসায় গিয়েছিলাম। সেদিন ছিল ‘ভ্যালেনটাইনস্ ডে’। ঘরোয়া পরিবেশ হলেও পার্টি হলের ঝুলন্ত সুদর্শণ সোনালী রঙের ঝাড়বাতির ঝিকিমিকি আলোর কণায় বেশ রোমান্টিক লাগছিলো। মুহূর্তের জন্য মনে হচ্ছিল যেন, স্বপ্নের পৃথিবীতে চলে এসেছি। দেখলাম, তখনও থোকায় থোকায় লাল রঙের হার্টসেফের বেলুন আর সুবর্ণ আলোর মালায় চলছে ডেকোরেশনের পর্ব। তার ঘন্টাখানেক পরই শুরু হয়, চমকপ্রদ প্রসাধনের বাহার ছড়িয়ে, আতরের গন্ধ উড়িয়ে, হাসির ফোয়ারা তুলে বাহুবেষ্টিত যুগলবন্দী কপোত-কপোতীর পালা করে আগমন-কথোপকথনের গুঞ্জরণ; হাসির কলতান। ধীরে ধীরে আনন্দোৎচ্ছল সমারোহে ছেয়ে গিয়ে সৃষ্টি হয় এক মনোরম রোমাঞ্চকর পরিবেশ। বেশ উপভোগ্যই বটে! ক্ষীণ শব্দে গ্রামোফোন রেকর্ডে বাজজে পাশ্চাত্য সঙ্গীতের অপূর্ব মূর্ছণা। অন্যদিকে আগন্তুক অথিতিরাও উন্মত্ত চিত্তে কুশল বিনিময়ে মশগুল। পাশেই বিরাটাকারের একটি টেবিল জুড়ে সাজানো রয়েছে রকমারি আহারের চমৎকার বন্দোবস্ত। তার সাথে হুইস্কি, বীয়ার, ব্রান্ডি এবং সফ্ট ড্রিংক্সও আছে।

হঠাৎ দেখি, এক উর্বশী যুবতী রমণী ধুমকেতুর মতো আর্বিভূত হয়েই তার ডাগর চোখের অদ্ভুত দৃষ্টি মেলে কাকে যেনো খুঁজছে। তার চেহারা আর চটকদারী বেশভূষায় মনে হয়েছিলো যেন এক স্বপ্নপরী, স্প্যানিশ কন্যা। তারপরেই দেখি, ভ্রু-যুগল বাঁকা করে, চোখেমুখের বিচিত্র ইশারায় কাকে যেনো কি একটা সংকেত প্রেরণ করতে করতে গ্লাসে বিয়ার ঢালছে।

ঢেলে ফিল্মি হিরোইনদের মতো গ্লাসটা হাতে নিয়ে প্রাণবন্ত চঞ্চলতায় রহস্যাবৃত চোখদুটো ওর চড়কির মতো চারিদিকে ঘুরছে। হৃদয়ের দূকুল যেন ফূর্তিতে টগবগ করছে। কোমড় দুলিয়ে ইউরোপীয় ষ্টাইলে ছোট্ট ছোট্ট চুমুকে পান করতে করতে একটা সোফার গায়ে হেলায় দিয়ে দাঁড়ায়। দাঁড়াতেই দেখি, ভীড়ের মধ্যে থেকে পাগড়ি পরিহিত লম্বাটে সুঠাম, সুদর্শণ চেহারার এক তরুণ যুবক এসে ওর গা-ঘেষে দাঁড়ায়। সেও উচ্ছাসে একেবারে উতল। ৫৫৫ সিগারেটে অগ্নিসংযোগ করে পুরুষালী ইমেজে লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে তার মুগ্ধ চোখের দৃষ্টি মেলে আস্বাদন করতে থাকে, হৃদয়াকর্ষক সৌন্দর্য্যরে পারিজাত ঐ উর্বশী রমণীর বাঁধ ভাঙ্গা উত্তাল যৌবনের চমকপ্রদ রঙ আর রূপ। ইতিমধ্যে আশি দশকের একটি গান দিয়ে শুরু হয় জলসার প্রথম পর্ব। তারপরই উপস্থিত মন্ডলী সকলের দৃষ্টি আর্কষণ করে সেই উর্বশী রমণীর মনোমুগ্ধকর একটি নৃত্য পরিবেশনায়। সেটি ছিল একটি বাংলা ছায়াছবির গান, ‘গা ছম্ছম্ কি হয় কি হয়……থমথমে রাত যতই বাড়ে……খুব সাধা পায়রা বিবি……নজর কখন ছোবল মারে……ম্যায় হুঁ পায়রা পায়রা বিবি পায়রা পায়রা বিবি হাম।’

ক্ষীণ আবছা অন্ধকারে সুবর্ণ ঝিকিমিকি আলোর কণায় মুহূর্তের জন্য মনে হয়েছিলো, নৃত্যটি যেন রঙ্গিন পর্দায় প্রদর্শিত হচ্ছে। ঔৎসুক্য হয়ে সমগ্র উপস্থিত মন্ডলী সবাই মুগ্ধদৃষ্টিতে একেবারে উন্মত্ত চিত্তে নৃত্যটি উপভোগ করতে থাকে। কিন্তু জোরালো করতালি সহ একরাশ প্রশংসা কুড়িয়ে মন্ত্রের মতো হঠাৎ চোখের পলকে ওরা দুজনে কোথায় যে উধাও হয়ে গেলো, সেই রাতে ওদের আর দর্শণই পাওয়া যায়নি।

তার মাস ছয়েক পরের ঘটনা। সেদিন আকাশ ছিল মেঘাচ্ছন্ন। চারদিক নিঝুম, নিস্তব্ধ। বৃষ্টি পড়ছিল গুরি গুরি। তাই দৌড়ে যাচ্ছিলাম বাস ধরবো বলে। ইতিপূর্বে ট্রাফিক সিগ্ন্যালের গ্রীণ লাইটটা জ্বলে উঠতেই বাসটি দ্রুত পাস করে চলে গেল। আর তক্ষুণি মহিলা কণ্ঠস্বর কর্ণগোচর হতেই আমি থমকে দাঁড়াই। -‘আও ব্যাহেন আও, ইধার আও!’

পিছন ফিরে দেখি, একজন অচেনা যুবতী মহিলা। কাঁচের তৈরী বাসষ্টপেজের ছোট্ট শ্যাল্টারে বসে আছে। আশেপাশে কেউ নেই। বৃষ্টির ঝাপটায় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। খানিকটা বিস্ময় নিয়ে বাসষ্টপেজের দিকে এগিয়ে যাই, -কে এই মহিলা?

চোখে চোখ পড়তেই ঠোঁটের কোণে অস্ফূট একটা বিষন্ন হাসি ফুটিয়ে মহিলাটি ক্ষীণ মৃদু কণ্ঠে বলে ওঠে,-‘হায়, হাউ আর ইউ? পহেচানা? ম্যায় সুলোচনা। পায়রা বিবিকো এয়াদ হ্যায়?’

পায়রা বিবি? এ আবার কি নাম? এমন নাম হয় না কি কারো! কিন্তু এই নামে কাউকে তো চিনি না! কে এই মহিলা? ভাবতে ভাবতে মহিলাটির আপাদমস্তক নজর বুলাতেই চমকে উঠি। স্তম্ভিত হয়ে যাই বিস্ময়ে। -এ কি! এ তো সেই উর্বশী রমণী! ওর চেহারার এই হাল কেন! জরাজীর্ণের মতো নিথর, নিস্তেজ শরীর। চোখমুখ শুকিয়ে একেবারে গর্তে ঢুকে গিয়েছে। একদম কঙ্কালের মতো লাগছে। কোনো বিকার নেই। উচ্ছাস নেই। সাজ-সজ্জার বালাই নেই। কেশ বিন্যাশ এলোমেলো। প্রসাধনের অবস্থাও তদ্রুপ। পরনের পোশাকটি দামী হলেও মলিনতার ছাপ প্রকট।

ইত্যবসরে নাকের ডগা দিয়ে তীব্রবেগে পাস করে গেল আরো দুটো বাস। অথচ বাড়ি ফেরার কোনো তাগিদ বোধই করছে না সুলোচনা। মনে হচ্ছিল, প্রবল ঝড়ের মুখে উড়ে আসা মুমূর্ষ্যু পাখীর মতো নির্জনে চুপটি করে বিমূঢ় ভারাক্রান্ত মনে বসে আছে। সংসারে ওর কেউ নেই। বাড়ি ফেরার তাড়া নেই। ফেরার ইচ্ছাও নেই। ব্যাপারটা কি! কিছু ঘটেনি তো!
হ্যাঁ, ঠিক তাই। অনুমান মিথ্যে নয়। ওর সন্নিকটে গিয়ে দাঁড়াতেই আমায় জড়িয়ে ধরে সুলোচনা হুহু করে কেঁদে ওঠে। তারপর ধীরে ধীরে সাশ্রুনয়নে উন্মোচন হতে থাকে ওর প্রতারিত জীবনের করুন কাহিনী।

**********************************************************************

আজ থেকে প্রায় দশ বছর আগে নব-পরিণীতা সুলোচনা এ্যামিগ্রান্ট হয়ে কানাডায় পাড়ি দিয়েছিলো, প্রিয়তম স্বামী সন্দীপের হাত ধরে। জাতিতে ওরা দুজনেই মারাঠী। কোলকাতায় একই কলেজে একসাথে পড়তো দুজনে। সন্দীপের পিতা ছিলেন একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। তৎকালীন কোলকাতা শহরের পলিটিক্যাল্ পার্টির একজন বিশিষ্ট নেতা। উচ্চবিত্ত ও সম্ভ্রান্ত ব্রাহ্মণ পরিবারের বংশধর। তারই একমাত্র সুপুত্র সন্দীপ যোগলেকর। কিন্তু সন্দীপ ছিল ওর পিতার সম্পূর্ণ বিপরীত। রাজনীতি অঙ্গন থেকে একেবারে আলাদা। পড়াশোনার পাশাপাশি যন্ত্র সঙ্গীতেও ছিল সমান পারদর্শী। গীটার প্লে করতো সন্দীপ। ষ্টেজে পারফর্ম করতো। যা ওর পিতা যগমোহন যোগলেকর পছন্দ করতেন না। যে কারণে পিতা পুত্রের সম্পর্ক ভালো ছিল না। মুখ দেখাদেখি বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফলে পিতার সংস্পর্শ থেকে সড়ে এসে সন্দীপ ভাড়া বাড়িতে থাকতো। ইকোনোমিক্সে মাষ্টার্স করেই মাতা পিতার অজ্ঞাতসারে সুলোচনার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সস্ত্রীক পাড়ি জমায় কানাডার ভ্যাঙ্কুবার শহরে। তখন কচি বয়স সুলোচনার। আবেগে, উচ্ছাসে একেবারে উতলা। আচমকা নিজস্ব গন্ডি ছেড়ে বাইরের রঙ্গিন পৃথিবীতে পর্দাপণ করে সুলোচনা ধাঁধায় পড়ে গিয়েছিল। মনে করেছিল, আকাশের চাঁদটাই বুঝি পেয়ে গিয়েছে হাতে। আর নাগাল পায় কে! খুশীর পাল তুলে মুক্ত-বিহঙ্গের মতো একাই জীবন জোয়ারে ভাসতে থাকে। বিদেশী পর্যটকদের মতো প্রচন্ড বিস্ময় আর ঔৎসুক্য নিয়ে শহরের নানাবিধ মনোহরা দর্শণীয় স্থানগুলি একে একে ঘুরে দেখতে লাগলো। যখন রংধনুর মতো ওর হৃদয় আকাশে আবির্ভূত হয়েছিল চিরঞ্জিত সিং। ততদিনে সন্দীপের কাক্সিক্ষত বাসনাগুলি একে একে সব পূরণ হতে থাকে। মর্যাদাসম্পন্ন উচ্চপদস্থ সরকারি চাকুরী, দেশীয় ষ্টাইলে আলিশান বাড়ি, গাড়ি, বিলাসবহুল আসবাবপত্র, অর্থ-বিত্ত-ঐশ্বর্য্য, দামী শাড়ি-গহনা, সব পরিপূর্ণ। যখন স্বর্গসুখ ছিল সুলোচনার হাতের মুঠোয়।

ইতিমধ্যে সুযোগ্য পুত্র সন্দীপের আশাতীত সাফল্যের সুসংবাদে মনের ক্ষোভ, মান-অভিমান, অভিযোগ সব অপসারিত করে সন্দীপের মাতা-পিতা ভিজিট করতে চলে আসেন কানাডায়। যা স্বপ্নেও কোনোদিন ভাবতে পারেনি।

কিন্তু বিধি বাম। খন্ডাবে কে! অপ্রত্যাশিত যোগলেকর পরিবারে এতো সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, আনন্দ বিধাতার মঞ্জুর হলো না। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো একদিন মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় সন্দীপের অপমৃত্যুতে নিভে গেল সুলোচনার ভালোবাসার প্রদীপ। ভেঙ্গে চূড়মার হয়ে গেল ওর সোনার সংসার, ভালোবাসার রাজপ্রসাদ। অচীরেই ওর জীবনে ঘনিয়ে আসে অন্ধকার। চোখে পথ দ্যাখে না। যখন জীবন-নদীর খেয়া ওকে নিয়ে চলে অনিশ্চিত মোহনার দিকে। যেখানে কূল নেই, কিনারা নেই, নেই বেঁচে থাকার কোনো উপাদান। যা স্বপ্নেও কখনো কল্পনা করেনি সুলোচনা।

সদ্য স্বামী হারানোর শোকে কাতর মুহ্যমান সুলোচনার উপরে অমানবিকভাবে শুরু হয়, ওর শ্বশুড়-শ্বাশুড়ীর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, দুর্ব্যবহার আর মিথ্যে কলঙ্ক-অপবাদ লেপন। নিষ্ঠুর নির্দয়ের মতো তাঁরা প্রতিনিয়ত শুধু বলতেন,-’ডাইনি, রাক্ষসী, কুলাঙ্গার, পোড়ামুখী। দূর হ এখান থেকে। তোর কোনো অধিকার নেই এখানে থাকবার!’

অথচ ওনারা একবারও ভেবে দেখলেন না যে, অকাল বৈধব্যে তারুণ্যকে জলাঞ্জলি দিয়ে উনত্রিশ বছরের যুবতী মেয়ে একা কোথায় যাবে! কোথায় থাকবে! কিভাবে জীবনযাপন করবে! দূরদেশে যার কেউ নেই, সে কোন্ সাহারায় বেঁচে থাকবে! তখনি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসে প্রতারক, বিশ্বাসঘাতক চিরঞ্জিত সিং। যাকে বিশ্বাস করে মনে-প্রাণে ভালোবেসে সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়েছিলো সুলোচনা। আর সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করে, সুকৌশলে মিথ্যে আশ্বাস দিয়ে সুলোচনার অন্ধকার জীবনে আলোর পথ দেখাতে চিরঞ্জিতই ওকে ভ্যাঙ্কুভার থেকে নিয়ে আসে টরোন্টো শহরে। যদিও ওর অন্তরাত্মা সাড়া দিচ্ছিলো না, তবে বিবেকের দংশণের বিপরীতে নিজেকে শান্তনা দিয়ে সুলোচনা সেদিন মনে মনে ভেবেছিলো, দিনকাল বদলে গিয়েছে, বদলে গিয়েছে মানুষের রুচী, ধ্যান-ধারণা। সতীদাহ প্রথাও উচ্ছেদ করে দিয়েছেন রাজা রামমোহন রায়। তারুণ্যে বিধবার পূণর্বিবাহের রেওয়াজও বহুকাল থেকেই প্রচলিত। পাপ-পূণ্যের দোহাই দিয়ে, নিজের সাধ-আহাল্লাদ, কামনা-বাসনাগুলিকে বিসর্জন দেবার চেয়ে জীবনকে নতুন রঙ্গে, নতুন ঢঙ্গে সাজিয়ে তোলা ঢের ভালো।

কিন্তু নারীর মন বড়ই নাদান। মতলবী পুরুষমানুষের ভন্ডামী সহসা মনের আয়নায় ধরা পড়ে না। উপরন্তু সে আবেগের বশীভূত হয়ে, দৃঢ় বিশ্বাসে ভর করে ভালো-মন্দ যাচাই না করেই অন্ধের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে ভালোবাসার গহীন সমুদ্রে। যার কূল নেই, কিনারা নেই, গন্তব্যর ঠিকানা নেই, নেই বাঁচার কোনও পথ।

সুলোচনা মনস্থির করে, পুনরায় লেখাপড়া শুরু করবে। ইউনিভার্সিটিতে যাবে। স্বাবলম্বী হবে। নিজেকে সুপ্রতিষ্ঠায় প্রতিষ্ঠিত করবে। শুনে খুব খুশী হয় চিরঞ্জিত। উৎসাহিত করে সুলোচনাকে। কিন্তু ভিতরে ভিতরে ও’যে কী মতলব আঁটছিলো, তা ঘূণাক্ষরেও টের পায়নি সুলোচনা।

প্রতিদিন আর্লি মর্নিং-এ দুজনে একসাথে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতো। আবার বিকেলের দিকে যথাসময়েই বাড়ি ফিরে আসতো। সেদিন যথারীতি সুলোচনা বাড়ি ফিরে এসে দ্যাখে, ওদের ঘরের দরজাটা আলতোভাবে খোলা। ভাবল, চিরঞ্জিত এসে পড়েছে। এখুনি চা-জলখাবার তৈরী করতে হবে। এইভেবে দ্রুত ঘরের ভিতরে ঢুকেই মাথায় যেন ওর বজ্রাঘাত পড়ে।-এ কি, ঘর-দুয়ারের এ অবস্থা কেন? জিনিসপত্র সব এলোমেলো! চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। চিরঞ্জিত কোথায়? ওতো এখনো আসেনি? তবে কি বাইরের কেউ ঘরের ভিতর ঢুকে সব চুরি করে নিয়ে গেল!
দ্রুত এ-ঘর ও-ঘর নজর বুলিয়ে দ্যাখে, চিরঞ্জিতের পরনের জামা-কাপড়, কোট-টাই, দামী স্যুট কিছু নেই। লেদারের বড় একটা স্যুটকেস ছিল, সেটাও নেই। তার মধ্যেই সযত্নে রাখা ছিলো সুলোচনার কিছু গহনা, টাকা-পয়সা, ল্যাডিং পেপার, কানাডিয়ান সিটিজেনশীপ পেপার, পাসপোর্ট সব।
সুলোচনা বিচলিত হয়ে পড়ে। কি করবে দিশা খুঁজে পায় না। কিন্তু তখন একবারও মনে হয়নি, এসব চিরঞ্জিতের কাজ। চিরঞ্জিতই এসে সব হাতিয়ে নিয়ে গিয়েছে। ঘূণাক্ষরেও সুলোচনা টের পেলনা। এমনকী যে বাড়িতে ওরা থাকতো, সেটাও অন্যের মালিকাধিনে চুক্তিবদ্ধ করে গচ্ছিত রেখে গিয়েছে। শুধুমাত্র পড়নের কাপড় আর হাতের বালাদু’টিই ছিল একমাত্র সম্বল। একটা সুঁতো পর্যন্ত ছিলনা সুলোচনার।

অপেক্ষা করে বসে থাকে কখন চিরঞ্জিত আসবে। কিন্তু কোথায় চিরঞ্জিত? সন্ধ্যে পেরিয়ে ক্রমশ রাতের অন্ধকার ঘনিয়ে আসে। দুঃশ্চিন্তায় দুর্ভাবনায় অস্থির হয়ে ওঠে। কিন্তু কতক্ষণ! রাত পোহাতেই উদ্বেগ উ™£ান্ত সুলোচনার ক্রমশ মনের মধ্যে সন্দেহের দানা বাঁধতে শুরু করে। তবু কিছুতেই বিশ্বাস হয় না। মানতে পারে না। উল্টে অন্ধ ভালোবাসার মায়া মোহে সুলোচনার নিস্পাপ মন চিরঞ্জিতের অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকে। ওর দৃঢ় বিশ্বাস, চিরঞ্জিত কোথাও ফেঁসে গিয়েছে নিশ্চয়ই। ও’ ফিরে আসবেই। কেটে যায় কয়েক পক্ষকাল। কিন্তু চাকুরীর ইন্টারভিউ দেবার বাহানায় ঊষার প্রথম প্রহরে ঘন কূয়াশায় গা-ঢাকা দিয়ে বাড়ি থেকে সেই যে বেরিয়ে গিয়েছিল, আর ফিরে আসেনি চিরঞ্জিত।

অথচ মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধান। অন্যান্য দিনের তুলনায় সেদিন নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল চিরঞ্জিত। কিছুদূর গিয়ে পিছন ফিরে বেশ কিছুক্ষণ সুলোচনার মুখপানে পলকহীন নেত্রে তাকিয়ে ছিল। তখন মনে হয়েছিল, হয়তো কোনো প্রয়োজনেই বোধহয়! কিন্তু দৃষ্টিটা অন্যদিনের তুলনায় একটু ব্যতিক্রম মনে হতেই ঘর থেকে ছুটে বাইরে বেরিয়ে এসেছিল সুলোচনা। ইতিপূর্বে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই চিরঞ্জিত মুখ ফিরিয়ে মায়া মরীচিকার মতো চোখের নিমেষে মিলিয়ে গেল ঘন কূয়াশার মাঝে। তখন কি একবারও ভাবতে পেরেছিল সুলোচনা, চিরদিনের মতো বিদায় নিয়ে চিরঞ্জিত ওর জীবন থেকে একেবারে অদৃশ্য হয়ে গেল!

সুলোচনা আজ পথের ভিখিরি। অনুতাপ আর অনুশোচনার আগুনে দগ্ধ হতে হতে জীবনে চাওয়া-পাওয়া, বড় হওয়ার স্বপ্ন, আশা-আকাক্সক্ষা, বিশ্বাস-ভালোবাসা, ভালোবাসার ইচ্ছা-আবেগ-অনুভূতি, কামনা-বাসনা জ্বলে পুড়ে সব ছাই হয়ে গিয়েছে। মরে গিয়েছে ওর বেঁচে থাকার সাধ। কোনো কিছুতে আর আগ্রহ নেই. উৎসাহ নেই। কানাডার মতো দেশে থেকেও শুধু প্রাণটা নিয়েই এতিমের মতো শহরের অখ্যাত অলিতে-গলিতে অপদস্থ, প্রবঞ্চিত, লাঞ্ছিত ও নীপিড়ীত হয়ে অস্তগামী সূর্য্যরে মতো শুধু প্রহর গুনছে মৃত্যুর অপেক্ষায়।

শনিবারের চিঠি/ আটলান্টা / জুন ১৮,২০১৬

Facebook Comments Box

বাংলাদেশ সময়: ১০:৫৭ পূর্বাহ্ণ | শনিবার, ১৮ জুন ২০১৬

https://thesaturdaynews.com |

Development by: webnewsdesign.com